শোষিত-বঞ্চিত ও অধিকারহীন শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তাও আজ নেই
দেশের মোট শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা কতো তার সঠিক হিসাব কখনো কোনো সরকার রাখেনি। সর্বশেষ সরকারি জরিপ অনুযায়ী মোট শ্রমশক্তি প্রায় সাড়ে ৬ কোটি। এর মধ্যে নারী প্রায় ২ কোটি। মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৮ ভাগ কৃষিতে নিয়েজিত। মোট নারী শ্রমশক্তির প্রায় ৬৮ শতাংশ এবং পুরুষ শ্রমশক্তির ৪২ শতাংশ কৃষিকাজে যুক্ত। মোট শ্রমশক্তির ২০ শতাংশ প্রায় দেড় কোটি দিনমজুর। মোট শ্রমশক্তির ৩.৫ শতাংশ এবং এদের মধ্যে শহুরে শ্রমশক্তির ৬ শতাংশ ও গ্রামীণ শ্রমশক্তি ৩ শতাংশ নির্মাণ খাতে। আবার মোট শ্রমশক্তির ৮৭ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি। উৎপাদন ও পরিবহন খাতে শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ। শ্রমজীবী জনগণের ৮০ ভাগ গ্রামাঞ্চলে কর্মরত। দেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা কমপক্ষে ৭৪ লাখ। অন্যদিকে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা নারী পুরুষ মিলে প্রায় ৭০ লক্ষ। এরা বিগত ৪০ বছরে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকরা অনেক কষ্ট করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠালেও তারা নানাভাবে অপদস্ত হয় দেশে বিদেশে। মোট শ্রমজীবীর প্রায় ৪০ শতাংশ আবার অর্ধ বেকার বা প্রায় বেকার। বিশ্বের ২০টি শীর্ষ বেকারত্ব কবলিত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১২তম।
শ্রমিকরা কেবল সংখ্যার দিক দিয়েই বেশি নয়, দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তাদের অবদান অনেক বেশি। কিন্তু বাংলাদেশের এই শ্রমজীবীরাই সবচেয়ে বেশি শোষিত-বঞ্চিত অধিকারহীন। এমনকি বর্তমানে এই শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রেও জীবনের নিরাপত্তাহীন। শ্রমিকদের এই নিরাপত্তাহীনতা ভয়ংকর উদ্বেগজনক অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে। বিভিন্ন কলকারখানায় অগ্নিকান্ড, ভবন ধস ও বিভিন্ন দূর্ঘটনায় শ্রমিকদের মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। শুধু মাত্র গার্মেন্টস খাতে সাম্প্রতিক সাভার ট্র্যাজিডি সহ এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে, যাদের অধিকাংশ নারী। অথচ বারবার কর্মক্ষেত্রে নানা দুর্ঘটনায় বিপুল শ্রমিকের প্রাণহানী ঘটলেও, তাদের কর্মপরিবেশ ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। বিলস তথ্য মতে, ২০০৯ সালে ৩৭৮ জন শ্রমিক নিহত হয় এবং এর মধ্যে কর্মস্থলে দূর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ২৩৮ জন। আর ২০১২ সালে কর্মস্থলে এই শ্রমিক মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯০৩ জন। এ বছর কর্মস্থলে শ্রমিক মৃত্যুর তালিকা আরো দীর্ঘ হবে। যে গার্মেন্টস শিল্পখাতে দূঘর্টনায় শ্রমিকের মৃত্যুর হার বেশি, সেখানে এই খাতেই মালিকরা সর্বোচ্চ মুনাফা লাভ করে। সিপিডির তথ্যমতে, বাংলাদেশে পোশাক শিল্পে মুনাফার হার অবিশ্বাস্য—৫১৮ শতাংশ। অথচ আই এম এফ এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে শ্রমিকের গড় মজুরি সবচেয়ে কম, ১৮০ টাকা। নেপালে তা ৩৫০ টাকা এবং পাকিস্তানে ৬০০ টাকা। ডেনমার্কে একজন শ্রমিক দৈনিক মজুরি পায় প্রায় ৪৫০০ টাকা।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আই.এল.ও-র ৩৩ টি সনদ অনুমোদন করেছে, যার মধ্যে শ্রমিকের মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত সনদ ৭টি। কিন্তু শ্রমিকের ন্যায্য শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেই সঙ্গে দেশের শ্রম আইন বার বার সংশোধিত হলেও শ্রমিকের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বেতন ৫১ বার এবং মন্ত্রী-এমপিদের বেতন কয়েক বার বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকদের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা আজও বাস্তবায়িত হয় নি। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় যে সব আইন কানুন আছে সেগুলোও বাস্তবায়িত হয় না। শ্রম আদালতসহ ২৯ টি শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র মূলত অকার্যকর হয়ে আছে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় দেশের শ্রম আদালতগুলো কোনো ভূমিকাই পালন করে না। দেশের শ্রম আদালতগুলোতে ঝুলে থাকা হাজার হাজার মামলার কোন সুরাহা হয় না।
দেশে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার বেসিক ট্রেড ইউনিয়ন, ১১৫ টি ফেডারেশন, ৩২ টি জাতীয় ফেডারেশন এবং কয়েকটি গার্মেন্টস ফেডারেশন রয়েছে। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রম আইনের আওতায় আছে মোট শ্রমিকের মাত্র ২০ শতাংশ। বিশেষ করে অসংগঠিত, অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল সেক্টরের শ্রমজীবী জনগণ সবচেয়ে অধিকার বঞ্চিত। গৃহস্থালী শ্রমিক, দিন মজুর ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরাই সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্থ। শ্রম অধিদপ্তর সূত্র মতে, মোট শ্রমজীবীদের নগণ্য অংশ অর্থাৎ মাত্র ২৫ লাখ দেশের বেসিক ট্রেড ইউনিয়নগুলোর আওতাধীন। বিগত এক দশকে কমপক্ষে ৫ হাজার বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ায় শ্রমিক দুর্দশা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০১ সালে আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলা এবং এরপরে কোটা পদ্ধতি উঠে যাবার ফলে গার্মেন্টস শিল্পে ধস নামতে শুরু করে। কর্মচ্যুতির শিকার হয় প্রায় ১০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক, যার ৮০ ভাগই নারী শ্রমিক। এ অবস্থায় তাই শ্রমবাজারে অসহায় অবস্থার সম্মুখীন শ্রমজীবীরা। তাদের জীবনমান কমায় তারা কেবল বেকার হয়ে দারিদ্র্য দশায় পতিত হচ্ছে না, সেই সাথে শ্রমজীবী জনগণ দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে যে সব অধিকার অর্জন করেছিল, তাও আজ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এক সময় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ১১টি সেক্টরে কর্পোরেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। এর মধ্যে ছিল সরকার মালিকানাধীন ২২টি পাটকল, ১৬টি চিনিকল, ১৪টি বস্ত্রকল, ২২টি কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি ছাড়াও বন ও পরিবেশ, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইস্পাত-প্রকৌশল খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহ। বর্তমানে ৭টি সেক্টর কর্পোরেশনের অধীনে স্বল্পসংখ্যক শিল্প প্রতিষ্ঠান কোনো মতে খুড়িয়ে চলছে। বেসরকারিকরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক সরকারি কলকারখানা। বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান। এভাবে পথে বসেছে কয়েক লাখ শ্রমিক কর্মচারী। কেবল আদমজী পাটকল সরকার বন্ধ দেওয়ায় বেকার হয়েছে ২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। তাই কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারী খাতের অবদান এখন মাত্র ৪/৫ শতাংশ। বর্তমানে সরকারি শিল্পখাত বা কলকারখানার শ্রমিক কর্মচারীর সংখ্যা ৬৭ হাজার এবং সমপরিমাণ রয়েছে অস্থায়ী শ্রমিক। দেশের মোট বড়, মাঝারি শিল্প-কলকারখানার ৯৮ ভাগই এখন বেসরকারি মালিকানায়। বেসরকারি শিল্পখাতের ৮০ ভাগই হলো আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক বা ইনফরমাল সেক্টর। বিশ্বব্যাংক সূত্র মতে, সারাদেশে রিকশা শ্রমিকের সংখ্যা ৭০ লাখ। আর যান্ত্রিক যানবাহন শ্রমিকের সংখ্যা ৫ লাখের কাছাকাছি। দেশের ৪০ হাজার রাইস মিলে কর্মরত আছে ৭ লাখ শ্রমিক যার ৬৫ ভাগই নারী। বিশ্বব্যংকের নির্দেশে সরকারের সাম্প্রতিককালে বি-শিল্পায়ন বা দেশকে শিল্পহীন করার কুনীতি বাস্তবায়িত হওয়ায় ২৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ করা হয়। আরো ৪৫টিকে এভাবে ধ্বংস করার পাঁয়তারা চলছে। এ পর্যন্ত কমপক্ষে শতাধিক কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত মালিকানায় প্রদান করে রাষ্ট্রীয় খাতকে আরো সঙ্কুচিত করে অর্থনীতির বারোটা বাজানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বারবার ঘোষণা দিয়েও সরকার ১ হাজার ৮৮৯টি রুগ্ন শিল্পকে বাঁচাবার কোনোই পদক্ষেপ নেয়নি। বিসিআইসির অন্তর্ভুক্ত ২২টি কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে ইতোমধ্যে ১১টি বন্ধ হয়ে গেছে। ওই ১১টির মধ্যে আবার ৮টি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে বিভিন্ন চিনিকল ও ইস্পাত-প্রকৌশল সংস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চিনি ও খাদ্য সংস্থার ১৮ হাজার, কেমিকেল সংস্থার ১২ হাজার, ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার ৩ হাজার ৩শ’ ৬০ জন শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের প্রায় ৩০০ ফাউন্ডি বা ঢালাই লোহা কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রায় ৯০ হাজার মানুষ বেকার হয়েছে। কেবলমাত্র সর্বশেষ ৩ বছরে কয়েক হাজার কলকারখানা বন্ধ হওয়ায় আরো ১৫ লাখ নয়া বেকার সৃষ্টি করেছে সরকার। ফার্নেস অয়েল সরবরাহ বন্ধে সরকারি ঘোষণার ফলে ৬ হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠানে এখন উৎপাদন বন্ধ এবং পুরোপুরি বন্ধ আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠান। এভাবে শ্রমের বাজারে বেকার ও অর্ধ বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে লক্ষ লক্ষ কর্মক্ষম শ্রমিক। উপরন্তু গত ১৪ বছরে ২ লাখ ২৭ হাজার তাঁতী বাধ্য হয়ে তাদের পেশা ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এ অবস্থায় ট্রেড ইউনিয়ন তথা শ্রমিক আন্দোলন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ায় শ্রমিকদের অসহায়ত্ব ও বিপন্নতা আরো বাড়ছে। কারণ দেশের শ্রমজীবী জনগণ সাংগঠনিকভাবে সংগঠিত হবার সুযোগ পাচ্ছে না। শ্রমবাজারে দেরিতে আসা নারী শ্রমিকরা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে অধিকার হারা। অন্যদিকে সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়নের উপরও নানাভাবে আঘাত হানা হচ্ছে। শিল্প, শ্রমিক ও দেশের স্বার্থবিরোধী দালাল ও সন্ত্রাসী ট্রেড ইউনিয়ন নেতা তৈরি, পেশী শক্তির দাপটে ট্রেড ইউনিয়ন দখল, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে বিশৃঙ্খলা বলে আখ্যায়িত করা ইত্যাদি নানাভাবে ট্রেড ইউনিয়নকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা চলছে। ১৯৯৮ সালে বিশ্বব্যাংকের ফরমায়েস মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকে ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ করে। এটাই ট্রেড ইউনিয়নের উপর সরকারের প্রথম প্রকাশ্য আঘাত। সম্প্রতি দেশের প্রচলিত শ্রম আইন ও শ্রম অধিকার ভঙ্গ করে গার্মেন্টস মালিকদের আবদার অনুযায়ী শ্রম মন্ত্রণালয় গার্মেন্টস কারখানায় সাপ্তাহিক ৭২ ঘণ্টা শ্রম দায়ের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর মাধ্যমে আসলে ফ্যাসিস্ট কায়দায় শ্রমিকদের অর্জিত অধিকারই হরণ করা হয়েছে। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে সংগ্রামী, দায়িত্বশীল, গঠনমূলক ও গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হবে।


মন্তব্য নেই
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.