প্রসঙ্গ: ভাষার উৎসের সন্ধান
সমাজের সংস্পর্শ ছাড়া ভাষা শেখা সম্ভব নয়। মানুষ ভাষা শুনে শুনে শেখে। তাই সমাজে বসবাসরত মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যদিয়েই ভাষার শিক্ষা হয়। মোগল সম্রাট আকবর দুটো আলাদা নির্জন স্থানে দুটি শিশুকে দুজন মহিলাকে দেখাশোনার ভার দিয়ে শিশুদের সাথে কথা বলা বারণ করে চার বছর পরে দেখতে পান শিশুদুটি কোনো ভাষাই শিখতে পারেনি। কারণ বাস্তব সামাজিক সম্পর্কে আসতে না পারার কারণে তারা ভাষা শিখতে পারেনি কিন্তু ভারতীয় পৌরাণিক গ্রন্থে বর্ণিত বহু কাহিনিতে অতিপ্রাকৃত শক্তিকেই ভাষার উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে দেবতার ইচ্ছাতেই এই ভুবন এবং ভাষার আবির্ভাব। কাহিনিতে বলা আছে, একটা সোনার ডিম থেকে প্রজাপতি ব্রহ্মার জন্ম হয়েছে। জন্মের পরে ব্রহ্মা একবছর চুপ থেকে কথা বলেননি, তাই শিশুরা জম্মের একবছর পরে কথা বলা শেখে। কোনো কার্যকারণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই বহু শতাব্দি ধরে মানুষ ভাষার এই দৈব উদ্ভবের কাহিনীতে বিশ্বাস স্থাপন করে রেখেছে। এগুলোর অবাস্তবতা নিয়ে অনেকের মধ্যে এখন আর বিতর্ক না থাকলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও অতিপ্রাকৃত শক্তিকেই মানুষের ভাষা শেখার উৎস বলে মনে করে।
ভাষা শব্দের উৎপত্তির বিষয়ে সক্রেটিস মনে করতেন, ভাষার শব্দগুলো কোনো না কোনো শিল্পীর সৃষ্টি। শিল্পী যেমন করে রং-তুলি দিয়ে ছবি আঁকেন তেমনই, তার মতে বস্তুর ধ্বনির অনুকরণে প্রাকৃতিক নিয়মেই শব্দ গড়ে ওঠে, যাঁরা এই মতের সাথে একমত হতে পারেননি, তাঁরা মনে করতেন শব্দের উৎপত্তি হয়েছে কনভেনশন বা প্রথাগত নিয়মে। যার সাথে বস্তুটির প্রত্যক্ষ কোন সম্পর্ক নেই, ভাষায় শব্দের উৎপত্তি নিয়ে এই Nature-Convention বিতর্কটি জুলিয়াস সিজারের কাল পর্যন্ত চলেছে। প্লেটো মনে করতেন চিন্তা হলো নিজের সঙ্গে আত্মার কথোপকথন। ‘ধ্বনি বা স্বর সেখানে কিছুই নেই’। সেই চিন্তা ঠোঁটের মাঝখান দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেই তা হয়ে যায় ভাষা। অর্থাৎ মনকে প্রকাশ করার যে ক্ষমতা তারই প্রতিনিধিত্ব করে ভাষা। হবসের মতে ভাষিক ক্ষমতার পিছনে রয়েছে ঈশ্বরের একটি প্রাথমিক অবদান, তবে মানুষকে তার নিজের উদ্যোগেই শিখে নিতে হয় শব্দভান্ডার ও ভাষার গঠনগত উপকরণ। ঈশ্বর ওগুলো শিখিয়ে দেন না।
ভাষার উৎপত্তি প্রসঙ্গে অনেক ভাষা বিশ্লেষকদেরই ভাবনা হলো, মানুষের আবেগজাত ধ্বনির অনুকরণেই ভাষার উদ্ভব হয়েছে। মানুষের আদিম অবস্থায় আবেগের সহজাত প্রকাশ হিসেবে কিছু ধ্বনি উৎপন্ন হত, বা যোগাযোগের আকাঙ্ক্ষার কিছু ধ্বনি ব্যবহার করত, সেই সব ধ্বনির অনুসারীর শব্দভান্ডারই ভাষার মৌলিক ভিত্তি। প্রাচীন ভারতে ব্যাকরণের আলোচনায় ভাষার ধ্বনির বর্ণনায় বাক-অঙ্গের যোগ পাওয়া যাবে। কারণ ধ্বনিগুলো সেভাবে সাজানো হয়েছে—কণ্ঠ, তালব্য, দন্ত ইত্যাদি। সে তুলনায় প্রাচীন ইউরোপেও পৃথকভাবে ব্যাকরণের আলোচনা শুরু হয়েছে অনেক পরে। গ্রিক ব্যাকরণবিদদের আলোচনার ভাষার আলোচনা পৃথকভাবে ছিল না। অন্যান্য দর্শন বিষয়ক আলোচনার সাথে মিশে ছিল। তাঁরা জানতেন, দেহের অস্তিত্ব বাস্তব কিন্তু মন, যা দিয়ে এই জগতের উপলব্ধি হতে থাকে, তার আশ্রয় দেহের অভ্যন্তরে না বাইরে, মন দেহ বিযুক্ত কোন শক্তি, নাকি দেহেরই ধারাবাহিক বিবর্তনের পথে নানা অঙ্গের ক্রিয়া-বিক্রিয়ার পরিনতিতে মানের আপেক্ষিক পৃথক অস্তিত্ব রয়েছে—এসব নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
ভাষাবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং দার্শনিকদের মধ্যে প্রায় সবার আলোচনায় ঠাঁই পেয়েছে, মনের সঙ্গে ভাষার যে সম্পর্ক রয়েছে তা পরোক্ষ না প্রত্যক্ষ? তবে প্রাথমিকভাবে মনের আপেক্ষিক স্বাধীনতা বা অস্তিত্ব স্বীকার না করলে ভাষার বিমূর্ত কাঠামোগত ব্যাপারটিকে একটা ভিতের উপর দাঁড় করানো সম্ভব নয়। ভাষা ব্যবহারের যে একটি আপেক্ষিক স্বাধীনতা রয়েছে এবং মননের যে এক ধরনের স্বয়ংক্রিয়তা রয়েছে, সেই ধারণাটি গড়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভাষা কি কেবল অঙ্গনির্ভর? এটা স্বীকার করলে ভাষার কাঠামোগত আপেক্ষিক স্বাধীন অবস্থাটির কোন প্রয়োজন থাকে না, সেটি উপেক্ষিত হয়, অঙ্গের ভূমিকা এখনও অস্পষ্ট। অঙ্গের নানা বৈচিত্র রয়েছে, তারা অঙ্গ-উপাঙ্গের গঠন ও ক্রিয়ার সাপেক্ষে কাজ করে। সুতরাং অঙ্গের আন্দোলনের সঙ্গে ভাষিক উপকরণের সমান্তরাল সম্পর্ক রহস্যাবৃত্ত। কারণ অঙ্গের প্রভাব শুধু ভাষার কাঠামো নির্ভর নয়। মস্তিষ্ক নামক মানুষের অঙ্গের কথা যদি বলি, তাহলে তার কাজ তো সীমাহীন। মস্তিষ্কের মধ্যে লক্ষ লক্ষ স্নায়ুতন্ত্রের বহুত্ব, বৈচিত্র্য রয়েছে যেগুলোর ভূমিকা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ভাষায় যে মস্তিষ্কের ভূমিকা বয়েছে, তা স্পষ্ট।
ভাষার উৎসের বিষয় মতামতকে গ্রহণযোগ্য হতে হলে ভাষার কাঠামো নিয়েও কথা বলতে হয়। ভাষার কাঠামো আছে, এবং এর পিছনে সুশৃঙ্খল নিয়মও আছে। প্রাচীন কাল থেকেই দেশে দেশে ব্যাকরণের পর ব্যাকরণ রচনা করে কাঠামোর বিষয়ে যে নিয়ম কাজ করে তা প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন আসে এসব নিয়মের আধার কী? এর আশ্রয় কোথায়? ভাষার কাঠামোর প্রয়োগের একটা আপেক্ষিক স্থান দরকার। যেখানে বয়েছে ভাষার সঙ্গে মননের সম্পর্ক যা উপেক্ষা করা যায় না। দেহ ও মনের, সম্পর্ক নিয়ে দার্শনিক বিতর্ক দেহের সামর্থ, জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা শাখার ও সমাজবিকাশের তাত্ত্বিক ভাবনাগুলোর সাপেক্ষেই কেবল ভাষার উৎসের বিষয় মতামতটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে এবং ভাষার উৎসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটি আরও স্পষ্ট হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে মনের স্বরূপটি ঠিক ভাবে বুঝতে না পারলে, সেটিই আবার ভ্রান্তির কারণ হতে পারে। কারণ সত্য জানার ক্ষেত্রে দু’টি পদ্ধতি কাজ করে। কেউ মনে করেন ‘মন’ ঈশ্বরের দান। সুতরাং মনের আধিপত্যের বিষয়গুলো নিয়ে তেমন কোনো অনুসন্ধানের প্রয়োজন থাকে না। আরেক দল রয়েছেন, তাঁরা বস্তুজগতের যে নিয়ম প্রকৃতিতে বিরাজ করে সেই নিয়মের অনুসরণে মনকে জানতে চান, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ভাষায় অঙ্গের বিষয়টি সব নয়, মনের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই সেই মন যখন মনে করে ভাষা ঈশ্বরের দান তখন আর অনুসন্ধানের কোনো পথ খোলা থাকে না এবং কোনো কার্যকারণভিত্তিক যুক্তি দিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ সেখানে বস্তুজগতের কোন নিয়মই কাজে লাগে না। কিন্তু বস্তুজগৎ যে নিয়মে চলছে, সেই ভাবনাকে যারা বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে ভাষার বিমূর্ত-কাঠামোর পেছনে বাস্তব ঘটনাটি কী এবং বিজ্ঞানমনষ্ক ভাবনা দিয়ে কীভাবে বিষয়টির সমাধান করা যায় সে চেষ্টাই অব্যহত রেখেছেন।
ভাষার উৎপত্তি বিষয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে দু’টি ধারা পরিলক্ষিত একটি ভাববাদী ধারা অন্যটি বস্তুবাদী। মূলত দার্শনিক দৃষ্টিতেই এ দুটো ধারার পার্থক্য রয়েছে। একটি ধারা মনে করে মনই সত্যের নির্ধারক, সত্যের অবস্থানই হচ্ছে মনে। এখানে মন যা ভাবছে, তা বাস্তব সম্মত কিনা, তা বিচারের কোনো প্রশ্নই নেই। এটি হলো ভাববাদী। অন্য ধারাটি বাস্তব জগতের বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাগুলোর বিচার ও ইতিহাসলব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়ালে অনুসন্ধানের পথ খোলা থাকে।
ভাষার উৎসের আলোচনায় বিবর্তনের বিষয়টিও জরুরি। কারণ মানুষের শ্বসন প্রক্রিয়ার যে কাঠামো প্রকৃতি থেকে প্রাণের মৌলিক উপকরণ অক্সিজেন সংগ্রহ করে জীবদেহকে চালনা করছে সেটির সঙ্গে যুক্ত একটি অঙ্গ কীভাবে বিবর্তনের আর একটি পর্যায়ে ধীরে ধীরে স্বরতন্ত্রী হিসেবে গড়ে উঠেছে তা জানা দরকার। অর্থাৎ সেই শ্বসনযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য প্রত্যঙ্গগুলোও ধীরে ধীরে নতুনভাবে আন্দোলিত হতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। ভাষার আবির্ভাব তারই একটি পরিণতি। আদিম মানুষের মধ্যে আধুনিক মানুষের বহু বৈশিষ্ট্যই ছিল না। তাদের মস্তিষ্কের আকৃতি দেখলে বোঝা যায় জটিল কর্মপরিচালনার ক্ষমতা তাদের ছিল না। ছিল না শ্বসনযন্ত্রকে বাকযন্ত্রে রূপান্তরিত করে ভাষা ব্যবহারের জন্য প্রযোজনীয় মুখবিবর। যেখানে জিহ্বা স্বরতন্ত্রীর সঙ্গে যোগ রেখে বিশেষ বিশেষ ধ্বনি উচ্চারণের সহযোগী হয়ে গড়ে উঠতে পারে। জীবজগত থেকে মানুষের সরে আসার এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারন এটি নির্ভর করে মুখবিবরের মধ্যে পরিসরের মাত্রার ওপর। বিবর্তনের এই নৃতাত্ত্বিক ঘটনাই ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মুখবিবরে প্রযোজনায়, পরিমিত শূন্যস্থানের জন্ম দিয়েছিল। ফলে এর সুবাদেই ওপরের বাকযন্ত্রে ও স্বরতস্ত্রীর সংযোগে বায়ুগমনাগমনে মুখবিবরের বিভিন্ন স্থানে, নানাভাবে মুখ-বিবরস্থ বায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, শ্বাসবায়ুপ্রবাহে বাধার বৈচিত্র্য দিয়ে ধ্বনির বৈচিত্র্য সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। ফলে উদ্ভব হয়েছে ধ্বনির ব্যবহার যা মৌখিক যোগাযোগের ভিত্তি হিসেবে প্রকাশ পেতে থাকে। এই বৈচিত্র্যই মানুষকে অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের থেকে আলাদা করতে থাকে। ভাষাতত্ত্বে এই সময়কালকেই ধ্বনি সৃষ্টির শুরু বলে চিহ্নিত করা হয়। বিবর্তনের ঘটনা একটির সাথে অন্যটি যুক্ত হয়ে থাকে। একটির পরিবর্তন অন্যটির ওপর প্রভাব ফেলে। যখন কথা বলে, তখন স্বরতন্ত্রীর উপরের ফ্যারিংস ও মুখবিবরের আকৃতির পরিবর্তন, ভাষার ধ্বনি বৈচিত্র্যের জন্ম দিতে পারে। এটি না ঘটলে মানুষের পক্ষে এতো ধ্বনি উচ্চারণ করা সম্ভব ছিল না।
বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ছোট ছোট অঙ্গগত পরিবর্তনগুলো ঘটে কোটি কোটি বছর ধরে। আজকের বাকযন্ত্রগুলো বাক সৃষ্টিতে যেভাবে ব্যবহৃত হয় সেগুলোর ছিল ভিন্ন ভিন্ন অ-ভাষাতাত্ত্বিক শারীরিক ভূমিকার পরিণাম। যেমন ল্যারিংসের (কণ্ঠনালী) স্বরতন্ত্রী হয়ে গড়ে উঠতে লেগেছে তিন কোটি বছর।
বাকযন্ত্রগুলো বাক সৃষ্টিতে বিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কিত তাত্ত্বিক আলোচনার পরে পরে এক্ষেত্রের ব্যাখ্যায় বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের ভাষার উৎস সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন এনেছে। ফলে অতিপ্রাকৃত শক্তির ভাবনা অনেকটা পেছনে চলে যায়। বাস্তব জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যাঁরা ভাষার উৎস সন্ধান করেছেন তাঁদের মধ্যে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি মনে করতেন, সবধরনের ভাববাদী চিন্তার অন্যতম উৎস ছিল মানুষের ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা। অজ্ঞতার মূল কারণ, জাগতিক ঘটনার পেছনে প্রকৃতি ও বস্তুজগতের যে নিয়ম কাজ করে চলছে। সেই ধারণা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখা। মানুষ যেন ঘটনার কার্য-কারণ কি, তার যুক্তিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভাবনা দ্বারা পরিচালিত না হন। কার্য-কারণ যুক্তিতে পরীক্ষা নিরীক্ষার, ভাবনার দ্বারা পরিচালিত হওয়ার, ক্ষেত্রে এ্যাঙ্গেলসের মতে সৃজনশীল মানুষ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যেখানে তাদের মধ্যে পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগের প্রয়োজন হয়েছিল। সেই প্রয়োজনীয়তাই বাধ্য করেছিল মানুষের বাক-অঙ্গের পরিবর্তন ঘটাতে। একশ্রেণির অব্যবহৃত স্বরযন্ত্র ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে একটা সামঞ্জস্যবিধানের দিকে বিবর্তিত হচ্ছিল, তাদের চেষ্টা ছিল ক্রমাগত আরও উন্নত রূপে পাওয়া। এভাবেই ভাষায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে নতুন নতুন স্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করতে সমর্থ করে তোলে।
মানুষের কেন্দ্রিয় অঙ্গ হলো মস্তিষ্ক। ভাষা কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের সাথে যুক্ত এবং তার একটি নিজস্ব প্রক্রিয়া রয়েছে। এটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিন্যস্ত। যেটির সাথে নির্দিষ্ট বাক অঙ্গের সামর্থও যুক্ত। তাই ভাষা ব্যবহারের আঙ্গিক জটিলতাগুলো খেয়ালে রাখার মতো। স্বরযন্ত্রের, পরিবর্তন ঘটলে, তার সাথে তাল মিলিয়ে মস্তিষ্কের পরিবর্তন ঘটে। কারণ মানুষের শরীরের যে কাঠামো তার কেন্দ্রিয় অঙ্গ হল মস্তিষ্ক। বিজ্ঞানী পাভলভ দেখিয়েছেন, মানব মস্তিষ্কে রয়েছে একটি বিশেষ ক্ষমতা, যা অন্য কোনো প্রানীর নেই, তা হলো, দ্বিতীয় সংকেতন্ত্র। তিনি এও দেখালেন, ভাষা কেবল বাস্তবের সংকেত নয়, সংকেতের সংকেত, যেটির গ্রাহকযন্ত্র রয়েছে মানব মস্তিষ্কে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কথা বলার সময় প্রতি সেকেন্ডে মস্তিষ্ক থেকে ১৪০০ রকমের নির্দেশ পালন করতে হয় বাক-অঙ্গ ও অন্যান্য প্রত্যঙ্গগুলোকে কেন্দ্রিয় স্নায়ুব্যবস্থার অঙ্গ হিসেবে মস্তিষ্ক যোগাযোগের ব্যাপারগুলো পরিচালনা করায় মস্তিষ্কের আকৃতিও বিস্তৃত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন্যপায়ীদের মধ্যে মানুষ গোত্রীয় প্রাণিদের মস্তিষ্কের আকৃতি বেশ বড়। এদের ওজন প্রায় ১৩০০ গ্রাম। ধীরে ধীরে এই গোত্রের মস্তিষ্কের জটিলতা যত বাড়ছে ততই মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে শক্তির বিকাশ ঘটেছে। ফলে হাতের ব্যবহার, দুপায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানো, সরল থেকে জটিল যন্ত্রের ব্যবহার এবং ভাষা ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করেছে। অর্থাৎ বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়, একদিকে যেমন আঙ্গিক বৈচিত্র্য বেড়েছে, তেমনি মননের বৈচিত্র্য এবং সেই রীতিতে মস্তিষ্কের ক্ষমতাও পরিবর্তিত হয়েছে। এই জৈবিক ঘটনাগুলোই ভাষা ব্যবহারের পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
হাজার হাজার বছর আগেই প্রশ্ন উঠেছিল, আমরা কার ইচ্ছার কথা বলি। এর উত্তরে দৈববিশ্বাস ছিল, তা থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। এঙ্গেলস, পাভলভদের আলোচনার পরে ভাষাকে আশ্রয় করে অজ্ঞতা বহুলাংশে ঘুচে গেছে। ভাষার ব্যাপারে দৈব অবদানের যুক্তির দিনও শেষ হয়েছে। তাই বলে ভাষার উৎস কী তার উত্তর এক কথায় বা দু’একটি ঘটনার বিচার বিশ্লেষণ দিয়ে পুরোটা চিহ্নিত করা যাবেনা। ভাষা প্রাণের বিবর্তনের পথে, মানুষের সমাজবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন বোধের এক জটিল প্রক্রিয়া, যা কেটি কোটি বছর ধরে চলেছে, তারই গতিপথে একটু একটু করে আঙ্গিক পরিবর্তনের পাশাপাশি ধ্বনির বিমূর্ত প্রতীকী কাঠামোর মধ্য দিয়ে এসেছে ভাষা। এই বিস্ময়কর পরিবর্তনের, সব প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। তবে এ প্রক্রিয়া নিরন্তর চলছে। কাজেই ভাষার উৎসের অনুসন্ধানের প্রয়াস চলছে—চলবে।



মন্তব্য