রুশ বিপ্লবের তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা

রুশ বিপ্লবের তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা

আজ থেকে ১১২ বছর পূর্বে রাশিয়ায় ঘটে এক মহা ঘটনা, যা বিশ্ব মানব সভ্যতার গতিপথ পাল্টে দেয়। দুনিয়াটা আর অতীতের ধারাবাহিকতায় অক্ষুণ্ন রাখেনা, তার ছেদ ঘটায়। হাজার বছরের শোষণ-বঞ্চনা-অত্যাচার থেকে নিজেদের মুক্ত করার এক মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করে সেদেশের মেহনতি মানুষ। শোষণহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সমতার সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বহু যুগের অন্যায়-অবিচার-জুলুম-নিপীড়ন-ভেদাভেদ-অমর্যাদা-অধিকারহীনতার অবসান হয়। গোটা বিশ্বকে এক নয়া উন্নত মানবিক সভ্যতার পথ দেখায় তারা -যার নাম হলো সমাজতন্ত্র। ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর রাশিয়ায় এই সমাজতন্ত্র কায়েমের মহাকর্মযজ্ঞ দুনিয়া কাঁপানো ‘রুশ বিপ্লব’ রূপে খ্যাত।

অতীতে নানা দেশে আরও অনেক বিপ্লব ঘটেছে। কিন্তু এসব বিপ্লব অধিকাংশ মানুষের ওপর মুষ্টিমেয়র শোষণ-শাসন-নিপীড়নের অবসান ঘটায়নি। কেবল এসবের ধরন বা রূপের বদল ঘটিয়েছে মাত্র। কিন্তু শোষণ-বৈষম্য-নিপীড়নের চির অবসান ঘোষণা করে এই রুশ বিপ্লব। মেহনতিদের নেতৃত্বে মেহনতি জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী মানুষের সরকার কায়েম হয়। জনগণ সত্যিকারের মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনে সক্ষম হয়ে ওঠে। সবার মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা দেয়। রুশ বিপ্লব দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, শ্রমজীবী জনগণ তার সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক সংগঠন মারফত ক্ষমতা দখল এবং তা সংহত করতে সক্ষম।

নারী-পুরুষের মধ্যে সব অসমতা ও বৈষম্য বিলোপের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে রুশ বিপ্লব।

তবে সাধারণ মানুষের মহৎ স্বপ্ন হিসেবে সমাজতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। যখন থেকে মানুষ শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত হতে শুরু করেছে, তখন থেকেই সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছে তারা। এ নিয়ে নানা চিন্তা ও তৎপরতা চলেছে বহুকাল ধরে। কিন্তু শত আন্তরিকতা ও মহত্ত্ব সত্ত্বেও এসব প্রচেষ্টা ছিলো অবাস্তব ও কাল্পনিক।

মার্কস-এঙ্গেলসই প্রথম এযাবৎ কাল অবধি অর্জিত মানবজ্ঞানের নির্যাস থেকে সমাজতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব গড়ে তোলেন। ফলে সমাজতন্ত্র হয়ে ওঠে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য। আর রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র বাস্তব রূপ লাভ করে। রাশিয়ার নাম হয় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন।

তবে রুশ বিপ্লব কেবল স্থানিক ঘটনা হিসেবে স্তিমিত হয়ে যায়নি। সারা বিশ্বে রুশ বিপ্লব সৃষ্ট সমাজতন্ত্রের চেতনা ছড়িয়ে পড়ে। দেশে দেশে শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম প্রচণ্ড গতিবেগ লাভ করে। উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে শোষিত-নিপীড়িত দেশগুলির জনগণের প্রতি সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এই নবীন সমাজতান্ত্রিক দেশ। তাইতো দুনিয়াব্যাপী বিবেকবান, নীতিনিষ্ঠ, যুক্তিবাদী ও গণতান্ত্রিক মানুষ সমাজতন্ত্রের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়। সমাজতন্ত্রের মধ্যে সাম্য, সুন্দর, কল্যাণময়, সমঅধিকারভিত্তিক সমৃদ্ধশালী ও মর্যাদাপূর্ণ নতুন পৃথিবীর সম্ভাবনা খুঁজে পায় তারা। তাই বিশ্ব বিখ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতারা স্বাগত জানায় সমাজতন্ত্রের আগমনকে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানেও গণদাবি রূপে সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি করা হয়।

উল্লেখ্য, মাত্র দুই দশকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন অবিশ্বাস্য অগ্রগতি ঘটায়। কয়েকশত বছরে পুঁজিবাদ যা পারেনি, সমাজতন্ত্র মাত্র কয়েক দশকে সেই কাক্সিক্ষত মানবিক সমাজ নির্মাণে সফলতা দেখায়। নূতন মানবিক সভ্যতার সূচনা করে। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জ্ঞান-বিজ্ঞান-উন্নয়নের সব মানদণ্ডে উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যায় সমাজতন্ত্র। শুধু নিজের উন্নয়ন নয়, গোটা বিশ্বের অগ্রগতির দায়-দায়িত্বও কাঁধে নেয়। ফ্যাসিবাদের কবল থেকে বিশ্ব মানব সভ্যতাকে রক্ষা করে বিপুল আত্মত্যাগের দ্বারা। দেশে দেশে শোষণ মুক্তির সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ে পাশে এসে দাঁড়ায়। গোটা বিশ্বের সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে নতুন দিশা দেখায়। এভাবেই পুঁজিবাদের বিপরীতে সমাজতন্ত্র তার শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখে। 

সমাজতন্ত্রের এই দ্রুত সাফল্যে তাই ভীত হয় পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি। তাই তারা সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করতে শুরু থেকেই লাগাতার বহুমুখী আক্রমণ চালিয়ে যায়। তারাই আবার নিজ দেশে সমাজতন্ত্রের সাফল্যগুলিকে আত্তীকরণের মাধ্যমে নানা সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। 

অন্যদিকে বিপ্লবের সময় রাশিয়া ছিলো বেশ পশ্চাৎপদ একটি দেশ। তাই শৈশব থেকেই নবীন সমাজতন্ত্র অভিজ্ঞতাহীন, অস্বাভাবিক ও প্রতিকুল পরিস্থিতির চাপের মুখোমুখী হতে বাধ্য হয়। আর এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা-ভুলত্রুটি- বিচ্যূতি ঘটে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কয়েক শত বছরের এগিয়ে থাকা উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির সাফল্যকে ম্লান করে দেয় সমাজতন্ত্র। প্রমাণ করে তার শ্রেষ্ঠত্ব। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উন্নত ও অগ্রসর দেশে পরিণত হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও অধিকার পূরণের নিশ্চয়তা দেয়। তা সত্ত্বেও নানা কারণে ৭৩ বছর পর কাক্সিক্ষত বিকাশ রূদ্ধ হওয়ায় তা সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ডেকে আনে।

কিন্তু একটি বাস্তবায়নযোগ্য মহৎ স্বপ্ন রূপায়নের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেই সেই মহৎ স্বপ্ন পরাজিত হয় না। নানা আঁকাবাঁকা পথে তা এগিয়ে চলে, কখনও পিছু হটে। মানুষের সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের লক্ষ্য ও স্বপ্নের বিজয় পরিণামে অনিবার্য। সমাজতন্ত্রের বিজয়- মানুষের সেই মহৎ স্বপ্নেরই বিজয়। আজ, না হয় কাল, না হয় পরশু - অর্থাৎ আগামীতে সমাজতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী বিজয় ঘটবেই। কেননা মানুষের মহৎ স্বপ্নের কখনো মৃত্যু হয় না।

তাই সমাজতন্ত্রের মৃত্যু নেই। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সমাজতন্ত্র হয়ে উঠবে আরো উন্নত, সৃজনশীল, বৈচিত্র্যপূর্ণ, ত্রুটি-বিচ্যূতিহীন এবং অপরাজেয়। আর বর্তমান আমাদের না হলেও ভবিষ্যৎ আমাদেরই।

মন্তব্য নেই

  • Philip W

    প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্য

    Phasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.

  • Philip W

    প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্য

    Phasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.

মন্তব্য লিখুন