‘আমি’ থেকে ‘আমিও’: মিটু আন্দোলনের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

‘আমি’ থেকে ‘আমিও’: মিটু আন্দোলনের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

‘মিটু’ শব্দটি দিয়েই শুরু করা যাক। “মিটু”র বাংলা করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘আমিও’। ‘আমি’ শব্দটির সাথে “ও” প্রত্যয় যুক্ত হয়ে, হয়েছে আমিও। আমি’র মধ্যে রয়েছে আমিত্ববোধ। আমিত্ব তো সেই জিনিস যে কিনা অন্যকে হেয় করে, খারিজ করে, অস্বীকার করে শুধু নিজে টিকে থাকার ঘোষণা দেয়। এই স্বার্থপর, অহংকারী গন্ধমিশেল শব্দটির সাথে যখন ‘ও’ প্রত্যয় যোগ হলো, তখন নিমেষেই এর চেহারাটি আমুল পালটে গেল। তার গায়ে এখন আর স্বার্থপতার ও অহংকারীর লেশমাত্র নাই। সে এখন আর কাউকে খারিজ করে না, পিছনে ফেলতে চায় না, কনুই দিয়ে গুতা দিয়ে কায়দা করে সাইট করে নিজের মাথা উঁচু করে না। ‘আমিও’ শব্দটি সবার সাথে হাত ধরাধরি, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই সারিতে হাটে। কিছুটা নেগেটিভ বোধের জন্ম দেয়া শব্দ ‘আমি’ শুধুমাত্র একটি বর্ণ যোগ হওয়াতেই এর ধরণের কী মারাত্মক পরিবর্তন!

‘আমি’ থেকে ‘আমিও’ শব্দের মতোই আমূল পাল্টে যেতে পারতো এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য, গতি- প্রকৃতি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই মিটু আন্দোলন বাংলাদেশে যদিও শুরু করেন উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির নারীরা। কিন্তু অন্য দেশে যা ঘটেনি তা আমাদের দেশে ঘটে। নিম্নবিত্তের নারীরাও ওই সময় মুখ খোলে। আমি মধ্যপ্রাচ্য ফেরত যৌন নির্যাতিত নারী শ্রমিকসহ সদ্য ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডের স্বীকার নুসরাতের কথা বলছি। এসকল নারী মিটু আন্দোলনের কারণে মুখ খোলেনি, তারা মিটু সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানেনা, এটি সত্য। তাদের কাছে হিব্রু, স্প্যানিশ প্রভৃতি ভাষা বা শব্দের মতোই মিটু সুদূরের। কিন্তু তারা বিশ্বে মিটু ঝড়ের সময়ই কিন্তু মুখ খুলেছে। 

metoo অভিযোগকারী এইসকল নারীরা metoo আন্দোলনের আগে থেকেই প্রতিবাদী, লড়াকু এবং জীবনযাপনে স্বাধীন। পুরুষতন্ত্র, সামাজিক ট্যাবুকে তাঁরা বিভিন্ন সময়ই তাদের কাজ বা জীবনযাপন দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেই। এবং যাদের বিরুদ্ধে তারা অভিযোগ এনেছে তারা কি নিপাট ভদ্রলোক লোক হিসেবে পরিচিত ছিলো, ছিলো না! এদের প্রায় প্রত্যেকেই তাদের পরিসরে যৌন নিপীড়নকারীসহ আরও নানাবিধ দোষে দুষ্ট। অভিযোগকারী নারীরা প্রত্যেকেই তাদের সুবিধাজনক স্থানে গিয়ে অভিযোগ করেছেন। এতে তাদের রুটি-রুজি সামান্যও হুমকির মুখে পড়েনি।

বাংলাদেশ বাদে অন্যান্য দেশে এই আন্দোলন খুব বড় পরিসরে না হলেও মূলধারার মিডিয়াতে হালকা-পাতলা জায়গা করে নিতে পেরেছিল । কিন্তু আমাদের দেশে মূলমিডিয়া তো দূরের কথা, সামাজিক মাধ্যমেই খুব সামান্য বুদবুদ তুলতে পেরেছিলো। ‘মি’ থেকে ‘মিটু’ হতে পারা শব্দের মতোই এই আন্দোলনটি উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে তৃণমুল নারীর আন্দোলন হতে পারার সব শর্তই বিদ্যমান ছিলো। আমাদের দেশে শুরুও করেছিলেন তাঁরা । আমি মধ্যপ্রাচ্য ফেরত যৌন নির্যাতিত নারী শ্রমিকদের কথা বলছি। তারা মিটু সম্পর্কে কিছুই জানে না। এই শব্দ এবং বিশ্বে এই নিয়ে আন্দোলন তাদের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। তবুও একই সময়ে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এটি কাকতালীয় নয়। আমাদের মিডিয়া ও নারীবাদীরা চাইলে এখান থেকেই রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারত। আমাদের দেশের নারীবাদী এবং নারী সংগঠনগুলোর ভূমিকা এখানে আরও সক্রিয় হওয়া উচিত ছিলো। তাঁরা চাইলে পারত উচ্চবিত্তের গণ্ডি পেরিয়ে তৃণমূল নারীদের কণ্ঠকে সামনে আনতে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী নারীদের অভিজ্ঞতাকে মূলধারায় জায়গা দেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ততটা চোখে পড়ে না। ফলে আন্দোলনটি বিস্তৃত সামাজিক রূপ নিতে পারেনি বিধায়, প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নির্যাতন না কমে বরং বেড়েছে। নারীবাদী, নারী সংগঠনগুলোর উচিত ছিল এই বিচ্ছিন্ন কণ্ঠগুলোকে একত্র করে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।

মন্তব্য

মন্তব্য লিখুন