মার্কসবাদ ও বিউপনিবেশায়ন সম্বন্ধে দশটি থিসিস

মার্কসবাদ ও বিউপনিবেশায়ন সম্বন্ধে দশটি থিসিস

[২০২২ সালের জুলাই মাসে, ট্রাইকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ-এর পরিচালক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বিজয় প্রসাদ ইনস্টিটিউটের চলমান কাজের ওপর ভিত্তি করে সেখানে একটি বক্তৃতা দেন। ডসিয়ার নং ৫৬, মার্কসবাদ ও বিউপনিবেশায়ন সম্বন্ধে দশটি থিসিস, সেই বক্তৃতার মূল ভাবনাগুলোকে ধারণ করেছে এবং সেগুলোকে আরও বিস্তৃত করেছে।]

এক. ইতিহাসের সমাপ্তি

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব-ইউরোপের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন ঘটে ১৯৯১ সালে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বৈশ্বিক দক্ষিণে (গ্লোবাল সাউথে) এক ভয়াবহ ঋণসংকট—যার সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৮২ সালে, মেক্সিকোর ঋণখেলাপি হওয়ার মধ্য দিয়ে। এই দুটি ঘটনা—সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ‘তৃতীয় বিশ্ব প্রকল্প’-এর দুর্বলতা-কে কাজে লাগিয়ে ১৯৯০-এর দশকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং মার্কিন-পরিচালিত বিশ্বায়ন প্রকল্প প্রবল আঘাত হানে। বামপন্থীদের জন্য এটা ছিল দুর্বলতার দশক, কারণ আমাদের বামপন্থী ঐতিহ্য ও সংগঠনগুলো আত্মসংশয়ে ভুগছিল এবং বিশ্বব্যাপী নিজেদের স্পষ্ট অবস্থান সহজে এগিয়ে নিতে পারেনি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মতাদর্শীরা বলছিল—ইতিহাস শেষ হয়ে গেছে; সামনের একমাত্র পথ হলো মার্কিন প্রকল্পের অগ্রগতি। সোভিয়েত নেতৃত্বের আত্মসমর্পণের ফলে বামপন্থীরা যে শাস্তি পেল, তা ছিল গুরুতর—এর ফলে কেবল বহু বামপন্থী দলই বিলুপ্ত হয়নি, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে মার্কসবাদী চিন্তার স্পষ্টতা সম্পর্কে আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

দুই. চিন্তাধারার সংঘাত

১৯৯০-এর দশকে কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো তাঁর দেশবাসীকে আহ্বান জানান একটি “চিন্তাধারার সংঘাত (battle of ideas)”-এ অংশগ্রহণ করতে, যে শব্দবন্ধটি কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের জার্মান ভাবাদর্শ (১৮৪৬) থেকে নেওয়া।[১] কাস্ত্রোর অভিপ্রায় ছিল—বামপন্থীরা যেন নব্য-উদারনীতির উত্থান দেখে ভীত না হয়; বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে দেখায় যে, নব্য-উদারনীতিবাদ মানবজাতির মৌলিক সংকটগুলোর কোন সমাধান দিতে অক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুধার বিষয়টাই ধরা যাক: পৃথিবীতে ৭.৯ বিলিয়ন মানুষ বাস করে, অথচ খাদ্য মজুত রয়েছে ১৫ বিলিয়নের জন্য; তবুও প্রায় ৩ বিলিয়ন মানুষ প্রতিদিন খাবারের জন্য সংগ্রাম করে। এই বাস্তবতাকে সমাধান করা সম্ভব কেবল সমাজতন্ত্র দিয়েই, কোন দাতব্য ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে নয়।[২] “চিন্তাধারার সংঘাত” বলতে বোঝানো হয় যে, আমাদের সময়ের সংকটের সংজ্ঞা এবং তা সমাধানের পথ যেন  পুঁজিপতিদের উপর ছেড়ে না দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে আরও বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়ন এবং সমাধান হাজির করতে হবে। যেমন, ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে বক্তৃতাকালে কাস্ত্রো আবেগের সঙ্গে “মানবাধিকার (human rights)” ও “মানবতা (humanity)”র ধারণা সম্পর্কে বলেছিলেন:

মানবাধিকারের কথা প্রায়শই বলা হয়, কিন্তু মানবতার অধিকারের কথাও বলা প্রয়োজন। কেন কিছু মানুষকে খালি পায়ে হাঁটতে হবে, যাতে অন্যরা বিলাসবহুল গাড়িতে ভ্রমণ করতে পারে? কেন কিছু মানুষকে মাত্র ৩৫ বছর বাঁচতে হবে, যেখানে অন্যরা ৭০ বছর বাঁচে? কেন কিছু মানুষকে নিদারুণ দারিদ্র্যে থাকতে হবে, যাতে অন্যরা অতিমাত্রায় ধনী হয়? আমি সেইসব শিশুদের হয়ে বলছি, যাদের কাছে এক টুকরো রুটিও নেই। আমি সেইসব অসুস্থ মানুষের হয়ে বলছি, যাদের ওষুধ নেই। আমি তাদের হয়ে বলছি, যাদের জীবন ও মর্যাদার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।[৩]

কাস্ত্রো যখন ১৯৯০-এর দশকে “চিন্তাধারার সংঘাত”-এর প্রসঙ্গ ফের আলাপ তুললেন, তখন বামপন্থীরা দুটি প্রবণতার মুখোমুখি হয় (যারা পরস্পর সম্পর্কিত), যা আজও আমাদের সময়ে ভাবাদর্শগত জটিলতা তৈরি করে চলেছে—

১. উত্তর-মার্কসবাদ (Post-Marxism). এই মতবাদ বলল, মার্কসবাদ অতিরিক্তভাবে “মহা-বয়ান” (grand narratives)-এর ওপর নির্ভরশীল, যেমন—পুঁজিবাদ অতিক্রম করে সমাজতন্ত্রে পৌঁছনোর অপরিহার্যতা। এর বিপরীতে বলা হলো, টুকরো টুকরো খন্ড গল্পগুলোই নাকি বাস্তবতা বোঝার জন্য বেশি কার্যকর। ফলে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষকের রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের সংগ্রামকে আরেকটি ভুয়া “মহা-বয়ান” হিসেবে বাতিল করা হলো, আর এনজিওধর্মী খণ্ডিত রাজনীতিকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করা হলো। এভাবে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে সেবাধর্মী আর সংস্কারের রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া হলো, এবং তা করা হলো “মার্কসকে অতিক্রম” করার নামে। কিন্তু প্রয়াত আইজাজ আহমদ যেমন বলেছিলেন, মার্কসকে অতিক্রম করার এই যুক্তি আসলে মার্কস-পূর্ব সময়ে ফিরে যাওয়া; অর্থাৎ ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে উপেক্ষা করা এবং পুঁজিবাদের নৃশংসতা ও অবক্ষয়ের বিপরীতে জটিল পথে সমাজতন্ত্র গঠনের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা। উত্তর-মার্কসবাদ শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়াল ভাববাদে ও পরিপূর্ণতাবাদের (perfectionism) খোঁজে ফেরা।

২. উত্তর-উপনিবেশবাদ. বামপন্থার একাংশ যুক্তি দিল, উপনিবেশবাদের প্রভাব এত গভীর যে প্রকৃত রূপান্তর কোনদিন সম্ভব নয়; সমাধান একটাই—অতীতে ফিরে যাওয়া। তারা অতীতকে দেখেছিল একটি গন্তব্য হিসেবে, কোন সম্পদ হিসেবে নয়—যেমনটা [পেরুভীয়] মার্কসবাদী তাত্ত্বিক হোসে কার্লোস মারিয়াতেগি ১৯২৮ সালে ইন্ডিজেনিজম (indigenism, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যেখানে অতীতের গৌরব পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়েছে) ধারণা সম্পর্কে বলেছিলেন। এর ফলে উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের নানা ধারা গড়ে উঠল; অনেকগুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ হাজির করলো, যা প্রেরণা পেয়েছিল জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের চিন্তাবিদদের কাজ থেকে (যেমন ফ্রানৎস ফানোঁ)। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে এসে এ ধারা উত্তর আটলান্টিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবে বিপ্লব-অসম্ভবতার দিকে ঝুঁকে গেল। “আফ্রো-নিরাশাবাদ (Afro-pessimism)” নামের এই নতুন ধারার এক অংশের চরম মতাদর্শীরা তো ঘোষণা করল—আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের জন্য “সামাজিক মৃত্যু”র বিরান প্রান্তরের, যেখানে পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনাই নেই। বিউপনিবেশিক চিন্তাধারা বা decolonialidad (decoloniality/বিউপনিবেশিকতা) নিজেই নিজেকে ইউরোপীয় চিন্তার ফাঁদে ফেলেছে, এই দাবী মেনে যে অনেক মানবীয় মতবাদ (concept), এই যেমন গণতন্ত্র—নির্ধারিত হয়  ঔপনিবেশিক “ক্ষমতার কাঠামোতে (matrix of power)” বা “আধুনিকতার কাঠামোতে (matrix of modernity)”। বিউপনিবেশিক চিন্তার শাস্ত্রগুলো বারেবারে ফিরে যায় ইউরোপীয় চিন্তার কাছে, এবং সমকালীন উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামের ভিত থেকে নতুন চিন্তার ঐতিহ্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।

আসলে সত্যিকারের বিউপনিবেশায়ন হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা এবং পুঁজিবাদ-বিরোধিতা। মনের উপনিবেশমুক্তি ঘটানো সম্ভব নয়, যদি না সামাজিক উৎপাদনের শর্তগুলোকে ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব থেকে মুক্ত করা যায়। উত্তর-মার্কসবাদ সামাজিক উৎপাদনের বাস্তবতাকে যেমন উপেক্ষা করে, তেমনি সামাজিক সম্পদ গড়ে তোলা—যে সম্পদকে অবশ্যই সামাজিকীকরণ করতে হবে—সে বিষয়টিও উপেক্ষা করে।  আফ্রো-নিরাশাবাদ বলে যে, স্থায়ী বর্ণবাদের কারণে কাজটি অসম্ভব। বিউপনিবেশিক চিন্তা যদিও আফ্রো-নিরাশাবাদকে অতিক্রম করে যেতে পারে, কিন্তু উত্তর-মার্কসবাদের চৌহদ্দির বাইরে যেতে পারে না—তাই সামাজিক উৎপাদনের শর্তসমূহের বিউপনিবেশিকরণের প্রয়োজনীয়তাকেও ধরতে ব্যর্থ হয়।

তিন. ভবিষ্যৎ কল্পনার ব্যর্থতা

১৯৯১ থেকে ২০০০-এর দশকের গোড়ার সময় পর্যন্ত জাতীয় মুক্তিভিত্তিক মার্কসবাদী ধারাটি একপ্রকার পরাভূত হয়ে গেল; উত্তর-মার্কসবাদ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব যেসব সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল, তার জবাব দিতে ব্যর্থ হলো। এই ধারাটি আর আগের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেল না, যখন এক সময় বিপ্লবী আন্দোলন ও তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলো একে অপরকে সহযোগিতা করতো, এমনকি জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ধরনের ধারণা এগিয়ে নিতে কাজ করতো। বামপন্থী আন্তর্জাতিকতাবাদ বিকশিত করার প্ল্যাটফর্ম—যেমন ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম—জনগণের আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে স্পষ্ট হতে চাইলো না। তাদের স্লোগান ছিল: “অন্য এক পৃথিবী সম্ভব”, যা দুর্বল এক বক্তব্য; কারণ সেই “অন্য পৃথিবী” ফ্যাসিবাদ দ্বারাও সংজ্ঞায়িত হতে পারে। এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট ও তীক্ষ্ণ স্লোগান—যেমন “সমাজতন্ত্র অপরিহার্য”—উচ্চারণ করার আগ্রহ দেখা গেল না।

উত্তর-মার্কসবাদের অন্যতম প্রধান ব্যাধি—যার অনেক জ্বালানি নৈরাজ্যবাদ থেকে এসেছে—হ’লো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে এক ধরনের বিশুদ্ধতাবাদী উদ্বেগ। রাষ্ট্রক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে উন্নততর ব্যবস্থাপনার দাবিতে ব্যবহার না করে, উত্তর-মার্কসবাদের যুক্তি হলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের যেকোন প্রচেষ্টার বিরোধিতা। এটি আসলে এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণির যুক্তি, যারা ক্ষুধা আর নিরক্ষরতার কঠোর বাস্তবতা ভোগ করে না। তারা দাবি করে ক্ষুদ্র-আকারের পারস্পরিক সাহায্যভিত্তিক বা দানধর্মী কাজগুলো নাকি ক্ষুধা দূরীকরণের রাষ্ট্রীয় প্রকল্পগুলোর মতন “কর্তৃত্ববাদী (authoritarian)” নয়। এই বিশুদ্ধতাবাদের যুক্তি শেষমেশ এমন এক অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে ক্ষুধা ও মানবমর্যাদার (human dignity) ওপর আঘাত দূরীকরণের সম্ভাবনাকেই পরিত্যাগ করা হয়। দরিদ্র দেশগুলোয় যেখানে ক্ষুদ্র দাতব্য উদ্যোগের কোন উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই, সেখানে অসমতা ও নিপীড়নের মতো জটিল সমস্যাগুলো মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও সেই ক্ষমতা ব্যবহার ছাড়া বিকল্প নেই।

সমাজতন্ত্রের প্রশ্নে পৌঁছাতে হলে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো গড়ে তুলতে হবে—যাতে বুর্জোয়া শ্রেণিকে আদর্শগত আধিপত্য ও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়—তা নিয়ে ভাবতে হবে। কিন্তু এই শক্তিগুলো বড় আঘাত পেল যখন ১৯৭০-এর দশক থেকে নব্য-উদারনৈতিক বিশ্বায়ন উৎপাদনকে বৈশ্বিক সারিতে পুনর্গঠিত করল, শিল্পোৎপাদনকে খণ্ড খণ্ড করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে; এতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক ঘনত্বের সেক্টরের ট্রেড ইউনিয়নগুলি দুর্বল হয়ে গেল এবং শ্রমিকশক্তি গঠনের কৌশল হিসেবে জাতীয়করণ অকার্যকর হলো। অগোছালো, ইউনিয়নবিহীন, দীর্ঘ যাতায়াত ও কর্মদিবসে ক্লান্ত, সমগ্র আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল।[৪] আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এই অংশকে বলছে precariat (নিশ্চয়তা-বঞ্চিত শ্রমজীবী শ্রেণী)—অর্থাৎ অনিশ্চিত প্রলেতারিয়েত। সংগঠিত শক্তি ছাড়া শ্রমিক, কৃষক, বেকার ও অল্প-কর্মসংস্থানপ্রাপ্তরা তাদের সংগ্রামের মধ্য থেকে পুঁজিবাদের মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় তত্ত্ব ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে কার্যত অক্ষম হয়ে পড়েছে।

তবুও শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের জন্য ভারতের সংগ্রাম এক বড় শিক্ষা হয়ে উঠেছে। গত এক দশকে সেখানে প্রতিবছর প্রায় ৩০ কোটি শ্রমিক সাধারণ ধর্মঘটে অংশ নিয়েছে। ২০২০–২১ সালে লক্ষ লক্ষ কৃষক প্রায় এক বছর ধরে আন্দোলন চালিয়ে সরকারকে কৃষি শ্রমকে উবারকরণ (uberise, কাজ থাকলে আয় থাকবে কিন্তু না থাকলে নেই এবং ছুটি, স্বাস্থ্যবীমা, পেনশন বা শ্রমিক অধিকার না থাকা) করার নতুন আইন থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছিল। কিভাবে কৃষকদের আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলন সম্ভব হলো, এমন এক প্রেক্ষাপটে যেখানে ইউনিয়ন ঘনত্ব অত্যন্ত কম এবং ৯০% এর বেশি শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে?[৫] এর মূল কারণ হলো—অসংগঠিত শ্রমিকদের (বিশেষত সেবাখাতের নারী শ্রমিকদের) নেতৃত্বে ঘটেছে লড়াই। গত দুই দশকে ট্রেড ইউনিয়নগুলো ক্রমে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের দাবি—যেমন চাকরির স্থায়িত্ব, সঠিক মজুরি চুক্তি, নারী শ্রমিকদের মর্যাদা ইত্যাদি—সমগ্র ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের দাবি হিসেবে গ্রহণ করেছে। এতে বিভিন্ন অংশের শ্রমিকদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য তৈরি হয়েছে। আজ ভারতের প্রধান আন্দোলনগুলো নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকরা, যাদের লড়াই এখন ট্রেড ইউনিয়ন কাঠামোর সংগঠিত শক্তির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আজ বিশ্ব শ্রমশক্তির অর্ধেকের বেশি নারী, আর তারা নিজেদের সমস্যাকে কেবল নারীর সমস্যা হিসেবে দেখে না—বরং সব শ্রমিকের লড়াইয়ের বিষয় হিসেবে দেখে। একইভাবে বর্ণ, জাত, বা অন্যান্য সামাজিক বিভাজনকে কেন্দ্র করে শ্রমিক মর্যাদার প্রশ্নও সবার যৌথ দাবি হয়ে দাঁড়ায়। ইউনিয়নগুলো শুধু কর্মক্ষেত্র নয়, বরং সামাজিক জীবন ও কম্যুনিটির কল্যাণের (social life and community welfare) গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোও তুলছে—যেমন পানি ও নর্দমা সংযোগের অধিকার, শিশুদের শিক্ষা, সর্বপ্রকারের অসহিষ্ণুতা থেকে মুক্ত থাকার অধিকার। এসব “কম্যুনিটি বা সম্প্রদায়ভিত্তিক” সংগ্রাম শ্রমিক ও কৃষক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সংগ্রামে যুক্ত হয়ে ইউনিয়নগুলো যুথবদ্ধ জীবন ফিরিয়ে আনা ও সামাজিক বুননকে শক্তিশালী করার প্রয়াসে নিজেদের প্রোথিত করছে যা সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য আবশ্যক।

চার. উৎসে ফেরা

এখন সময় এসেছে জাতীয় মুক্তি-ভিত্তিক মার্কসবাদী ঐতিহ্যের সেরা দিকগুলো পুনরুদ্ধার করার ও ফিরে যাওয়ার। এই ঐতিহ্যের শেকড় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভেতরে, যা সবসময়ই বিস্তৃত ও গভীর হয়েছে দরিদ্র দেশগুলোর কোটি কোটি শ্রমিক ও কৃষকের সংগ্রামের মাধ্যমে। এসব সংগ্রামগুলোর তাত্ত্বিক ভিত রচনা করেছেন হোসে কার্লোস মারিয়াতেগি, হো চি মিন, ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ, ক্লডিয়া জোন্স, ফিদেল কাস্ত্রোর মতো মানুষরা। এই ঐতিহ্যের দুটি মূল দিক রয়েছে:

১. “জাতীয় মুক্তি” শব্দবন্ধ থেকে আসে সার্বভৌমত্বের ধারণা। কোন জাতি বা অঞ্চলের ভূখণ্ডকে সাম্রাজ্যবাদী দমন থেকে মুক্ত ও সার্বভৌম হতে হবে।

২. মার্কসবাদী ঐতিহ্য থেকে আসে মর্যাদার ধারণা। মর্যাদার জন্য লড়াই মানে হলো মজুরি-ব্যবস্থার অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, এবং সেইসঙ্গে বর্ণ, লিঙ্গ, যৌনতা ইত্যাদির ভিত্তিতে পুরোনো ও জীর্ণ সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।

পাঁচ. “ঈষৎ সম্প্রসারিত” মার্কসবাদ

মার্কসবাদ সরাসরি মার্কসের মাধ্যমে নয়, বরং ভ্লাদিমির লেনিন ও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে বিকশিত ধারার মাধ্যমেই উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামে প্রবেশ করে। ফ্রানৎস ফানোঁ যখন বলেছিলেন, মার্কসবাদ ইউরোপের প্রেক্ষাপট ছাড়িয়ে এলে সেটি “ঈষৎ সম্প্রসারিত” (slightly stretched) হয়, তখন তিনি এ কথাই বোঝাচ্ছিলেন।[৬] এই “প্রসারিত মার্কসবাদ”-এর চরিত্রকে পাঁচটি মূল উপাদান সংজ্ঞায়িত করে, যা বিস্তৃত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভেতরে বিকশিত হয়েছিল:

১. শুরুর দিককার মার্কসবাদীদের কাছে এটা স্পষ্ট ছিল যে, মানবতার সংকট সমাধানে উদারনীতিবাদ অক্ষম। তাঁরা স্পষ্ট দেখেছিলেন যে পুঁজিবাদী জীবনের কঠিন বাস্তবতা—যেমন ক্ষুধা ও অসুস্থতা—উদারনীতিবাদ সমাধান করতে পারবে না। কোন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই এসব সংকট সমাধানকে তার কেন্দ্রীয় কাজ করেনি; বরং সেটিকে ঠেলে দিয়েছে দাতব্য ইন্ডাস্ট্রির হাতে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রীয় প্রকল্পগুলো “মানবাধিকার”কে বিমূর্ততা দান করেছে; বিপরীতে, মার্কসবাদীরা বুঝেছেন যে এসব সংকটগুলো অতিক্রম না করলে মানবাধিকারের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

২. শিল্পোৎপাদনের আধুনিক রূপ হলো এই অতিক্রমণের পূর্বশর্ত। কারণ, কেবল আধুনিক শিল্পই যথেষ্ট সামাজিক সম্পদ উৎপাদন করতে পারে, যা সামাজিকীকৃত হতে পারে। উপনিবেশবাদ উপনিবেশিত অঞ্চলে উৎপাদনশীল শক্তির বিকাশকে বাধা দিয়েছে, ফলে সেখানে উল্লিখিত সংকট সমাধানের জন্য সামাজিক সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ হয়নি।

৩. উপনিবেশিত অঞ্চলে সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পকে একই সঙ্গে উপনিবেশবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই মানে সার্বভৌমত্বের জন্য সংগ্রাম, আর পুঁজিবাদী সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের বিরুদ্ধে লড়াই মানে মর্যাদার জন্য সংগ্রাম। জাতীয় মুক্তি-ভিত্তিক মার্কসবাদের এই দুটি দিক আজও মূল ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

৪. উপনিবেশগুলোতে শিল্প পুঁজিবাদের বিকাশ না হওয়ায়, এবং এর ফলে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিল্পশ্রমিকের (প্রলেতারিয়েত) অভাবে, কৃষক ও কৃষিশ্রমিকেরা সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক ব্লকের (historical bloc) প্রধান শক্তি হয়ে উঠল।

৫. এটা খেয়াল রাখা আবশ্যক যে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলগুলোতে। ধনী দেশগুলোয় উৎপাদনশীল শক্তি উন্নত হলেও বিপ্লব হয়নি; বরং তা ঘটেছে রাশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, কিউবার মতো দরিদ্র দেশগুলোয়। এই দেশগুলোর বিপ্লবী শক্তির দ্বৈত দায়িত্ব ছিল: স্বাধীনতা অর্জন করা, এবং উৎপাদনশীল শক্তি (productive forces) গড়ে তোলা ও উৎপাদনের উপকরণকে সামাজিকীকরণ করতে বামপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠিত করা। জনগণের দ্বারা গঠিত ও সমর্থিত এসব দেশগুলোর সরকারগুলোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব প্রথম প্রজন্মের মার্কসবাদীরা যা কল্পনাও করেননি তার চেয়ে অনেক জটিল ছিল। এখান থেকেই জন্ম নিল নতুন, সীমাহীন (boundless) মার্কসবাদ—যেখানে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ ছিল এক পরীক্ষামূলক মনোভাবসম্পন্ন প্রকল্প। তবে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের এসব বিকাশের (developments) অনেকগুলোকেই তত্ত্বে পরিণত করা হয়নি, যার ফলে জাতীয় মুক্তি-ভিত্তিক মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ঐতিহ্য সম্পূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি। এর ফলেই উত্তর-মার্কসবাদ ও উত্তর-উপনিবেশবাদ যখন তৃতীয় বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক চর্চার ওপর আক্রমণ চালাল, তখন প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ল।

ছয়. মানবতার দোটানা

বিশ্বের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়—ক্ষুধা ও নিরক্ষরতা থেকে শুরু করে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু বিপর্যয়ের ফলাফল পর্যন্ত। মানবজাতির এসব গভীর সংকট মোকাবিলায় যে সামাজিক সম্পদ ব্যবহার করা যেত, তা অপচয় হচ্ছে অস্ত্র ও কর স্বর্গে। ক্ষুধা দূরীকরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDGs) পূরণে প্রতিবছর ৪.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন, কিন্তু বাস্তবে এর নগণ্য একটি অংশ ব্যয় হয় এই লক্ষ্য পূরণে।[৭] মহামারি ও লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কারণে এই খাতে ব্যয় আরও কমবে। ফলে মানবকল্যাণ, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা পরিমাপের সূচকগুলো আরও পিছিয়ে যাবে। মানবজাতির সবচেয়ে বড় সংকট—ক্ষুধা—এখন নির্মূল হওয়ার কোন সম্ভাবনাতেই নেই (চীন ব্যতীত, যেখানে ২০২১ সালে চরম দারিদ্র্য দূর হয়েছে)।[৮] অনুমান করা হয়, বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ নিত্যদিনের বিভিন্ন ধরনের ক্ষুধার সঙ্গে সংগ্রাম করছে।[৯]

উদাহরণ হিসেবে জাম্বিয়ার দিকে তাকানো যাক, যেখানে এসডিজি-র চতুর্থ লক্ষ্য হলো নিরক্ষরতা দূর করা। কপারবেল্ট অঞ্চলের প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির প্রায় ৬০% শিশু পড়তে পারে না।[১০] অথচ এই অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম প্রধান তামা উৎপাদনকারী এলাকা, যা আমাদের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির জন্য অপরিহার্য। এই শিশুদের বাবা-মায়েরা সেই তামা বিশ্ববাজারে সরবরাহ করে, কিন্তু তাদের সন্তানরা পড়ালেখা করতে পারে না। উত্তর-মার্কসবাদ বা উত্তর উপনিবেশবাদ কোনটাই নিরক্ষরতার এই বাস্তবতা কিংবা এসব বাবা-মায়েদের সন্তানদের শিক্ষিত করার আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে কোন সমাধান দেয় না। কিন্তু জাতীয় মুক্তি-ভিত্তিক মার্কসবাদ, যার ভিত্তি সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা, এসব প্রশ্নের জবাব দেয়: এটি দাবি করে যে জাম্বিয়া যেন তামা উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ও উচ্চতর আয় (royalty payments) পায় (সার্বভৌমত্ব) এবং জাম্বিয়ার শ্রমিকশ্রেণি যেন উদ্বৃত্ত মূল্যের বড় অংশ গ্রহণ করে (মর্যাদা)। অধিকতর সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাই হলো মানবজাতির এসব সংকট সমাধানের পথ। কিন্তু সামাজিক সম্পদ এসব মৌলিক উন্নয়নে খরচ না করে, সম্পদ ও ক্ষমতার মালিকেরা প্রতিবছর ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করছে অস্ত্রে এবং আরও বহু ট্রিলিয়ন ব্যয় করছে নিরাপত্তা বাহিনীতে—সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে পুলিশ পর্যন্ত।[১১]

সাত. বর্ণবাদ ও পিতৃতন্ত্রের যৌক্তিকতা

এটি লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে বর্ণবাদ ও পিতৃতন্ত্রের কাঠামোগুলো এখনও যৌক্তিক রয়ে গেছে। কেন এমনটা ঘটে? পুঁজি (১৮৬৭) গ্রন্থে মার্কস উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের দুটি রূপ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং তৃতীয় আরেকটি রূপের আভাস দিয়েছিলেন। প্রথম দুটি রূপ হলো—পরম উদ্বৃত্ত মূল্য (absolute surplus value) ও আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্য (relative surplus value)। মার্কস দেখিয়েছিলেন, কীভাবে কর্মদিবস জুড়ে শ্রমিকের সময় চুরি করে মজুরিভোগী শ্রমিকের কাছ থেকে পরম উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণ করা হয়, আর কীভাবে উৎপাদনশীলতার উন্নতির ফলে শ্রমিক তার মজুরি উৎপাদনে যে সময় ব্যয় করে তা কমে যায় এবং একই সঙ্গে উৎপাদিত উদ্বৃত্তের পরিমাণ বেড়ে যায় (আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্য)। তবে মার্কস আরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তৃতীয় এক ধরনের আহরণের দিকে—কিছু পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের এমন মজুরি দেওয়া হয় যা কোন সভ্য সমাজের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে প্রযোজ্য ন্যায্য মজুরির চেয়েও কম। তিনি লিখেছিলেন, পুঁজিপতিরা চেষ্টা করে “শ্রমিকের মজুরি তার শ্রমশক্তির প্রকৃত মূল্যেরও নিচে নামিয়ে আনতে”। কিন্তু শ্রমশক্তিকে পূর্ণ মূল্যে কেনাবেচার নিজের বিশ্লেষণে অধিক গুরুত্ব দেয়ার কারণে তিনি এই রূপটি আর বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেননি।[১২]

এই তৃতীয় রূপটি—যাকে আমরা অতিরিক্ত শোষণ (super-exploitation) বলি—আমাদের বিশ্লেষণে অপ্রাসঙ্গিক নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদের আলোচনায় এটি একেবারেই কেন্দ্রীয় বিষয়। কাঁচামাল উত্তোলনের ক্ষেত্রে রয়্যালটি বাড়াতে অস্বীকৃতি কিংবা শ্রমিকের মজুরি দমিয়ে রাখার যৌক্তিকতা কীভাবে তৈরি হয়? ঔপনিবেশিক যুক্তির মাধ্যমে বলা হয়, বিশ্বের কিছু অঞ্চলের মানুষের জীবনের প্রতি প্রত্যাশা তুলনামূলক কম, তাই তাদের সামাজিক উন্নয়ন অবহেলিত থাকতে পারে। একই ঔপনিবেশিক যুক্তি প্রযোজ্য নারীদের ক্ষেত্রেও, যারা পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজ করে থাকে বিনা মজুরিতে বা অতি নগণ্য মজুরিতে, কারণ এটিকে বলা হয় ‘নারীর কাজ’।[১৩] একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বর্ণবাদ ও পিতৃতন্ত্রের এই কাঠামো দ্বারা আবদ্ধ নয়, কারণ পুঁজিপতির উদ্বৃত্ত মূল্যের অংশ বাড়ানোর জন্য এ ধরনের কাঠামোর উপর তার নির্ভরশীলতা নেই। তবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই কাঠামোগুলোর অস্তিত্ব, যা পুঁজিবাদ আরও গভীর করেছে, এমন সব অভ্যাস সৃষ্টি করেছে যেগুলো কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। সেই কারণেই বর্ণবাদ ও পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভাবাদর্শিক সংগ্রাম চালাতে হবে, এবং এ সংগ্রামকে শ্রেণিসংগ্রামের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

আট. এজমালি/সামষ্টিক জীবনের পুনরুদ্ধার

নব্য-উদারনীতিবাদী বিশ্বায়ন সমষ্টিগত জীবনের চেতনা ধ্বংস করেছে এবং ব্যক্তিকরণের হতাশাকে (despair of atomisation) আরও গভীর করেছে, দুটি আন্তঃসম্পর্কিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে—

১. শ্রমিক সংগঠনকে দুর্বল করা এবং ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক জন-আন্দোলন ও কর্মক্ষেত্রের সংগ্রামের ভেতর নিহিত সমাজতান্ত্রিক সম্ভাবনাগুলোকে ভেঙে দেওয়া।

২. নাগরিকের ধারণাকে ভোক্তার ধারণা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা—অর্থাৎ মানুষ মূলত পণ্য ও সেবার ভোক্তা, এবং মানবসত্ত্বাকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় ভোগের আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে—এমন ধারণা চাপিয়ে দেওয়া।

সমাজজীবনের ভাঙন প্রবণতা ও কনজিউমারিজম/ভোক্তাবাদের উত্থান হতাশাকে আরও কঠিন করে তোলে, যা বিভিন্ন ধরনের পলায়ন প্রবৃত্তির সৃষ্টি করে। এর দুটি দৃষ্টান্ত হলো—ক) পরিবারের গণ্ডির ভেতর আশ্রয় নেওয়া, অথচ সামাজিক সেবা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার ফলে পরিবারের ওপর যে দায়-দায়িত্ব পড়ে, পরিচর্যাকার্যের যে বাড়তি বোঝা চাপে এবং দীর্ঘ কর্মদিবস ও যাতায়াতের কষ্টের ফলে পরিবার এই চাপ সামলাতে অক্ষম হয়ে পড়ে। খ) ধর্ম কিংবা বিজাতিবিদ্বেষের (xenophobia) মতো পথে সামাজিক বিষাক্ততার দিকে ঝুঁকে যাওয়া। যদিও এসব পথ কখনও কখনও সমষ্টিগত জীবনের আয়োজনের সুযোগ দেয়, তবুও সেগুলো মানুষের অগ্রগতির জন্য নয়, বরং সামাজিক সম্ভাবনাকে আরও সংকীর্ণ করে ফেলার জন্য সংগঠিত হয়।

তাহলে সমষ্টিগত জীবনকে কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়? এর প্রতিষেধক হলো জনসাধারণের কর্মকান্ড (public action), যার ভিত্তিমূলে রয়েছে সামাজিক স্বস্তি ও সাংস্কৃতিক আনন্দ। কল্পনা করুন, যদি বাম ঐতিহ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি সপ্তাহ ও প্রতিটি মাসে জনমানুষের তৎপরতা হয়, যেখানে ক্রমে আরও বেশি মানুষ একত্রিত হয়ে কাজ করবে, আর সেই কাজের মাধ্যমে সমষ্টিগত জীবনকে উদ্ধার করবে। এমন এক কার্যক্রম হলো লালবই দিবস (Red Books Day), যা প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০-এ আন্তর্জাতিক বামপন্থী প্রকাশকদের ইউনিয়নের উদ্যোগে—যে দিনটি আবার ১৮৪৮ সালে মার্কস ও এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইশতেহার প্রকাশের দিন। ২০২০ সালের প্রথম লালবই দিবসে সারা বিশ্বের কয়েক লক্ষ মানুষ বিভিন্ন ভাষায়—কোরীয় থেকে স্পেনীয়—ইশতেহার পড়ে শোনান জনসমাগমে। ২০২১ সালে মহামারির কারণে বেশিরভাগ অনুষ্ঠান অনলাইনে হয়, ফলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বলা কঠিন। ২০২২ সালে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ মানুষ বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত হন।

সমষ্টিগত জীবন উদ্ধার করার জ্বলন্ত উদাহরণ করোনা মহামারির সময়ও জীবন্তভাবে দেখা গিয়েছিল। ভারতের কেরালায় ট্রেড ইউনিয়ন, যুব সংগঠন, নারী সংগঠন ও ছাত্র ইউনিয়ন রাস্তায় নেমে পড়েছিল—হাত ধোয়ার বেসিন বানানো, মাস্ক সেলাই করা, কমিউনিটি কিচেন স্থাপন, খাবার বিতরণ, ঘরে ঘরে জরিপ চালানো—যাতে প্রত্যেক মানুষের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া যায়।[১৪]

নয়. আবেগের লড়াই

ফিদেল কাস্ত্রো নব্বইয়ের দশকে চিন্তাধারার সংঘাত ধারণাকে কেন্দ্র করে এক বিতর্ক উসকে দিয়েছিলেন—এটি ছিল মানবজীবন সম্পর্কিত নব্য-উদারনীতিবাদী সস্তা ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে চিন্তায় শ্রেণি সংগ্রাম। এই সময়ে ফিদেলের বক্তৃতাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু তিনি কী বলেছেন তা-ই নয়, বরং কীভাবে বলেছেন সেটিও। তাঁর প্রতিটি শব্দ ভরে থাকত মানবতাকে সম্পত্তি, সুবিধা ও ক্ষমতার শেকল থেকে মুক্ত করার এক মহান সহমর্মিতা দিয়ে। প্রকৃতপক্ষে, চিন্তাধারার সংঘাত ছিল নিছকই ধারণার লড়াই নয়, বরং এক ধরনের “আবেগের লড়াই (battle of emotions)”—অর্থাৎ মানুষের আবেগকে লোভের মোহ থেকে সরিয়ে সহমর্মিতা ও আশার দিকেই পুনর্নির্দেশ করার প্রচেষ্টা।

আমাদের সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বুর্জোয়া শ্রেণির সংস্কৃতি-কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে জনগণকে আসল সমস্যাগুলো থেকে দূরে সরিয়ে রাখা এবং যৌথ সমাধান খোঁজার পরিবর্তে কল্পিত সমস্যাগুলো নিয়ে বিভ্রান্ত করা। মার্কসবাদী দার্শনিক আর্নস্ট ব্লখ ১৯৩৫ সালে একে বলেছিলেন ‘swindle of fulfilment, অর্থাৎ মানুষের মনে এমন সব কল্পনার বীজ বপন করা, যেগুলোর বাস্তবায়ন অসম্ভব, অথচ সেগুলো মানুষকে বিভ্রান্ত করে। ব্লখ লিখেছিলেন, “সামাজিক উৎপাদনের সুফল কুড়ায় বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণি, যারা ভীতিকর স্বপ্ন ব্যবহার করে শ্রমিকশ্রেণির বাস্তবতাকে ঢেকে দেয়।”[১৫] বিনোদ শিল্প প্রলেতারীয় সংস্কৃতিকে ক্ষয়ে দেয় এমন সব আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে, যেগুলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতর কখনও পূরণ হওয়ার নয়। অথচ এই মায়াবী আকাঙ্ক্ষাগুলো শ্রমিকশ্রেণির প্রকল্পকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

পুঁজিবাদের অধীনে এক অবক্ষয়িত সমাজ এমন এক সামাজিক জীবন তৈরি করে যা ভরে থাকে ব্যক্তিকরণ ও বিচ্ছেদকরণ, হতাশা ও ভয়, রাগ ও ঘৃণা, ক্ষোভ ও ব্যর্থতায়। এগুলো হলো কুৎসিত আবেগ, যা পদ্ধতিগতভাবে গড়ে তোলে সংস্কৃতি-কারখানা (‘তুমিও পেতে পারো!’), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (‘লোভই প্রধান চালিকা শক্তি’), আর নব্য-ফ্যাসিবাদীরা (‘অভিবাসী, যৌন সংখ্যালঘু বা যেই-ই তোমার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াক, তাকে ঘৃণা করো’)। এই আবেগগুলোর সমাজে প্রভাব প্রায় সর্বগ্রাসী, আর নব্য-ফ্যাসিবাদীদের উত্থানও এই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থবোধকতা যেন শূন্য হয়ে পড়ে—সম্ভবত এটা এমন এক প্রদর্শনীর সমাজ (a society of spectacles)-এর পরিণতি, যার সময়সীমা শেষ হয়ে এসেছে।

মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতিকে মানব বাস্তবতার কোন বিচ্ছিন্ন ও কালাতীত উপাদান হিসেবে দেখা হয় না; আবেগকেও ইতিহাসের বিকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন ধরা হয় না। মানুষের অভিজ্ঞতা যেহেতু ভৌত জীবনের শর্ত দ্বারা সংজ্ঞায়িত, তাই ভাগ্যের ধারণা ততদিন টিকে থাকবে যতদিন দারিদ্র্য থাকবে। দারিদ্র্য অতিক্রম করা গেলে নিয়তিবাদ তার আদর্শিক ভিত্তি হারাবে, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলীন হবে না। সংস্কৃতি স্বভাবতই বিরোধাত্মক—একটি অসম সমাজের তন্তু থেকে উৎসারিত ভিন্ন ভিন্ন উৎপাদনকে একত্রে ধরে রাখে—একদিকে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে পুনপ্রতিষ্ঠা করে, অন্যদিকে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধও তৈরি করে। প্রাধান্যবিস্তারকারী ধারার ভাবাদর্শগুলো সংস্কৃতিকে ভাবাদর্শিক কলকব্জার (ideological apparatuses) শেকল দিয়ে এমনভাবে ঘিরে রাখে যেন এক জলোচ্ছ্বাস শ্রমিক ও কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে ডুবিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত নতুন সংস্কৃতি তৈরি হবে শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে, সমাজতান্ত্রিক প্রকল্প থেকে জন্ম নেওয়া নতুন সামাজিক গঠনের মধ্য দিয়ে—শুধু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তা দিয়ে নয়।

মনে রাখা জরুরি যে প্রতিটি বিপ্লবী প্রক্রিয়ার শুরুর বছরগুলোতে—১৯১৭ সালের রাশিয়া থেকে ১৯৫৯ সালের কিউবা পর্যন্ত—সাংস্কৃতিক বিকাশ ভরে ছিল আনন্দ ও সম্ভাবনার আবেগে, সৃজনশীলতা ও পরীক্ষানিরীক্ষার তীব্রতায়। এই অনুভূতিই লোভ ও ঘৃণার বিকৃত আবেগের বাইরে অন্য কিছুর সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।

দশ. ভবিষ্যত কল্পনার সাহস

সোভিয়েত-পরবর্তী যুগের অন্যতম স্থায়ী মিথ হলো যে, পুঁজিবাদ-উত্তর কোন ভবিষ্যৎ সম্ভব নয়। এই মিথ এসেছে বিজয়োল্লাসী মার্কিন বুদ্ধিজীবী শ্রেণি থেকে, যাদের “ইতিহাসের সমাপ্তি” ধারণা অর্থনীতি ও রাজনৈতিক তত্ত্বের মতো ক্ষেত্রগুলোতে রক্ষণশীলতা জোরদার করেছিল এবং পুঁজিবাদ-পরবর্তী ব্যবস্থা সম্পর্কিত কোন খোলামেলা আলোচনার পথ রুদ্ধ করেছিল। এমনকি, যখন প্রথাগত অর্থনীতি বিদ্যমান সংকট সমূহের ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়, বিশেষ করে ২০০৭–০৮ সালের মহা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও, তখনও এই শাস্ত্র তার বৈধতা ধরে রাখে। এই মিথগুলো জনপ্রিয় হয়েছিল হলিউড চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন সিরিজের মাধ্যমে, যেখানে ধ্বংসযজ্ঞ ও ডিস্টোপিয়ান বা দুঃস্বপ্নলোকের কাহিনী গ্রহীয় (planetary) ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়, তবুও সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের কথা বলেনা। পৃথিবীর সমাপ্তি কল্পনা করা যেন সমাজতান্ত্রিক এক দুনিয়া কল্পনা করার চেয়ে সহজতর।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময়, ‘টু বিগ টু ফেইল’ (too big to fail; অত্যন্ত বড়, তাই ব্যর্থ হতে পারে না) কথাটি জনসচেতনতায় স্থায়ী হয়ে যায়, যা পুঁজিবাদ যে চিরন্তন এবং এর ভিত্তি নড়বড়ে করার চেষ্টাও যে বিপদজনক—এ ধারণাকে জোরদার করে। পুরো ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছিল। কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি নখ-দন্ত বের করেছিল অনিশ্চিত জীবিকার মানুষদের দিকে। ছোট ব্যবসাগুলো ভেঙে পড়েছিল ঋণের অভাবে। তবুও পুঁজিবাদকে অতিক্রম করার কোন ব্যাপক চিন্তা হয়নি। বিশ্ববিপ্লবকে নিকট ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে দেখা যায়নি। এই আংশিক বাস্তবতা আশা-আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রেখেছিল, পুঁজিবাদ-পরবর্তী ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করেছিল। এই ব্যবস্থা—“টু বিগ টু ফেইল”—এখন চিরস্থায়ী বলে মনে হয়। কিন্তু আমাদের ঐতিহ্য নিরাশার বিপক্ষে দাঁড়ায় এবং দাবি করে যে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হবে আশাবাদ। কিন্তু এই আশার বস্তুগত ভিত্তি কোথায়? এই ভিত্তি তিনটি স্তরে পাওয়া যায়:

১. ক্ষুধা ও নিরক্ষরতা, গৃহহীনতা ও অমর্যাদার মতো দুর্দমনীয় বাস্তবতাগুলোকে অদৃশ্য করা যায় না। যাদের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে, তাদেরকে চুপ করানো সম্ভব নয়, আর যদি এই বাস্তবতাগুলো মোকাবিলা না করা হয় তবে সেগুলো দূরও হবে না। এই অস্বীকৃতি থেকেই জন্ম নেয় হতাশা ও ক্রোধ।

২. বৈশ্বিক উৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি—কৃষি, শিল্প এবং সেবাখাতে—আমাদের এমন এক পৃথিবী কল্পনা করার ক্ষমতা দিয়েছে, যা প্রয়োজনকে অতিক্রম করে স্বাধীনতার দরজা খুলে দিতে পারে। কেবল আইনী ঘোষণা দিয়ে স্বাধীন হওয়া যায় না। স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন পুঁজিবাদের অধীনে জীবনের এই বেয়াড়া বাস্তবতাগুলোকে অতিক্রম করা। বহু দশক ধরে আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করছি, যেখানে মানবতার প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য রয়েছে।

৩. বৈশ্বিক উৎপাদনে এই অগ্রগতিগুলো কেবল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির কারণে হয়নি, বরং চূড়ান্তভাবে শ্রমের সামাজিকীকরণের কারণে ঘটেছে। যাকে আমরা বিশ্বায়ন বলি, তা পুরো প্রক্রিয়াটিকে মূলধনের দৃষ্টিকোণ থেকে এবং মুনাফা বৃদ্ধির দিক থেকে দেখে। কিন্তু এটি স্বীকার করে না যে এই বিশাল অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে কারণ শ্রমিকরা এখন বিশ্বব্যাপী একসাথে কাজ করছে, এবং শ্রমের এই সামাজিকীকরণ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী শ্রেণির সংহতিকে প্রতিফলিত করে। শ্রমের এই সামাজিকীকরণ ব্যক্তিমালিকানার সংকীর্ণ, দমবন্ধ করা সীমানার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, যা নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে আরও অগ্রগতিকে আটকে রাখে। শ্রমের সামাজিকীকরণ ও ব্যক্তিমালিকানার মধ্যে এই দ্বন্দ্বই সম্পত্তিকে সামাজিকীকরণের সংগ্রামকে, যা আধুনিক সমাজতন্ত্রের ভিত্তি—গভীর করে তোলে, যেমনটি মার্কস ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

পুঁজিবাদ ইতিমধ্যেই ব্যর্থ। এটি আমাদের সময়ের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে না, সেই দুর্দমনীয় বাস্তবতাগুলো—যেমন ক্ষুধা ও নিরক্ষরতা—যা প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে বিদ্যমান। শুধু বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়। মানুষের বেঁচে থাকার পাশাপাশি বিকশিত হওয়ার অধিকার থাকতে হবে। আর এই মনোভাবই বৈপ্লবিক রূপান্তরের দাবি তোলে।

★ ★ ★ ★ ★

আমাদের জাতীয় মুক্তির মার্কসবাদী ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং একইসঙ্গে আমাদের আন্দোলনগুলোর কাজের ভিত্তিতেও সেই ঐতিহ্যের তত্ত্বকে আরও বিকশিত করতে হবে। আমাদেরকে হো চি মিন ও ফিদেল, ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ ও ক্লডিয়া জোন্সের তত্ত্বগুলোর প্রতি আরও মনোযোগ দিতে হবে। তারা শুধু গতানুগতিক কাজই করেননি, নতুন তাত্ত্বিক চিন্তাধারার উপস্থাপনও করেছেন। সেসব তত্ত্বগুলোকে আমাদের সমকালীন বাস্তবতাযর নিরিখে বিকশিত ও পরীক্ষিত করতে হবে। শুধু ধ্রুপদী রচনাগুলোর ওপর নির্ভর না করে—যেগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ—আমাদের বর্তমান বাস্তবতার আলোকে মার্কসবাদকে নির্মাণ করতে হবে। লেনিনের ‘নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ (concrete analysis of the concrete conditions)’ দাবি করে সুনির্দিষ্ট, বাস্তব, ঐতিহাসিক তথ্যের প্রতি নিবিষ্ঠ মনোযোগ। আমাদের সময়ের আরও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন প্রয়োজন। সমকালীন সাম্রাজ্যবাদের—যা সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে একটি সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব গঠনের ঐতিহাসিক প্রয়োজনকে বাধাগ্রস্ত করছে—আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দরকার। ঠিক এই লক্ষ্যেই ট্রাইকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ কাজ করছে প্রায় ত্রিশটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যাদের সঙ্গে আমরা নেটওয়ার্ক অব রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করি, এবং আমরা ২০০ টির বেশি রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও কাজ করি, যাদের মাসলাইন (mass line) আন্তর্জাতিক পিপলস’ অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে ট্রাইকন্টিনেন্টালের গবেষণা এজেন্ডাকে ভিত্তি জোগায়।

নিশ্চিতভাবেই সমাজতন্ত্র জাদুর মতো হঠাত করে আবির্ভূত হবে না। এটিকে সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন ও নির্মাণ করতে হবে। আমাদের লড়াইকে আরও সুগভীর করতে হবে। আমাদের সামাজিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। আমাদের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। এখনই ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গড়ে তোলার সময়—শ্রমিক শ্রেণি, কৃষক শ্রেণি ও মিত্র শ্রেণিগুলোকে একত্রিত করার মাধ্যমে শ্রমিকদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং আমাদের তত্ত্বকে আরও সুস্পষ্ট করা জরুরি। শ্রমিক শ্রেণি, কৃষক শ্রেণি এবং মিত্র শ্রেণিগুলোর ঐক্য গড়ে তুলতে হলে সকল বাম ও প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য অপরিহার্য। এই চরম সঙ্কটের সময়ে বিভাজনকে ভরকেন্দ্র করা চলবে না; আমাদের ঐক্য অপরিহার্য। মানবতা সেটিই দাবি করছে।

[১] Karl Marx and Friedrich Engels, The German Ideology (Moscow: Progress Publishers, 1968), 38.

[২] Food and Agriculture Organisation, Building a Common Vision for Sustainable Food and Agriculture. Principles and Approaches (Rome: FAO, 2014); FAO, IFAD, UNICEF, WFP and WHO, The State of Food Security and Nutrition in the World 2022: Repurposing Food and Agricultural Policies To Make Healthy Diets More Affordable (Rome: FAO, 2022), vi.

[৩] Fidel Castro, Statement at the UN General Assembly, in capacity of NAM President, 12 October 1979.

[৪] Tricontinental: Institute for Social Research, In the Ruins of the Present, working document no. 1, 1 March 2018.

[৫] Govindan Raveendran and Joann Vanek, ‘Informal Workers in India: A Statistical Profile’, Statistical Brief 24 (Women in Informal Employment: Globalising and Organising, August 2020), 1; Tricontinental: Institute for Social Research, The Farmers’ Revolt in India, dossier 41, 14 June 2021.

[৬] Frantz Fanon, The Wretched of the Earth, trans. Richard Philcox (New York: Grove Press), 5.

[৭] Organisation for Economic Cooperation and Development, ‘Global Outlook on Financing for Sustainable Development 2021’, 9 November 2020.

[৮] Tricontinental: Institute for Social Research, Serve the People: The Eradication of Extreme Poverty in China, 23 July 2021.

[৯] FAO et al., The State of Food Security, vi.

[১০] Lusaka Times, ‘Over 60% Copperbelt Province Lower Primary Pupils Can’t Read and Write—PEO’, Lusaka Times, 18 January 2018.

[১১] Stockholm International Peace Research Institute, ‘World Military Expenditure Passes $2 Trillion for First Time’, SIPRI, 25 April 2022.

[১২] Karl Marx, Capital: A Critique of Political Economy—Volume I, trans. Ben Fowkes (London: Penguin Books, 2004), 670.

[১৩] Tricontinental: Institute for Social Research, Uncovering the Crisis: Care Work in the Time of Coronavirus, dossier no. 38, 7 March 2021, https://thetricontinental.org/dossier-38-carework/.

[১৪] Tricontinental: Institute for Social Research, CoronaShock and Socialism, CoronaShock no. 3.

[১৫] Ernst Bloch, Heritage of Our Times, trans. Neville and Stephen Plaice (Berkeley; Los Angeles: University of California Press, 1991), 103.

মূল ইংরেজি থেকে অনূদিত

মন্তব্য নেই

  • Philip W

    প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্য

    Phasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.

  • Philip W

    প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্য

    Phasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.

মন্তব্য লিখুন