পরিচয়ের রাজনীতি: উত্থান ও আত্মবিরোধ
সাম্প্রতিককালে বহুল আলোচিত বিষয় হলো ‘পরিচয়ের রাজনীতি’ (Identity Politics)। অনেকেই এই শব্দটি সম্পর্কে আগে থেকেই কিছুটা অবগত। কারণ অনেক বিতর্ক, বিশেষ করে জাতি, লিঙ্গ এবং যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো, পরিচয়ের রাজনীতি বা আইডেন্টিটি পলিটিক্সের ধারণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। পরিচয়ের রাজনীতি এমন অনেক বিতর্কে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যাতে—অনেকেই মনে করতে পারে যে বামপন্থী রাজনীতি মানেই পরিচয়ের রাজনীতি, আর পরিচয়ের রাজনীতিই যেন বামপন্থী রাজনীতির পুরোটা। কিন্তু সত্যি বলতে, ব্যাপারটা এমন নয়।
ঐতিহ্যবাহী বামপন্থী রাজনীতি ছিল শ্রেণি রাজনীতির (Class Politics) ওপর ভিত্তি করে। কমিউনিস্ট সমাজতন্ত্রী ও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে বড় গণসংগঠন তৈরি করত। এর পেছনের ধারণা ছিল সব জাতি, ভাষা, ধর্ম ও পরিচয়ের মানুষ এই সংগঠনের পতাকাতলে একত্রিত হয়ে পুঁজিবাদকে উৎখাত করতে বা অন্তত পুঁজিবাদে সংস্কার আনতে সাহায্য করবে। এই রাজনীতি গড়ে উঠেছিল একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি ঘিরে—যার চারপাশে বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষ একত্রিত হতো, দলকে এগিয়ে নিত, তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করত। উদারপন্থি রাজনীতি এবং বাম রাজনীতি—উভয়ের ক্ষেত্রেই এমনটাই ছিল মূল কাঠামো।
১৯৮০-এর দশকে পরিচয়ের রাজনীতির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জাতি, ভাষা, ধর্ম ও পরিচয়ের মানুষের ঐক্যভিত্তিক মতাদর্শগত রাজনীতির অগ্রযাত্রায় কিছুটা ছেদ পড়ে। কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ, কর্মসূচি বা চিন্তাধারার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের বদলে, মানুষ কিছু নির্দিষ্ট পরিচয়ের ভিত্তিতে সংগঠিত হতে শুরু করে। এই পরিচয়গুলো ছিল বয়স, ধর্ম, শ্রেণি, পেশা, সংস্কৃতি, প্রতিবন্ধকতা, শিক্ষা, বর্ণ (Race), জাতিসত্তা, ভাষা, লিঙ্গ, পেশা, যৌন প্রবৃত্তি, শহর বা গ্রামের অধিবাসী, ইত্যাদি। আর এই ‘পরিচয়ের রাজনীতি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার হয়েছিল ১৯৭৮ সালে কম্বাহি রিভার কালেকটিভে (Combahee River Collective)। আর তখন থেকেই এটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রোন্যাল্ড রিগ্যান ও যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচার ক্ষমতায় এসে জাতীয় পর্যায়ে নানা নব্য-উদারপন্থী সংস্কার (Neoliberal Reforms) বাস্তবায়ন করছিলেন। সেই সময়ে কল্যাণ রাষ্ট্রের ব্যবস্থা (Welfare State) ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছিল। সে সময়ে ইউরোপের বামপন্থিরা বেশিরভাগ জায়গায় কল্যাণ রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। আর তারা এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারার আসল কারণ এটা নয় যে, তারা রক্ষণশীলদের দ্বারা পরাভূত হয়েছিল। বরং বামপন্থিদের নিজেদের মধ্যে ভাঙ্গনই এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারার মূল কারণ। এই ভাঙনের পেছনে ছিল একাডেমিক পর্যায়ে পোস্টমডার্নিজম (Postmodernism) ও পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের (Post-structuralism) উত্থান, যা বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে রাজনীতির মাঠে পরিচয় রাজনীতি এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করছিল।
পরিচয়ের রাজনীতি (Identity Politics) মূলত দলভিত্তিক রাজনীতির (Party-based Politics) সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না। দলভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে তারা পরিচিতিভিত্তিক (Identity-based) এবং ইস্যুভিত্তিক (Issue-based) রাজনীতি করতে চায়। অর্থাৎ, তারা কাজ করবে যেমন—লিঙ্গের প্রশ্নে, জাতিগত প্রশ্নে, যৌন পরিচয়ের প্রশ্নে, ল্যাটিন আমেরিকার জনগোষ্ঠীর প্রশ্নে, ভাষাগত প্রশ্নে—যে পরিচয়ই হোক না কেন। কিন্তু তারা রাজনৈতিক দল গঠন করবে না; বরং গঠন করবে তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র সংগঠন বা সামাজিক আন্দোলন (Social Movements), যা নির্দিষ্ট কোনো পরিচিতির ভিত্তিতে মানুষকে সংগঠিত করবে—সমগ্র সমাজের জন্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কর্মসূচির ভিত্তিতে নয়।
আর এই ক্ষেত্রে, তারা স্পষ্টতই কেবল সেই নির্দিষ্ট ইস্যুতে একমত ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। তাই এটিকে ‘ইস্যুভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন’ও বলা যেতে পারে। অনেকেই যুক্তি দিয়েছেন যে—এগুলোকে রাজনৈতিক আন্দোলন বলা ঠিক নয়, বরং এগুলো ছিল সমাজের নির্দিষ্ট অংশের দাবি ও স্বার্থ নিয়ে গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলন।
পরিচয়ের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—এটি শ্রেণি (Class)-এর বাইরে আরও অনেকগুলো নতুন পরিচয়ের ভিত্তি তৈরি করে, যেগুলোর ভিত্তিতে তারা রাজনীতি করতে চায়। এগুলো কী কী ছিল?
তারা একটি অক্ষ বা দ্বৈততা (Binary) তৈরি করে, যার এক পাশে থাকে সুবিধাভোগীরা (Privileged), আর অন্য পাশে থাকে বঞ্চিত, অধীন, নিপীড়িত মানুষরা (Under-Privileged)। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এই দ্বৈত কাঠামোকে সংকুচিত করা—সুবিধাভোগীদের কিছুটা কম সুবিধা দেওয়া, আর বঞ্চিতদের আরও ক্ষমতায়িত করা। তাহলে, এই দ্বৈততাগুলো কী কী? উদাহরণস্বরূপ:
- একজন পুরুষালি পুরুষ অথবা নারীসুলভ নারী—যারা প্রচলিত লিঙ্গ পরিচয়ের (Gender Stereotype) সঙ্গে মানানসই—তারা সমাজে বেশি ক্ষমতা ও সেই সুবিধা ভোগ করে। তুলনায় যাদের লিঙ্গ পরিচয় প্রচলিত ধরণ থেকে ভিন্ন (যেমন: কোমল-শান্ত-লাজুক পুরুষ কিংবা সাহসী-দুরন্ত-মারদাঙ্গা নারী), তাদের সমাজে কম সুযোগ ও মর্যাদা মেলে।
- একজন পুরুষ, একজন নারীর তুলনায় বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত।
- শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের তুলনায় বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত।
- ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতরা অ-ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতদের তুলনায় বেশি সুবিধা পায়।
- হেটারোসেক্সুয়ালরা (Heterosexuals, বিপরীত লিঙ্গভিত্তিক যৌন সম্পর্ক) এলজিবিটি (LGBT, নারী ও পুরুষ সমকামী, ট্রান্সজেন্ডার) জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত।
- অক্ষমদের তুলনায় বেশি শারীরিকভাবে সক্ষমরা সুবিধাভোগী।
- শিক্ষিত বা সনদপ্রাপ্তরা অশিক্ষিত বা অদক্ষদের তুলনায় বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত।
- তরুণরা বয়স্কদের তুলনায় বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত।
- সুন্দর বা আকর্ষণীয় মানুষরা অপেক্ষাকৃত কম আকর্ষণীয়দের চেয়ে বেশি মর্যাদা পায়।
- উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা ধনীরা গরিবদের তুলনায় বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত।
- যারা ইংরেজি বলতে পারে, তারা যারা পারে না তাদের তুলনায় বেশি সুযোগ পায়।
- উজ্জ্বল ত্বকের মানুষ গাঢ় ত্বকের মানুষের চেয়ে বেশি সামাজিক মর্যাদা পায়।
- অ-ইহুদিরা ইহুদি জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত।
- যারা সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম, তারা যারা বন্ধ্যাত্বে ভোগে তাদের তুলনায় বেশি মর্যাদা পায়।
তবে শুধু এই পরিচিতিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা দরকার নেই—চাইলে যেকোনো নতুন পরিচিতি যোগ করা যায়। এমনকি, কারও চুল সাদা হয়ে যাওয়া (graying hair)—এমন পরিচিতিও চাইলে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। কোনো বিশেষ আপত্তি নেই নতুন কোনো পরিচিতি বা সুবিধার অক্ষ (Axis of Privilege and Identity) সংযোজনের ক্ষেত্রে। অনেকেই এমন অনেক ইস্যু ও অক্ষের কথা বলেছেন, যেগুলোর এক পাশে সামাজিক মর্যাদা বা সুবিধা দেওয়া হয়, আর অন্য পাশে দেওয়া হয় অবমূল্যায়ন বা বঞ্চনা।
এখন, যে কেউ সহজেই বুঝতে পারবেন যে এই সব পরিচিতি বা অক্ষগুলো কোনো একক উৎস থেকে উদ্ভূত নয়। এগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়াতে পারে, ছেদ ঘটাতে পারে—তবু এগুলো একে অপরের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো একটি পরিচিতি বা ক্ষমতার অক্ষ অন্য সবগুলোর উপর প্রাধান্য পায় না।
এর মানে কী? এর মানে, প্রথাগত বাম রাজনীতি বলত—আমরা শ্রেণি নিপীড়নের (Class Oppression) মুখোমুখি, আর এই শ্রেণি নিপীড়নের ফলে একটি শোষণমূলক (Exploitative) ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থা গরিব, দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষদের শোষণ করে চলে। এই শোষণ চালিয়ে যেতে হলে নানা ধরনের চিন্তাধারা, কাঠামো ও সংস্কার তৈরি করতে হয়, যেগুলো শোষণকে আরও গভীর করে, তা বৈধতা দেয়। দাসত্ব, পিতৃতন্ত্র ও অন্যান্য বিষয়গুলোর বৈধতার জন্য তৈরি হয় একটা পূর্ণ মতাদর্শ বা অধিকাঠামো (Superstructure)।
কিন্তু এই সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গরিব ও নিপীড়িতদের শোষণ। তাই, এই ধারণা অনুসারে—সব পরিচয়ের মানুষকে—যেমন নারী, শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, প্রান্তিক গোষ্ঠী—সবার উচিত একত্রিত হয়ে নিজেদের একটি শ্রেণি (Class) হিসেবে চিহ্নিত করা, এবং একসঙ্গে এই শোষণ ব্যবস্থাকে উৎখাত করা। আর এই পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থাকে পরাজিত করে, কিংবা অন্তত সংস্কার করে, আমরা একটি সমতা ও ন্যায়ের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, কারণ এই ভিন্ন ভিন্ন সমস্যাগুলোর মূল অন্তর্নিহিত কাঠামো একটাই—শোষণের রাজনৈতিক অর্থনীতি (Political Economy of Exploitation)।
এই ধারণাকে ১৯৭০ ও ’৮০-এর দশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। বলা হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গি শ্রেণিকে অন্য সব ধরনের নিপীড়নের ওপরে প্রাধান্য দিচ্ছে। এটি শ্রেণিকে লিঙ্গবৈষম্যের (Sexism) ওপরে তুলে ধরছে, শ্রেণিকে বর্ণবৈষম্যের (Racism) থেকেও বড় করে দেখছে। এটি বর্ণবৈষম্যকে কেবল শ্রেণি ব্যবস্থার একটি উপশাখা বা ফলাফল হিসেবে বোঝাচ্ছে, যেখানে প্রকৃতপক্ষে এটি একটি স্বতন্ত্র ও ভিন্ন ধরনের নিপীড়ন।
এই ধারণার পরিণতি কী হয়? ফলাফল হয় এই যে, বাম রাজনীতির যে বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো একসময় গোটা সমাজের সংস্কার বা বিপ্লবের কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল—তারা ক্রমশ ভেঙে পড়ে। এই ধারণাগুলো সবসময়ই সমাজে ছিল, কিন্তু তখন পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট (Post-structuralist) ও পোস্টমডার্নিস্ট (Postmodernist) কর্মীদের কারণে সেগুলোর গুরুত্ব বাড়ে, এবং আলাদাভাবে রাজনৈতিক জোর পেতে শুরু করে।
যেমন, একটি সাধারণ ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে একজন শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকের মধ্যে সহযোগিতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক মনে করতে পারেন যে শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা ভোগ করেন। তাই তারা নিজেদের স্বতন্ত্র, কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয়ের সংগঠন গড়ে তুলতে চাইবেন। একইভাবে নারীরা চাইবেন নারীদের জন্য আলাদা সংগঠন, এবং বিভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষ চাইবেন তাদের নিজ নিজ পরিচয়ের ভিত্তিতে সংগঠন গঠন করতে।
ফলে কী হয়? ফলাফল দাঁড়ায়—বৃহৎ আন্দোলনগুলো, যেমন বড় ট্রেড ইউনিয়ন বা ১৯৫০, ’৬০ ও ’৭০-এর দশকে গড়ে ওঠা বামপন্থী গণআন্দোলনগুলো পরিচিতির ভিন্ন ভিন্ন রেখায় ভেঙে পড়ে। আর যেহেতু এই সব পরিচিতির মধ্যে কোনো পরিচিতি অপরটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়—তাই আর কেউ বলতে পারে না যে, ‘দারিদ্র্য হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। আগে এটা সমাধান করি, তারপর অন্য সমস্যাগুলো দেখা যাবে।’ না, সেটা আর বলা যায় না।
এখন দারিদ্র্যের প্রশ্নটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় একজন মানুষ ‘আকর্ষণীয়’ না ‘অনাকর্ষণীয়’—এই প্রশ্নটিও। অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নটি ঠিক তেমন গুরুত্বে গণ্য হবে, যেমনভাবে শারীরিক সৌন্দর্যের প্রশ্নটি গুরুত্ব পায়।
আগে যখন মার্কসবাদীরা বলতে পারত—এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান দ্বন্দ্ব (Principal Contradiction) কী—যেমন, আমাদের এখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, অথবা এই সমস্যাটা আগে সমাধান করতে হবে, কিংবা কল্যাণ রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হবে। সেই সময় তারা বলতে পারত, ‘আকর্ষণীয় বনাম অনাকর্ষণীয়’ হওয়ার প্রশ্নটা এখনই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে না, কারণ আমরা মনে করি এটি একেবারে তুচ্ছ নয়, কিন্তু এরচেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—সব মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু এখন এই ধরনের অবস্থানকে বলা হয় ‘চরম স্বার্থপরতা’ বা ‘চূড়ান্ত সুবিধাবাদিতা’। এটি হয়ে যায় নিষিদ্ধ—‘নো-গো এরিয়া’। এখন প্রত্যেকটি প্রশ্ন একইসঙ্গে এবং সমান গুরুত্বে দেখতে হবে—এমনটাই দাবি করা হয়।
এর ফলাফল কী? ধরুন, ইংল্যান্ডের দিকে তাকান। ওয়েন জোন্স (Owen Jones) বলেন, এর ফলে লেবার পার্টির (Labour) অবক্ষয় ঘটে এবং টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে ‘নিউ লেবার’ (New Labour)-এর উত্থান ঘটে। এই নিউ লেবার একদিকে নিজেদের বাম রাজনীতির ধারক হিসেবে উপস্থাপন করে, আর অন্যদিকে অর্থনৈতিক নীতিতে চালু করে মূলত ‘নব্য-উদারপন্থা’ (neoliberalism)—যার বিরুদ্ধে এখন জেরেমি করবিন (Jeremy Corbyn) প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন এবং লেবারকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
ওয়েন জোন্স বলছেন, এই ধরনের পরিচয়ের রাজনীতি (Identity Politics) আসলে শ্রমিকশ্রেণির রাজনীতিকে (working-class politics) পেছনে ঠেলে দেয়। নিউ লেবার এইভাবে নিজেদের বিপ্লবী ভাবমূর্তি ধরে রেখে একইসঙ্গে থ্যাচারপন্থী (Thatcherite) নীতিগুলো সামনে এগিয়ে নিতে পারে।
একইভাবে, ক্রিস হেজেস (Chris Hedges) বলেন—পরিচয়ের রাজনীতি হলো কর্পোরেট পুঁজিবাদের (corporate capitalism) একটি রূপ, যা কেবল রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করে। এখন প্রায় সব কর্পোরেশনই এসব পরিচিতি ইস্যুতে নিজেদের ভূমিকা দেখিয়ে বলে, ‘দেখুন, আমরা এই সমস্যা সমাধানে কতটা সচেতন—তাই আমাদের পণ্য কিনুন!’ অর্থাৎ, আজকের পৃথিবীতে পরিচয়ের রাজনীতি অনেকটাই কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের দ্বারা দখল হয়ে গেছে।
এভাবেই, চার্লস ডারবার (Charles Derber) বলছেন—আমেরিকান বামপন্থা এখন অনেকটাই পরিচয়ের রাজনীতির একটি দল হয়ে গেছে। তারা পুঁজিবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতির (Political Economy) বিরুদ্ধে কোনো বিস্তৃত সমালোচনা উপস্থাপন করে না। আমেরিকান বামপন্থা কৃষ্ণাঙ্গদের, নারীদের ইত্যাদির জন্য সংস্কারমূলক দাবির ওপর গুরুত্ব দেয় ঠিকই, কিন্তু তা বৃহৎ কাঠামো হিসেবে পুঁজিবাদের মধ্যে বসিয়ে বিশ্লেষণ করে না। পরিচয়ের রাজনীতি একবার বাম রাজনীতির মধ্যে ঢুকে গেলে, তারপরে আর কোনো পুঁজিবাদবিরোধী সমালোচনা অবশিষ্ট থাকে না।
এর ফলে কী ঘটে? এর ফলে বাম রাজনীতি খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়ে, বাম রাজনীতি পরিণত হয় ‘অরাজনৈতিক’ (Depoliticized) চর্চায়। কারণ এটি ধনীদের হাতে গরিবদের শোষণের বিষয়টি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, আর মনোযোগ দেয় সাংস্কৃতিক বিষয়ের দিকে। অথচ মূল সমস্যা অর্থনৈতিক, একটি মারাত্মক রকমের বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই আসল সমস্যা। অথবা যদি অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা বলেও, তা তো বলা হয় একাধিক পরিচয় প্রশ্নের মধ্যে একটি হিসেবে, কোনো আলাদা গুরুত্ব না দিয়েই।
এখানে পরিচয়ের রাজনীতির ভেতরে আরেকটি ধারণা উঠে আসে—‘প্রামাণিক ভাষার অধিকার’ বা ‘অভিজ্ঞতাজনিত সত্য’ (Language of Authenticity)। যার অর্থ হলো—যিনি নিজে কোনো অভিজ্ঞতা ভোগ করেছেন, সেই ব্যক্তিই কেবল সেই বিষয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন। উদাহরণ হিসেবে, অড্রে লর্ড (Audre Lorde) বলেন—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই আমাদের সংজ্ঞায়িত করে। সেটাই একমাত্র উৎস যার মাধ্যমে কেউ নির্দিষ্ট বিষয়ে কথা বলার বৈধতা পায়। আপনি যদি নারী না হন, তাহলে নারীর অধিকারের বিষয়ে কথা বলা উচিত নয়। আপনি যদি পাকিস্তানি না হন, বা মুসলমান না হন, তাহলে আপনি পাকিস্তানি বা মুসলমানদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন না।
অড্রে লর্ডের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো—‘If I didn’t define myself for myself, I would be crunched into other people’s fantasies for me and eaten alive.’ অর্থাৎ, যদি আমি নিজেকে নিজের জন্য সংজ্ঞায়িত না করি, তবে আমি অন্যদের কল্পনার ভেতর পিষে যেতাম এবং নিঃশেষ হয়ে যেতাম।
এখন আপনি বুঝতে পারছেন—এখানে একটি বিষয়ীগত (Subjective) ভাষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে একটি প্রথাগত বৈজ্ঞানিক (Scientific) ভাষ্যের ওপর। পূর্ববর্তী বৈজ্ঞানিক বয়ান বলত, ‘এই হচ্ছে তথ্য (Data), এই তথ্য কী বলছে, এবং জাতিগত সম্পর্ক (Race Relations) উন্নত করতে হলে আমাদের কী করা উচিত।’ এর বিপরীতে এখন ব্যক্তি-অভিজ্ঞতাকে মুখ্য করে তোলা হচ্ছে।
একই প্রসঙ্গে, ভারতীয় বুদ্ধিজীবী, গবেষক এবং সমাজকর্মী গায়ত্রী স্পিভাক (Gayatri Spivak) একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ লেখেন—‘Can the Subaltern Speak?’ যা পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলেছিল। আবার যুক্তরাষ্ট্রে, বেটি ফ্রিডান (Betty Friedan) ও গ্লোরিয়া স্টাইনেম (Gloria Steinem)—এই দুই নারীবাদী নেত্রীকে নিজ নিজ আন্দোলনের মধ্য থেকেই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। কারণ তাঁরা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ, মধ্যবিত্ত, এবং হেটারোসেক্সুয়াল নারী—এই অবস্থান থেকে তাঁরা শ্রমজীবী নারী, এলজিবিটি মানুষ বা কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের পক্ষে কথা বলার অধিকার রাখেন না—এই ছিল যুক্তি। তখন আত্ম-উপস্থাপনাকে (Self-representation) অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জোরালোভাবে বলা হয়।
এটা শুনতে অনেকটা স্বাভাবিকই মনে হতে পারে, যেন কমনসেন্সের কথাই বলা হচ্ছে। কিন্তু মার্কসবাদী ও সমাজতন্ত্রী চিন্তাবিদেরা যুক্তি দেন—পরিচয়ের রাজনীতি (Identity Politics) মূলত বস্তুবাদী সমালোচনার (Materialist Critique) অবসান ঘটায়। এটি একটি বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণধারার মৃত্যু ডেকে আনে, যেখানে দেখা হতো, ‘তথ্য কী বলছে?’ বা অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ (Empirical Evidence) কী দেখাচ্ছে?”
এটা ঠিক যে কেউ বলেনি তথ্য (Data) নেই। কিন্তু যারা বিষয়ীনির্ভর জ্ঞানতত্ত্ব বা ‘Subjectivist Epistemology’-এর প্রবল সমর্থক, তারা যুক্তি দেন—যারা বলেন ‘তথ্য’ বা ‘Data’ নাকি নিরপেক্ষ, তারা আসলে বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশে নিজেদের পক্ষপাত (Bias) ঢেকে রাখছেন, এবং ‘বিজ্ঞানের ভাষায়’ লুকিয়ে ফেলছেন নিজেদের অবস্থান। এবং এটি সত্যি—আমরা যখন যেকোনো বিষয়কে দেখি, আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে একেবারে বিশুদ্ধ নিরপেক্ষতা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।
মার্কসবাদীরা বিষয়ীনির্ভর জ্ঞানতত্ত্বের এই উত্থানকে (Subjectivism at the Epistemological Level) তীব্রভাবে সমালোচনা করেন। তারা বলেন—এ ধরনের একটি জ্ঞানের ধরন খুব সহজেই ডানপন্থি (Right-wing) শক্তি বা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা ‘Co-opt’ বা দখল করে নেওয়া যায়। শুধু বিষয়গত চিন্তা আপনাকে কখনওই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক সমতাভিত্তিক বা প্রগতিশীল সমাজে পৌঁছে দেবে—তা নিশ্চিত নয়।
এখানে শুধু মার্কসবাদীরাই নন, অনেক লিবারাল (Liberal) চিন্তাবিদও এই বিষয়ে লেখালেখি করেছেন। যেমন, সুসান মোলার ওকিন (Susan Moller Okin) বলেন—‘সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা’ (Cultural Relativism) ও ‘বহুসাংস্কৃতিকতা’ (Multiculturalism) অনেক সময় নারীদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে, কারণ তা সংখ্যালঘু সংস্কৃতিতে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করতেও সহায়তা করতে পারে।
ক্যারল সোয়েন (Carol Swain) বলেন—অশ্বেতাঙ্গদের জাতিগত গর্ব এবং বর্ণভিত্তিক পরিচিতি রাজনীতির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব, আসলে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের (White Nationalism) উত্থানকে উৎসাহিত করছে। এবং অনেকেই যুক্তি দিয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান আসলে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের রাজনীতিরই ফলাফল।
এছাড়াও, পরিচয়ের রাজনীতির আরও একটি সমালোচনা হলো—এটি ‘Navel-gaying’ বা অতিরিক্ত আত্ম-মনোযোগের দিকে ঠেলে দেয়। মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে শেখায়—নিজের শরীর, নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের অবস্থান—এইসব নিয়ে এমন একধরনের আত্মমগ্নতা তৈরি করে, যা ব্যক্তিকে বৃহত্তর সমাজ ও সমষ্টির সঙ্গে যুক্ত না করে, বরং বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
ধরা যাক, আপনি ‘ইন-গ্রুপ’-এর সদস্য—অর্থাৎ, আপনি নিজেই সেই পরিচয়ের অধিকারী এবং নিজেকে নিয়ে কথা বলছেন—তাহলে এখানে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়: সহনশীল আত্মীকরণ বনাম বিচ্ছিন্নতা। ধরা যাক আপনি সালটে সম্প্রদায়ের—নিজেকে মূলধারার সংস্কৃতির সঙ্গে একীভূত করেন, তাহলে কি আপনি আপনার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলেন; আপনাকে কি এক অর্থে গিলে ফেলা হয়। আবার আপনি যদি নিজের পরিচয় রক্ষা করেন এবং নিজেকে বৃহত্তর সমাজ থেকে আলাদা রাখেন, তাহলে আপনি শুধু মানসিকভাবে নয়, বাস্তব অর্থেও নিজেকে একটি গেটো বিচ্ছিন্ন জায়গায় আবদ্ধ (Ghetto) করে ফেলতে পারেন। এটি অনেক সময় ‘বুদ্ধিবৃত্তিক আবদ্ধকরণ’ হিসেবেও পরিণত হয়।
এ কারণেই বহু লেখক যুক্তি দিয়েছেন—এই ধরনের পরিচয়ের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক অবস্থানকে আরও দীর্ঘতর করে। কারণ, আপনি বারবার জোর দিচ্ছেন—কীভাবে আপনি অন্যদের থেকে আলাদা, সমাজের বাকিদের থেকে ভিন্ন।
অন্যদিকে, আপনি যদি ‘আউট-গ্রুপ’-এর সদস্য হন, তাহলে সেখানে একটি বিপরীত ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়: প্রান্তিকতা বনাম ঔপনিবেশিকতা। যেমন, যদি আপনি ‘আউট-গ্রুপ’-এ থাকেন এবং অড্রে লর্ড (Audre Lorde)-এর মতবাদ অনুসরণ করেন, তাহলে আপনাকে সেই বিষয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়, যেটি আপনি নিজে অভিজ্ঞতা হিসেবে অনুভব করেননি।
ধরুন, আপনি একজন পুরুষ—তাহলে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলবেন কি? পরিচয় রাজনীতির উত্তর হবে—না, কারণ আপনি নারী নন; আপনি নারীর অভ্যন্তরীণ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানেন না।
তাহলে, ‘আউট-গ্রুপ’-এর সদস্য হিসেবে আপনি নারীর বিষয় নিয়ে কথা না বললে, আপনি যেন তাদের নিজের জায়গায় কথা বলার অধিকারকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এতে আপনার প্রতি অভিযোগ উঠতে পারে—আপনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীরব আছেন, নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলছেন না, আপনি সেই প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করছেন।
আবার আপনি যদি কথা বলেন, তাহলে আরেকটি বিপরীত অভিযোগ উঠতে পারে—আপনি নারীর এলাকা দখল করছেন। বিশেষ করে যারা পরিচয়ের রাজনীতির জোরালো সমর্থক, তারা বলবেন—পুরুষদের নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা মানেই নারীদের ক্ষেত্র দখল করে নেওয়া।
এখন, এই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে কে ঠিক, তার স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। এটি একটি চিরস্থায়ী ও জটিল দ্বন্দ্ব বলে মনে হয়—‘আউট-গ্রুপ’-এর কেউ যদি চুপ থাকে, তাকে বলা হয় সে অবহেলা করছে। আবার সে কথা বললে, বলা হয় সে জায়গা দখল করছে। এদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার, বা এমন কোনো পথ খুঁজে পাওয়ার পর যে আপনি একদিকে অন্যের অভিজ্ঞতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন এবং অন্যদিকে একইসঙ্গে সেই ইস্যুগুলোও তুলে ধরবেন—এমন কোনো নিশ্চিত সমাধান আজও পাওয়া যায়নি।
এখন আসি পরিচয়ের রাজনীতির তৃতীয় ও মূল স্তম্ভে—যেটি আসলে এর কেন্দ্রীয় দার্শনিক ভিত্তি আর তা হলো প্রতি-অপরিহার্যকরণ (Anti-essentialism) ও ইন্টারসেকশনালিটি (Intersectionality)। আমি ইতোমধ্যে আগের অংশে কিছুটা বলেছি, তবে এখানে আরেকটু বিস্তারিত বলি।
মূল ধারণাটি হলো—বস্তুবাদী বা অবজেকটিভ বিজ্ঞানের মাধ্যমে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীগুলো নিপীড়িতদের সম্পর্কে একটি সার্বজনীন, অপরিবর্তনীয় চরিত্র আরোপ করে দেয়। সমাজবিজ্ঞানী বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানীরা—আমার মতো লোকেরাও—অন্য সম্প্রদায়ের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সেই সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর দমন করেছি। এক, আমরা তাদের নিজের কথা বলার অধিকার অস্বীকার করেছি; দুই, আমরা তাদের সম্পর্কে একধরনের ‘মেটা-বর্গ’ (Meta-category) তৈরি করেছি—যেমন, ‘শ্রমজীবী শ্রেণি মানেই এমন,’ ‘কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী মানেই এমন,’ বা ‘পাকিস্তানিরা মানেই এমন।’
এইভাবে আমরা তাদের একটি সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য দিয়ে সংজ্ঞায়িত করি—এটিই ‘অপরিহার্যকরণ’ (Essentialism)। এই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মূলত লিবারাল রাজনৈতিক দর্শন (Liberal Political Theory) ও মার্কসবাদ।
মার্কসবাদ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীকে একটি শ্রেণি হিসেবে সর্বজনীন বৈশিষ্ট্যে রূপ দেয়। আবার লিবারাল দর্শন সকল মানুষকে জাতিহীন, লিঙ্গবিহীন, একধরনের ‘নিরপেক্ষ নাগরিক’ হিসেবে কল্পনা করে।
হবস (Hobbes) থেকে শুরু করে লক (Locke), রুশো (Rousseau), কান্ট (Kant), এমনকি জন রলস (John Rawls)-এর ‘Veil of Ignorance’-এর ধারণাতেও দেখা যায়—এই নাগরিকদের কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নেই। তারা একধরনের ‘নিরপেক্ষ মানব’ হিসেবে ভাবা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের ‘নিরপেক্ষ নাগরিক’ বলে কিছু নেই।
পোস্টমডার্নিস্ট ও পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্টরা যুক্তি দেন—লিবারাল রাজনৈতিক দর্শনের পেছনে গোপনে অবস্থান করছে একধরনের মানুষ: একজন শ্বেতাঙ্গ, পুরুষ, মধ্যবিত্ত, পুঁজিপতি, শারীরিকভাবে সক্ষম, হেটারোসেক্সুয়াল। যদিও এটি প্রকাশ্যে বলা হয় না, কিন্তু ধারণাটির পেছনের প্রেক্ষাপট এটাই। কারণ এই চিন্তাগুলোর উৎপত্তি তাদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা (Lived Experience)। তাই, যা ‘অবজেকটিভ’ বা ‘বৈজ্ঞানিক’ বলে মনে হয়, তা আসলে একধরনের পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি।
এই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ জানানো জরুরি। এখানে পরিষ্কার করে বলা দরকার—পোস্টমডার্নিস্টরা বলছেন না যে বাস্তব জগৎ নেই। কিন্তু তারা গভীর সন্দেহ প্রকাশ করছেন যে কেউ সেই জগৎকে পুরোপুরি নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। যারা বলে তারা সেটা পারে, তারা আসলে হয় এসেনশিয়ালিজমে বা অপরিহার্যবাদে লিপ্ত, নয়তো রিডাকশনিজম (লঘুকরণবাদে) বা ডিটারমিনিজমে (নিমিত্তবাদে) নিমজ্জিত। আর এক অর্থে তারা এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন তারা নিরপেক্ষ, অথচ বাস্তবে আমাদের সব জ্ঞান ও চিন্তাধারা গভীরভাবে বিষয়ীগত (Subjective)।
অনুরূপভাবে, মেডিকেল সায়েন্স বা চিকিৎসা বিজ্ঞানকেও নারীবাদীরা তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে ‘জৈবিক নিমিত্তবাদ (Biological Determinism)’-এর ধারণা—যেটি বলে নারীদের কিছু বৈশিষ্ট্য নাকি প্রকৃতিগত, স্থায়ী, জৈবিকভাবে নির্ধারিত—এই ধারণাকে চতুর্থ ঢেউয়ের (Fourth-wave) নারীবাদীরা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
তারা বলেন, যে জৈবিক বিজ্ঞান নারীদেহকে একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দিয়ে ব্যাখ্যা করে, সেটি আসলে পুরুষপ্রধান (Male-dominated) ও পুরুষপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত। এবং নারী-পুরুষের যে জৈবিক পার্থক্য—তা মোটেও স্থায়ী বা স্বাভাবিক নয়; বরং তুলনামূলকভাবে এটি একটি সামাজিক নির্মাণ (Social Construct)।
তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে—লিঙ্গ একটি সামাজিক নির্মাণ (Gender as a Social Construct)—এই ধারণা নতুন নয়। ১৯৪৯ সালে সিমোন দ্য বোভোয়ার (Simone de Beauvoir) থেকেই এ বিষয়ে আলোচনা চলছে, এবং তারও আগে কিছু নারীবাদী লেখক এই বিষয়ে লিখেছেন। কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে একটি নতুন চিন্তা আসতে থাকে—এখন শুধু আমাদের ভূমিকাগুলোই (Roles) সামাজিক নির্মাণ নয়, বরং আমাদের শরীর, আমাদের জৈবিক গঠন—সবই এক অর্থে সামাজিক নির্মাণ।
এই ধারণাটি জনপ্রিয় করে তোলেন জুডিথ বাটলার (Judith Butler) তার বই Gender Trouble-এ, এবং আরও অনেক লেখক এ নিয়ে লিখেছেন। তাহলে এই ভাবনার ভিত্তি কী? বাটলার এটিকে বলেন—‘the metaphysics of substance’। তাঁর মতে, এবং তাঁর মতো আরও অনেকে মনে করেন, সমাজ যে-সব দ্বৈততা (Binary) তৈরি করে—পুরুষ বনাম নারী, হেটারোসেক্সুয়াল বনাম এলজিবিটি—এইসব শ্রেণিবিন্যাস আসলে জৈবিক এসেনশিয়ালিজম (Biological Essentialism)। এবং এই শ্রেণিবিন্যাসগুলো এক ধরনের বৈষম্যমূলক ক্রমবিন্যাস তৈরি করে—যেখানে একজন অপরজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে চিত্রিত হয়। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, এই শ্রেণিবিন্যাসগুলো নিজেকে উপস্থাপন করে নিরপেক্ষ, প্রাকৃতিক, বৈজ্ঞানিক হিসেবে—যা মূলত ফুকো (Foucault)-এর বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই শ্রেণিবিন্যাসগুলো আদৌ নিরপেক্ষ বা প্রাকৃতিক নয়।
পোস্টমডার্ন চিন্তাবিদরা বলেন—কোনো একক পরিচয় নেই—না জৈবিকভাবে, না সামাজিকভাবে। কোনো ব্যক্তির একটি মাত্র পরিচয় থাকে না। বরং কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় দিয়ে কাউকে সংজ্ঞায়িত করাই হলো সামাজিক অবিচারের ভিত্তি। যখন আমরা কাউকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে আটকে ফেলি, তখন সেই পরিচয়টি বাস্তবিক নয়, বরং একটি ভাষ্য, একটি কথন কাঠামো (Discourse), একটি মতাদর্শ দ্বারা নির্মিত হয়।
এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি শুধু অপরিহার্যকৃত বা নির্দিষ্ট (এসেনশিয়ালাইজড) হয় না, বরং এই চিন্তা শৃঙ্খলাজাত (Disciplinary) ভূমিকা পালন করে। মানে, সমাজ চায় ব্যক্তি যেন সেই নির্ধারিত পরিচয়ের ছাঁচে নিজেকে মানিয়ে নেয়।
আসলে আমরা প্রত্যেকে বহুমাত্রিক, বহু রূপের সমাহারভিত্তিক (Intersectional) পরিচয়ের ধারক—যেগুলো নির্দিষ্ট নয়, পরিবর্তনশীল, চলমান। তাই এই পুরো আলোচনার একটি বড় ফলাফল হলো—কোনো একক পরিচয়ের ভিত্তিতে আন্দোলন গড়া কোনোভাবেই উপযুক্ত নয়।
এখানে এক ধরনের বৈপরীত্য (Contradiction) দেখা দেয়—যদিও পোস্টমডার্ন ও পোস্ট-স্ট্রাকচারাল চিন্তাধারা থেকেই পরিচয়ের রাজনীতির উত্থান, তারাই আবার এই পরিচয়ের রাজনীতির মূল কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করে। বিশেষ করে বাটলারের মতো চিন্তাবিদরা বলেন, পরিচয়ের রাজনীতি নিজেই হয়ে গেছে এসেনশিয়ালিস্ট—যার মূল লক্ষ্যই ছিল এসেনশিয়ালিজমকে ধ্বংস করা।
এই দ্বন্দ্ব একটি অসীম আত্মবিরোধিতা (Interminable Self-contradiction)। আপনি যতবারই নির্দিষ্ট কোনো ইস্যুতে সংগঠিত হোন—যেমন গর্ভধারণ বা প্রজনন অধিকার ইত্যাদি—ততবারই আপনি একটি পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে সংগঠিত করছেন, যেটি অন্য পরিচয়কে বাদ দিচ্ছে।
আপনি যদি বলেন—‘আমরা নারীর অধিকারের জন্য কাজ করছি’—তাহলে ‘নারী’ একটি পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, যা ‘পুরুষ’ বা ‘অন্যান্য’ পরিচয়ের বিপরীতে নির্মিত। এইভাবে আপনি আবার সেই দ্বৈততা (Binary) তৈরি করে ফেলছেন—যেটাকে আপনি শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। এবং আপনি তা না চাইলেও বারবার করে ফেলছেন।
পোস্টমডার্ন চিন্তাবিদরা বলবেন—হ্যাঁ, কৌশলগতভাবে (Strategically) সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এটা করতে হয়। কিন্তু তা সবসময় এই সচেতনতা নিয়েই করতে হয়—আপনি আসলে সেই একই দ্বৈত কাঠামোকে পুনরায় গড়ে তুলছেন, যেটাকে আপনি নিজেই ভাঙতে চেয়েছিলেন।
এই আত্মবিরোধিতা থেকে কোনো পোস্টমডার্ন চিন্তাবিদই সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসতে পারেননি—পরিচয়ের রাজনীতিও পারেনি। এটিকে শুধু কৌশলগত দ্বন্দ্ব বলেই শেষ করা যায় না। এটি একটি গভীরতর দার্শনিক সংকট। কারণ আপনি যখনই রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেন, তখন আপনাকে হয় অ্যান্টি-এসেনশিয়ালিস্ট ভিত্তি ত্যাগ করতে হয়, নয়তো রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া বাতিল করতে হয়। এইভাবে, পরিচয়ের রাজনীতি একটা অচলাবস্থায় (Deadlock) পৌঁছে যায়। এগোতে পারে না। ডানপন্থিরা বহু আগেই বলেছে—এটা আক্রান্ত হবার বা ভিকটিমহুডের রাজনীতি তৈরি করে। আমি সে বিষয়ে ঢুকছি না, তবে এটুকু বলি—পরিচয়ের রাজনীতি নিয়ে যারা লিখেছেন, তারাও স্বীকার করেন—এই ধারাটি শেষ পর্যন্ত সম্প্রীতির রাজনীতির পরিবর্তে একধরনের আক্রোশপূর্ণ কাঠামো তৈরি করে।
আরেকটি বড় বিতর্ক হলো—জৈবিক এসেনশিয়ালিজম নিয়েও অনেক নারীবাদী সমালোচনা করেছেন—যেমন, জারমেইন গ্রিয়ার (Germaine Greer)। প্রশ্ন উঠেছে—যে সব পুরুষ মনে করেন তারা আসলে নারী—তারা নারীবাদের নামে কথা বললে, তা কি নারীদের নিজের জায়গা দখল করে নিচ্ছে? অনেক নারীবাদী বলেন—এইসব পুরুষ তো নারীদের জীবনের অভিজ্ঞতা ভোগ করেননি। তাহলে তারা এখন যদি নারীবাদের নেতৃত্বে আসেন, তবে তারা নারীদের জন্য নির্ধারিত রাজনৈতিক ক্ষেত্রটি ঔপনিবেশিকভাবে দখল করে নিচ্ছেন।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ সমালোচনা আছে—যদি নারী ও পুরুষদের মধ্যে কোনো জৈবিক পার্থক্য না থাকে, তাহলে নারীরা এতদিন ধরে যে দাবি করেছে—যে পুরুষেরা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে পুরুষকেন্দ্রিকভাবে দেখেছে, এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণ (Contraception) ও প্রজনন অধিকারগুলোও পুরুষের সুবিধার দিকে ঝুঁকে তৈরি করেছে—সেই সমালোচনাই তো ভেঙে পড়ে।
কারণ, যদি আমরা পুরুষ ও নারীর মধ্যকার জৈবিক পার্থক্যকেই স্বীকার না করি, তাহলে পিতৃতন্ত্র (Patriarchy) কীভাবে সৃষ্টি হলো? কৃষিযুগে—দশ হাজার বছর আগে, বা যখনই হোক—এটি কীভাবে গড়ে উঠল? যদি পুরুষ ও নারীর মধ্যে জৈবিক পার্থক্যই না থাকে, তাহলে সেই সমাজ কাঠামো আসলে কীভাবে এসেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেও দিতে পারি না। আমি মনে করি এটি একটি অদ্ভুত ধরনের আত্মবিরোধিতা তৈরি করে, যা বেশিরভাগ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলে।
অতএব, শেষ পর্যন্ত দেখা যায়—প্রতি-অপরিহার্যকরণ (Anti-essentialism) রাজনৈতিকভাবে একপ্রকার সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তায় (Inaction) পৌঁছে দিতে পারে। কারণ, প্রতিটি পরিচয়—নিজ স্বরূপেই—শুধু বহিষ্করণ বা বাদ দেওয়ার ভিত্তিতে গঠিত নয়, এটি একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও (Disciplinary Regime)। এবং রাজনৈতিক সাফল্য পেতে হলে আপনাকে বলতেই হবে: ‘এই আমাদের দাবিপত্র, এই আমাদের উদ্দেশ্য’। এই ধরনের নির্ধারণ বা সীমারেখা টানার কাজটিই এক ধরনের শৃঙ্খলাত্মক কাঠামো।
আরও একবার বুঝিয়ে বলি—ধরা যাক, নারীরা যদি নারীসত্তা পুনরুদ্ধার করতে চায়, কিংবা পুরুষেরা যদি তাদের পুরুষত্ব পুনরুদ্ধার করতে চায়—তবে এই ‘নারীত্ব’ বা ‘পুরুষত্ব’ পুনরুদ্ধারের অর্থই হয় আবার সেই নারী বনাম পুরুষ দ্বৈততা পুনরায় তৈরি করা—যেটি পুরো সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু।
অর্থাৎ, একদিকে আমাদের হাতে রয়েছে অ্যান্টি-এসেনশিয়ালিস্ট, বিষয়ী জ্ঞানতত্ত্ব (Subjectivist Epistemology) ও মতাদর্শ, আর অন্যদিকে রাজনৈতিক কাজ করতে গেলে আমাদের কোনো না কোনো পরিচয় নির্মাণ করতেই হয় এবং তাতে কিছুটা হলেও এসেনশিয়ালিজম ঢুকে পড়ে। এই দ্বৈততা এক ধরনের আত্মবিরোধিতা তৈরি করে।
তাহলে, শেষ কথা বলি—পরিচয়ের রাজনীতি নিয়ে আমাদের আপত্তি কী?
আমার মনে হয়, পরিচয়ের রাজনীতি বড় ধরনের গণঐক্য বা বৃহৎ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মকে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলে—যা আসলে বাস্তব পরিবর্তন আনতে গেলে সবচেয়ে বেশি দরকার।
আমার মনে হয়, এটি মানুষকে অরাজনৈতিক করে তোলে। এটি মানুষকে এমন ধারণা দেয় যে—আপনি নির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে কাজ করতে পারেন, কিছুটা স্বতন্ত্র সংগঠন তৈরি করতে পারেন—এবং রাজনৈতিক দল ছাড়াই বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। আমি মনে করি, এটি ভুল ধারণা। রাজনৈতিক দল প্রয়োজন।
আরব বসন্তের কথাই ধরি—সেখানে হাজার হাজার কর্মী ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সফলতা পায় ডানপন্থি দলগুলো। কেন? কারণ তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে সংগঠিত ছিল। আর যারা উদারপন্থি বা বাম ঘরানার ছিলেন কিন্তু স্বতন্ত্র আন্দোলন বা সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন, তারা নির্বাচনের সময় কোনো কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি।
পরিচয়ের রাজনীতি একধরনের অভ্যন্তরীণ, আত্মমুখী রাজনীতি তৈরি করে। এটি শেষ পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতাও (Intellectual Ghettoization) তৈরি করতে পারে।
এটি একান্তই আত্মবিরোধিতায় পরিপূর্ণ—আমি ব্যাখ্যা করেছি কীভাবে এসেনশিয়ালিজম বনাম অ্যান্টি-এসেনশিয়ালিজম এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দ্বন্দ্বের কোনো সুস্পষ্ট নিষ্ক্রমণপথ নেই।
আর সর্বশেষ (কিন্তু একেবারে গুরুত্বহীন নয়), এটি খুব সহজেই যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক এজেন্ডা দ্বারা বিকৃত করা যায়—সেটি প্রগতিশীল না-ও হতে পারে, বরং প্রতিক্রিয়াশীলও (Reactionary) হতে পারে। এবং আমি মনে করি, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ (White Nationalism) ও উগ্র-ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান এই পরিচয়ের রাজনীতির ছত্রছায়াতেই কিছুটা গড়ে উঠেছে।



মন্তব্য