আমাদের সংস্কৃতির পথ-নিশানা
সংস্কৃতি চর্চার হালচাল আলোচনার মধ্য দিয়ে তার পথ-নিশানার অন্তর্গত প্রবণতা উপলব্ধির আগে আমাদের সংস্কৃতি চর্চার ধরণ ও তাঁর বৌদ্ধিক সূচনা কখন কিভাবে ঘটে, তাঁর একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা প্রয়োজন। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক গতিপথের নিশানা স্পষ্ট করে দেখবার জন্য আভাসে হলেও একটু অতীতের কথা বলা দরকার। উনবিংশ শতাব্দির গোড়ায় বাংলা ছিল সাহিত্যে ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মূল কেন্দ্র এবং রাজা রামমোহন রায় ছিলেন বাংলার নবজাগরণের বৌদ্ধিক ভিত্তি তৈরীর প্রধান ব্যক্তিত্ব। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং সেই কলেজের প্রসিদ্ধি লাভের মাধ্যমে বঙ্গ প্রদেশের মানুষের পশ্চাত্য শিক্ষা ও বিজ্ঞানচিন্তার সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটে। এ সময়েই মুদ্রণ শিল্প স্থাপন ও সংবাদপত্র প্রকাশের সূচনা ঘটায় নতুন নতুন চিন্তা ও স্বাধীন মত প্রকাশের পরিসর তৈরী হয়। ফলে অনেক মুক্ত চিন্তার মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যাদের প্রত্যেকের জীবনের সংগ্রাম, সমাজের কোন না কোন দিকের নতুন চিন্তা ও নতুন দিশা দেয়ার ইতিহাস সৃষ্টি করে। এ সময়েই বাংলায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবনে নবজাগরণের উন্মেষ ঘটে।
ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে যখন স্বজাত্যবোধের জাগরণ ঘটে তখন এই জাগরণের চিন্তাকে ভাষা দিতে আবির্ভূত হন কয়েকজন আলোকজ্বল ব্যক্তিত্ব। তাঁরা হলেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, লালন ফকির, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বেগম রোকেয়া, কাজী নজরুল ইসলাম, মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, আবুল হোসেন প্রমুখ। তাঁরা কেবল সাহিত্যের ভাষাকে নয়, মানুষের চিন্তাকেই বদলে দিয়েছেন। তাঁরা পাঠককে এক নতুন আত্মবীক্ষণের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। তাঁদের মাধ্যে অনেকেই বাংলা গদ্যের ভাষাকে সংস্কৃত নির্ভর কৃত্রিমতা থেকে টেনে এনে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার কাছে পৌছে দিয়েছেন। তঁরা একেক জন ছিলেন নানা অর্থে বিপ্লবী। তাঁদের চিত্তে ছিল বিদ্রোহ, কলমে ছিল অনুশাাসনের বিরুদ্ধে বিপুল দ্রোহ। তাঁদের ভাষায় ছন্দ ও অলঙ্করণ সহ যে উচ্চারণ সম্ভব হয়েছিল, তা পাশ্চাত্যের সাহিত্যকেও চমকে দিতো। তাঁরা বাঙালির সাহিত্য মানসে অত্নজাগরণের এক আখ্যান রচনা করেছিলেন।
উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্রনাথের হাতে ভাষা পেয়েছে মানবিক সংবেদনশীলতা, সৌন্দর্য্যরে এক অপূর্ব সংগীত ও দার্শনিকতা। তিনি বাংলা ভাষাকে আত্মপরিচয়ের ভরকেন্দ্র করে তুলেছিলেন। নজরুল তাঁর উপনিবেশিকতা বিরোধী সংগ্রামে রচনা করেছেন মহাবিদ্রোহের বানী। এদের সকলের পূর্বসূরী মধ্যযুগীয় বাঙালি কবি আব্দুল হাকিম তাঁর লেখনির মাধ্যমে দাসত্ববোধের বিরুদ্ধে বাঙালির সংস্কৃতিকে আত্মমর্যাদায় দাঁড় করেছিলেন, তিনি তাঁর বঙ্গবানী কবিতায় লিখেছেন, ‘যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবানী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। বিস্ময়কর প্রতিভা লালন ফকির তাঁর গানে গেয়েছেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি’। ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজণ হবে, যেদিন হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে’। এমন অসাম্প্রদায়িক মানবমিলনের মানবিক চেতনা, মনুষ্যত্ববোধ ও সাম্য চিন্তার ধ্বনি সত্যিই বিরল। এসব তো ছিল সে কালের সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার মর্মার্থ। তবে বাংলায় মুক্তচিন্তার বিকাশ ও নবজাগরণের বৌদ্ধিক ভিত্তি তৈরীর লড়াইয়ে সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ সবসময়ই ছিল। প্রতিপক্ষ ছাড়া যেমন কোন লড়াই জমে ওঠে না তেমনি সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ হিসেবে একটি শত্রুপক্ষ সবসময়ই ছিল। অপসংস্কৃতি চর্চা হলো সেই শত্রুপক্ষ।
যেসব ভাবনায় প্রগতির চাকা সামনে এগোয় এবং যেসব লেখনিতে দাসত্ববোধকে বিতাড়ণের মাধ্যমে সংস্কৃতির আত্মমর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করে, তা যুগে যুগে বিনা বাঁধায় অগ্রসর হতে পারেনি। তবে ইদানিং অপসংস্কৃতি চর্চায় সমাজের একটি বিশাল অংশের তরুণ-তরুণীরা অশ্লীলতাকে তথাকথিত সংস্কৃতির নামে ভয়ানক ভাবে পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। এটা ইদানিং শুধু শহরেই নয়, গ্রাম এলাকায় এমনকি নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক সহ নানান সামাজিক মাধ্যমে অপসংস্কৃতির চর্চা প্রাণভরে দেখে এবং নিজেদের জীবনে এসব প্রয়োগের জন্য একনিষ্ঠ সাধনা চালায়। এক পর্যায়ে এসব সাধনা মাদক, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং, জুয়াভিত্তিক গেইম, অশ্লীলতা ও ক্যাসিনোর মধ্যে ঢুকে পড়ে পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তোলে। অপসংস্কৃতির চর্চায় এই পরিনতি ছিন্ন করা সহজ হবে না। যদি না সংস্কৃতির মর্মার্থ কি এবং কেন, তার সম্যক উপলব্ধি আমাদের না থাকে।
একসময়ে মুসলিম পরিবারগুলোও বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির প্রকৃষ্টই লালন করেছেন। মুসলিম ধর্মীয় দর্শন এবং সুফিবাদ তার ইতিহাস, ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে পরিবেশন করা মহরমের পালাগান, কবিগান, যাত্রাপালা, জারি, সারি, পুঁথিপাঠ, ওরস সুদীর্ঘকালের স্বাক্ষী হিসেবে এদেশে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতো। গ্রাম-শহরের সহজ সরল বাঙালি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতিভিত্তিক সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান করতে দ্বিধা ছিল না। নবান্ন, নববর্ষের হালখাতা, লাঠিখেলা, বিয়ে, আকিকা, ষাঁড়ের লড়াইকে ঘিরে নানান প্রাসঙ্গিক মেলা, জারির পাটগান, নাটক, যাত্রাপালা, কবিগান, মারফতি, মুর্শিদী, ঘাটু, থিয়েটারের পিছনে অসংখ্য ভক্ত-আয়োজক তাদের জীবনের পুরোটাই বিলিয়ে দিয়েছেন। প্রকৃতির উপাদান থেকে প্রাপ্ত এসব রসসিক্ত উৎসব এখন বিলুপ্ত প্রায়। সুদূর অতীতকাল থেকে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের সমাজ জীবন ও প্রতিদিনকার জীবনাচরণের এসব ঐতিহ্যকে নবতর কলাকৌশলে নতুন অবয়বে ধরে রাখতে না পারলে, কালক্রমে এগুলো কেবল স্মৃতি হয়েই রয়ে যাবে।
সুদীর্ঘ কাল থেকে বাংলাদেশের আবহমান সংস্তৃতি চর্চার বিরুদ্ধে একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক মহল নানামুখী অপপ্রচার চালাচ্ছে। ইদানিং তারা এক্ষেত্রে মারমুখী আচরণ করছে। সাধারণ মানুষের ধর্ম বিষয়ে, সরল বিশ্বাসকে ব্যবহার করে সংস্কৃতি বিরোধী প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অপসংস্কৃতির অবাধ প্রসারে লিপ্ত থেকে সফলও হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মর্মে মর্মে ঢুকে এই প্রচারণা অব্যাহত রেখে বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধীতাকে গ্রামে-গঞ্জে তৃণমূলে পৌছে দিয়েছে। এক কথায় আবহমান সংস্কৃতির একটি বিরুদ্ধ শক্তি আজ সমাজের টপ টু বটম তাদের সকল অপকর্ম নিয়ে সক্রিয়। “গান-বাজনা মুসলিম সংস্কৃতির অংশ নয়- শুধুমাত্র এই একটি কথাই ব্যাপক প্রোপাগান্ডা হিসেবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ধর্ম সভা, সেমিনার, সাংগঠনিক প্রোগ্রামে এসব নেতিবাচক কথা বলার সুযোগ নিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী উস্কানিমূলক বক্তব্য ও স্ট্যাটাস দিয়ে অনবরত বক্তৃতা দিচ্ছে। এভাবে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের মনের গভীরে সাম্প্রদায়িকতা ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য সৃষ্টির বীজ বপণ করে চলছে এবং মানুষের মধ্যে বিভাজনের কাজে সফল হচ্ছে।
বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি চর্চায় যারা সৎ ছিলেন তাঁদের কাছে দেশপ্রেম, মা-মাটি-মানুষ ছিল এ তাড়নার অবলম্বন। সে কালের সংস্কৃতি কর্মীদের মধ্যে রিয়েলিটি শোতে মঞ্চ কাঁপানো, সেলিব্রেটি এবং সেরা হওয়ার প্রবণতা ছিল না। তাঁরা নিজেকে খ্যাতির চূড়ায় যেতে ব্যস্ত থাকতে অভ্যস্ত ছিলেন না। তাঁরা সংস্কৃতি চর্চাকে প্রাণবন্ত রাখতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রক্তধারাকে ধারণ করতেন। যে সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চা মানুষের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারে না সেগুলো একঅর্থে অপসংস্কৃতি। বাঙালি সংস্কৃতি বলে, ঢাক-ঢোল যতই পেটানো হোক তা যদি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কর্মপ্রবাহ ও জীবনযাপন থেকে প্রেরণা নিতে না পারে তাও অপসংস্কৃতির মতো উটকো ও ভিত্তিহীন হতে বাধ্য।
কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কর্মপ্রবাহ ও জীবনযাপন থেকে প্রেরণা নিতে না পারলে সে সংস্কৃতিও অপসংস্কৃতির মতো ভিত্তিহীন হতে বাধ্য।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের নতুন জাতীয় সত্তার বিকাশ এবং সমৃদ্ধি ঘটেছিল সংস্কৃতিকে আশ্রয় করেই। বাঙালির চৈতন্যোদয় এবং অন্তর্লোকের জাগরণ ঘটেছে সংস্তৃতির সোনার কাঠির ছোঁয়ায়। এসব চিত্তসম্পদ বাংলাভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি, হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের চেষ্টা, শ্রম ও সাধনার সৃষ্টি। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে ধর্মশাসিত একটি কৃষিভিত্তিক সমাজের জাড্য কুসংস্কার সংস্কৃতির সোনার কাঠির ছোঁয়ায় ভিতর থেকে চিত্তদোলা দিয়ে গতিবেগ সঞ্চার করেছে। বাঙালির মহীয়ান সংস্কৃতির জীবনীশক্তি গোটা বাংলার শিল্প-সাহিত্য সৃজণে প্রগতির সৃষ্টিময় ধারাকে অব্যহত রাখতে পারতো। কিন্তু বারবার রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ ও ধর্মীয় অপব্যবহার চিত্তের এই অগ্রযাত্রাকে জখম করে প্রগতির সৃষ্টিময় ধারাকে অবাধ হতে দেয়নি। তবে এটাতো জানাকথা, চিত্তের স্ফূর্তি সামাজিক অভিজ্ঞতাকে শিল্পে রূপান্তর ঘটায়, এটাকে বারবার কঠিন অর্গল জঁটে রোধ করার অপচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু মানুষের সমাজ অজ্ঞিতায় অন্তরাত্মার রাগিনী কোন বাঁধা না মেনে বারবার পূর্ণ সুরে বেঁজে উঠেছে। তাই পাহাড়ি নদীর মত বাঙালির সৃজণশীলতা মাঝে মধ্যে খাত পরিবর্তন করলেও আমাদের সংস্কৃতির গতিপথের নিশানা স্পষ্ট হয়েই থেকেছে। আমাদের সংস্কৃতির গতি পথের এই ধারাকে অপ্রতিরোধ্য করার জন্য প্রয়োজন বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে শুধু তার রূপ-রস ও প্রানসম্পদে পুষ্ট হয়ে ওঠা নয়, দরকার তাকে তার ভাব এবং বুদ্ধি সম্পর্কেও পুষ্টি লাভ করা।


মন্তব্য নেই
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.