রোকেয়া আবিষ্কার এবং পুনরাবিষ্কারের অপেক্ষায়

রোকেয়া আবিষ্কার এবং পুনরাবিষ্কারের অপেক্ষায়

রোকেয়া যতটা উচ্চারিত, তার খুব সামান্যই পঠিত এবং গৃহীত। কারণ আজও তিনি নানা খণ্ডীকরণের খপ্পড়ে অবরূদ্ধ। ”মুসলিম নারী শিক্ষার অগ‘দূত্র, ”নারী জাগরণের প্রতীক্র, ”মুসলিম সমাজ সংস্কারক্র, ”ইসলামী নারীবাদ্রী, ”আমূল নারীবাদী’, ”বিশিষ্ট মুসলিম লেখিক্রা ইত্যাদি নানা পরিচয়ে রোকেয়ার সংকোচন ঘটেছে। ত্রা কালের জাতীয় ও বৈশ্বিক পে‘ক্ষাপটে সামগি‘কভাবে রোকেয়ার মূল্যায়ন এখনও অনুপস্থিত।

এই কারণেই বোধ হয় ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত শামসুন নাহার মাহমুদ রচিত ”রোকেয়ার জীবন্রী গ‘ন্থের ভূমিকায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক পদ্মিত অধ্যাপক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন—”কিন্তু রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাস্তবিক যে কত বড় ছিলেন, তাহা বাহিরের লোকেদের কাছে অজানা রহিয়া গেল।” এই অজানার অন্ঠকার আমাদের আদেদ্ধ কাটেনি বরং রোকেয়া দিবস, রোকেয়া পদক, রোকেয়ার নামে নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির আনুষ্ঠানিকতায় তাঁকে উঁচুতে উঠিয়ে অচেনা করে সাধারণের কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ যেন ”তোমার পুজার ছলে তোমায় ভুলে থাক্রা। 

রোকেয়ার জীবন ছিল তিনটি অধ্যায়ে বিস্তৃত। জন্ম (১৮৮০ সাল) ও শৈশব-কৈশোর কেটেছে রংপুরের পায়রাবন্ঠে, বিয়ের (১৮৯৮ সাল) পর ভাগলপুরে এবং স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯১১ সালে সাল থেকে আমৃত্যু কলকাতায়।

এই যাবৎকাল পর্যন্ত আমরা রোকেয়া চর্চার মধ্যে পাই- রোকেয়া পিতা-মাতা, ভাই-বোনসহ পরিবারের পরিচয়, তৎকালীন সমাজের-বিশেষত মুসলিম সমাজের অবস্থা, রোকেয়ার বেড়ে ওঠা ও গৃহে লেখাপড়ার প্রচেষ্টা, বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন, স্বামীর মৃত্যুর পর প্রথমে ভাগলপুর- পরে কলকাতায় মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা, তাঁর নিঃসঙ্গতা, সাহিত্য কর্ম ও কিছুটা সমাজকর্ম ইত্যাদি বিষয়। কিন্তু এই সব বিবরণমূলক রচনায় স্বয়ং রোকেয়া কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেন না। ফলে তাঁর স্বকীয়তা, মেদ্ধলকত্ব, অনন্যতা, ব্যক্তিত্ব, তীক্ষèধী, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, কর্মকেদ্ধশল- এই সব খুব সামান্যই উদ্ভাসিত হয়। ফলে বাংলার নবজাগরণের মানসকন্যা, মানবতাবাদী, গণতান্ত্রিক, দেশপে‘মিক, স্বদেশী, জাতীয়তাবাদী, সংগঠক, নারীমুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, সমাজ সংস্কারক, মেদ্ধলবাদবিরোধী অসাম্প্রদায়িক—রোকেয়ার এই সব পরিচয় ঝাপসা হয়ে আসে। 

বিয়ের পর বিহারের ভাগলপুরে সাহিত্য, রচনার মধ্য দিয়ে তৎকালের বিদগ্ধ সমাজে কিছুটা আলোড়ন তুলে রোকেয়ার প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতে। 

গবেষকদের প্রাপ্ত হালনাগাদ তথ্য মতে রোকেয়ার প্রথম রচনা ”পিপাস্রা প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে হরেন্দ্রনাথ রায় ও জ্ঞানেন্দ্র লাল রায় সম্পাদিত ‘নবপ্রভা’ পত্রিকায়। ওই একই সময় তিনি তার একমাত্র উপন্যাস ”পন্ডবাগ্র রচনা করেন যা অনেক পরে ১৯২৪ সালে প্রকাশ লাভ করে। 

লক্ষ্যণীয় যে মহররমের মত ধর্মীয় বিষয় নিয়ে এটি লেখা এর হলেও মূলভাব সার্বজনীন। যেমন উল্লেখ করা যায় “... পিপাসা পিপাসা- মূর্খ মানব! জান না এ কিসের পিপাসা? ... এ হৃদয়ের দুর্দান্ত পিপাসা যেমন কেমন করিয়া দেখাইব? আমার হৃদয় যত গভীর, পিপাসাও তত প্রবল! এ সংসারে কাহার পিপাসা নাই? ... ধনীর ধন-পিপাসা, মানীর মান-পিপাসা, সংসারীর সংসার পিপাসা। নলিনীর তপন-পিপাসা, চকোরির চন্দ্রিকা-পিপাসা! অনলেরও তীব্র পিপাসা আছে! পিপাসা না থাকিলে ব্রহ্মান্ড ঘুরিত কী লক্ষ্য করিয়া? ...” 

১৯০৩ সালে গিরিশ চন্দ্র সেন সম্পাদিত মহিলা পত্রিকায় রোকেয়া তাঁর প্রথম বিস্ফোরক লেখা লেখেন। “অলংকার না ইধফমব ড়ভ ঝষধাবৎু?” পরে ”আমাদের অবনতি নাম্রে (পরে এর পরিমার্জিত রূপ ”স্ত্রী জাতির অবনতি) নবনূর পত্রিকাতেও তা ছাপা হয়। তাঁর এই লেখা ও পরে লেখা ‘অর্ধাঙ্গী’ সে সময়ে প্রবল বিতর্কের ঢেউ তোলে। তিনি শিক্ষিত বিদগ্ধ মহলের তীব্র বিরোধীতার সম্মুখীন হন তার নারীমুক্তিকামী অগ‘সর চিন্তার কারণে। শুধু মুসলিম সমাজের তৎকালীন বিখ্যাত ব্যক্তিরাই তাঁর প্রতি বিক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ করেননি, সেই সাথে হিন্দু সমাজের প্রগতিশীল অংশও তাঁর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। তাই আমরা দেখি রোকেয়ার নারী-পুরুষের সাম্যের চিন্তাকে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, সৈয়দ এমদাদ আলী, এ. এ. আল মুসাভী, নওশের আলী খান ইউসুফজীর মত বিদ্বানরা মেনে নিতে পারেনি। তেমনি কালের বিচার অগ‘সর রোকেয়ার নারী ভাবনাকে ”ঠাকুমার ঝুল্রির লেখক দক্ষিণারঞ্ছন মিত্রের মত লেখকও গ‘হণ করেননি। এমনকি তিনি রোকেয়া প্রতিভার প্রশংসা করলেও তাঁকে পাশ্চাত্য প্রীতির দোষে অভিযুক্ত করেছেন। কিন্তু এই অভিযোগে যে অমূলক তা রোকেয়ার নিবিড় পাঠে বোঝা যায়। এই প্রসঙ্গে রোকেয়ার নিজের মন্তব্যই যথেষ্ট। ‘...আমরা ইংল্যাদ্মের সামাজিক অবস্থার সহিত আমাদের সমাজের দূরবস্থার তুলনা করিয়া দেখিব, অবলাপীড়নে কোন সমাজ কি রূপ সিদ্ধ হস্ত। ... ইংরাজ রমণীর কি রূপ? আমরা মনে করি, তাহারা স্বাধীন, বিদুষী, পুরুষের সমকক্ষা, সমাজে আদৃতা, তাহাদের আরও কত কি সুখ সেদ্ধভাগ্যের চাকচিক্যময় মূর্তি মানস নয়নে দেখি। কিন্তু একবার তাহাদের গৃহাভ্যন্তরে উঁকি মারিয়া দেখিতে পাইলে-বুঝি সব ফাঁকা। দূরের ঢোল শুনিতে শ‘ুতি মধুর।...বঙ্গদেশ, পাঞ্ছাব, ডেকান, বোম্বাই, লদ্মন- সর্বত্র হইতে একই ভাবের উচ্ছ্বাস উণ্ডিত হয় কেন? তদুত্তরে বলা যাইতে পারে, ইহার কারণ সম্ভবত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবলাবৃন্দের আধ্যাত্মিক একতা।” 

তবে স্বশিক্ষিত রোকেয়া হয়ত তাঁর নিজস্ব পাঠ দ্বারা তৎকালীন ইউরোপ-আমেরিকার সমাজ সম্বন্ঠে কম-বেশি অবগত ছিলেন। কিন্তু তাঁর নারীমুক্তি চৈতন্য পাশ্চাত্য বিমুখতা ও স্বদেশ প্রীতির নামে কোন সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার ক্ষেত্রে রোকেয়া স্রোতের বিপরীতে একা দাঁড়াতেও ভয় পাননি। তাই দেখি যখন ১৯২৭ সালে ক্যাথরিন মেয়োর লেখা ”মাদার ইদ্মিয়্রা গ‘ন্থে গান্ঠিজি ও রবীন্দ্রনাথের মত মানুষ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন, তখন রোকেয়া সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে বলছেন- ’এ দেশীয় কর্তারা বলেন ভারতমাতা পুস্তকে ভারতের কেবল নিকৃষ্ট অংশ দেখান হইয়াছে, উৎকৃষ্ট অংশের উল্লেখ করা হয় নাই। ভারতের উৎকৃষ্ট অংশের প্রশংসাগীতি গাহিবার জন্য ভারতের গড়পড়তা ষোল কোটি পুরুষতো আছেই। সে জয়ঢাকে কাঠি ঠুকিবার জন্য মিস মেয়োর দরকার কি? মিস মেয়োর প্রয়োজন সেই কথা কহিতে যাহা এ যাবৎ আর কেহ বলিতে সাহস পায় নাই। সেই কথা আমিও কুড়ি বছর হইতে বলিয়া আসিতেছি, কিন্তু আমার ক্ষীণ কদ্বস্বর কাহারও শ‘বণ বিবরে প্রবেশ করে নাই—আজ মিস মেয়োর গর্জনে সকলের টনক নড়িয়াছে।” 

এখানে উল্লেখ্য যে ক্যাথরিন মেয়ো একজন মার্কিন শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক লেখক হলেও তার আলোচ্য বিতর্কিত বইটিতে তৎকালীন ভারতীয় নারীর দুরাবস্থার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। 

”মতির্চুর এবং পরে অন্যান্য গ‘ন্থে সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হবার পর শুধু তিনি সমালোচিত হয়েছেন তা নয়। তৎকালীন অনেক মনীষী রোকেয়াকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত হননি। জীবিতকালে ও মৃত্যুর পর রোকেয়াকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—গিরিশচন্দ্র সেন, দক্ষিণারঞ্ছন মিত্র মজুমদার, মোহিতলাল মজুমদার, আবুল হুসেন, প্রমথ চেদ্ধধুরী, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, শাহাদাৎ হোসেন, কবি গোলাম মোস্তফা, অদ্বৈত মল্লবর্মন, অধ্যাপক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, গোলাম কুদ্দুস প্রমূখ। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে সুকুমারী ভট্টাচার্য, আব্দুল কাদির, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, গেদ্ধরি আইয়ুব, শিবনারায়ণ রায় প্রমুখের রোকেয়া সংক্রান্ত লেখা আমাদের রোকেয়াকে চিনতে সাহায্য করে। 

দক্ষিণারঞ্ছন মিত্র মজমুদার রোকেয়ার কিছু লেখার ক্ষেত্রে আপত্তি জানালেও ”মতির্চূর গ‘ন্থ সমালোচনায় যোগ্য সমাদর করতে কার্পণ্য দেখাননি। তাই তিনি লিখেছেন-“মতিচূর পড়তে পড়তে বঙ্কিমচন্দ্রের ”কমলাকান্ত্র, ”লোকরহস্য্র, কালি প্রসন্নের ”ভ্রান্তিবিনোদ্র মনে পড়ে। অতুল কাব্যালঙ্কারে বিপুল রহস্য বিজড়িত রসপূর্ণ যে সুগভীর সমস্যা প্রশ্নসমুচ্চয়ে কমলাকান্তাদির উৎপত্তি হইয়াছে, ”মতির্চূরও সেইরূপ অগণ্য সমস্যা ভাব আনিয়া উপস্থিত করিয়াছে। পার্থক্য কেবল, তাহাদের মূল প্রধানত দর্শনে; ইহার ভিত্তি সমাজ সমস্যার উপরে। ”মতিচূর্রের ন্যায় গ‘ন্থের পক্ষে ইহা অল্প প্রশাংসার বিষয় নহে। সুতরাং ইহার গুরুত্বও সামান্য নহে। ”মতির্চূর শুধু হিন্দু মুসলিম সমাজকে নহে, সর্বোচ্চ শে‘ণির পাঠককে-ভারতরঙ্গে আলোড়িত করিয়াছে। মুসলিম মহিলা লিখিত সর্বপ্রথম বাঙ্গলা গ‘ন্থের এ ক্ষমতা কতদূর বিস্ময়কর তাহা ভাষায় বুঝানো সুকঠিন।্র 

মোহিতলাল মজুমদার রোকেয়া জীবনীপাঠে মুগ্ধ হয়ে তাই মন্তব্য করেছেন—’নানা কুসংস্কার, কুপ্রথা এবং অশিক্ষাজনিত মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রভাব অতিক্রম করিয়া তাঁহার আত্মা যে স্থানটিতে আরোহন করিয়াছিল তাহা যে কত সত্য ও ধ্রুব তাহার এই প্রমান পাই যে—আমি বাঙালি হিন্দুযে নীতি ও ধর্মকে প্রাণের মধ্যে গ‘হণ করিয়াছি এই বাঙ্গালি মুসলিম দুহিতাও ঠিক তাহাকে প্রাণে প্রাণে অনুভব করিয়াছেন, বাঙ্গালী জাতির পে‘রণাই তাঁহাকে পরিচলিত করিয়াছিল। ...একালে হিন্দু সমাজেও এমন নারী চরিত্র বিরল। কিন্তু এজন্য হিন্দু আমি কিছুমাত্র লজ্জা বোধ করিতেছি না; কারণ বেগম রোকেয়া শুধুই মুসলিম মহিলা নহেন, তাঁহার জীবনবৃন্তান্ত পাঠ করিয়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে তিনি খাঁটি বাঙ্গালীর মেয়ে।“ 

বিখ্যাত সাহিত্যিক ও পন্ডিত অধ্যাপক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় মহিয়সী নারী সিস্টার নিবেদিতার প্রতিচ্ছবি রোকেয়ার মধ্যে দেখতে পেয়ে মন্তব্য করেছিলেন—’রোকেয়ার মানসচিত্রকে নিবেদিতার চিত্রের পার্শ্বে স্থাপন করিতে ইচ্ছা হয়।“ 

রোকেয়ার পুরুষতন্ত্র বিরোধী মনোভাবের সমর্থনে আবুল হুসেন লিখেছিলেন - ’...পুরুষের বিরুদ্ধে তিনি এমন কিছুই বলেন নাই যাহাতে পুরুষেরা আপত্তি করিতে পারে। আমার মনে হয় পুরুষের অপরাধের তুলনায় তাহাদিগকে তদপেক্ষা আরও অধিক কষাঘাত করা উচিৎ ছিল। কিন্তু লেখিকার মাহাত্ম্য ঐ স্থলে প্রকাশ পাইয়াছে বেশি; তিনি ভগিনীগণের ত্রুটিই বেশি করিয়া দেখাইছেন, পুরুষকে কেবল আঙ্গুলি দ্বারা নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন মাত্র।“ 

সুকুমারী ভট্টাচার্য কালের পে‘ক্ষাপটে রোকেয়াকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন—’সমাজের সমস্যা তিনি শুধু শাস্ত্র বচন দিয়ে সমাধান করার চেষ্টা করেননি। সমকালীন সামাজিক পে‘ক্ষাপটে মানবিক বোধ ও যুক্তি বিচার দিয়ে সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করতে চেয়েছেন। রোকেয়াকে বুঝতে হলে তৎকালীন পর্দানশীল মুসলিম নারী সমাজ, এ সম্বন্ঠে নানা ধর্মীয় ও পারিবারিক বিধি নিষেধকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে যে, প্রতিকূলতা শুধু পুরুষের থেকেই আসেনি, এসেছিল সংস্কারাচ্ছন্ন নারীদের কাছ থেকেও এবং সম্মুখ সমরে না গিয়েও মানবিক আবেদন ও যুক্তির দ্বারা তিনি সমস্যাগুলোর সমাধান করেন। রোকেয়া সর্ব অর্থেই একজন মহিয়সী মহিলা ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর প্রাপ্ত সাহচর্যযতটাই হোক, তিনি সমাজকে দিয়েছেন অনেক বেশি। ঊনবিংশ শতকে নারী আন্দোলনের সূচনাও এই নারীর কর্তৃত্ব।“ 

রোকেয়ার চিন্তা ও কর্মের মধ্যে যে অসাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ ঘটেছিল তার স্বীকৃতি স্বরূপ অদ্বৈত মল্লবর্মন ১৯৩৮ সালে ”নবর্নূর পত্রিকায় লেখেন- ’ব¯দতঃ বঙ্গীয় মুসলীম নারী সমাজ তাঁহাদের জাগরণের জন্য এবং শিক্ষাদীক্ষার পথ সুগম হওয়ার জন্য এই মহিয়সী মহিলার নিকট চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকিবেন। নারী জাতির জন্য তাঁহার অন্তরের দরদই তাঁহাকে নারীদের কল্যাণের জন্য সর্বস্ব সমর্পণে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল। শুধু মুসলমান নারীগণ নহে, হিন্দু-মুসলমান সমভাবে সকল নারীগণেরই তাই এই বিশাল প্রাণা মহিলা প্রাতঃস্মরণীয়।” 

রোকেয়ার এই নারীমুক্তি চেতনার গভীরতাকে উপলব্ধি করে তাই রোকেয়া রচনাবলীর সম্পাদক ও সাহিত্যিক আব্দুল কাদিরের মন্তব্য—“...নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা-ন্যায়ানুমোদিত রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও জাতীয় শিক্ষার চিন্তাই রোকেয়ার চিত্তকেও রেখেছিল সদা জাগ‘ত...।“ 

‘বুদ্ধির মুক্ত্রি আন্দোলনের অগ‘দূত কাজী আব্দুল ওদুদের চোখে ধরা পড়েছিল রোকেয়ার মননীলতা। বাঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি ভাষণে তিনি রোকেয়ার এই দিকটি তুলে ধরেন—’এ যুগের মুসলমান সাহিত্যিকদের চিন্তার ক্ষেত্রে বিশেষ গেদ্ধরবের আসন এই তিনজনের - মিসেস আর এস হোসেন (রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন), কাজী ইমদাদুল হক ও লুৎফর রহমান। ...মিসেস আর. এস হোসেনের প্রতিভা একালের ভগ্নহৃদয় মুলমানদের জন্য যেন এক দৈব আশ্বাস।“ অন্যত্র তিনি লেখেন- ’শুধু মুসলমান সাহিত্যিকদের মধ্যে নয়, গোটা বাংলার নারী সাহিত্যিকদের মধ্যে মিসেস আর. এস হোসেনের স্থান অতি উচ্চ-সর্বোচ্চ কিনা তা এখনও বলতে পারছিনা, কিন্তু সময়ে সময়ে তাই মনে হয়। এমন একটা মার্জিত অথচ প্রতিভাদীপ্ত চিত্ত বাংলাদেশে দুষ্প্রাপ্য না হইলেও সুপ্রাপ্য নয়।“ 

রোকেয়ার ভেতরে যে একটি কর্মধার সাহসী ও বিদ্রোহী সত্তা ছিল সেটি আকৃষ্ট করেছিল গেদ্ধরি আইয়ুবকে। তাই তিনি লিখেছিলেন- “...তিনি কাঁদিবার পাত্রী নন, বরং তাঁর হাতের কলম যেন বিদ্রোহ ঝাণ্ডা। তাঁর সাহিত্য কীর্তির অসম্মান না করেও বোধ হয় বলা অসঙ্গত হবে না যে দীপ্তিময়ী মহিলার প্রতিভা সৃষ্টিশীল সাহিত্যে যত না প্রকাশ পেয়েছে তার চেয়ে অনেক পেয়েছে স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারে, সমাজকে ঢেলে সাজাবার আগ‘হে। সমাজ চেতনা ও সাহসে তাঁর জুড়ি বাঙ্গালী মহিলাদের মধ্যে সরলা দেবী ছাড়া আর কেউ বোধ হয় নাই।“ শিবনারায়ণ রায়ও এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভগিনী স্বর্ণকুমারী দেবীর সঙ্গে রোকেয়ার তুলনা করে অনুরূপ কথা বলেছেন- ’নারীকে নিয়ে রোকেয়ার মত বিপ্লবী স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন না।“ 

রোকেয়ার রচনাশৈলীতে যে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট রয়েছে তা অনেক বিদগ্ধ জনকে বিস্মিত করেছে। সাহিত্যিক ও গবেষক অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান তাকে চিহ্মিত করেছেন এভাবে- ’বেগম রোকেয়ার রচনারীতির বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় তাঁর ভাষার সারল্যে, ভঙ্গীর তীক্ষèতায় এবং সুক্ষ্ম ব্যঙ্গে। মুসলমান লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ যেমন মীর মশাররফ হোসেন-সমাজ সমালোচনার উপায় স্বরূপ ব্যঙ্গ রচনা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু স্থুলতা ও অতিরঞ্ছন থেকে মুক্ত হতে পারেনি এবং কোথাও কোথাও বিদ্বেষের ছাপ লেগেছে। বেগম রোকেয়াই বিদ্রুপের শাণিত কষাঘাত নিয়ে সাহিত্য ক্ষেত্রে নামলেন এবং আঘাত করলেন ব্যক্তিকে নয়, সমাজের মনোবৃত্তিকে।“ 

তবে তৎকালীন ভারতের বিখ্যাত নেত্রী সরোজীনি নাইডু যার নারী বিষয়ক ইংরেজি পত্রিকায় রোকেয়ার ”সুলতানার স্বপ্ন্র প্রথম প্রকাশ পায়—তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন রোকেয়ার লেখনিতে নয়, শিক্ষাব্রতি ভূমিকায়। সেজন্য তিনি ১৯১৬ সালে রোকেয়াকে চিঠিতে লিখেছিলেন- ’মুসলমান বালিকাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান করে এবং তাকে সুস্থভাবে পরিচালনা করে চলার কাজে আপনার নিষ্ঠা আপনার আত্মদানকে আমি কত গভীরভাবেই না শ‘দ্ধা করি ...।“ 

তৎকালীন নানা পত্রপত্রিকা রোকেয়ার লেখাকে উচ্চমূল্য দিয়ে প্রশংসিত করেছিল। যেমন, মোসলেম ভারত, দ্য মুসলমান ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, রোকেয়ার লেখা বিভিন্ন বাংলা-ইংরেজি পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এবং এ সব পত্রিকার হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ দ্বারা সম্পাদিত বা পরিচালিত হত। যেমন- মহিলা, নবনুর, পুণ্য, নবপ্রভা, ভারত মহিলা, আল-এসলাম, বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা, অন্তঃপুর, সওগাত, সাধনা, পরিচারিকা, ইসলাম দর্শন, ধুমকেতু, এডুকেশন গেজেট, বঙ্গলক্ষ্মী, সাপ্তাহিক সত্যাগ‘হী, নওরোজ, সোনার ভারত, আহ্মকী, সবুজপত্র, মোহাম্মদী, গুলি¯ঁÍা, সাহিত্যিক, মোয়াজ্জিন, ঞযব গঁংংধষসধহ, ওহফরধহ খধফরবং সধমধুরহব প্রভৃতি। তবে সবচেয়ে বেশি লেখা প্রকাশিত হয় কোরান 

শরিফের বাংলা অনুবাদক সর্বজন শ‘দ্ধেয় ভাই গিরিশচন্দ্রের ”মহিল্রা পত্রিকায়। তিনি ১৯০৩ থেকে ১৯০৭ সাল- এই ৪ বছরে রোকেয়ার ২০টি প্রবন্ঠ ও কবিতা প্রকাশ করেন। শুধু তাই নয়, রোকেয়াকে গিরিশচন্দ্র অনেক উঁচুতে স্থান দিয়েছেন। রোকেয়া সম্বন্ঠে ”মহিল্রা পত্রিকাতে তিনি লিখেছিলেন- ’প্রবন্ঠ রচয়িতার প্রতি আমাদের আন্তরিক সম্মান ও শ‘দ্ধা আছে। ...তিনি বেশ বুদ্ধিমতী, চিন্তাশীল মনস্বিনী কন্যা। বঙ্গীয় মুসলিমকূলে অসামান্য নারী বলিয়া আমরা তাঁকে শ‘দ্ধা, আদর ও সম্মান করি।“ একই উপলব্ধি থেকে প্রমথ চেদ্ধধুরীও তাঁর ”সবুজপত্র্র পত্রিকায় রোকেয়ার লেখা প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর উচ্ছসিত প্রশংসা করেছেন। 

তবে আশ্চর্যজনক হল - এই মহানগরে বসবাস করা সত্ত্বেও কেন রোকেয়ার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, শরৎ চন্দ্রএবং নজরুলের কোনো শুভসংযোগ ঘটেনি। এটা কি তাদের অজানার নিরবতা, নাকি উপেক্ষার উদাসীনতা! রোকেয়ার মৃত্যুর পর প্রায় ৯ বছর রবীন্দ্রনাথ জীবিত ছিলেন এবং রোকেয়ার চাইতে ১৯ বছরের ছোট নজরুল রোকেয়ার মৃত্যুকাল পর্যন্ত দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হননি। আর রোকেয়া তাঁর রচনার জন্য তখন যথেষ্ট বিতর্কিত ও আলোচিত। কেউ কি তাদের রোকেয়া প্রতিভা সম্পর্কে অবহিত করেনি, নাকি রোকেয়ার দিক থেকে অভিমানী যোগাযোগহীনতা বজায় ছিল। অথচ রোকেয়ার ভাবশিষ্য সুফিয়া কামালসহ আরো অনেক মুসলিম লেখিকার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ, যোগাযোগ ও পত্রালাপ ঘটেছিল। নজরুলের ক্ষেত্রে একই কথা খাটে। রোকেয়ার মৃত্যুর পর কলকাতার আলবার্ট হলে অনুষ্ঠিত হয় নাগরিক স্মরণসভা। বহু বিশিষ্ট ও বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এখানে হাজির হলেও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল-বাংলার এই দুই শীর্ষ নক্ষত্রের উপস্থিতি ঘটেনি। তাদের কোনো বাণীও পে‘রিত হয়নি। সম্প্রতি প্রকাশিত ও আবুল আহসান চেদ্ধধুরী সম্পাদিত ”রোকেয়া প্রয়াণলেখ: সাময়িকপত্রে সাক্ষ্য ও অন্যান্য্র নামক গবেষণা গ‘ন্থে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হলেও, কোনো সদুত্তর মেলেনি। ফলে বিষয়টি আজো অজানাই থেকে গেল, ভবিষ্যতে হয়তো এর উত্তর পাওয়া যাবে। 

রোকেয়ার কর্মকাদ্ম ছিল ৩টি ক্ষেত্রে বিস্তৃত—সাহিত্য কর্ম, নারী শিক্ষার বিস্তার - বিশেষত মুসলিম নারীদের জন্য এবং সামাজিক রাজনৈতিক কার্যক্রম। প্রশ্ন হল- এসব ক্ষেত্রে তখন অনেকেই উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা হলে রোকেয়ার বিশেষত্ব ও অনন্যতা, কোথায়? ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি রোকেয়ার লেখা তাঁর স্বকালে বেশ নিন্দিত এবং নন্দিত হয়েছে। কিন্তু এটুকু বলাই যথেষ্ট নয়। আসলে প্রবল বাধা, বিরোধীতা ও সামাজিক পশ্চাদপদ তাঁর মধ্যে ভাই, বোন ও স¦ামীর সহযোগিতায় এবং নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন রোকেয়ার প্রথম বিপ্লব। সেই সঙ্গে সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রে তিনি এমন এক রচনা রচনাশৈলী গড়ে তুললেন যা একেবারেই তাঁর নিজস্ব। রোকেয়ার আগে-পরে অন্য নারীরা তাদের লেখালিখি মূলত: শিল্প সাহিত্য সাধনার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিল। আর রোকেয়া নারীমুক্তি আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক সূচনা ঘটায় তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে। অনেকেই নারীর দুর্দশায় কাতর হয়েছেন। তাদের বন্দী দশা, শিক্ষাহীনতা, নিগ‘হ নিয়ে লিখেছেন। তারা নারী জাগরণের অগ‘দূত রপে নমস্য। কিন্তু রোকেয়ার আগে কেউ নারীমুক্তির স্বরূপটি উপলব্ধি করতে পারেননি। নারীকে মানুষ বা ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার যে প্রয়াস আমরা ১৯৭২ সালে মেরি উলস্টোনক্রফটের ”নারী অধিকারের ন্যায্যত্রা (ঠবহফরপধঃরড়হ ড়ভ ঞযব জরমযঃং ড়ভ ডড়সবহ) গ‘ন্থে দেখতে পাই এবং যার প্রতিধ্বনি উঠে ১৮৬৯ সালে জন স্টুয়ার্ড মিলের ”নারীর অধঃস্তনতা’ (ঝঁনলঁমধঃরড়হ ড়ভ ডড়সবহ) গ‘ন্থে, সেই একই অনুভবের অনুরণন ঘটেছে রোকেয়ার লেখায় 

“বুক ঠুকিয়া বল মা; আমরা পণ্য নই; বল ভগিনী; আমরা আসবাব নই; আমরা জরাউ অলংকার রূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার ব¯দ নই; সকলে সমস্বরে বল, আমরা মানুষ। আর কার্যত দেখাও যে, আমরা সৃষ্টি জগতের শে‘ষ্ঠ অংশের অর্ধেক। 

আশ্চর্যজনক হল আদিম সমাজ সংক্রান্ত মর্গান বা এঙ্গেলসের রচনার সঙ্গে পরিচিত না হয়েও তিনি সভ্যতার উদ্ভবের সঙ্গে নারীর পরাধীনতার যোগসূত্রটি আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে রোকেয়া লিখেছেন—’আদিমকালের ইতিহাস কেউই জানি না বটে, তবু মনে হয় যে পুরোকালে যখন সভ্যতা ছিল না; তখন আমাদের অবস্থা এরূপ ছিল না। কোন অজ্ঞাত কারণবশতঃ মানবজাতির এক অংশ (নর) যেমন ক্রমে নানাবিধ উন্নতি করিতে লাগিল, অপর অংশ (নারী) তাঁর সঙ্গে সেরূপ উন্নতি করিতে পারিল না বলিয়া পুরুষের সহচরী বা সহধর্মীনি না হইয়া দাসী হইয়া পড়িল। ... সভ্যতা ও সমাজ বন্ঠনের সৃষ্টি হইলে সামজিক নিয়মগুলি অবশ্য সমাজপতিদের মনোমত হইলো। ইহাও স্বাভাবিক। ’জোর যার মুলক তার“ ... এখন জিজ্ঞাসা করি আমাদের অবনতির জন্য কে দোষী?“ ইউরোপ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম যুগের নারীবাদীদের মধ্যেও আমরা এমন বৈজ্ঞানিক অনুমান দেখতে পাই না। অন্যদিকে রোকেয়া (হয়তো) পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা আলোকিত হয়েছেন কিন্তুতাঁর নারীমুক্তির ভাবনাটি নিছক পাশ্চাত্য নির্ভর নয়। পরাধীন দেশে স্বকালের পে‘ক্ষাপটে নিজস্ব মেদ্ধলিকত্বেতাঁর নারীমুক্তির ভাবনা সমৃদ্ধ হয়েছে। ফলে নারীমুক্তির ক্ষেত্রে পুরুষবিরোধী বা পুরুষবিদ্বেষী সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পেরেছেন। এককভাবে পুরুষের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দায় সারেননি, নারীকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন তিনি: ’নারীর অন্তর, বাহির, মস্তিষ্ক, হৃদয় সবই দাসী হইয়া পড়িয়াছে। এখন আর আমাদের স্বাধীনতা, ওজস্বিতা বলিয়া কোন ব¯দ নাই এবং তাহা লাভ করিবার প্রবৃত্তি পর্যন্ত লক্ষিত হয় না।“ সেই সঙ্গে রোকেয়া নারীমুক্তি চেতনা, সামাজিক, সামষ্টিক—পাশ্চাত্যেও মত ব্যক্তিসর্বস্বতাবাদী নয়। আর এখানেই পাশ্চাত্যের চিন্তার সঙ্গে তাঁর স্বাতন্ত্র। আপত্তির কারণে ‘আমাদের অবনতি’ প্রবণদের বাদ দেওয়া অংশের সঙ্গে আমরা মিল খুঁজে পাই ১৮৯৮ সালে রচিত এলিজাবেথ কেডি স্ট্যান্টনের ডড়সবহ ইরনষব নামক গ‘ন্থের। আরও বিস্ময়কর হল, ভার্জিনিয়া উলফ নারীর গৃহহীনতা নিয়ে যে গভীর উপলব্ধিজাত প্রবন্ধ অ জড়ড়স ড়ভ ঙহব’ং ঙহি লিখেছিলেন ১৯২৯ সালে, এর প্রায় দ্রুদশক আগেই রোকেয়ার কদ্বে ওই একই অনুভবের প্রতিধ্বনি শুনি- ”গৃহ বলিতে একটি পথ কুটিরও নাই। প্রাণী জগতে কোন জšদই আমাদের মত নিরাশ‘য়া নহে।“ তবে সবচেয়ে অবাক লাগে যখন দেখি- রবীন্দ্রনাথ ১৯২৯ সালে যোগাযোগ উপন্যাসে নারীকে যে রূপে চিত্রিত করতে চেয়েছিলেন, বহু আগেই ১৯০২ সালে ”পন্ডরাগ্র উপন্যাসের সিদ্দিকার মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেছেন- ’আমিও দেখাইতে চাহি যে, দেখ, তোমাদের ”ঘর কর্রা ছাড়া আমাদের আরও পথ আছে। স্বামীর ”ঘর করাই্র নারীজীবনের সার নহে। মানব-জীবন খোদাতায়ালার অতি মূল্যবান দান- তাহা শুধু ‘রাঁধা-উনুনে ফুঁ পাড়া- আর কাঁদার জন্য অপব্যয় করিবার জিনিস নহে।“ 

প্রশ্ন জাগে—রোকেয়া কি মার্ক্সবাদী সাহিত্য বা রুশ বিপ্লবের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন? রোকেয়ার স্বকালে তৎকালীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং কমিউনিস্ট আন্দোলন বেশ বিকাশমান এবং পার্টি ও বিভিন্ন গণসংগঠনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী অগ্রণী ভূমিকায়। কিন্তু তা সত্বেও রোকেয়ার সঙ্গে সেই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টির কোন প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ যোগাযোগের তথ্য এ যাবৎকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। 

নারীশিক্ষাব্রতি রোকেয়াকে নিয়ে অনেক লেখালেখি, আলোচনা ও গবেষণা আজ বেশ নজরে পড়ে। তবে এক্ষেত্রে তাঁর বিপ্লবী ভূমিকাটি সামনে উঠে আসে না। রোকেয়ার সমসাময়িক অনেকেই নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, কিন্তু প্রায় সকলেই নারীশিক্ষাকে যোগ্য স্ত্রী, ভদ্রমহিলা, সুগৃহিনী হওয়ার কিংবা চাকুরি করার উপায় হিসাবেই দেখেছেন। নারীর গঁৎবাঁধা সীমানার মধ্যেই উন্নতি চেয়েছেন। আত্মশক্তি ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন এবং মনুষ্যত্ব ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ—সর্বোপরি নারীমুক্তির জন্য শিক্ষাকে চিহ্মিত করেন। রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্রবিদ্যাসাগরের মহত ও সংগ্রামী প্রচেষ্টায় হিন্দু নারীরা প্রাণে বাঁচলেও হিন্দু-মুসলিম সহ সকল পরনির্ভরশীল নারী আত্মশক্তিহীনতায় রয়ে গেল বিপন্ন। তাঁদেরই উত্তরসূরী হিসাবে রোকেয়া তাই শিক্ষার মশাল নিয়ে এগিয়ে এলেন, আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে নারীর ক্ষমতায়নে। তিনিই প্রথম শিক্ষার সাথে নারীমুক্তির যোগসূত্র স্থাপন করলেন—এখানেই রোকেয়ার অনন্যতা। 

রোকেয়ার সাহিত্যকর্ম মূলতঃ নারীমুক্তিকেন্দ্রীক হলেও বিষয় বৈচিত্র্যের পে‘ক্ষিতে তাঁর পরিসর অনেক বিস্তৃত। এ থেকে বোঝা যায় কত কিছুই নিয়ে তা তিনি ভেবেছেন ও করতে চেয়েছেন এবং করেছেনও অনেক। কর্মবীর রোকেয়ার দিকটি উদ্ভাসিত হবার অপেক্ষায়। ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষা, অলংকার, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, চাষী, স্বদেশী আন্দোলন, উপনিবেশ বিরোধীতা, বাঙালীর চরিত্র ও মোসাহেবী, মেয়েলিপনা, জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি, নারীর ভোটাধিকার, সংগঠন, মাতৃদুগ্ধ ও শিশু পালন, গৃহের সাজসজ্জা, মহামারী, সুস্বাস্থ্য, সমাজ সংস্কার, মাতৃভাষা- আরও কত বহুমুখী বিষয়। 

উপনিবেশিক বিরোধী, স্বাধীনতাকামী, জাতীয়তাবাদী ও স্বদেশী রোকেয়ার দেখা আমরা পাই তাঁর নানা লেখা ও বক্তৃতায়। ”প্রবাসী জীবন ও তাহার জন্মভূমি’, ‘আপীল’, ‘নিরূপম বীর’, ‘নিরীহ বাঙ্গালী’, ‘মুক্তিফল’—এ সব রচনায় রোকেয়ার এ দিকটি ফুটে উঠে। এই চেতনা কখনও সরাসরি, কখনও রূপকধর্মীভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বৃটিশবিরোধী সশস্ত্র ধারার আন্দোলনে শহীদ কানাইলাল দত্ত স্মরণে তিনি ‘কানাইলালের বীরত্ব’ নামক কবিতা লেখেন—...ত্যাজি সে পিঞ্জর চলিল কানাই/ ওরে শত কোটি শ্যাম/ ভারত গণনে দেখা দিবে পুনঃ/ ধন্য তোমার নাম/ বীর সন্তান জাগিয়া প্রভাতে/ স্মরিবে কানাই নাম/ প্রাতঃস্মরণীয় কানাই মোদের/ বলে বলে বন্দে শ্যাম্র।“ এ কবিতা লেখার জন্য তাঁর উপর পুলিশের নজরও পড়ে। রোকেয়ার কাছে জাতীয়তাবাদ হলো- “আর স্মরণ রাখিতে হইবে, আমরা শুধু হিন্দু বা মুসলমান নয় কিংবা প্রবাসী বা খ্রীষ্টিয়ান অথবা বাঙ্গালী, মাদ্রাজী, মাড়ওয়ারী বা পাঞ্জাবী নহি, আমরা ভারতবাসী। আমরা সর্বপ্রথমে ভারতবাসী—তারপর মুসলমান, শিখ বা আর কিছু।“ 

রাজনীতিতে বাঙালির দলাদলি, তর্ক-বিতর্ক, বক্তৃতাবাজী দেখে এবং সর্বোপরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ায় রোকেয়া সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হননি, কিন্তু তিনি পুরোপুরি রাজনীতি সচেতন ছিলেন। অন্যদিকে বাঙালির স্বভাব-চরিত্র ও মোসাহেবী তাঁকে পীড়িত করেছিল। এ প্রসঙ্গে তার মন্তব্য হলো- ”আমাদের সব কার্যের সমাপ্তি বক্তৃতায়, সিদ্ধি করতালী লাভে...।“ তীব্র ব্যঙ্গ বিদ্রƒপের কষাঘাতে বাঙ্গালী চরিত্রকে চিহ্মিত করেছেন এভাবে—”কুসুমের সেদ্ধকুমার্য, চন্দ্রের চন্দ্রিমা, মধুর মাধুরী, যুথিকার সেদ্ধরভ, সুপ্তির নীরবতা, ভূধরের অচলতা, নবনীর কোমলতা, সলিলের তরলতা—এক কথায় বিশ্ব জগতের সমুদয় সেদ্ধন্দর্য এবং স্নিগ্ধতা লইয়া বাঙ্গালী গঠিত হইয়াছে।...আমরা অলস, তরলমতি; শ‘মকাতর, কোমলাঙ্গ বাঙ্গালী কিনা, তাই ভাবিয়া দেখিয়াছি সশরীরে পরিশ‘ম করিয়া মুদ্রা লাভ অপেক্ষা ঙষফ ভড়ড়ষ শ্বশুরের যথাসর্বস্ব লুণ্ঠন করা সহজ।“ ভারতীয় পুরুষরা যেভাবে দেশপে‘মহীনভাবে ইংরেজদের মোসাহেবী করে তা দেখে রোকেয়া জ্বলে উঠেছিলেন—”আমরা (ঐ সকল পুরুষরা) আরও অনেক প্রকার কার্য্য নির্বাহ করে থাকি। যথা: (১) রাজ্য স্থাপন অপেক্ষা রাজা উপাধি লাভ সহজ (২) শিল্প কার্য্যে পারদর্শী হওয়া অপেক্ষা ই.ঝঈ. ওউ. ঝপ পাস করা সহজ (৩) বিস্তর অর্থব্যয়ে দেশে কোনো মহৎ কার্য্য দ্বারা খ্যাতি লাভ করা অপেক্ষা ”খাঁ বাহাদুর’ বা ”রায় বাহার্দুর উপাধি লাভের জন্য অর্থ ব্যয় করা সহজ (৪) প্রতিবেশী দরিদ্রের শোকে দুঃখে ব্যথিত হওয়া অপেক্ষা বিদেশীয় বড় লোকদের মৃত্যু দুঃখে ”শোক সর্ভার সভ্য হওয়া সহজ (৫) দেশের দুর্ভিক্ষ নিবারণের জন্য পরিশ‘ম করা অপেক্ষা আমেরিকার নিকট ভিক্ষা গ‘হণ সহজ।...“ আমাদের এই চরিত্র আজো আদেদ্ধ কি বদলেছে! 

রোকেয়া তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতাবোধ থেকে নারীর ভোটাধিকার অর্জনের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ লক্ষ্যে গঠিত ”বঙ্গীয় নারী সমাজ্র এ ক্ষেত্রে মুসলিম নারী সমাজের মধ্য থেকে যে দুজনের উল্লেখযোগ্য সাড়া পেয়েছিলেন তার মধ্যে রোকেয়া অন্যতম। বারবারা সাউথার্ডের দি উইমেল মুভমেন্ট অ্যাদ্ম কলোনিয়াল পলিটিক্স ইন বেঙ্গল্র নামক গ‘ন্থে উল্লিখিত তথ্য থেকে জানা যায়—’স্বধর্মের রক্ষণশীল অংশের সম্ভাব্য নিন্দাবাদের শঙ্কা দূরে ঠেলে যে কয়জন মুসলিম নারী ভোটাধিকারের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিলেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।“ পরবর্তীকালে নারীর সীমিত ক্ষেত্রে ভোটাধিকারের লাভের পর এক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের অনীহাকেও রোকেয়া তখন আক্রমণ করেছেন—’এখন স্ত্রী লোকেরা ভোটদানের অধিকার প্রাপ্ত হইয়াছেন, কিন্তু মুসলিম মহিলাগণ এ অধিকারের সদ্ব্যবহারে স্বেচ্ছায় বঞ্চিত রহিয়াছেন। গত ইলেকশনের সময় দেখা গেল কলিকাতায় মাত্র ৪ জন স্ত্রীলোক ভোট দিয়াছেন। ইহা কি মুসলমানের জন্য গেদ্ধরবের বিষয়?” 

রোকেয়াকে নিয়ে বিতর্কের একটি অন্যতম বিষয় হলো-ধর্ম প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। এক্ষেত্রে অনেকেই ধর্ম ও ধর্মান্ঠতা এবং সম্প্রদায়ের প্রতি মঙ্গলবোধ ও সাম্প্রদায়িকতাকে গুলিয়ে ফেলে রোকেয়াকে অহেতুক বিতর্কিত করেন। অথচ রোকেয়ার এ সংক্রান্ত লেখাপত্র গভীর মনোযোগে পাঠ করলে বোঝা যায় তিনি কতখানি ধর্মান্ঠতা, গোঁড়ামী ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছিলেন। তেমনি তৎকালীন পে‘ক্ষাপট বিচ্ছিন্ন হয়ে মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধর্ম প্রশ্নে রোকেয়ার কেদ্ধশলী অবস্থান উপলব্ধির অপরাগতায় অনেকেই তাঁকে ”আপসকাম্রী, ”দোদুল্যমান্র, ”দ্বিধাগ‘স্ত্র রূপে চিহ্মিত করার বিভ্রান্তিতে ভোগেন। আবার নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর পদবী যুক্ত করায় তাকে সমালোচিত হতে হয়। অথচ রোকেয়া কেন নিজের নামের সাথে স্বামীর নাম যুক্ত করেছিলেন, তাঁর অনেক চিঠি 

পত্রে এবং অনেক গবেষকের লেখায় তার ব্যাখ্যা মেলে। এখানে উল্লেখ্য যে, রোকেয়া কখনো তাঁর নামের সাথে বেগম যুক্ত করেননি। বেগম শব্দের প্রতি তাঁর আপত্তির কথা অনেক গবেষকের লেখায় পাওয়া যায়। তৎকালীন সকলেই লিখতেন মিসেস রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, মিসেস আর. এস. হোসেন কিংবা আর. এস. হোসেন। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে বর্তমানে রোকেয়াকে ‘বেগম রোকেয়্রা বলা বা লেখা এখন সার্বজনীন চলে পরিণত হয়েছে। 

রোকেয়া নারীমুক্তি নিয়ে কেবল চিন্তা-ভাবনা ও লেখালেখির সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তাকে তৎপরতায় প্রসারিত করেছিলেন। তিনি ১৯১৬ সালে নারী সমাজের জন্য গড়ে তুলেছিলেন মুসলিম নারীদের সংগঠন ”আঞ্ছুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম্র বা নিখিল বঙ্গ মুসলিম মহিলা সমিতি। ১৯১৭ সালে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগে‘স অধিবেসনে রোকেয়া তাঁর কয়েকজন অনুগামীকে নিয়ে যোগ দেন। সমাজ পরিত্যক্তা নারীদের জন্য গঠিত ”নারীতীর্থ আশ‘ম্র এর কার্যনির্বাহী সভাপতির দায়িত্বও তিনি ১৯২২ সালে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তবে রোকেয়ার এই সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা এবং অন্যান্য তৎকালীন সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার সামান্য বিবরণ পাওয়া গেলেও তা আজও লোক চক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে। 

ভাষা, শব্দ, পরিভাষা যে নিরীহ নয়, তা যে মর্যাদাহানীকর ও পক্ষপাতদুষ্ট হয় সেটাও সেকালে রোকেয়ার নজর এড়ায়নি। তাই তিনি প্রভু, গ্রহীত, স্বামী, অর্ধাঙ্গী, দাসী—এসব নারী বিদ্বেষী শব্দকে সমালোচনা করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন—“তাহারা ভূস্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্রমে আমাদের স্বামী হইয়া উঠিলেন।...শ্রীমতিগণ জীবনের চিরসঙ্গী শ‘ীমানদিগকে ”স্বামী’ ভাববেন কেন... আশা করি এখন ”স্বাম্রী স্থলে ”অর্ধাঙ্গ্র শব্দ প্রচলিত হইবে ...।“ 

আশ্চর্য হল সেকালে মাতৃদুগ্ধ পান ও টিনজাত দুধ বর্জনে রোকেয়ার দৃষ্টিপাত—আজও আমাদের বিস্মিত করে। এক্ষেত্রে তার পরামর্শ ”এক বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ সবচেয়ে ভাল; তা যদি একান্ত না পাওয়া যায়, গাইয়ের দুধে অনেকটা জল মিশিয়ে মায়ের দুধের মত খাওয়াবে।’ এরপর একটি উর্দু কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে রোকেয়ার মন্তব্য—’বেচারা শিশু পিতামাতার স্বভাবের গন্ঠ লাভ করিবে কোথায় হইতে? সে তো টিনের ডিবের কৃত্রিম দুধ খায়, আর শিক্ষালাভ করে গভর্নমেন্টের।“ 

সামগি‘ক মূল্যায়ণের চেষ্টায় আমরা রোকেয়ার মধ্যে দেখি বাংলার নবজাগরণ বা রেঁনেসার সব বৈশিষ্ট্যের সমাহার—মুক্তি, স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবধিকার, সাম্য ইত্যাদি। সে বিবেচনায় রোকেয়াকে বাংলার নবজাগরণের মানসকন্যা রূপে অনায়াসে অভিহিত করা যায়। 

স্বাধীন বাংলাদেশে রোকেয়া চর্চার ক্ষেত্রে বেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। এ ক্ষেত্রে অগ‘ণীরা হলেন—অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, মো. শামসুল আলম, মফিদুল হক, গোলাম মুরশীদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, ড. সোনিয়া নিশাত আমীন, মালেকা বেগম, হুমায়ন আজাদ, আবুল আহসান চেদ্ধধুরী, আহমদ রফিক প্রমুখ। 

কিন্তু তা সত্ত্বেও রোকেয়ার স্বরূপ সন্ঠানে এখনও অনেক অপূর্ণতা রয়ে গেছে। এর একটি অন্যতম কারণ হলো—নারীমুক্তিসংগ্রামী সংগঠন ও আন্দোলনের অনুপস্থিতি। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, অবিভক্ত ভারতবর্ষে নারীমুক্তি আন্দোলন বৃটিশ উপনিবেশবাদ বিরোধী বিভিন্ন ধারার (শান্তিপূর্ণ, সশস্ত্র, সাম্যবাদী) জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের স্রোতধারায় মিশে গিয়েছিল। একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। দেশভাগের পর দীর্ঘদিন প্রবল অগণতান্ত্রিক ও সামরিক শাসন, ভাষা আন্দোলনের হ্নুলিঙ্গ থেকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের দাবানল, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। ফলে এখানেও নারীমুক্তি আন্দোলন ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ছিল একাকার। পরবর্তীকালে রোকেয়ার শিষ্য সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে দেশের সর্ববৃহৎ জাতীয়ভিত্তিক নারী সংগঠন ”মহিলা পরিষদ” নামেন গড়ে ওঠে। কিন্তু নানা কারণে আজ সে সংগঠন তার নিজস্ব চরিত্র হারিয়ে এনজিও খাতের একটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নারীমুক্তি আন্দোলনের নতুন কোন ধারাও আর গড়ে ওঠেনি। মূলত নারী উন্নয়নমুখী সংস্কারমূলক প্রকল্পভিত্তিক এনজিও কর্মকাণ্ডের মধ্যে এখন নারীইস্যু কেন্দ্রিক তৎপরতা সীমিত। গত কয়েক দশকে সুশীল সমাজের উদ্যোগে কিছু ”নারীবাদ্রী সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু এদের কাছে “রোকেয়া” কেবল পদক প্রদান ও দিবস পালন পর্যন্ত—রোকেয়া পথেয় হয়ে উঠেনি। 

অন্যদিকে আবার সাম্প্রতিককালে রোকেয়াকে নিয়ে নতুন করে নানা তর্ক বিতর্কেরও সূচনা হয়েছে। কেউ কেউ খণ্ডিত ও যান্ত্রিক পাঠ থেকে ”স্ববিরোধ্রী, “ধর্মভীর্রু, “আপোষকামী, “পুরুষ বিদ্বোষ্রী, “পুরুষতান্ত্রিক্র, “ইসলামী বা মুসলিম নারীবাদ্রী ইত্যাদি নানাভাবে রোকেয়া চিহ্মিত হচ্ছেন। তাঁর কিছু লেখা যেমন ”বোরকা, সুগৃহিনী, নূরে ইসলাম নিয়ে এ বিতক চর্লে। 

এসব অবমূল্যায়ণ বহু গবেষক ইতোমধ্যে খণ্ডন করেছেন। তবুও বলা যায়—আজকের যুগের তত্ত্ব-জ্ঞান-চেতনা ও তথ্যের আলো দিয়ে রোকেয়াকে বিচার করা অনুচিত। তাঁকে পরিমাপ করতে হবে তাঁর যুগের পে‘ক্ষাপটে—নতুবা আমরা রোকেয়াকে চিনতে ভুল করবো। 

নিঃসঙ্গ একাকী রোকেয়া প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে মাত্র ৫২ বছর বয়সে ঘুমিয়ে পড়লেও ঘুম ভাঙ্গিয়ে যান আগামী প্রজন্মের নারী সংগ্রামীর। বৈরী সমাজ তাঁকে কবরের জায়গাটুকুও দেয়নি। সোদপুরে পানিহাটিতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। অনেক দিন পর্যন্ত রোকেয়ার কবর ছিল অজ্ঞাত, লোকচক্ষুর অন্তরালে। ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে পরে রোকেয়ার কবর আবিষ্কার করেন—যেখানে আজ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত। হয়তো কবরে শুয়েও তিনি শুনতে পান ছাত্রীদের কলকাকলি। মহাপ্রয়াণের রাতে তিনি তাঁর ”নারী অধির্কার নামক শেষ প্রবন্ঠে লেখেন—’আমাদের ধর্মমতে বিবাহ সম্পূর্ণ হয় পাত্র-পাত্রীর সম্মতি দ্বারা। তাই খোদা না করুন বিচ্ছেদ যদি আসে, তবে সেটা আসবে উভয়ের সম্মতিক্রমে। কিন্তু কেন এটা হয় এক তরফা, অর্থাৎ শুধু স্বামী দ্বারা?...

রোকেয়া আজ জাতীয় ক্ষেত্র ছাপিয়ে বৈশ্বিক স্তরে উন্নীত। কিন্তু এ দেশে ‘আমাদের সীমাবদ্ধতার অবরোধে রোকেয়া’ আজও অবরুদ্ধ। তবে একদিন নিশ্চয়ই রোকেয়া স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত হবেন এবং এর পথও তিনি বাতলেছেন-“যাহার চক্ষু আছে, সে দেখুক, যাহার কর্ণ আছে, সে শুনুক, আর যাহার মন আছে, সে চিন্তা করুক।“

মন্তব্য নেই

  • Philip W

    প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্য

    Phasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.

  • Philip W

    প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্য

    Phasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.

মন্তব্য লিখুন