মার্কসবাদ এবং জাতপাতের প্রশ্ন
জাতপাত, শ্রেণি এবং লিঙ্গ বিভিন্ন সময়পর্বে সংগ্রামের প্রধান ক্ষেত্র হিসাবে উদ্ভূত হতে পারে। এবং এগুলির যে কোনও ইস্যুও সামনে এসে হাজির হোক না কেন, তাকে নিয়েই প্রগতিশীল শক্তিকে সংগ্রামে নামতে হবে।
উচ্চশিক্ষা এবং সৃজনশীলতার চর্চা হয় যে সব প্রতিষ্ঠানগুলিতে, সম্প্রতি তাদের ওপর নেমে এসেছে হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলির আক্রমণ। এরই প্রতিক্রিয়ায় দেশের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভেসে উঠেছে এক ধরনের বৌদ্ধিক বুদবুদ যা থেকে আবার জাতপাতের প্রশ্নটিকে ঘিরে উদ্ভূত হয়েছে একটা নয়া বামপন্থী ব্যাখ্যা বা ডিসকোর্স। সেকারণে মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ এবং জাতপাত ভিত্তিক নিপীড়নের ইস্যুটির মধ্যেকার সম্পর্কের বিষয়টি ফের একবার সামনে চলে এসেছে। বর্তমানে যে সংগ্রামগুলি চলছে সেগুলির ওপর এই সম্পর্ক–বিষয়ক আলোচনার খুব বেশি আশু ও ব্যবহারিক প্রভাব নাও থাকতে পারে। তবে তাত্ত্বিক অ্যাজেন্ডায় বিষয়টি যে চলে এসেছে, এই বিষয়টিকে অস্বীকার করা যাবে না।
মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ এবং জাতপাত ভিত্তিক নিপীড়নের সম্পর্ককে ঘিরে একটা দীর্ঘকালীন বিতর্ক রয়েছে। এর উৎসে রয়েছে অনেকের, বিশেষ করে দলিত বুদ্ধিজীবীদের এই অভিযোগ যে—মার্কসবাদ ‘জাতপাত’ এর চেয়ে ‘শ্রেণি’কে বেশি গুরুত্ব দেয়, সমাজ সম্পর্কে মার্কসবাদের প্রাথমিক উপলব্ধি নির্ধারিত হয় শ্রেণি বিভাজনের নিরিখে এবং জাতপাতের নিরিখে নয়, এবং সেকারণেই মার্কসবাদ শ্রেণির চেয়ে জাতপাতের গুরুত্বকে খাটো করে দেখে। এই বিতর্কে আমরা প্রায়ই সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারি তিনটি সুনির্দিষ্ট বৌদ্ধিক অবস্থানকে ( যেগুলোর কোনওটাই আবার সার্বিক অর্থে চূড়ান্ত নয়)। একটি অবস্থানের বক্তব্য একরকম যে, ভারতে শ্রেণি ও জাতপাতের নিপীড়ন কম বেশি পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এবং নিঃসন্দেহে এই বক্তব্যে যথেষ্ট ন্যায্যতা রয়েছে। এই অবস্থানের পক্ষে থাকা লোকেদের বক্তব্য হল, নিপীড়িত জাতিগুলি শুধুমাত্র নিপীড়িত শ্রেণিগুলির একটা অংশমাত্র নয়, বরং নিপীড়িত জাতিগুলিই হল মূলত নিপীড়িত শ্রেণি। এই কারণে এরকম চিন্তাভাবনার অনুসারী বেশ কিছু লেখক এদেশে শোষণের প্রক্রিয়াটিকে বর্ণনা করার জন্য হাইফেন যুক্ত ‘জাতি-শ্রেণি’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন।
দ্বিতীয় অবস্থানের পক্ষে যারা, তারা জাতি এবং শ্রেণি, এই দুই ধারণার মধ্যে তফাৎ করার তাৎপর্যের ওপরে জোর দেন। তবে তারা, সমাজ বদলের লক্ষ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রাথমিক লক্ষ্য হিসাবে জাতি এবং শ্রেণির মধ্যে যে কোনও একটিকে অন্যটির তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবেন। কারোর অগ্রাধিকার থাকে শ্রেণি লাইনে সংগ্রাম গড়ে তোলার ওপর। আবার অন্যরা জাতপাতের নিপীড়নকে কেন্দ্র করে সংগ্রাম গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেন।
তৃতীয় অবস্থানটি পদ্ধতিগতভাবে একটা ভিন্ন গোত্র-এর। এই অবস্থনের মূলে রয়েছে ফরাসি কমিউনিস্ট দার্শনিক লুই আলথুজারের তাত্ত্বিক কাজকর্ম, যে অ্যালথুজার আবার মার্কসবাদের একটা ‘কাঠামোবাদী’ ব্যাখ্যা হাজির করেছিলেন। এই ভিন্ন গোত্র-এর সমর্থকেরা আবার অ্যালথুজারের সমালোচনাও করেন একথা বলে যে, অ্যালথুজার তাঁর দর্শনকে যতটা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, কেন তিনি তা থেকে আরও বেশি এগিয়ে নিয়ে যাননি। তৃতীয় এই অবস্থানটির বক্তব্য হল, একটা সমাজে যে কোনও নির্দিষ্ট সময়পর্বে একই সঙ্গে অনেকগুলি দ্বন্দ্ব পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। এবং সেখানে একটার তুলনায় অন্য কোনও দ্বন্দ্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কোনও একট নির্দিষ্ট মুহুর্তে এই সব দ্বন্দ্বগুলির যে কোনও একটা সামনে চলে আসতে পারে, তখন প্রগতিশীল শক্তিকে সেই সামনে চলে আসা দ্বন্দ্ব নিরসনের ওপরেই সমস্ত শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে হবে। এই রকম একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে গিয়ে, তৃতীয় অবস্থানপন্থীরা একটা সংকটকালের আবির্ভাব আগাম অনুমান করে নিতে পারেন যে সংকটকালে গোটা কাঠামোটাই রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে।
আমাদের এই আলোচনা প্রসঙ্গে এই তৃতীয় বা শেষ যুক্তিটির মানে কী? এর মানে হল, জাতপাত, শ্রেণি এবং লিঙ্গ বিভিন্ন সময়পর্বে সংগ্রামের প্রধান ক্ষেত্র হিসাবে উদ্ভূত হতে পারে। এবং এগুলির যে কোনও ইস্যুও সামনে এসে হাজির হোক না কেন, তাকে নিয়েই প্রগতিশীল শক্তিকে সংগ্রামে নামতে হবে। এক্ষেত্রে কোনভাবেই অন্য দ্বন্দ্বগুলির তুলনায় ‘শ্রেণিদ্বন্দ্ব’কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
গতিতে নয়, সমাজকে স্থিতিতে দেখার দৃষ্টিভঙ্গী
ওপরের তিনটি বৌদ্ধিক অবস্থানের মধ্যেই একটা সাধারণ মৌলিক বিষয় লক্ষ্য করার মতো: তিনটি অবস্থানই যখন বিচার করে নির্দিষ্ট কোনও একটা দ্বন্দ্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত কিনা তখন তারা সমাজকে দেখে স্বল্প মুহুর্তের ঝাঁকি দর্শনে। এটা হল ঠিক যেন ক্যামেরায় ঝটিতি তোলা ছবির একটা ফ্রেমের মতো। (ক্যামেরায় একবার শাটার টিপলে কোনও বস্তুর একটা মুহুর্তের ভগ্নাংশের ছবি ফ্রেমে বন্দি হয়। এটা বস্তুটির গতিহীন, নিশ্চল ছবি। কারণ ওই বস্তুটি শাটার টেপার আগেও আছে, পরেও বিদ্যমান। সবগুলি অবস্থানকে একসঙ্গে ধরলে তবেই বস্তুটিকে গতিতে পাওয়া যাবে। কিন্তু কোনও এক মূহুর্তের ভগ্নাংশের ছবি আসলে গতিহীন ফ্রেমের ছবি। —অনুবাদক)। একইভাবে ঝাঁকি দর্শনে সমাজকে দেখা মানে সেই সমাজকে একটা গতিহীন, নিশ্চল ফ্রেমে বন্দি করে দেখা। এমনকি এই তিনটি বৌদ্ধিক অবস্থানের মধ্যে শেষেরটিও, যারা মনে করে সাধারণভাবে রূপান্তরিত না হওয়া কোনও সমাজে ভিন্ন ভিন্ন সময়পর্বে ভিন্ন ভিন্ন দ্বন্দ্বকেই প্রাধান্য দিতে হবে, সমাজ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীও আসলে গতিহীন, নিশ্চল ফ্রেমে বন্দি। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে বিষয়টা বোধ হয় তেমন নয়। কারণ তৃতীয় অবস্থানটি বলছে যে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দ্বন্দ্ব প্রাধান্য পায়। এথেকে মনে হতে পারে যে এই অবস্থানের প্রবক্তারা পরিবর্তনশীল সমাজের কথাই বলছেন, সমাজের গতিহীন নিশ্চল ফ্রেমের কথা বলছেন না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দ্বন্দ্বকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা যে পরিবর্তন বা বদলের কথা বলেন আসলে সেটাও সেই গতিহীন, নিশ্চল ফ্রেমের মধ্যেই অবস্থান বদল –এর পূর্বানুমান। তাঁদের অনুমান হল, সমাজের কোনও নির্দিষ্ট গতিহীন ফ্রেমে বা মুহুর্তে কোনও একটা দ্বন্দ্ব প্রাধান্যের জায়গায় চলে আসতে পারে, আবার নির্দিষ্টভাবে অন্য কোনও গতিহীন ফ্রেমে আরেকটি দ্বন্দ্ব প্রাধান্যের জায়গায় চলে যেতে পারে। (অর্থাৎ সমাজকে সামগ্রিকতায় না দেখে, বিচ্ছিন্ন করে দেখা—অনুবাদক)
সংক্ষেপে বললে, ভারতে ‘শ্রেণি’ ও ‘জাতপাত’ বিষয়ে আলোচনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চলেছে সমাজকে গতিতে নয়, স্থিতিতে দেখার দৃষ্টিভঙ্গীর পরিপ্রেক্ষিতেই। এবং এবিষয়ে মার্কসবাদী অবস্থানকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে, এই অবস্থানে ‘শ্রেণি’কে ‘জাতপাতের’ চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আসলে এই ভুল ব্যাখা করা হয়েছে সমাজকে গতিতে নয়, স্থিতিতে দেখার ভিত্তিতেই। এটা ভুল। কারণ, একটা গতিহীন, নিশ্চল ফ্রেমের মধ্যে একটা বর্গকে অন্য বর্গের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে মার্কসবাদ আদৌ ভাবিত নয়। আসলে মার্কসবাদ যে বিষয়টি নিয়ে ভাবিত তা হল, কীভাবে আমরা এক ফ্রেম থেকে অন্য ফ্রেমে পৌঁছতে পারি । অন্যভাবে বললে, কোনও প্রদত্ত ফ্রেমে শ্রেণি, জাতপাত, লিঙ্গ ও অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সম্পর্কসমূহের একটা গুচ্ছ বা একটা সমগ্র, (মার্কসবাদী দার্শনিক জর্জ লুকাচের ধারণা ব্যবহার করে বলা যায়)) এই সব সম্পর্কগুলো মিলে তৈরি হয় একটা টোট্যালিটি বা সামগ্রিকতা। এই সামগ্রিকতা, বিশেষ করে আমাদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতপাত–শ্রেণীর এই গুচ্ছ বা সমগ্র , সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। এখানে মার্কসবাদ যে প্রশ্নটা তোলে তা হল: এটা কীভাবে এবং কেন বদলায়? অন্যভাবে বললে, এখানে মূল বিষয় এটা নয় যে এই সমগ্রতার মধ্যে কোন্ উপাদানটি আপনা থেকেই, কিংবা সহজাতভাবেই, বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ( আলাদাভাবে বিচার করলে এটা আদতে একটা অর্থহীন প্রশ্ন মাত্র)। এখানে মূল বিষয় হল, কোন্ শক্তি ওই সমগ্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এখানে মার্কসবাদ যে উত্তরটা দেয় তার সঙ্গে ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার সম্পর্ক রয়েছে সেই ব্যাখ্যা প্রায় সকলেরই জানা এবং সেকারণে এখানে উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন। তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা ‘দ্য ডেভেলপমেন্ট অফ মনিস্ট ভিউ অফ হিস্ট্রি’–তে জি ভি প্লেখানভ জোর দিয়ে বলেছেন যে ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যাই মার্কসবাদের ডিফারেন্সিয়া স্পেশিফিকা বা পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্য । তবে এখানে সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে সংক্ষেপে যে আলোচনা করাটা উপযুক্ত হতে পারে, তা হল পুঁজিবাদী সময়পর্বের বা যুগের বৈশিষ্ট্য।
মার্কসের বিশ্লেষণাত্মক রচনার মূল জোরের জায়গাটা ছিল পুঁজিবাদ। সেই রচনায় মার্কস জোর দিয়েছিলেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর। ঘটনা হল পুঁজিবাদী ব্যবস্থা একটি স্বতশ্চালিত বিষয় যা আবার কতগুলি অন্তর্নিহিত প্রবণতার অধীন। এই প্রবণতাগুলি মানুষের ইচ্ছা ও চেতনা নিরপেক্ষ, (যেমন কেউই ১৯৩০ এর মহামন্দা চায়নি, কিংবা বর্তমান বিশ্ব পুঁজিবাদী সঙ্কটও কেউ চায়নি, এবং যদিও সবরকম সচেতন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই সঙ্কট এখনও টিকে রয়েছে)। সবচেয়ে বড় কথা হল, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত এই সব প্রবণতাগুলির গঠনে যেসব মানবিক আচরণ উপাদান হিসাবে কাজ করে, সেগুলি আদৌ মানবিক (অর্থনৈতিক) এজেন্টদের সচেতন ইচ্ছাশক্তির বিষয় নয়। বরং মানবিক (অর্থনৈতিক) এজেটদের নির্দিষ্ট একটি উপায়ে ঘাড় ধরে কাজ করতে বাধ্য করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। কারণ ওই রকম অনুসারী আচরণ না করলে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নির্দিষ্ট অবস্থান থেকেই তাদের সরে যেতে হবে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পুঁজিবাদীরা পুঁজি সঞ্চয় করে এজন্য নয় যে তারা সেটা করতে পছন্দ করে। বরং, তারা যদি পুঁজি সঞ্চয় না করে তাহলে এই ব্যবস্থার মধ্যে তারা টিকে থাকতে পারবে না এবং প্রতিযোগিতার ধাক্কায় তাদের পথের ধুলোয় পড়ে থাকতে হবে। অন্যভাবে বললে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে পুঁজিপতিরাও এই ব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন (alienated) এজেন্টই।
ওপরের আলোচনা থেকেই এটা বোঝা যায়, পুঁজিবাদের বিকাশের কারণেই জাতপাত–শ্রেণি মিলে গঠিত সমগ্রের প্রকৃতি বদলে বদলে যেতে পারে। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’কে অতিক্রম না করতে পারলে মানবিক স্বাধীনতা অসম্ভব। শ্রেণি শোষণ তথা জাতপাতভিত্তিক নির্যাতনের অবসানের পূর্বশর্ত হল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’কে অতিক্রম করা। কারণ, ব্যবস্থাকে অতিক্রম করতে না পারলে, যদি নিপীড়িত জাতিগুলির কিছু লোক ‘সামাজিক সিঁড়ি বেয়ে শ্রমিকশ্রেণির অবস্থানের বাইরে উঠেও আসে’ (দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের সম্পর্কে ওয়ার্লড ব্যাঙ্ক ও অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গী যেমন ছিল), তাহলেও তাদের বেশির ভাগ অংশই জাতপাতের নিপীড়নের পাঁকেই ডুবে থাকবে, ঠিক যেমনভাবে তারা ডুবে রয়েছে শ্রেণি শোষণের পাঁকে এবং এভাবে তাদের অবস্থা আদৌ বদলাবে না।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে যাওয়ার গুরুত্ব
বিদ্যমান ব্যবস্থা, যেখানে শ্রেণি শোষণ টিকে রয়েছে বেশ কিছু আদিম রূপে, সেই ব্যবস্থার মধ্যে টিকে থাকা জাতপাত ভিত্তিক নিপীড়নের বাস্তবতার অবসান ঘটিয়ে সেই জায়গায় (অন্য এমন কোনও বিকল্প বাস্তবতাকে) প্রতিষ্ঠিত করা আদৌ সম্ভব নয় যেখানে এই নিপীড়নের পুরোপুরি অবসান ঘটবে। এথেকেই স্পষ্ট হয় যে, যারা জাতপাতের নিপীড়নের অবসানের জন্য লড়াই করছেন তাঁরা তাদের লড়াইয়ে সফল হতে পারবেন না যদি না তাঁরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই অতিক্রম করে যেতে পারেন। সংক্ষেপে জাতপাতভিত্তিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে হলে দরকার হল পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই অতিক্রম করে যাওয়া। যদিও এটা সত্যি যে জাতপাত ভিত্তিক নিপীড়নের অবসান ঘটনোর জন্য এটা যথেষ্ট পূর্বশর্ত নয়। তবে নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত। এটাই মার্কসবাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত।
কোন বর্গকে প্রাধান্য দিতে হবে— ‘শ্রেণি’ না ‘জাতপাত’— তা বিবেচনা করতে হবে ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই। বিচ্ছিন্নভাবে সমাজের গতিহীন, নিশ্চল কোনও ফ্রেম বা সময়পর্বের নিরিখে তা বিচার করলে চলবে না। সমাজের গতিহীন, স্থবিরতার নিরিখে এই আলোচনা নিরর্থক। পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে যাওয়া কোনও জাতপাতবাদী দাবি হতে পারে না। পুঁজিবাদ একটা ব্যবস্থা, সেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আবার অতিক্রম করে যেতে হবে, এবং যদি পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে যাওয়া যায় তাহলে তার জায়গায় বিকল্প যা প্রতিষ্ঠা করতে হবে — এসব বিষয়ে জ্ঞান ও ধারণা, এগুলো এমন সব ইস্যু যা জাতপাত নামক বর্গের ভিত্তিতে করা যে কোনও বিশ্লেষণের সীমার বাইরে। তবে এটা নিশ্চিত যে, যে কেউ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও তার বিকল্প সংক্রান্ত ইস্যুগুলিতে পৌঁছে যেতে পারবেন যদি তিনি সততার সঙ্গে ও ধারাবাহিক ভাবে জাতপাত ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার লক্ষ্যটিতে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে লেগে থাকেন। একাজ করতে হলে তাকে জাতপাতের পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে যেতে হবে। অন্যভাবে বললে, যদি কেউ একান্তভাবে জাতপাত ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যেই নিজেকে সীমাব্ধ রেখে দেন, তাহলে তিনি কখনই জাতপাত ভিত্তিক নিপীড়নের অবসান ঘটাতে সফল হবেন না।
মার্কসবাদের বিরুদ্ধে শ্রেণির পরিপ্রেক্ষিতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। মার্কসবাদের দিক থেকে এমন ধারণার উৎসে রয়েছে পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে যাওয়া সংক্রান্ত উপলব্ধি। শুধু শ্রেণি শোষণের অবসান ঘটানোর জন্যই পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে যাওয়াটা প্রয়োজনীয় নয়, জাতাপাত ভিত্তিক এবং অন্যান্য সব ধরনের নিপীড়নের অবসানের জন্যই এটা দরকার। এমনকী পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে গেলেই জাতপাতভিত্তিক নিপীড়নের অবসান ঘটবে না। বরং পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে যাওয়ার কাজটি যে বিষয়ের ওপর জোর দেয় তা হল, শ্রেণি শোষণকে নিছক জাতপাত–ভিত্তিক নিপীড়নের স্তরে নামিয়ে আনা চলবে না। বরং শ্রেণি শোষণের একমেবাদ্বিতীয়ম বৈশিষ্ট্যকেই স্বীকৃতি দিতে হবে। আমাদের সমাজে জাতপাতভিত্তিক নিপীড়ন এত দৃঢ়ভাবে প্রোথিত, এর শিকড় এত গভীরে যে বিলীন হওয়া দূরের কথা, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে, অর্থাৎ পুঁজিবাদের উচ্ছেদের আগে, এই নিপীড়ন আরও পল্লবিত হয়ে ওঠে। এমনকী পুঁজিবাদের উচ্ছেদের পরেও একটা দীর্ঘস্থায়ী লড়াই ছাড়া জাতপাত ভিত্তিক নিপীড়ণের সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো যাবে না। সংক্ষেপে বললে, জাতপাতভিত্তিক নিপীড়ন হল আমাদের সমাজের গভীরে শিকড় ছড়ানো এমন একটা দ্বন্দ্ব যাকে অতিক্রম করা সহজ নয়।
তবে শ্রেণি শোষণকে প্রাধান্য দেওয়া এক জিনিস আর এর স্থায়িত্ব কিংবা গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া একেবারে আলাদা জিনিস। মার্কসবাদ শ্রেণি সংগ্রাম ও শ্রেণিদ্বন্দ্বকে যে প্রাধান্য দেয়, সেটার মানে হল আরেকভাবে একথা বলা যে, জাতপাতগত নিপীড়ন সহ সব ধরণের নিপীড়নের সমাধানের মূল সূত্র রয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অতিক্রম করার মধ্যেই।
আবার পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে প্রাধান্য দেওয়া মানে এই নয় যে, জাতপাতগত নিপীড়ড়কে অগ্রাহ্য করতে হবে এবং বিষয়টিকে কম গুরুত্বের বা অধীনস্থ বিষয় বলে ধরে নিতে হবে। বরং, যে কোনও জাতপাতগত লড়াইকে অগ্রাহ্য করা মানেই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকেই খাটো করা। বিষয়টা মোটেই এমন নয় যে, শ্রেণি সংগ্রামের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার অনিবার্য ফল হিসাবেই জাতপাতভিত্তিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কম গুরুত্ব পাবে। বরং জাতপাতভিত্তিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কম গুরুত্ব দিলে আদতে শ্রেণি সংগ্রামকেই দুর্বল করা হয়। মার্কসবাদে ‘শ্রেণি’ নামক বর্গকে প্রাধান্য দেওয়ার মানে হল, সব ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম , এমনকী জাতপাতবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামও যেন পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করার প্রয়োজনীয়তাকে এড়িয়ে না যায়, বরং এই ধরনের সব সংগ্রামই করতে হবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করার লড়াইয়ের প্রাঙ্গনে।
৩ এপ্রিল ২০১৬, পিপলস ডেমোক্রেসি
সূত্র: মার্কসবাদী পথ


মন্তব্য নেই
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.