শ্রেণি এবং শ্রেণি সংগ্রাম গায়েব করার অপচেষ্টা

শ্রেণি এবং শ্রেণি সংগ্রাম গায়েব করার অপচেষ্টা

সাম্প্রতিককালে মেহনতি-শ্রমজীবী মানুষের কাজের ধরন, শ্রম ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের লড়াই-সংগ্রামের চিত্র বেশ বদলে গেছে। মূলত বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রগতি, তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লব এবং উৎপাদন ব্যবস্থার বিশ্বায়িত হবার দরুন এটি ঘটেছে। এ থেকে তাই এখন অনেকে সিদ্ধান্ত টানছেন যে- শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রাম এখন অস্তিত্বশীল নয়; আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে- আমাদের নয়া তত্ত্বের দরকার। অর্থাৎ মার্কসবাদ দিয়ে আর আজ গোটা বিশ্বকে ব্যাখ্যা এবং তাকে বদলানো সম্ভব নয়। ফলে বিপুল সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও শ্রমিক শ্রেণিকে অদৃশ্য করে ফেলা হচ্ছে। আসলেই বাস্তবতা কি তাই? 

কার্ল মার্কস যখন ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ আহ্বান জানান, তখন শ্রমিক শ্রেণি বিশ্বজুড়ে একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠী। সংখ্যায় যা মাত্র দুই কোটির মতো। স্বাধীন কারিগর, কৃষক ও শ্রমিকের সাগরে একটি দ্বীপ মাত্র। আর বর্তমানে বেঁচে থাকার জন্য নিজের শ্রমশক্তি বিক্রি করতে বাধ্য এমন মানুষরা এখন দুনিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। সংখ্যার হিসেবে দুইশ’ কোটির মতো। কিন্তু মজুরি শ্রমিক হওয়াটা এখন যখন বৈশ্বিক বাস্তবতা; তখন আবার ‘শ্রমিক শ্রেণি’ কে অদৃশ্য করা হচ্ছে। মধ্যবিত্তের কাতারে উন্নীত হয়েছে শ্রমিকরা—এমন বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণি এখন আর সমাজ বদলের পরিচালকের আসনে আসীন হতে পারছে না। এ অবস্থা দেখে অনেকে লাফ দিয়ে সিদ্ধান্ত টানছেন যে, শ্রমিক শ্রেণির এই অদৃশ্যমানতা তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের অভাব থেকে উদ্ভূত। শ্রমিক শ্রেণি আর সচেতন রাজনৈতিক শক্তি রূপে সক্রিয় হতে পারছে না। অনেক তাত্ত্বিকরা ঘোষণা করেছেন—‘শ্রমিক শ্রেণির মৃত্যু ঘটেছে’, তাই ‘হে শ্রমিক শ্রেণি বিদায়’! 

অন্য অনেকে আবার মনে করেন—একটি সামাজিক শক্তি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হবার ক্ষেত্রে শ্রমিকরা অনেক বেশি খণ্ড-বিখণ্ড, যা তাদের অদৃশ্যমানতায় ঠেলে দিয়েছে। কারণ তারা এখন দ্রুত বিকাশমান অনানুষ্ঠানিক খাতে নিযুক্ত, অতি শিক্ষিত অথচ কর্মহীন, নাজুক চরিত্রের ছোট চাকুরিজীবী, অ-শিল্প কর্মক্ষেত্রে কর্মী এবং যারা শহর ও গ্রামে ঘন ঘন কাজের খোঁজে ছোটে। তারা জোড়াতালি মার্কা কাজে নিযুক্ত থাকায় বিচ্ছিন্ন দশায় থাকে। এদেরকে ফ্যাশন করে বলা হয়—প্রিক্যারিয়েট (Precariat) অর্থাৎ যারা নিয়মিত কর্মসংস্থানের অভাবে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অসহায় ও দুর্দশাগ্রস্ত। এ চিত্র অনেকখানি বাস্তব হলেও তা থেকে যে সিদ্ধান্ত টানা হয় তা সঠিক নয়। 

কেননা বৈশ্বিক শিল্প-কলকারখানা ও সরবরাহ ব্যবস্থার অতি দ্রুত বৃদ্ধিকে এখানে বিবেচনা করা হয় না। একদিকে যখন সংকোচন ঘটছে, অন্যদিকে তখন শিল্পায়নের কেন্দ্রীভবন হচ্ছে। বড় বড় কর্মক্ষেত্রে পুনর্গঠন চলছে। ফলে অনেক খাতে শ্রমের শিল্পায়ন দেখা দিচ্ছে। যেমন- ব্যাংক শাখার স্থলে আসছে এটিএম (ATM) বা কল সেন্টার, বইয়ের দোকানের বদলে আমাজন ওয়ারহাউজ, ছোট ক্লিনিকের জায়গায় বড় বড় হাসপাতাল, অসংখ্য কারখানার জায়গা দখল করছে ফক্সকন (Foxconn)-এর মতো বিরাট শিল্প কমপ্লেক্স। 

আবার অনেকে মনে করেন বিশ্বে এখন উদ্বৃত্ত শ্রমজীবীর প্রাধান্য, যারা কোনো মূল্য (Value) তৈরি করে না। কিন্তু এটাও ভুল। কারণ আমরা যখন বস্তির অর্থনীতির দিকে তাকাই, তখন দেখি যুক্তরাষ্ট্রের কাঠবাদামের প্রায় অর্ধেক প্রক্রিয়াজাতকরণ হয় উত্তর ভারতের বস্তিতে কিংবা এখানে তৈরি গাড়ির যন্ত্রাংশ পৌঁছে যায় মেক্সিকোতে। এভাবে উন্নত-ধনী উত্তর বি-শিল্পায়িত হচ্ছে অনেকখানি, আর বিপরীতে দক্ষিণের দেশগুলি বিশ্বের নয়া কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠছে। 

তাই উত্তর-দক্ষিণ শ্রমিক বিভাজন, প্রিক্যারিয়েটদের বা বেকায়দায় থাকা শ্রমিকদের রাস্তার লড়াই এবং শিল্প ক্ষেত্রের সংগঠিত শ্রমিকের লড়াইয়ের বিভাজন রাজনৈতিক সচেতনতার ঘাটতিজনিত নয়, বরং তা বস্তুগত বিভক্তিকে নির্দেশ করে। 

পুঁজির বৈশ্বিক সচলতার নাটকীয় বিকাশ ঘটেছে, কিন্তু শ্রমের বিশ্বায়ন ঘটেনি। বরং শ্রম আটকা পড়ে আছে দেশের সীমানায়। ফলে পুঁজির অন্যত্র চলে যাবার জন্য কর্মচ্যুতির ঝুঁকি শ্রমিক আন্দোলনকে নাজুক অবস্থায় ফেলছে। 

অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী—ক্ষুদ্র ব্যবসা, মেরামত, অযান্ত্রিক পরিবহন, নির্মাণকর্মী, স্বনিয়োজিত শ্রমিক, গৃহকর্মী- অর্থাৎ শিল্প কলকারখানার বাইরে পুঞ্জীভূত হওয়া এসব মেহনতি মানুষ এখন শ্রমিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যদিও এদের অনেকেই সরাসরি মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের অন্তর্ভুক্ত নয়। 

তাই সাম্প্রতিককালে বিশ্ব পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলেও ‘শ্রেণি’ ধারণাটিকে পরিত্যাগ করা আত্মঘাতী হবে। নানা তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হলেও আমরা এখনও মানুষের নানা গ্রুপ দেখি যারা তাদের সমাজের দ্রব্য সামগ্রী ও পরিষেবা উৎপাদনে জড়িত। যেমন- শিক্ষক, বাস চালক, ডাক বিভাগের কর্মী, হাসপাতালের শ্রমজীবী, পানশালার কর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নির্মাণ কর্মী, সুপার মার্কেটের ক্যাশিয়ার, ওয়ার হাউজ কর্মী—এরকম আরো। এসব মেহনতিদের কাজ-কর্ম খুবই রুটিনমাফিক ও কঠোর অবস্থায় সম্পাদিত হয়, কিন্তু উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার ক্ষমতা তাদের নেই। তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কাউকেই নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি (প্রত্যক্ষভাবে) করে না। বরং তারাই অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। এরাই একবিংশ শতাব্দীর শ্রমিক শ্রেণি। এদের মধ্যে রয়েছে- অভিজাত শ্রমিক বা ব্লু কালার ওয়ার্কার, অদক্ষ শ্রমিক, অতি দরিদ্র শ্রমিক, নারী বা দলিত গোষ্ঠীর শ্রমজীবী। 

সেজন্য এখনকার পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় গোটা সমাজই একটি কারখানা, তাই শোষণ ও মুনাফা সৃষ্টির পরিসর কারখানার চার দেওয়ালে আবদ্ধ নয়। ফলে শ্রেণির নির্মাণ ও সংঘাতের ক্ষেত্রও বহু বিস্তৃত হয়েছে। 

সমাজ বদলের লড়াইয়ে কারখানার শ্রমিকদের ভূমিকা হয়তো কমে আসছে। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের মেহনতি মানুষের লড়াই সামনে উঠে আসছে। স্মরণ রাখা দরকার কারখানার শ্রমিকরাই কেবল আজকের প্রেক্ষাপটে শ্রমিক শ্রেণির একমাত্র রূপ নয়, আরো বিস্তৃত হচ্ছে পরিসর। যেমন: ডিজিটাল লেবার বা তথ্যপ্রযুক্তি-অনলাইন নির্ভর শ্রমিক (Digital Worker, Crowd Worker), অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীরা, জ্ঞান শ্রমিক। 

বর্তমানে উৎপাদনের চেহারা বদল ঘটেছে। এর অনেকখানি হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে। ফলে পুঁজিবাদী সংগঠন বদলে গেছে। উৎপাদন খণ্ড-বিখণ্ড হচ্ছে। আউটসোর্সিং, সাব-কন্ট্রাকটিং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বহুজাতিক কোম্পানির ভ্যালু চেইনের শেষ প্রান্তে কেউ বাড়িতে বসে কাজ করছে। অন্যদিকে পরিষেবার ক্ষেত্রগুলি—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যানবাহন, নিরাপত্তা—এসব ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত। এসব এখন ব্যক্তি বা বেসরকারি মালিকানাধীন। তাই এসব ক্ষেত্রে নিযুক্ত শ্রমিকদের বড় অংশই আজ মুনাফা উৎপাদনকারী অনুৎপাদনশীল শ্রম। ফলে এই ক্ষেত্রগুলি ক্রমশ শ্রেণি সংগ্রামের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। একবিংশ শতাব্দিতে নতুন কায়দায় নানা ধরনের—শ্রমজীবী মেহনতি ঐক্যবদ্ধ হবে, তাদের সংগঠন গড়ে তুলবে এবং পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এই আলামত ইতোমধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তে দেখা যাচ্ছে। 

তবে এক্ষেত্রে স্মরণ রাখা দরকার যে, শ্রেণির অস্তিত্ব চিহ্নিতকরণ মার্কসের কৃতিত্ব নয় তার আগেই সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদরা তা আবিষ্কার করেছেন। মার্কসের অবদান ছিল এটা প্রমাণ করা যে, সমাজ বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরে শ্রেণির উদ্ভব এবং শ্রেণি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রেণির বিলুপ্তি ঘটবে সাম্যবাদে উত্তরণের মাধ্যমে। সেই সঙ্গে আধুনিক শ্রেণি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মার্কসের বড় অবদান হলো এটা দেখানো যে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মালিক পুঁজিপতি তাদের মুনাফার প্রাথমিক উৎস হিসেবে লাগাতারভাবে মজুরি বিনিময়ে নিযুক্ত শ্রমিকদের কাছ থেকে বিনা মজুরির শ্রমের ফসল আত্মসাৎ করে। কিন্তু পরে এটাকে আড়াল করা হয়। 

কেউ কত বেশি টাকা তৈরি করলো সেটাই শ্রেণি চিহ্নিতকরণের মানদণ্ড নয় কিংবা কেবল সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বা শিক্ষা স্তর দিয়ে শ্রেণি নির্ধারণ হয় না। যে মজুরির বিনিময়ে বেঁচে থাকার জন্য তার শ্রম সর্বত্র বিক্রি করে এবং যে তার জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ নিজে তৈরি করতে পারে না—তারাই শ্রমিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। 

পুঁজিবাদের অধীনে শ্রেণি হলো শ্রমিক তাদের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য এবং পুঁজিপতি তা কিনে উৎপাদনে ব্যবহার করে। তবে গোটা উৎপাদন পদ্ধতিকে একটি পদ্ধতি রূপে না বুঝলে—যেখানে শ্রমিকরা অন্য কারো মুনাফা তৈরির জন্য কাজ করে যায়, আমরা শ্রমিক শ্রেণি কিংবা পুঁজিপতি শ্রেণিকে চিহ্নিত করতে পারবো না। কেননা শ্রেণি হলো শোষণের সম্পর্ক।

মন্তব্য নেই

  • Philip W

    প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্য

    Phasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.

  • Philip W

    প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্য

    Phasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.

মন্তব্য লিখুন