মার্কসবাদ ও লিবারেশন থিওলজি
লিবারেশন থিওলজির জন্মস্থান লাতিন আমেরিকা—লিবারেশন থিওলজি বা মুক্তির ধর্মতত্ত্ব ক্যাথলিক চার্চের অবদান। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই মতবাদের প্রবক্তারা সামাজিক, অসাম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। লাতিন আমেরিকা ছাড়াও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনস প্রভৃতি দেশে চার্চ সামাজিক অন্যায় ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেছে। লিবারেশন থিওলজির প্রবক্তারা এবং কমিউনিস্টরা অনেক দেশেই হাতে হাত মিলিয়ে সমাজ পরিবর্তনের লড়াইতে সামিল হয়েছেন। বলা যেতে পারে লিবারেশন থিওলজি কমিউনিস্টদের বাধ্য করেছে ধর্ম সম্পর্কে উন্নাসিক, অবজ্ঞার দৃষ্টিভঙ্গী ত্যাগ করতে।
সাধারণভাবে মার্কসবাদীরা ধর্ম সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ ও প্রচার করে থাকেন মার্কসের নিজের ধর্ম সম্পর্কে চিন্তাধারা তার চেয়ে অনেক সূক্ষ্ম, জটিল ও দ্বান্দ্বিক। কমিউনিস্টরা মার্কসের রচনা থেকে একটি খণ্ডিত উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন, “ধর্ম জনসাধারণের আফিম।” অর্থাৎ নিম্নবর্গের মানুষ যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে তাই সুবিধাভোগী, প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী তাদের ধর্মের নেশায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ধর্মের ঠুলি চোখ থেকে সরাতে না পারলে নিপীড়িত জনসাধারণের শোষণ থেকে মুক্তির কোন সম্ভাবনা নেই। স্বার্থান্বেষী মহলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলি ধর্ম সম্পর্কে এই ধারণাকেই আরো বিকৃত করে প্রচার করে যে মার্কসবাদ ধর্মের অবসান চায় এবং সেকারণেই মার্কসবাদ ধর্মের শত্রু। ধর্মের সাথে মার্কসবাদের এই বৈরিতামূলক সম্পর্কটিই সাধারণ মানুষের মনে প্রোথিত হয়ে গেছে।
মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে মার্কস সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। ধর্ম সম্পর্কে মার্কসের সম্পূর্ণ বক্তব্যটি এই:
রমের যন্ত্রণা একই সাথে প্রকৃত যন্ত্রণার অভিব্যক্তি এবং সেই প্রকৃত যন্ত্রণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ধর্ম হল নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস; যে জগৎ দয়াহীন, ধর্ম হল তার দাক্ষিণ্য; যে পরিস্থিতিতে আধ্যাত্মিকতা নেই, ধর্ম হল তার আত্মা। ধর্ম জনসাধারণের আফিম—
“ধর্ম জনসাধারণের কাল্পনিক, সুখ—তাই ধর্মের ‘অবসান ঘটানোর অর্থ মানুষের প্রকৃত সুখ দাবি করা। যে পরিস্থিতিতে মানুষের প্রয়োজন হয় মনে মনে সুখের কল্পরাজ্য গড়ে তোলা, সেই পরিস্থিতিতে কল্পনাকে বিসর্জন দেবার দাবি করা হল আসলে সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটানোর দাবি। যে দুঃখ উপত্যকায় ধর্মের দিব্য জ্যোতির আশ্বাসে মানুষের পরিক্রমা, ধর্মের সমালোচনা হল সেই দুঃখ উপত্যকারই সমালোচনা। যে কল্পনাসৃষ্ট কুসুমাবলী মানুষের বন্ধনশৃঙ্খলকেই অলঙ্কৃত করে রাখে এই সমালোচনা তাদের ছিন্নভিন্ন করে। এই সৃষ্টি প্রয়াসের উদ্দেশ্য এই নয় যে মানুষ তার ঐ শিকল পরে থাকুক অথচ মোহাবেশের আরামটুকু থেকেও বঞ্চিত হোক। উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ যেন তার এই বাঁধন ছিড়ে ফেলতে পারে আর আহরণ করে এমন ফুল যা জীবন্ত। ধর্মের সমালোচনা আনে মোহমুক্তি; আর সেই মোহমুক্তির ফলে পূর্ণ সম্বোধি পেয়ে মানুষ চিত্তা কর্ম এবং আত্মসত্ত গঠনে ব্যাপৃত হতে পারে। মানুষ তখন নিজেই নিজের সূর্য, স্বকীয় অক্ষপটে তার গতিবিধি। ধর্ম হল সেই কপট সূর্য যা পূর্ণ আত্মচেতনা থেকে বঞ্চিত মানুষের চারপাশে পরিক্রমণ করে।
লক্ষণীয় যে মার্কস দুর্গত, নিপীড়িত মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে গভীর মমতা ও সহানুভূতির দৃষ্টিতে বিচার করেছিলেন এবং কখনই এই বিশ্বাসকে অন্ধ, কুসংস্কার হিসাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেননি। অবশ্যই মার্কস বলেছেন যে ধর্মের মোহজাল ছিন্ন করলেই মানুষ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সঠিক চেতনা অর্জন করতে পারে। কিন্তু গভীর প্রজ্ঞার সাথে তিনি লক্ষ্য করেছেন যে ধর্মের অবসান আসলে সেই অমানুষিক পরিস্থিতিরই অবসান দাবি করে যাতে মানুষ ধর্মের মধ্যে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়। যে শ্রেণীবিভক্ত, শোষণভিত্তিক সমাজে সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকে সেখানে নিজেকে বহিরাগত হিসাবে গণ্য করা ছাড়া তার উপায় থাকে না। সামাজিক শক্তিগুলির উপর প্রায়শই তার কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বরং সে নিজেই সেই শক্তিগুলির হাতে ক্রীড়নক হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে ধর্মের কল্পনাবিলাসের মধ্যে মানুষ সুখের সন্ধান করে।
এঙ্গেলসের ভাষায়, “যে বাইরের শক্তিগুলি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের উপর প্রভুত্ব করে, মানুষের মনে সেই শক্তিগুলির উদ্ভট প্রতিফলন ছাড়া ধর্ম আর কিছুই নয় এবং এই প্রতিফলনে পার্থিব শক্তিগুলি অতি প্রাকৃতিক শক্তির রূপ নেয়।” আদিম মানুষ ছিল প্রাকৃতিক শক্তির কাছে সম্পূর্ণ অসহায়। প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে ব্যাখ্যা করা বা প্রাকৃতিক শক্তিকে নিজের কাজে লাগানো ছিল তার সাধ্যের বাইরে। মানবেতিহাসের সেই ঊষালগ্নে প্রাকৃতিক শক্তিগুলিতে দেবত্ব আরোপের মাধ্যমেই ধর্মের সূচনা হয়েছিল। কালক্রমে উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নতি হল, শ্রম বিভাজন ঘটল, পণ্য উৎপাদন প্রথা প্রবর্তিত হল। সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হল বটে, কিন্তু একই সাথে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক পণ্যের মধ্যেকার সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। আদিম মানব সমাজ ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। এক একটি গোষ্ঠীর মানুষেরা জীবজন্তু শিকার ও ফলমূল আহরণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সবাই মিলে ভাগ করে জীবন ধারণ করত। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক ছিল স্পষ্ট, সোজাসুজি এবং তার মধ্যে কোন অনিশ্চয়তা ছিল না। শ্রম বিভাজন এবং পণ্য বিনিময় মানুষের সামাজিক সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন ঘটাল। পণ্যের মধ্যেকার সম্পর্কই মানুষের সামাজিক সম্পর্কের নির্ধারক হয়ে উঠল। নিজের উৎপাদনের উপর মানুষ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তারই অধীনস্থ হয়ে পড়ল। পণ্য বিনিময় প্রথা ক্রমাগত বিকাশের ফলে বাজার এবং মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন হল। একজন ব্যক্তি মানুষের উৎপাদিত দ্রব্যের চাহিদা বাজারে আছে কিনা সেটা আগে থেকে জানা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই বাজার নিয়ে এল মানুষের জীবনে ঘোর অনিশ্চয়তা, আর টাকা হয়ে দাঁড়াল মানুষের সামাজিক সম্পর্কের একমাত্র মাপকাঠি। সুতরাং বলা যেতে পারে উৎপাদনের প্রগতির সাথে সাথে মানুষের সমাজজীবনে নেমে এল নৈরাজ্য এবং মানুষের সৃষ্ট সামাজিক উৎপাদিকা শক্তিগুলিই যেন বাইরের শক্তি হিসাবে প্রতিভাত হয়ে প্রভুত্ব কায়েম করল মানুষের সামাজিক সম্পর্কের উপর। এইভাবে প্রাকৃতিক শক্তির সাথে সামাজিক শক্তি যুক্ত হয়ে মানুষের মনে ধর্মের ভিত্তি আরো মজবুত হল।
উৎপাদনের বিস্ময়কর সম্প্রসারণ ঘটল পুঁজিবাদে—পুঁজিবাদের জয়যাত্রার পথকে প্রশস্ত করেছে আধুনিক বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের দুটি দিক। একটি হল বিশুদ্ধ বিজ্ঞান এবং অপরটি হল বিজ্ঞানের প্রায়োগিক রূপ বা প্রযুক্তি। প্রকৃতিকে ঘিরে জিজ্ঞাসু, সচেতন মানুষের চিরন্তন কৌতূহল। বিশুদ্ধ বিজ্ঞান প্রকৃতির অপার রহস্যকে একের পর এক অনুসন্ধিৎসু মানুষের কাছে উদ্ঘাটিত করে চলেছে। এরই পাশাপাশি ফলিত বিজ্ঞান অর্থাৎ প্রযুক্তি প্রকৃতির শক্তিকে বশীভূত করে মানুষের কাজে লাগিয়ে বস্তুগত উৎপাদনের ক্ষেত্রে অভাবনীয় উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। উন্নত দেশগুলির ব্যাপক মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে প্রাকৃতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই শিথিল হয়ে গেলেও অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের ব্যাপক কৃষিজীবী দরিদ্র জনসাধারণের জীবনে তা বহুল পরিমাণে অটুট রয়ে গেছে।
প্রকৃতি অনন্ত আর মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। বিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার আরো নতুন নতুন আবিষ্কারের প্রেরণা জোগায়। একটি প্রশ্নের সমাধান বিজ্ঞানের সামনে নতুন প্রশ্ন হাজির করে। প্রকৃতির রহস্যকে অনুধাবন করার জন্য মানুষের ছুটে চলা বিরামহীন। প্রাত্যহিক জীবনে প্রাকৃতিক শক্তির আধিপত্য খর্ব হলেও প্রকৃতির রহস্য পুরোপুরি গোচরে আসা কোনদিনই মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তার কারণ যুগের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তি মানুষের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা—এ যুগে যে প্রশ্ন সমাধানের অতীত থেকে যায়, হয়তো পরবর্তী যুগের মানুষ তা সমাধান করে। কিন্তু জ্ঞানের এই অপূর্ণতা মানুষকে স্বস্তি দেয় না। প্রাকৃতিক নিয়মেই নতুন নতুন দ্বন্দ্ব মানুষের সামনে আবির্ভূত হয়। দ্বন্দ্বের সমাধানে মানুষ উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। কিন্তু মানুষের মনের গঠনই এমন যে পূর্ণাঙ্গ, নিটোল জ্ঞান ছাড়া মানুষ যেন তৃপ্তি পায় না। উদ্দীপনারই অপর পিঠ হল অতৃপ্তি। তাই জ্ঞানের অসম্পূর্ণতা মানুষ কল্পনা দিয়ে ভরিয়ে নিতে চায়—তাই কোনো ছিদ্র পথে অতি প্রাকৃতিক শক্তি, ঈশ্বরের চিন্তা মানুষের মনে ঢুকে পড়ে। অসীম, অচেতন প্রকৃতির সাথে সচেতন মানুষের যে আন্তঃসম্পর্ক তারই মধ্যে রয়ে গেছে মানুষের ধর্ম বিশ্বাসের বীজ।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষের জীবনে প্রাকৃতিক শক্তির চেয়েও যা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ তা হল আর্থ-সামাজিক শক্তি—এঙ্গেলসের ভাষায়,
...বর্তমানের বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের নিজের সৃষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং উৎপাদনের উপকরণ সমূহ বাইরের শক্তি হিসাবে মানুষের উপর প্রভুত্ব করে।...যদিও বুর্জোয়া রাজনৈতিক অর্থনীতি এই বাইরের প্রভুত্বের কার্যকারণ সম্পর্ককে কিছুটা স্বচ্ছ করেছে, তাতে অবস্থার কোন তারতম্য ঘটেনি—বুর্জোয়া অর্থনীতি সঙ্কটকে যেমন রোধ করতে অক্ষম, তেমনই একজন ব্যক্তি পুঁজিপতিকে লোকসান, পাওনা টাকা ফেরত না পাওয়া বা দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে না বা একজন ব্যক্তি শ্রমিককে. কর্মহীনতা ও দারিদ্র থেকেও রক্ষা করতে পারে না। এটা এখনও সত্যি যে মানুষ প্রস্তাব করে এবং ঈশ্বর (অর্থাৎ বাইরের শক্তি হিসাবে পুজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার কর্তৃত্ব কায়েম ) মীমাংসা করেন। সামাজিক শক্তিগুলিকে সমাজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শুধুমাত্র জ্ঞানই, যদি তা বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রের সর্বাগ্রে চেয়ে সুদূরপ্রসারী ও গভীর হয় তাহলেও যথেষ্ট নয়—যা প্রয়োজন তা হল একটি সামাজিক কাজ (social act)। যখন এই কাজটি সম্পন্ন হবে, যখন উৎপাদনের সমস্ত উপকরণকে অধিগ্রহণ করে ও সেগুলিকে পরিকল্পনা মাফিক ব্যবহার করে সমাজ নিজেকে ও তার সমস্ত সদস্যকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেবে (যে উৎপাদনের উপকরণ সমূহ মানুষ নিজেই সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু যেগুলি একটি প্রবল বাইরের শক্তি হিসাবে এখন তার সামনে হাজির হয়, মানুষ তারই দাস হয়ে পড়েছে); যখন মানুষ শুধুমাত্র প্রস্তাবই করবে না, মীমাংসাও করবে—শুধুমাত্র তখনই শেষ বহিরাগত শক্তি, ধর্মের মধ্যে যার এখনও প্রতিফলন ঘটে, অন্তর্হিত হবে এবং তার সাথে ধর্মীয় প্রতিফলন নিজেই অন্তর্হিত হয়ে যাবে যেহেতু প্রতিফলিত হবার মত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
এঙ্গেলসের দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেবার প্রয়োজন হল এই কারণে যে মার্কসবাদী মহলে অনেকেরই ধারণা আধুনিক যুগেও যাদের ধর্মে বিশ্বাস আছে তারা অন্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং সেজন্য ঘৃণা, অবজ্ঞা বা উপহাসের পাত্র। আধুনিক বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের ধর্মকে আঁকড়ে ধরে থাকার যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান। সামাজিক শক্তির টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত, দিশাহারা মানুষ ভাবতেই পারে যে অন্তরীক্ষ থেকে এক অনির্দেশ্য শক্তি তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং যুক্তি বা বিজ্ঞান সেখানে অচল হয়ে পড়ে। এঙ্গেলস যাকে সামাজিক কাজ বলেছেন, সেই কাজটি অর্থাৎ বিপ্লব যে সব দেশে সম্পন্ন হয়েছে ভবিষ্যৎ প্রমাণ করেছে সে সব দেশের মানুষও ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়নি। উৎপাদনের উপকরণ সমূহকে বাজেয়াপ্ত করে ব্যক্তি পুঁজির অবসান ঘটালে বা বাজারী অর্থনীতির জায়গায় কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি প্রবর্তন করলেই যে উৎপাদনের উপর উৎপাদকদের সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না, বিপ্লবোত্তর দেশগুলির পরবর্তী ইতিহাস তা প্রমাণ করেছে—স্বৈরতন্ত্রের লীলাভূমি হচ্ছে লাতিন আমেরিকা। কোথাও উর্দিপরা জেনারেলরা সরাসরি শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। সামরিক শাসন যে সব দেশে নেই, সেখানেও গণতান্ত্রিক আবহাওয়া অনুপস্থিত। অতীতে কিউবা এবং কয়েক বছর আগে নিকারাগুয়াতে অবশ্য স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করে জনদরদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতি সম্প্রতি আবার নিকারাগুয়াতে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। লাতিন আমেরিকার অর্থনীতি রাজনৈতিক অবস্থার মতই সঙ্গীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোটা লাতিন আমেরিকাকেই সাম্রাজ্যবাদী শোষণের মৃগয়াক্ষেৎ হিসাবে মনে করে। ঔপনিবেশিক শিল্পনীতির ফলে শিল্পে স্বয়ম্ভরতা তো অর্জিত হয়নি, বরং আষ্টেপৃষ্ঠে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ। বড় বড় শহর গজিয়ে উঠেছে। সেখানে চোখ ধাধানো পাঁচ তারা হোটেল, ক্যাসিনো, নাইট ক্লাবে চূড়ান্ত ভোগ বিলাসের আয়োজন। আর তার পাশেই বিস্তীর্ণ বস্তি এলাকায় মানুষ পশুর অধম জীবনযাপন করছে। হতশ্রী গ্রামাঞ্চলের সমস্ত সম্পদ শহরে চলে আসছে মুষ্টিমেয় ধনী লোকদের সেবায়। দক্ষিণ গোলার্ধের চিরস্থায়ী অনুন্নয়ন যে উত্তর গোলার্ধের উন্নয়নের শর্ত, লাতিন আমেরিকা তার উজ্জ্বল (অনুজ্জ্বল?) দৃষ্টান্ত। ইদানীং কলম্বিয়া, পানামা ইত্যাদি দেশে ড্রাগ একটি ভয়াবহ সমস্যা হিসাবে হাজির হয়েছে। কোটি কোটি টাকার কোকেন ব্যবসা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক মূল্যবোধকে এক নতুন সঙ্কটের আবর্তে নিয়ে ফেলেছে।
যে লিবারেশন থিওলজি লাতিন আমেরিকার অনেক মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে তার ইতিহাস কিন্তু বেশিদিনের নয়। লাতিন আমেরিকার শ্বাসরোধকারী স্বৈরতান্ত্রিক পরিবেশে চার্চেই অপেক্ষা—কত কিছুটা মুক্তির আস্বাদ পাওয়া সম্ভব। সম্ভবত সেজন্যই লিবারেশন থিওলজি লাতিন আমেরিকায় একটি শক্তিশালী মতাদর্শ হিসাবে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হবার সুযোগ পেয়েছে। তাছাড়া ষাটের দশকের মধ্যভাগ থেকে কমিউনিস্ট ঐক্যে ভাঙন কমিউনিস্ট পার্টির ভাবমূর্তিকে কিছুটা ম্লান করেছে—লিবারেশন থিওলজির আবেদনের পেছনে সেটিও একটি জোরালো কারণ।
উপনিবেশ গড়ার সাথে সাথে স্পেন এবং পর্তুগাল লাতিন আমেরিকায় নিজেদের ভাষা ও ধর্মকেও নিয়ে এসেছিল। ঔপনিবেশিক যুগে এভাবেই লাতিন আমেরিকায় ক্যাথলিক চার্চের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ...ক্যাথলিক চার্চকে আধুনিক যুগের উপযোগী করে তোলার জন্য ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় ভ্যাটিক্যান কাউন্সিল বসে। কাউন্সিলের মূল আলোচনার বিষয় ছিল ‘চার্চ এবং জগৎ’। চার্চের ক্রিয়াকলাপকে বর্তমান যুগের মানুষের জীবন ধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলা এবং গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, শিল্পনির্ভর শহুরে সমাজ ইত্যাদিকে চার্চ কর্তৃক স্বীকৃতি দানই ছিল। এই কাউন্সিলের উদ্দেশ্য।
ইউরোপে ক্যাথলিক চার্চের মধ্যে এই কাউন্সিল যেভাবে উৎসাহ, উদ্দীপনা সঞ্চার করেছিল, লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রে তা করতে ব্যর্থ হয়। তথাকথিত ‘প্রগতি’ এবং শিল্পায়নের নামে আধুনিক যুগ লাতিন আমেরিকার ব্যাপক মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে নির্মম শোষণ ও বঞ্চনা। লাতিন আমেরিকার ক্যাথলিকদের অনেকেই তাই আধুনিক যুগের প্রগতি সম্পর্কে কাউন্সিলের মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্তের সাথে একমত হতে পারেননি। কলম্বিয়ার ক্যাথলিক পুরোহিত এবং সমাজতত্ত্ববিদ ক্যামিলো টরেসের মৃত্যুও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল লাতিন আমেরিকার ক্যাথলিক চার্চকে। ক্যামিলো টরেস ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে ক্ষমতা দখল ছাড়া কলম্বিয়ার জনগণের কল্যাণ সম্ভব নয়। লিবারেল এবং কনজারভেটিভ পার্টির গণতন্ত্র সম্পর্কে বাক্চাতুর্যে সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে তিনি ‘যুক্তফ্রন্ট’ গড়ে তোলেন। রাষ্ট্রশক্তির তাড়া খেয়ে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত উগ্রপন্থী বিপ্লবী গেরিলাদের দলে যোগ দেন—১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে তিনি লড়াইয়ে নিহত হন। ক্যামিলো টরেসের মৃত্যু ক্যাথলিক চার্চের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। চার্চের অনেকেই প্রচার করতে শুরু করলেন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চাই। ভ্যাটিকান কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত কিভাবে এবং কতখানি লাতিন আমেরিকায় প্রয়োগ করা যায় সেই উদ্দেশ্যে ১৯৬৮ সালে লাতিন আমেরিকার বিশপেরা কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরে সমবেত হলেন। এই মেডেলিন সম্মেলন থেকে “আমূল, সাহসিকতাপূর্ণ এবং আশু” পরিবর্তনের দাবি হল এবং ঘোষণা করা হল জনগণ “বস্তু নয়, তারা নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস সৃষ্টি করে”। লাতিন আমেরিকার জনগণের দুর্দশার জন্য সমবেত বিশপেরা সরাসরি “আন্তর্জাতিক একচেটিয়া কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদকে” দায়ী করলেন। বিশপেরা “স্থিতাবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক হিংসাকে” তীব্র ধিক্কার জানালেন—১৯৭১ সালে ফের পুয়েবলা শহরে বিশপেরা সমবেত হয়ে মেডেলিন সম্মেলনের প্রতিধ্বনি করে বললেন চার্চের “দায়িত্ব হল কোটি কোটি মানুষের মুক্তি ঘোষণা”। লাতিন আমেরিকার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দুর্গতির জন্য বিশপেরা দায়ী করলেন, “বহুজাতিক সংস্থাগুলোকে যেগুলি প্রায়ই দেশের মঙ্গল বিসর্জন দিয়ে শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখে”। এছাড়াও তাঁরা দায়ী করলেন “কৃষিতে কাঠামোগত সংস্কারের অভাব”কে যার ফলে লক্ষ লক্ষ কৃষক জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মানুষের ধর্মবিশ্বাস এবং চার্চের প্রতি মানুষের আনুগত্যকে ভিত্তি করে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের তত্ত্ব ও কর্মসূচী প্রণয়নই হচ্ছে লিবারেশন থিওলজির মর্মবস্তু। মেডেলিন সম্মেলন সেই দিকে এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ—গুস্তাভো গুতিয়েরেজ, পলো ফ্রায়রে, জোসে মিগুয়েজ-বনিনো প্রমুখ হলেন লিবারেশন থিওলজির তাত্ত্বিক নেতা।—এঁরা মানুষকে শেখালেন যে লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষদের অবর্ণনীয় দুর্গতির জন্য দায়ী ‘সামাজিক পাপ’ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দেশীয় অনুচরদের এঁরা ‘সামাজিক পাপ’ হিসাবে চিহ্নিত করলেন। যে যার মত ব্যক্তিগত জীবনে সৎপথে থাকা বা ধর্মের মূল্যবোধ চর্চা করা এযুগে আর যথেষ্ট নয়। সমাজের ভিতরে বিরোধ আছে এবং সংঘর্ষ ছাড়া এই বিরোধের নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। গুস্তাভো গুতিয়েরেজের মতে “...একটি গভীর পরিবর্তন, এ একটি সামাজিক বিপ্লব ছাড়া লাতিন আমেরিকার জনসাধারণ তাদের বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে না এবং বর্তমানে তারা যে অবস্থায় আছে এই বিপ্লব তার মৌলিক ও গুণগত পরিবর্তন ঘটাবে।” লিবারেশন থিওলজির তত্ত্ব অনুযায়ী পাপ কোন ব্যক্তির একক বিচ্যুতি নয় এবং সমাজ ব্যবস্থাকে পরিবর্তন না করে শুধুমাত্র নিরাবয়ব ধর্মচর্চার মাধ্যমে পাপের ক্ষালন বা ব্যক্তির আধ্যাত্মিক জাগরণ সম্ভব নয়। মানুষের সাথে মানুষের শত্রুতা বা ঘৃণার ভেতর দিয়ে পাপের যে প্রকাশ ঘটে তার মূল ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে নিহিত আছে এবং অর্থনৈতিক শোষণ ব্যবস্থা ও আধিপত্যকামী সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই তার উৎসকে খুঁজতে হবে। রাজনৈতিক মুক্তি এবং প্রত্যাশিত ‘রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠা সমার্থক নয়, তবে প্রথমটি হল দ্বিতীয়টির আবশ্যিক শর্ত বা প্রাথমিক ধাপ। মানুষের পরিপূর্ণ মোক্ষলাভ (salvation) তখনই হবে যখন মানুষের অন্তর থেকে শোষণ বা আধিপত্য করার প্রবণতার মূল উৎপাটিত হবে এবং ঈশ্বরের অনুগ্রহেই তা সম্ভব। তবে বর্তমানের শোষণভিত্তিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে উৎখাত না করে ইতিহাসবহির্ভূতভাবে মোক্ষলাভ বা প্রত্যাশিত রাজত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক মুক্তিই মোক্ষলাভের পথকে প্রশস্ত করবে।
‘লিবারেশন থিওলজি’র তত্ত্ব বিকশিত হবার আগেই লাতিন আমেরিকার ক্যাথলিক চার্চের চিরাচরিত ক্রিয়াকলাপের পাশাপাশি একটি নতুন ধারা প্রবর্তিত হয়েছিল। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে এই নতুন ধারার শুরু এবং এর মূল সুর ‘জনসাধারণের কাছে যাওয়া’। নতুন ধারার অনুবর্তী পুরুষ ষাজক ও সিস্টারেরা শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিবাহ ও নবজাতকের নামকরণ অনু-ষ্ঠান ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জনসাধারণের দৈনন্দিন কাজেকর্মে অংশ নেওয়া ও দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা শুরু করেছিলেন। নতুন ধারার মূলমন্ত্র।
ভেতর দিয়ে দশ থেকে একশ উপদেশ নয়, আলোচনাই (dialogue)—চার্চের এই নতুন ধরনের কাজের পর্যন্ত মূলতঃ গরীব মানুষদের নিয়ে এক একটি দল বা গোষ্ঠী তৈরী হল। এর ‘নাম বুনিয়াদী খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী (বেসিক ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিটি, সংক্ষেপে বিসিসি)। ১৯৮৪ সালের হিসাবে সারা লাতিন আমেরিকায় প্রায় দুলক্ষ বিসিসি আছে যার মধ্যে আশি হাজার শুধুমাত্র ব্রাজিলেই।
বাইবেল পাঠ ও চর্চা, পারস্পরিক সাহায্য প্রদান, নিজেদের অধিকার রক্ষা এইসব উদ্দেশ্য নিয়ে প্রথম বিসিসি গঠিত হয়েছিল এবং এইসবের মধ্য দিয়ে সদস্যদের চেতনাকে উন্নীত করাই হল বিসিসি’র লক্ষ্য। যীশুখৃষ্টের জীবনের কাহিনী ও বাইবেলের ঘটনাবলীকে যাজকেরা রূপক হিসাবে ব্যবহার করে সমসাময়িক জীবন ও জগৎকে ব্যাখ্যা করেন। প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য নিয়ে বি. সি সি গঠিত না হলেও কালক্রমে এটাই হয়ে দাঁড়ায় ‘লিবারেশন থিওলজি’র সাংগঠনিক বাহু—জনসাধারণের ভেতর থেকে নিজেদের নেতা তৈরী, সংগ্রামী গণসংগঠন যেমন কৃষক সংগঠন ও সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী মার্কসবাদী গেরিলা গ্রুপগুলিতে ক্যাডার* সরবরাহের প্রাথমিক ক্ষেত্র হিসাবে বিসিসি কাজ করে। বিসিসি থেকে গণ-সংগঠন এবং সেখান থেকে গেরিলা গ্রুপে যোগদান অনেক বিসিসি সদস্যের জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। গণসংগঠনে যোগ দিয়েও বেশীর ভাগ সদস্য বিসিসি ছাড়েন না, বিসিসি’র সাপ্তাহিক মিটিং, পূজাপাঠে অংশ নেন। বিসিসিকে প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র বলা যেতে পারে। গুয়াতেমালার বৃহত্তম সংগ্রামী কৃষক সংগঠন সি ইউ সি, এল সালভাদোরের বৃহত্তম . গণসংগঠন বি পি আর ইত্যাদি বিসিসি থেকেই উদ্ভূত—নিকারাগুয়াতে সফল সোমোজা বিরোধী বিপ্লবে বিসিসি এবং চার্চের উজ্জ্বল ভূমিকা আছে—হ্যাণ্ডিনিস্তা কৃষিমজুর ইউনিয়ন টি সি’র উদ্ভব বিসিসি থেকেই—স্যাণ্ডিনিস্তা ফ্রন্টের মতে কুখ্যাত সোমোজাকে উৎখাত করার কাজে খ্রিস্টানরা যেভাবে অংশ নিয়েছিল তা “লাতিন আমেরিকায় ও সম্ভবত পৃথিবীর অন্যত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব। এই ঘটনা অন্যান্য দেশের বিপ্লবী আন্দোলনে খ্রিস্টানদের অংশগ্রহণের নতুন ও চমৎকার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, শুধুমাত্র ক্ষমতার জন্য লড়াইয়ের সময়েই নয়, নতুন সমাজ গড়ে তোলার ধাপেও এই সম্ভাবনা বিদ্যমান।”
নিকারাগুয়ার বিপ্লবে চার্চের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে চার্চের নীচের তলার পুরোহিতের! বিপ্লবকে স্বাগত জানালে এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সোৎসাহে অংশগ্রহণ করলেও চার্চের ঊর্ধ্বতনকর্তৃপক্ষ বিপ্লবের সক্রিয় বিরোধিতার অবস্থান থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী পরিবর্তনের বাস্তবতাকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। স্যাণ্ডিনিস্তা ফ্রন্টের নাস্তিক মার্কসবাদীরা সবসময়েই চার্চের সাথে সংঘর্ষ যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলেছেন। অগণিত খ্রিস্টান নরনারী পুরোহিতেরা নিকারাগুয়ার বিপ্লবে অংশ নিয়েছেন এবং ওর্তেগার মন্ত্রিসভায় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈদেশিক দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাথলিক পুরোহিতেরা।
কিন্তু পোপ দ্বিতীয় জন পল হ্যাণ্ডিনিস্তার বিপ্লবে বোধ হয় খুশি হতে পারেননি। তাই ১৯৮৫ সালের মে মাসে ম্যানাগয়ার আর্চবিশপ চরম প্রতিক্রিয়াশীল মিগুয়েল ওব্যাণ্ডো রোমান ক্যাথলিক চার্চের কার্ডিনাল হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। নিকারাগুয়ার বিশপ সম্মেলনের সভাপতি ওব্যাণ্ডো এবং সহ-সভাপতি বিশপ ভেগা বিপ্লবকে ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মদতপুষ্ট কনট্রা প্রতিবিপ্লবীদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। চার্চের নিজস্ব সংবাদপত্র ও রেডিওকে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের কাজে তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সাধারণ খ্রিস্টান নরনারী এবং নীচের তলার যাজক ও পুরোহিতেরা ছিলেন হ্যাণ্ডিনিস্তার সমর্থক। তাই ওব্যাণ্ডো ও ভেগা ব্যর্থ হলেন। তাছাড়া ইতিমধ্যে ভ্যাটিক্যান ও নীতি পরিবর্তন করেছিল। অদূর ভবিষ্যতে লাতিন আমেরিকার জনসাধারণই হয়ে উঠবে রোমান ক্যাথলিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। তাই লাতিন আমেরিকার জনসাধারণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার এবং জনসমক্ষে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে বেশীমাত্রায় ঘনিষ্ঠ হিসাবে চিহ্নিত হবার আশঙ্কায় ভ্যাটিক্যান ওব্যাণ্ডো এবং ভেগার বাড়াবাড়িকে বেশীদিন সহ্য করেনি। একজন নিকারাগুয়া থেকে বিতাড়িত হলেন এবং অন্যজন স্যাণ্ডিনিস্ত। সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হলেন।
ভাটিক্যান এবং নিকারাগুয়ার চার্চের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চক্রান্ত ও বিরোধিতাও খ্রিস্টান জনসাধারণকে হ্যাণ্ডিনিস্তা বিমুখ করতে পারেনি এবং নিকারাগুয়ার বিপ্লবকে একই সাথে খ্রিস্টান বিপ্লব ও স্যাণ্ডিনিস্তা বিপ্লব বললে বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। নিকারাগুয়ার বিপ্লবের খ্রিস্টান চরিত্রে কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো এতটাই অভিভূত হয়েছেন যে তাঁরই উৎসাহে অতি সম্প্রতি কিউবার সরকারী নাস্তিকতা এবং কিউবার কমিউনিস্ট পার্টিতে খ্রিস্টানদের যোগদানের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
লিবারেশন থিওলজি তত্ত্বের বিকাশ ও প্রসারলাভ মার্কসবাদীদের বিশেষতঃ সেই সমস্ত মার্কসবাদী কমিউনিস্টদের যাঁরা আজন্ম নাস্তিকতা বা নিরীশ্বরবাদী চিন্তাধারায় লালিত-পালিত তাদের বেশ কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলবে। তাই মার্কসবাদের সাথে ধর্মের সম্পর্ক ́ অর্থাৎ যে আলোচনা দিয়ে প্রবন্ধের অবতারণা করা হয়েছিল উপসংহারে আবার সেই আলোচনাতেই ফিরে যাবার আবশ্যিকতা রয়েছে।
ইউরোপে মধ্যযুগের অবসানের পর যে যুগের সূচনা হল তাকে বলা হয় ‘আলোকপ্রাপ্তির যুগ’ বা ‘যুক্তির যুগ। বিজ্ঞানমনস্কতা হল এ যুগের জীবনদর্শন। যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে জীবন ও জগতকে ব্যাখা করা ও যাচাই করা হল এ যুগের বৈশিষ্ট্য। এই যুগ চিন্তাধারার ক্ষেত্রে যে জোয়ার এনেছিল, মার্কসবাদ তার সবচেয়ে পরিণত ফসল। মার্কসবাদ মানবচিন্তাধারার সবচেয়ে উন্নত ও পরিণত রূপ হওয়া সত্ত্বেও যুগের বৈশিষ্ট্য মার্কসবাদে রয়ে গেছে। মার্কস নিজে স্রেফ যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতে ধর্মকে বিচার করেননি, বরং গভীর সহমর্মিতা ও সমাজসচেতনতার সাথে তিনি লক্ষ্য করেছেন যে শোষিত, নিপীড়িত মানুষের জীবনে ধর্মের মায়া কিভাবে মানসিক শাস্তি ও ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। মার্ক র্স ধর্মের বিরুদ্ধে ঠিকই, কিন্তু তাঁর মতে ধর্মের মোহমুক্তি এবং আধিপত্য, শোষণ, নিপীড়নের অবসান পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু দুঃখের বিষয় পরবর্তীকালে মার্কসের অনুগামীরা যুক্তিবাদিতার নিরিখে ধর্মকে নস্যাৎ করতে চেয়েছেন। সাধারণভাবে মার্কসবাদীদের মতে ধর্ম অন্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনের বিকারমাত্র এবং ধর্মের ধ্বজাধারীরা ধর্মের প্রতিষ্ঠানকে প্রতিক্রিয়ার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। কথাটি আংশিক সত্য। শোষিত মানুষদের প্রতিবাদেও অনেক সময় ধর্ম এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে কাজ করে। ষোড়শ শতাব্দীর জার্মানিতে কৃষক আন্দোলন, আমাদের দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সন্ত্রাসবাদী ধারা বা ইদানীংকার লিবারেশন থিওলজি তার উদাহরণ। আসল কথা হল ধর্মের আনুগত্য ব্যাপারটি মানুষের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সাথে জড়িত—শুধুমাত্র যুক্তির মাপকাঠিতে তার বিচার চলে না। জন্ম-মৃত্যু, জীবনের তাৎপর্য ইত্যাদি প্রশ্নে বিচলিত হলে, কল্পিত ঈশ্বরের অনুকরণে জীবনকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে তুলবার প্রয়াস বা বাস্তবের কঠিন ভূমিতে দাঁড়িয়েও তাকে অতিক্রম করে যাবার বাসনা থাকলেই কোন ব্যক্তি বাস্তববিমুখ, আকালচারী, মূর্খ হয়ে যায় না। কে যেন বলেছিলেন, ঈশ্বর না থাকলেও মানুষ তাঁকে আবিষ্কার করত!
লাতিন আমেরিকার মার্কসবাদীরা ও লিবারেশন থিওলজির প্রবক্তারা একে অপরের থেকে শিক্ষা নিয়ে উভয়েই সমৃদ্ধ হয়েছেন। লিবারেশন থিওলজিস্টরা শুধুমাত্র মানুষের শুভবুদ্ধির উপর নির্ভর না করে লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষের দুর্গতির অর্থনৈতিক রাজনৈতিক-সামাজিক কারণ বিশ্লেষণে সচেষ্ট হয়েছেন এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলিকে সনাক্ত করতে এবং প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। অন্যদিকে মার্কসবাদীরা জনসাধারণের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখেছেন। যুগ যুগ ধরে ধর্ম সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনের অঙ্গ হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে। অনেক সময়ই দেখা যায় কমিউনিস্টরা জনসাধারণের ‘পশ্চাৎপদ’ সংস্কৃতির প্রতি উন্নাসিক অবহেলার ভাব পোষণ করে থাকেন। এতে কমিউনিস্টদের সাথে সাধারণ মানুষের দূরত্বই তৈরী হয়। লিবারেশন থিওলজির এক প্রধান প্রবক্তা পলো ফ্রায়রে বলেছেন, সাধারণ মানুষের আদিম, সরল চেতনাকে (naive consciousness) বিশ্লেষণী চেতনার (critical consciousness) স্তরে নিয়ে যেতে হবে। লাতিন আমেরিকার কমিউনিস্টদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
* এই প্রবন্ধ লিখতে মান্থলি রিভিউ পত্রিকার নিম্নলিখিত সংখ্যাগুলি থেকে বিশেষ সাহায্য নেওয়া হয়েছে। জুলাই-আগষ্ট ১৯৮৪, জানুয়ারী ১৯৮৭, জুলাই-আগষ্ট ১৯৮৭
* মার্কসের উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে ‘হেগ্বেদের আইনের দর্শনের সমালোচনা’ থেকে। উদ্ধৃতির অংশবিশেষে অনুবাদে সাহায্য নেওয়া হয়েছে “দেশ’ ২৭ জানুয়ারী ১৯৯০ সংখ্যায় প্রকাশিত হীরেন মুখার্জীর ‘ধর্ম ও সমাজ বিপ্লব’ প্রবন্ধ থেকে
* এঙ্গেলসের উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে ‘লুদবিগ ফয়ারবাখ ও বিরায়ত জার্মান দর্শনের সমাপ্তি’
[সূত্র: অনীক, জুন ১৯৯০]



মন্তব্য