স্তনের ভূমিকার রাজনৈতিক অর্থনীতি
একটি শিশুকে জিজ্ঞেস করুন—স্তন কী কাজে লাগে? সে বলবে, দুধ খাওয়ার জন্য। তার উত্তর সরল, কারণ তার অভিজ্ঞতা সরল। তার কাছে স্তন মানে খাদ্য, নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা। কিন্তু কৈশোরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সমাজ তার সেই সরল জ্ঞানকে ভেঙে দেয়। যে অঙ্গ জীবনধারণের উপায়, সেটিকেই শেখানো হয় লজ্জার, কামনার, গোপনতার বস্তু হিসেবে দেখতে। প্রশ্ন হলো—এই বদল কোথা থেকে আসে? প্রকৃতি থেকে, নাকি ক্ষমতা থেকে?
এই প্রবন্ধের অবস্থান স্পষ্ট: স্তনের যৌনায়ন প্রাকৃতিক নয়; এটি পুরুষতান্ত্রিক পুঁজিবাদের একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক নির্মাণ। যে অঙ্গ মানবজাতির পুনরুৎপাদনের কেন্দ্রে, তাকে যৌন বস্তুতে পরিণত করা নিছক রুচির প্রশ্ন নয়—এটি অর্থনীতি ও ক্ষমতার প্রশ্ন।
স্তনের যৌনায়ন: শরীরবৃত্তিয় না কি সামাজিক নির্মাণ?
যদি স্তনের সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক সহজাত হতো, তবে পৃথিবীর সব সমাজে একই প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। কিন্তু আমরা জানি, যৌনতা একটি সাংস্কৃতিক ভাষা। কোনো সমাজে নারীর খোলা চুল উত্তেজনার কারণ, অন্য সমাজে তা দৈনন্দিন। কোথাও খোলা পা অশ্লীল, কোথাও সমুদ্রসৈকতে প্রায় নগ্নতা স্বাভাবিক। অর্থাৎ যৌনতা শরীরে নয়—নির্মাণে। আর এই নির্মাণ নির্ধারিত হয় ক্ষমতার দ্বারা।পিতৃতান্ত্রিক সমাজে দীর্ঘদিন ধরে নারীদেহ ছিল সেই দৃষ্টির প্রধান লক্ষ্য। বিজ্ঞাপন, সিনেমা, নাটক—সবখানেই নারী ছিল আকর্ষণের কেন্দ্র। কিন্তু পুঁজির ধর্ম লিঙ্গভিত্তিক নয়; তার লক্ষ্য মুনাফাভিত্তিক। ফলে এখন পুরুষদেহও বাজারে সমানভাবে বিনিয়োগযোগ্য।
এক সময় মূলধারার চলচ্চিত্রে ভুঁড়িওয়ালা ব্যক্তিও নায়ক ছিলেন। আজিম, জসিম, তপস পালের মতো অভিনেতাদের শরীর ‘নিখুঁত’ না হলেও নায়কত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। কিন্তু আজকের বাজারে নায়ক মানে ছাঁচে ঢালা পেশি, চর্বিহীন শরীর, জিমে গড়া চেহারা। শরীর আর ব্যক্তিসত্তা নয়; এটি পণ্যের প্যাকেজিং। এখন ‘হিরো’ ইমেজ তৈরি হয় ডায়েট চার্ট, প্রোটিন শেক, ফিটনেস ট্রেনারের মাধ্যমে। বর্তমানে শরীর বিনিয়োগ; পেশি এখন বিপণনের ভাষা।এখানেই স্পষ্ট হয়—যৌনতা শরীরের গুণ নয়; এটি বাজারের ক্ষমতা কাঠামোর কৌশল।
যন্ত্রায়ন ও প্রযুক্তিগত বিকাশের ফলে নারীরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে। তারা শুধু গৃহস্থালির অদৃশ্য শ্রমিক নয়; তারা কারখানার শ্রমিক, অফিসকর্মী, উদ্যোক্তা, ভোক্তা। ফলে বাজার তাদেরও লক্ষ্য করে। যৌন আবেদন এখন কেবল পুরুষের দৃষ্টি তুষ্ট করার জন্য নয়; এটি বহুমুখী ভোক্তা-সংস্কৃতির অংশ।
তবুও ক্ষমতার মালিকানা এখনো প্রধানত পুরুষের হাতে। তাই নারীদেহের প্রদর্শন বেশি দৃশ্যমান। লালগালিচায় পিঠ-বুক খোলা পোশাকে উপস্থিত হওয়া, ফ্লাইং কিস ছুড়ে দেওয়া—এসবকে বলা হয় ‘গ্ল্যামার’। কিন্তু ভাবুন তো, যদি পুঁজির নিয়ন্ত্রণ নারীর হাতে যেত? তখন কি দৃশ্যপট উল্টে যেত না? তখন কি পুরুষ তারকারাই শর্টস ও স্লিভলেস পরে পেশি প্রদর্শন করে নারীদের উদ্দেশে ফ্লাইং কিস ছুড়তেন না? অর্থাৎ দেহের প্রদর্শন ক্ষমতার অনুবাদ।
স্তনকে যৌনায়ন করার রাজনৈতিক অর্থনীতি
এখন প্রশ্নের কেন্দ্রে আসা যাক—স্তনকে কেন বিশেষভাবে যৌন প্রতীকে পরিণত করা হলো?
কারণ স্তন কেবল শরীরের একটি অংশ নয়; এটি পুনরুৎপাদনের কেন্দ্র। মাতৃত্ব, পুষ্টি, মানবজাতির ধারাবাহিকতা—সবকিছুর সঙ্গে জড়িত। সন্তান ধারণ, জন্মদান ও লালন-পালন এমন শ্রম, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র অর্থনীতি। কিন্তু এই শ্রম অদৃশ্য। এর কোনো মজুরি নেই, কোনো স্বীকৃতি নেই।
যদি স্তনের প্রাথমিক ভূমিকা—শিশুকে পুষ্টি দেওয়া—সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে আসে, তবে মাতৃত্বের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য স্বীকার করতে হবে। তখন প্রশ্ন উঠবে—গার্হস্থ্য শ্রম কি উৎপাদন নয়? পুনরুৎপাদন কি অর্থনীতির অংশ নয়? এই প্রশ্ন পুঁজিবাদের ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করে।তাই স্তনের প্রাকৃতিক ভূমিকা আড়াল করে তাকে যৌনতার মোড়কে বন্দি রাখা হয়। স্তনের প্রাকৃতিক ভূমিকা হচ্ছে দুধের মাধ্যমে নবজাতকের শরীরে পুষ্টির সকল উপাদান পৌঁছে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে মায়ের পুষ্টিই যে সদ্যোজাত শিশুটির পুষ্টি—এই বিষয়টি সাধারণ বুদ্ধির বাইরের কোনো জটিল তত্ত্ব নয়। মায়ের দুধের পর্যাপ্ততা ও স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হলে মাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। এই সুষম খাদ্যের প্রধান যোগানদাতা প্রকৃতি।কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন বিশুদ্ধ পানি ও পুষ্টিকর খাবার ছাড়া কোনো মা-ই শিশুর দুধের চাহিদা পূরণ করতে পারেন না। কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত খাবার বা জাঙ্ক ফুড খেলে প্রসূতি মায়ের স্তনে দুধ তৈরি হয় না—এমন সরলীকৃত দাবি হয়তো পুরোপুরি বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুল নয়; কিন্তু এটা অস্বীকার করা যায় না যে অপুষ্টিকর ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার মায়ের সামগ্রিক স্বাস্থ্য, হরমোনের ভারসাম্য এবং দুধের গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চিকিৎসাবিদ্যা ও প্রসূতিবিদ্যার অভিজ্ঞতাও এই সম্পর্কের দিকেই ইঙ্গিত করে।
‘স্তন দুধ পানের জন্য’—এই মৌলিক সত্যটিকে গুরুত্বহীন বা আড়াল করে যৌনতার আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখাই কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত খাবার ও জাঙ্ক ফুডের বাজার সম্প্রসারণের পক্ষে সহায়ক। কারণ স্তনের অকৃত্রিম ভূমিকা যত সামনে আসবে, ততই প্রকৃতিনির্ভর খাদ্যব্যবস্থা, মাতৃপুষ্টি এবং কৃষিনির্ভর উৎপাদনের গুরুত্ব আলোচনায় আসবে। তখন মানুষ তার খাদ্যের উৎস সম্পর্কে সচেতন হবে, খাদ্যকে কেবল পণ্য নয়—জীবনের ভিত্তি হিসেবে ভাববে, এবং তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবি তুলবে। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করা কঠিন। পুঁজিবাদ মানুষকে তার শ্রম থেকে বিচ্ছিন্ন করে, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে, এমনকি নিজের শরীর থেকেও বিচ্ছিন্ন করে। আমরা শরীরকে অনুভব করি না; আমরা শরীরকে দেখি—অন্যের দৃষ্টিতে, ক্যামেরার ফ্রেমে, বিজ্ঞাপনের ভাষায়। শরীর যে অনুভবের বিষয় নয় পুরোপুরি দর্শনীয় বস্তু সেইকারণেই গোটা বিশ্বে বিউটি ইন্ডাস্ট্রি চরম বিকাশমান শিল্প।আর এইভাবে, বিউটি ইন্ডাস্ট্রি স্তনকে আকর্ষণীয় করে তোলার নামে প্রসাধন, সার্জারি, বিশেষ পোশাকের বিশাল বাজার তৈরি করেছে।শরীর হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক বিষয়। কিন্তু শরীরকে স্বাভাবিক না মেনে ‘অসম্পূর্ণ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তারপর সেই অসম্পূর্ণতার সমাধান বিক্রি করা হয়। এর ফলে মানুষের কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হয়। প্রতিনিয়ত কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করার মাধ্যমেই এই ভোগবাদী অর্থনীতি টিকে থাকে।
উপসংহার:
স্তনকে যৌন বস্তু হিসেবে দেখানো কেবল রুচির প্রশ্ন নয়; এটি ক্ষমতার কৌশল। এটি এমন এক নির্মাণ, যা মাতৃত্বের শ্রমকে অদৃশ্য করে, প্রকৃতির গুরুত্বকে আড়াল করে, এবং শরীরকে পণ্যে রূপান্তরিত করে।
স্তনকে পুনরায় জীবনের উৎস হিসেবে দেখতে শেখা মানে কেবল নৈতিক অবস্থান নেওয়া নয়; এটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া। এটি দৃষ্টির বিপ্লব—যেখানে শরীর পণ্য নয়, শ্রম অদৃশ্য নয়, এবং স্তনের পুনরুৎপাদন ও পুষ্টির ভূমিকাকে যৌনতার আড়ালে লুকিয়ে ফেলা নয়।
যেদিন আমরা স্তনকে যৌনতার সংকীর্ণ ফ্রেম থেকে সরিয়ে পুনরুৎপাদন ও পুষ্টির রাজনৈতিক কেন্দ্রে স্থাপন করতে পারব, সেদিনই পুঁজিবাদী দৃষ্টির বিরুদ্ধে প্রথম বাস্তব চ্যালেঞ্জটি ছুড়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
[২০২১ সালে উইমেন চ্যাপ্টারে “স্তনের ভূমিকা কী, জিজ্ঞাসি জনে জনে” শিরোনামে প্রকাশিত লেখাকে পরিমার্জন করা হয়েছে]



মন্তব্য নেই
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.