উত্তর আধুনিকতা: একটি মার্কসবাদী বিশ্লেষণ
সমকালীন দার্শনিক আলোচনায় উত্তর-আধুনিকতাবাদ (চড়ংঃ-সড়ফবৎহরংস) একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। দর্শনের এই ধারাটি মূলত বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে পশ্চিমা বিশ্বে বিকাশ লাভ করলেও আজকের দিনের এর প্রভাব বৈশ্বিক মাত্রা লাভ করেছে। উত্তর-আধুনিকতাবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো আধুনিকতার মৌলিক ধারণাসমূহের সমালোচনা। বিশেষ করে যুক্তিবাদ, প্রগতির ধারণা, বিশ্বজনীন সত্য (টহরাবৎংধষ ঞৎঁঃয) এবং সামগ্রিক তত্ত্বের (এৎধহফ ঘধৎৎধঃরাব) প্রতি সংশয় প্রকাশ। উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রবক্তাগণ যুক্তি দেখান যে মানবজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোনো একক বা সার্বজনীন সত্য নেই, বরং বহুমাত্রিক ও আপেক্ষিক বাস্তবতাই আমাদের অভিজ্ঞতা নির্মাণ করে।
সিপিএম প্রকাশিত দ্য মার্ক্সিস্ট পত্রিকায় আইজাজ আহমেদের লেখা ‘অন পোস্ট-মডার্নিজম’ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ১৯৭০-এর দশকের বিশেষ পরিস্থিতিতে, বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সংকটময় সময়ে পশ্চিমা সমাজে উত্তর-আধুনিকতাবাদের বিকাশ হয়েছিল (মার্ক্সিস্ট, ২০১১)। অন্যদিকে ডেভিড হার্ভের ‘দ্য কন্ডিশন অব পোস্ট মডার্নিজম’ থেকে দেখা যায় যে এই সময়কালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়, আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষিতে তেল সংকট এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা পশ্চিমা সমাজের আত্মবিশ্বাসকে নাড়া দিয়েছিল। এই সংকটময় সময়ে মার্কসবাদী চিন্তাধারা পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছিল। ঠিক তখনই উত্তর-আধুনিকতাবাদের আবির্ভাব ঘটে মার্কসবাদের বিপরীতে একটি বিকল্প বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো প্রদানের জন্য।
সত্তরের দশকের শেষের দিকে উত্তর-আধুনিকতাবাদী তত্ত্বের অন্যতম ভাষ্যকার জ্যাঁ-ফ্রঁসোয়া লিয়োতার দ্য পোস্ট-মডার্ন কন্ডিশন (১৯৭৯) বইয়ে ‘সর্বজনীন বয়ানের সমাপ্তি’ (ঊহফ ড়ভ এৎধহফ ঘধৎৎধঃরাবং) ঘোষণা করেন। ফুকো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের তত্ত্ব উপস্থাপন করেন এবং দেরিদা ভাষার স্থির অর্থকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তখন তারা মূলত মার্কসবাদের শ্রেণিসংগ্রাম ও সামাজিক পরিবর্তনের তত্ত্বকে অকার্যকর প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন। অন্যদিকে ফ্রেডরিক জেমসন তাঁর পোস্টমডার্নিজম, অর দ্য কালচারাল লজিক অব লেট ক্যাপিটালিজম (১৯৯১) বইয়ে বলতে চেয়েছেন যে, উত্তর-আধুনিকতাবাদ আসলে চলতি সময়ের পুঁজিবাদের (খধঃব ঈধঢ়রঃধষরংস) সাংস্কৃতিক যুক্তি মাত্র। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে আইজাজ আহমেদ উত্তর-আধুনিকতাবাদের বিস্তারকে মূলত ঔপনিবেশিক পরবর্তী জাতি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মার্কসবাদী বিকল্পের প্রতি আকর্ষণ হ্রাস করার কৌশল হিসেবে দেখেছেন।
এই লেখায় আমরা মূলত আইজাজ আহমেদের বিশ্লেষণের কাঠামোটিকেই পুনঃব্যবহার করে আজকের বাংলাদেশে উত্তর-আধুনিকতাবাদী চিন্তাধারার প্রভাব, বিশেষ করে বাংলাদেশের বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের বিভ্রান্তি ও তারল্যময় বামপন্থার উদ্ভবকে বোঝার চেষ্টা করবো।
উত্তর-আধুনিকতাবাদের দার্শনিক ভিত্তি ও ঐতিহাসিক উৎপত্তি
উত্তর-আধুনিকতাবাদের দার্শনিক পর্যালোচনায় প্রবেশের পূর্বে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝা অপরিহার্য। আধুনিকতাবাদী দার্শনিকেরা যেমন, হেগেল ইতিহাসকে যুক্তিবাদী দর্শন দ্বারা ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার বিশ্লেষণের কেন্দ্র হলো দ্বান্দিকতা। হেগেলীয় বিশ্লেষণে ইতিহাস অগোছালো কিছু নয়, বরং এর ভেতরে একটি যুক্তিসঙ্গত গতি আছে। ইতিহাসে যা কিছু ঘটে, তার পেছনে কোনো না কোনো কারণ ও প্রয়োজনীয়তা থাকে। অন্যদিকে মার্কস ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেছিলেন ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে দিয়ে। মার্কসের মতে, মানবসমাজের বিকাশ মূলত নির্ধারিত হয় মানুষের উৎপাদন পদ্ধতি ও উৎপাদন সম্পর্কের দ্বারা। আর অর্থনৈতিক কাঠামো (ঊপড়হড়সরপ ইধংব) নির্ধারণ করে রাজনৈতিক, আইনি, সাংস্কৃতিক, এবং মতাদর্শগত কাঠামো (ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব)। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম বাক্যে লিখেন—‘আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে, তাদের সকলের ইতিহাসই শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস।’
ফরাসি দার্শনিক জাঁ-ফ্রাঁসোয়া লিয়োতার তার তত্ত্বে মার্কসবাদের শ্রেণিসংগ্রাম এবং হেগেলের যুক্তিবাদী ইতিহাসদর্শন ইত্যাদি আধুনিকতার সমস্ত ‘সর্বজনীন বয়ান’ (গ্র্যান্ড ন্যারেটিভস বা মেটান্যারেটিভস) এখন সম্পূর্ণ অচল বলে সাব্যস্ত করেন। তিনি বলেন, সমাজে শুধু একটা সার্বজনীন সত্য বা চূড়ান্ত লক্ষ্য নেই। বরং, ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, গোষ্ঠী বা ক্ষেত্র তাদের নিজেদের ছোট ছোট নিয়মে, নিজেদের ভাষায় জ্ঞান তৈরি করে। একে তিনি বলেছেন ‘ভাষা-খেলা’ (ষধহমঁধমব মধসবং)। যেমন, বিজ্ঞানীরা একভাবে সত্য নিয়ে কথা বলেন, শিল্পীরা আরেকভাবে, রাজনীতি আবার অন্যভাবে। এদের মধ্যে কোনো একটিকে ‘চূড়ান্ত’ বা ‘সর্বজনীন’ বলা যায় না।
অন্যদিকে, ডেভিড হার্ভে উত্তর-আধুনিকতার উত্থানকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখান যে উত্তর-আধুনিকতাবাদকে বোঝার জন্য শুধু দর্শন বা সাহিত্য নয়, বরং উৎপাদন পদ্ধতির রূপান্তরকেও বিশ্লেষণ করতে হয়। তিনি বলেন যে, ১৯৭০-এর দশকে তেল সংকট এবং ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতনের ফলে ফোর্ডিজম নামে পরিচিত পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার (এক ধরণের কেইনেসীয় সমঝোতা যেখানে রাষ্ট্র, পুঁজি ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে আপস, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমা সমাজে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি এনেছিল) সংকট এবং এর পরিবর্তে ছোট পরিসরে বৈচিত্র্যময় উৎপাদন, চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী ও অনিশ্চিত শ্রম সম্পর্কের উদ্ভব উত্তর-আধুনিকতার উত্থানের প্রধান প্রেক্ষাপট। এই প্রেক্ষাপটে লিয়োতার তার উত্তর-আধুনিকতাবাদী তত্ত্বের মাধ্যমে পুঁজিবাদের একটি নয়া রূপকে স্বাগত জানান, যা তিনি ‘উন্নত উদারবাদী পুঁজিবাদ’ নামে অভিহিত করেন।
মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লিয়োতারের এই তত্ত্ব আসলে ১৯৮০-র দশকের রেগান-থ্যাচার নীতির বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফোর্ডিস্ট মডেলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ার পরে জোরালো শ্রমিক আন্দোলন পশ্চিমা বিশ্বে শ্রেণি সংগ্রামকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। তার বিপরীতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সেই সময়ে দুইটি সমান্তরাল কৌশল গ্রহণ করা হয়। একদিকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়া-উদারনীতিবাদের উত্থান, অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিকতাবাদের বিকাশ।
মিশেল ফুকো উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা সংযোজন করেন। তাঁর মতে ক্ষমতা কোনো কেন্দ্রীভূত সত্তা নয়, বরং তা সমাজের সর্বত্র বিস্তৃত—স্কুল, হাসপাতাল, কারাগার এমনকি যৌনতার ক্ষেত্রেও। তাঁর মতে কেবলমাত্র শ্রেণি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার বিলুপ্তি সম্ভব নয়। তিনি শ্রেণি সংগ্রামের পরিবর্তে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতর মানুষের নানা স্থানীয় ও খণ্ডিত সংগ্রামের কথা বলেন। ফুকোর এই ‘ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ’ তত্ত্ব আপাতদৃষ্টিতে প্রগতিশীল মনে হলেও আইজাজ আহমেদ এর একটি বিপজ্জনক দিক সামনে নিয়ে আসেন। এটি শ্রেণিশত্রু হিসেবে পুঁজিপতি শ্রেণিকে চিহ্নিত করার বদলে ক্ষমতাকে এক বিমূর্ত ধারণায় পরিণত করে, ফলে শোষণের মূল উৎস অস্পষ্ট থেকে যায়।
জাক দেরিদার ডিকনস্ট্রাকশন বা অবিনির্মাণ তত্ত্ব উত্তর-আধুনিকতাবাদের আরেকটি স্তম্ভ। দেরিদা তার বই অন গ্রামাটোলজিতে (১৯৭৬) বলেন—কোনো লেখারই স্থির বা চূড়ান্ত অর্থ নেই, অর্থ সর্বদা বিলম্বিত (ফবভবৎৎবফ) এবং পার্থক্যপূর্ণ (ফরভভবৎবহঃরধষ) সম্পর্কের মাধ্যমে গঠিত হয়। এই তত্ত্বের রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। ডিকনস্ট্রাকশন যেহেতু কোনো পাঠ বা ধারণার একক, স্থির অর্থকে অস্বীকার করে—তাই রাজনৈতিক স্লোগান, বিপ্লবী দলের ঘোষণাপত্র, এমনকি মুক্তির ধারণাও এখানে চূড়ান্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে। এর ফলে, যেমন আইজাজ আহমেদ উল্লেখ করেছেন—রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য একক আদর্শ বা স্পষ্ট কর্মসূচি নির্ধারণ করা জটিল হয়ে পড়ে। ফলে সংগঠিত বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ যুক্তি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় ‘গণতন্ত্র’ শব্দটির অর্থ নিয়ে ক্রমাগত বিতর্ক আন্দোলনের কেন্দ্রীভূত লক্ষ্যকে দুর্বল করে দেয়। একই রকম পরিস্থিতি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও দেখা গেছে, যেখানে ‘সংস্কার’ শব্দটি বিভিন্ন গোষ্ঠী ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে, ফলে প্রকৃত সংস্কারের ধারণাই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও টেরি ইগলটন দ্য ইল্যুশন অব পোস্টমডার্নিজমে (১৯৯৬) দেরিদার এই অবস্থানের সমালচনা করে বলেন যে, অবিনির্মাণ তত্ত্ব যেকোনো নৈতিক অবস্থানকেও আপেক্ষিক করে তোলে।
ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘এন্ড অব হিস্ট্রি’ উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারার চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে ফুকুয়ামা দাবি করেন যে উদার গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদই মানবসভ্যতার চূড়ান্ত পর্যায়, এবং এর পর আর কোনো র্যাডিক্যাল পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। এই তত্ত্ব সরাসরি মার্কসবাদের ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বিরোধিতা করে। কিন্তু বাস্তবতা ফুকুয়ামার এই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। ২০০৮-এর বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিণতি এবং বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসমতা প্রমাণ করে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে অক্ষম।
বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশে উত্তর-আধুনিকতার প্রভাব
ভারতীয় উপমহাদেশে উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ একটি জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস এবং স্বাধীনোত্তরকালীন জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের সমালোচনা থেকে এই অঞ্চলে উত্তর-আধুনিকতাবাদের উদ্ভব ঘটেছে বলে অনেক তাত্ত্বিক দাবি করেন। তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজে উত্তর-আধুনিকতাবাদের গ্রহণযোগ্যতা মূলত দুইটি সমান্তরাল ধারায় বিকশিত হয়েছে: প্রথমত, ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডের সমালোচনার নামে মার্কসবাদী ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রত্যাখ্যান, এবং দ্বিতীয়ত, জাতীয়তাবাদী আখ্যানের বিশ্লেষণের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতাবাদী মূল্যবোধের বিরোধিতা।
রণজিৎ গুহর নেতৃত্বে নিম্নবর্গীয় গবেষণা গ্রুপ ভারতীয় ইতিহাসচর্চায় একটি নতুন ধারার সূচনা করে, যা প্রথাগত ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবীক্ষার সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করার দাবি করেছিল। নিম্নবর্গীয় গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে এই দলটি ভারতীয় সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম ও প্রতিরোধকে ইতিহাসের মূল ধারায় প্রতিষ্ঠিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস চালায়। তবে আইজাজ আহমেদের মতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গবেষণা ধারা ক্রমশ মার্কসবাদী শ্রেণি বিশ্লেষণ থেকে দূরে সরে যায় এবং একটি অতিনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বীক্ষণের দিকে অগ্রসর হয়। এই পরিবর্তনের ফলে নিম্নবর্গীয় গবেষণা ভারতীয় সমাজের বৃহত্তর শ্রেণি কাঠামো ও অর্থনৈতিক সম্পর্কসমূহকে উপেক্ষা করতে শুরু করে, বরং আপাতদৃষ্টিতে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সংগ্রামের উপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব আরোপ করে।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের চিন্তাধারা ভারতীয় উপমহাদেশে উত্তর-আধুনিকতাবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর ‘আন্তর্জাতিকতাবাদ ও তার সীমাবদ্ধতা’ এবং ‘জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার পরিবর্তিত রূপ’ সম্পর্কিত রচনাসমূহে পশ্চিমা আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাসমূহকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস দেখা যায়। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ দ্বারা পর্যাপ্তভাবে বোঝা সম্ভব নয়, বরং এখানে ধর্মীয় পরিচয় ও সংস্কৃতির ভূমিকা স্বীকার করতে হবে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অত্যন্ত খ্যাতিমান, বিপ্লবীমনা ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, যারা ভারতীয় মনকে উপনিবেশিকতার প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে সংগ্রাম করেছিলেন, তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই অস্ত্রগুলিকে ধার দিয়েছেন যা প্রকৃতপক্ষে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আদর্শিক পাটাতন তৈরি করে দিয়েছে। যেমন আশীষ নন্দী বলেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতের নিজস্ব ধারণা নয়, বরং ইউরোপের—চার্চ আর রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব থেকে আসা। তাদের মতে, ভারত নিজস্বভাবে সহনশীল। এই যুক্তিই পরে ভারতের ডানপন্থীরা ব্যবহার করে বলে, তারা ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধী নয়, বরং ‘সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতা’-র পক্ষে—যেটি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের বিশ্বাসকে সম্মান দেয়। ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনও (ঈঅঅ) এই যুক্তিতেই টিকে। কিন্তু আসলে অতীতের সেই ‘সহনশীলতা’ মানে ছিল জাতিভেদ প্রথা—অসম, বিভক্ত আর নিষ্ঠুর নিয়মে বাঁধা সমাজ। সেটা কখনোই সমান নাগরিকদের সহাবস্থান ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র অন্তত এই প্রতিশ্রুতি দেয় যে, ব্যক্তি তার অধিকার নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে। একে ‘বিদেশি’ বলে খারিজ করলে, আসলে সেই সুরক্ষার দেয়ালটাই দুর্বল হয়ে যায়। সাম্প্রতিক বাংলাদেশেও আমরা দেখতে পাই সংবিধানের ধর্ম নিরপেক্ষতার ধারণাটিকে আরোপিত বলে প্রচার করা হচ্ছে। প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর এই দাবিগুলো আরো শক্ত ভিত্তি পায় যখন উত্তর-আধুনিকতাবাদী তত্ত্ব ধর্ম-নিরপেক্ষতাকে ইনক্লুসিভিটি বা অন্তর্ভুক্ততা ইত্যাদি শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা করে। এছাড়াও, লোকসংস্কৃতি বা স্থানীয় ঐতিহ্যকে দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখার কারণে সমাজের বহুদিনের লালিত কুসংস্কার, জাতভেদ, লৈঙ্গিকবঞ্চনা ইতাদি উপেক্ষিত হয়ে যায়। এর ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ভারতীয় উপমহাদেশে উত্তর-আধুনিকতাবাদের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে শ্রমিক আন্দোলন ও বাম রাজনীতির উপর। উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিকরা শ্রেণি সংগ্রামের ধারণাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘একচ্ছত্রবাদী’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন পরিচয়ভিত্তিক আন্দোলনকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেন। এই প্রবণতার ফলে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন ধর্ম, জাতি, ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের রাজনীতির কাছে ক্রমশ নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ফলস্বরূপ, শ্রমিক শ্রেণির একতাবদ্ধ সংগ্রাম দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পুঁজিবাদী শোষণ কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকে।
উত্তর-আধুনিকতাবাদের ভারতীয় উপমহাদেশে বিস্তারের পেছনে আন্তর্জাতিক আর্থ-রাজনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কসবাদের প্রতি বিশ্বব্যাপী যে অনীহা সৃষ্টি হয়, তার সুযোগ নিয়ে উত্তর-আধুনিক তত্ত্বসমূহ ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ও আন্তর্জাতিক ফাউন্ডেশনগুলোর অর্থায়নে ভারতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে উত্তর-আধুনিক কোর্স ও গবেষণা প্রকল্প চালু হয়, যা এই ধারার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভারতীয় উপমহাদেশে উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রভাব শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নীতিনির্ধারণেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। উপমহাদেশের সরকারগুলোর নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির প্রাধান্য বৃদ্ধি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণের নামে শ্রেণি সংগ্রামের ধারণাকে দুর্বল করা, এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার নামে পুঁজিবাদী শোষণের কাঠামোকে অক্ষুণ্ন রাখা—এসবই উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারার প্রত্যক্ষ ফলাফল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রভাব
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিন্যাসে উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ একটি জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সমাজব্যবস্থায় যে পরিবর্তনসমূহ ঘটেছে, তা বিশ্লেষণ করলে উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় ১৯৭২ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের প্রবাহে এই নীতিসমূহের ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণুতা এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানে উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
উত্তর-আধুনিকতাবাদের বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের প্রথম ধাপটি লক্ষ্য করা যায় ১৯৮০-এর দশকে, যখন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো তাদের তাত্ত্বিক কাঠামো পরিবর্তন করতে শুরু করে। এই সময়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মাধ্যমে প্রবর্তিত কাঠামোগত সমন্বয় নীতি (ঝঃৎঁপঃঁৎধষ অফলঁংঃসবহঃ চৎড়মৎধস) কেবল অর্থনৈতিক সংস্কারই আনেনি, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী রাষ্ট্রকে কল্যাণমূলক ভূমিকা থেকে সরে এসে শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রক ও তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। বাংলাদেশে এনজিওসমূহের ব্যাপক বিস্তার এবং তাদের মাধ্যমে সামাজিক সেবার বেসরকারিকরণ এই ধারারই প্রতিফলন।
উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারার সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের উপর। ঐতিহ্যগতভাবে মার্কসবাদী শ্রেণিসংগ্রামের ধারণাকে দুর্বল করে ফেলার জন্য উত্তর-আধুনিকতাবাদ শ্রমিকদেরকে তাদের শ্রেণি পরিচয়ের বদলে অন্যান্য পরিচয়ে বিভক্ত করার কৌশল গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই কৌশল বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে। এখানে শ্রমিকদেরকে তাদের শ্রেণিগত শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার বদলে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ বা ‘মাইক্রোক্রেডিট’ এর মতো ধারণার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। ফলে গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, অথচ নারী শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি পুঁজিপতি শ্রেণির জন্য অত্যন্ত অনুকূল, কারণ তা শ্রমিকদের সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাকে বাধাগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উত্তর-আধুনিকতাবাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব হলো পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির উত্থান। মার্কসবাদী শ্রেণি বিশ্লেষণকে প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারা ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, লিঙ্গ ইত্যাদি ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলাকে উৎসাহিত করেছে। বাংলাদেশে এই প্রবণতার ফলাফল হয়েছে অত্যন্ত ক্ষতিকর। একদিকে যেমন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের আন্দোলনসমূহ জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় গৃহীত ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে ক্রমাগত দুর্বল করে তুলছে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রভাব আরও গভীর। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগসমূহে উত্তর-আধুনিক তত্ত্বসমূহের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এই তত্ত্বসমূহ শিক্ষার্থীদেরকে ইতিহাসের গতিধারা, সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং সমষ্টিগত সংগ্রামের গুরুত্ব সম্পর্কে সংশয়ী করে তোলে। বিশেষ করে মার্কসবাদী সাহিত্য ও তত্ত্বকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বা ‘একচ্ছত্রবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, পপুলার কালচারে উত্তর-আধুনিকতার প্রভাব আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করছে। টেলিভিশন নাটক, সিনেমা এবং সঙ্গীতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, ভোগবাদ এবং আত্মকেন্দ্রিকতার বার্তা সম্প্রচারিত হচ্ছে, যা সমষ্টিগত সংগ্রামের ধারণাকে দুর্বল করছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় উত্তর-আধুনিকতাবাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রভাব হলো রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণার পরিবর্তন। উত্তর-আধুনিক চিন্তাধারা রাষ্ট্রকে একটি দমনমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে এর ভূমিকা সীমিত করার পক্ষে যুক্তি দেয়। বাংলাদেশে এই ধারণা ১৯৯০-এর দশক থেকে বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়, যখন রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলো ক্রমাগত খর্ব করা হয় এবং সেগুলোর স্থলে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে বাংলাদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ বেসরকারি সেবা কেবলমাত্র সামর্থ্যবানদের জন্যই সহজলভ্য।
মার্কসবাদী ভবিষ্যৎ
আইজাজ আহমেদের বিশ্লেষণ কাঠামোয় উত্তর-আধুনিকতাবাদকে আমরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংকটকালীন সময়ের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখতে পাই। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে পশ্চিমা বিশ্বে উদ্ভূত এই চিন্তাধারা শোষণমূলক সম্পর্কগুলোকে আড়াল করতে সক্ষম হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সামাজিক সংকটের মৌলিক কারণগুলোকে চিহ্নিত করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রভাব বিশেষভাবে ক্ষতিকর হয়েছে, কারণ এটি জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠা ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক চেতনাকে ক্রমাগত দুর্বল করে তুলেছে। শ্রেণিসংগ্রামের ধারণাকে অস্পষ্ট করে দিয়ে, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে উৎসাহিত করে এবং রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে উত্তর-আধুনিকতাবাদ বাংলাদেশে পুঁজিবাদী শোষণের কাঠামোকে সুদৃঢ় করতে কাজ করেছে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো মার্কসবাদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের দিকে প্রত্যাবর্তন। মার্কসবাদ আমাদেরকে শেখায় যে সমাজের মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব কেবলমাত্র উৎপাদনের উপকরণের সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হলো কৃষিতে বৈপ্লবিক ভূমি সংস্কার, শিল্পখাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক সেবাসমূহের সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ রোধ। কিন্তু এই অর্থনৈতিক রূপান্তরই শেষ কথা নয়। সমান্তরালভাবে প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের, যা সমাজের চিন্তা-চেতনায় আমূল পরিবর্তন আনবে। এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কেন্দ্রে থাকবে ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সমষ্টিগত কল্যাণের আদর্শ।
বাংলাদেশের মার্কসবাদী আন্দোলনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উত্তর-আধুনিকতাবাদের বিভ্রান্তিকর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে একটি সুসংহত রাজনৈতিক কর্মসূচি উপস্থাপন করা। এই কর্মসূচি হতে হবে বাস্তবসম্মত, কিন্তু আদর্শিকভাবে অনমনীয়। একদিকে যেমন শ্রমিক-কৃষকের দৈনন্দিন সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে, অন্যদিকে সামাজিক রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। জনগণের জনযুদ্ধরূপে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারে বামপন্থীদের লড়াই কেবলই রাজনৈতিক নয়, এটি একইসঙ্গে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতারও লড়াই।
একটি শ্রেণিহীন, শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদেরকে মার্কসবাদের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে আস্থা রাখতে হবে এবং আপেক্ষিকতাবাদী বিভ্রান্তি পরিহার করতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সত্যিকারের সামাজিক পরিবর্তন কখনই আংশিক সংস্কারের মাধ্যমে আসে না, তা আসে মৌলিক রূপান্তরের মাধ্যমে। বাংলাদেশের জনগণের সামনে এই মৌলিক রূপান্তরের পথই হলো মার্কসবাদী পথ—যুক্তি, বিজ্ঞান ও ন্যায়ের পথ।



মন্তব্য নেই
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.