গণমাধ্যম না ধনমাধ্যম
সর্বকালের মানুষের বাঁচার জন্য দরকার খাবার এবং খবর। কেবল পেটের খাবার হলেই চলে না, মনের খাবারই চাই। আর দেহ ও মনের খাবারের সন্ধান এনে দেয় খবর। এভাবেই খবর, তথ্য তথা সংবাদ যোগান দিতেই সংবাদপত্রের জন্ম। নানা সংবাদ প্রদানকারী এই সংবাদপত্র এখন সভ্যতার অবিচ্ছেদ অংশ। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমাজের কল্যাণের জন্য জনমত গঠনের ক্ষেত্রে সংবাদপত্র পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এই বিশেষ ভূমিকার দরুন সংবাদপত্র অর্জন করেছে নানা খেতাব—‘জনগণের আদালত’, ‘মানুষের বিবেক’, ‘গণতন্ত্র ও গণঅধিকারের পাহারাদার’, ‘সমাজের দর্পণ’ ইত্যাদি। সেজন্য বিচার বিভাগ, জাতীয় সংসদ ও নির্বাহী বিভাগ—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই মূল স্ত^ম্ভগুলির সঙ্গে সংবাদপত্র ৪র্থ স্তম্ভ তথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী স্তম্ভ রূপে বিবেচিত। সংবাদপত্রবিহীন সমাজের কথা আজ আমরা ভাবতেও পারি না। বস্তুত রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি—এমনকি পরিবার কেউই সংবাদপত্রের প্রত্যক্ষ—পরোক্ষ প্রভাবের বাইরে নয়। প্রতিদিন নাগরিক জীবনের শুরুই হয় সংবাদপত্র পাঠের মধ্য দিয়ে।
এ জন্ম বোধ হয় ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল মন্তব্য করেছেন—‘আমি পার্লামেন্টে বসে কেবল দু’দলের (বেসরকারী ও বিরোধী দল) সদস্যদের মতামত শুনতে পারি। কিন্তু দল মত নির্বিশেষে সব মানুষের মতামত জানতে পারি সংবাদপত্রে’। ভারতের জওহরলাল নেহেরু প্রতিদিন কাজের শুরুতে জাতীয় দৈনিকের প্রয়োজনীয় পেপার কাটিং চাইতেন। মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তৎকালীন বোম্বে শহরের সবার আগে দৈনিক পত্রিকা পাবার জন্য হকারদের বিশেষ বকশিস দিতেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দৈনিক পত্রিকা নিয়েই বাথরুমে যেতেন।
তথ্য প্রযুক্তির বর্তমান অবিশ্বাস্য অগ্রগতির প্রেক্ষিতে ভাবা হয়েছিল যে, সংবাদপত্রের দিন শেষ। কম্পিউটার, ই-মেইল, ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার—এসব এখন সংবাদপত্রের স্থান দখল করবে। এমন ঘোষাণাও শোনা গিয়েছিল যে—বিশ্ব একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশের পর সংবাদপত্র আর আলোর মুখ দেখবে না। কিন্তু সকল জল্পনা কল্পনার অবসর ঘটিয়ে সংবাদপত্র আজও দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছে।
তবে সংবাদপত্রকে আজকের অবস্থার পৌঁছাতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ইতিহাস জানায়, প্রাচীন গ্রীস নগরীতে নাগরিকরা তাদের দাবি দাওয়া লিখতো এক ধরনের দেওয়াল পত্রে। মোগল সম্রাটরা হাতে লেখা সংবাদপত্র প্রকাশ করতেন এবং এ জন্য তাদের সাংবাদিকও ছিল। তবে এখানে রাজকীয় খবরই প্রধানত ছাপা হতো। অবশ্য সংবাদপত্রের প্রকৃত যাত্রা শুরু মুদ্রন কৌশল প্রচলনের মাধ্যমে। প্রথমে আনুমানিক ৮৬৮ সালে চীনে ছাপাখানায় বই ছাপা হয় এবং পরে ১৪৫০ সালে জার্মানির গুটেনবার্গ ছাপাখানা উদ্ভাবন করেন। এই অগ্রগতির ফসল হল সংবাদপত্র। ১৫০৯ সালে থমাস রেনাল্ডো নামক এক ইংরেজের দ্বারা প্রথম ছাপা কাগজ প্রকাশিত হয়। প্রথম সংবাদপত্রের প্রকাশ ঘটে ১৬০৯ সালে জার্মানিতে, ১৬২২ সালে ইংল্যান্ডের লন্ডনে এবং আমেরিকায় ১৬৯০ সালে। এসব সংবাপত্র ছিল সাপ্তাহিক বা মাসিক এবং বেশিরভাগ খবর থাকতো বিশেষ গোষ্ঠীর। ১৭০২ সাল লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘দি উইকলি নিউজ’ হল প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র। আমাদের এ অঞ্চলে সংবাদপত্র প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ১৭৮০ সালে। আর ১৮৩৯ সালের ১৪ জুন থেকে ‘সংবাদ প্রভাকর’ নামক প্রথম বাংলা দৈনিক এর যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু সংবাদপত্রের এই যাত্রাপথ মোটেই মসৃন ছিল না। কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, সামাজিকভাবেও সংবাদপত্রের উপর জন্ম থেকেই বাধার খড়গ নেমে আসে।
প্রথম দিকে ১৬৩২ সাল পর্যন্ত নানা বিধি নিষেধের কারণে সংবাদপত্রে কেবল বিদেশী খবরই ছাপা হতো। দেশী খবর ছাপানো যেত না। পরে দেশী খবর যা আসতো, তা আসলে ইংল্যান্ডের সংসদের বিবরণ। ১৬৪১ সালে বিধি নিষেধ উঠে যায়। গৃহযুদ্ধের কালে (১৬৪২) ইংল্যান্ডে মানুষর মধ্যে সংবাদপত্রের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে কিছুদিনের মধ্যে প্রায় ২০০ সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরে আবার সরকারি সেন্সরের খড়গ নেমে আসে এবং ২টি সরকারি সংবাদপত্র ছাড়া বাকী সব বন্ধ হয়ে যায়। ১৬৬০ সালের দিকে সংবাদপত্রের উপর সরকারি দমন নীতি কিছুটা কমে আসে। তৎকালীন ইংল্যান্ডের রানী জ্ঞান অনুরাগী হওয়ায় সংবাদপত্র কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে।
আমাদের এই উপমহাদেশের সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ আতুড় ঘরেই মারা যায়। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারী উইলিয়াম বোল্টস সংবাদপত্র প্রকাশের আগ্রহ পোষণ করা মাত্রই তাকে ইংল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়। ভারতে প্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’ প্রকাশকারী জেমস অগাষ্টাস হিকিও অনেক নির্যাতন ভোগ করেন। সংবাদপত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখায় তার বেঙ্গল গেজেট শুরুতেই শাসক গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে। তাঁর নামে মামলা হয়। ডাকঘরের মাধ্যমে পত্রিকা বিলির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সৈন্যরা তার প্রেস তছনছ করে। পরে ৮০ হাজার টাকায় জামিন লাভ করলেও অর্থের অভাবে জামিন নিতে না পারায় তিনি জেলে যান। জেল খেটে সব দিক থেকেই তিনি দেউলিয়া হন। পরে হিকির আর্দশে অনুপ্রাণিত আরো দুজন ইংরেজ এ ধরনের উদ্যোগ নিলে তাদেরও জোর করে দেশে ফেরৎ পাঠানো হয়।
এভাবে ইউরোপ আমেরিকার মত এ দেশের সংবাদপত্র শুরু থেকেই অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছে। শাসক গোষ্ঠীর, ক্ষমতাবান শ্রেণীর নানা দমন মোকাবেলা করেছে। ১৭৯৯ সাল থেকে বলবৎ সেন্সর প্রথা বারবার সংবাদপ্রত্রের টুঁটি চিপে ধরেছে। এখনও এই কালো আইন সংশোধিত আকারের বহাল রয়েছে। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনামলে শাসক গোষ্টীর এ অঞ্চলের সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছে বহুবার। পাকিস্তান আমলেও অনেক বার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিই ঘটেছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও দুঃখজনকভাবে এই অপচেষ্টা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি কয়েকবার।
কিন্তু সমস্ত বৈরীতা পরাভূত করে সংবাদপত্রের জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। জন্ম থেকে আজ অবধি সংবাদপত্র স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় মুক্তি, গণতন্ত্র, মানবতা, গণঅধিকার অর্জনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। সত্য, সুন্দর, শুভ ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তবে বিগত কয়েক দশকে সংবাদপত্রের মুদ্রণ কৌশল, ব্যয় ভার, পুজি বিনিয়োগ, তথ্য প্রযুক্তি—এসব ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। সংবাদপত্রের মালিকানার ধরনও পাল্টে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে সংবাপত্রের চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের উপর। এসবের কারণে সংবাদপত্রের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। সাংবাদিকের নিরাপত্তা ঘরে-বাইরে সবখানেই বিপন্ন হচ্ছে। নিরপেক্ষ, সৎ, নির্ভিক, জনদরদী, নীতিবান সাংবাদিকরা এখন সন্ত্রাসের শিকার এবং নানা হুমকির সম্মুখীন। এমনকি সাংবাদিকতা হারাছেন তাদের তথ্য সংগ্রহের স্বাধীনতা। ২০০০ সালেই তাই আন্তর্জাতিক জার্নালিষ্ট ফেডারেশনের (ওঋঔ) সভাপতি ক্রিস্টোফার ওয়ারেন বলেছেন—‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার উপর চ্যালেঞ্জ আসছে তার মালিকদের কাছ থেকে, আগে যেমন আসতো, তেমন সরকারের কাছ থেকে নয়। ...গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বের আকর্ষণ যতটা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার সঙ্গে নিরাপত্তা, সাংবাদিকদের শক্তি এবং নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা যেভাবে বিকেশিত হওয়া উচিৎ ছিল সেভাবে হয়নি। বরং গত এক দশকে বা তার কিছু বেশি দিন ধরে দেখা গেল যে, আমাদের অধিকাংশ মালিকরা সাংবাদিকদের অধিকার খর্ব করেছেন, তাদের নিরাপত্তাহীনতার দিকে নিয়ে গেছেন এবং যৌথভাবে আমাদের সংগঠিত হবার ক্ষমতাকে খাটো করে দেখেছেন’।
আজকে দেশে-বিদেশের বৃহৎ আকারের কর্পোরেট পুঁজি শাসিত মূলধারার সংবাদপত্রগুলির কি এই দায় থেকে মুক্ত। আসলে সংবাদপত্র এখন তার বিকাশের তুঙ্গে উঠলেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী। কেননা অন্যতম গণমাধ্যম হিসাবে সংবাদপত্র কি গণমুখী নাকি, ধনমুখী হয়ে উঠছে—এই প্রশ্ন এখন উঠছে। হাল আমলের শীর্ষ মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি একই আশংকাই ব্যক্ত করেছেন—“যখন গণমাধ্যম ব্যবস্থা ব্যক্তিগত স্বেচ্ছাচারীদের হাতে চলে যায় তখন তা গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। আজকের সমাজে লগ্নিপুঁজি হলো আসল শক্তি। সমস্ত বাণিজ্যিক সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেল এদের দ্বারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত।” এই নয়া সংকটকে নিয়েই আজ সংবাদপত্র পথ চলছে। আপাতত পরিত্রাণহীন মনে হলেও, এ সংকট কিন্তু সমাধান-অযোগ্য নয়। এজন্য দরকার নুতন চিন্তা, নুতন চেতনা, নুতন দিশা। সেই বিকল্প নবজারগনের প্রতীক্ষায় এখন সংবাদপত্র। নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আত্মপ্রকাশ ইতোমধ্যে সেই লক্ষণকেই পরিস্ফুট করেছে। অতীতের মহৎ ঐতিহ্যে স্লাত হয়ে এই নুতন পথ বিকল্প ধন নয়, গণকেই আবার সংবাদপত্রের কেন্দ্রে স্থাপন করবে।


মন্তব্য নেই
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.