নারীর ‘নিজের মতো করে ভাল থাকার’ অর্থনৈতিক রাজনীতি
সম্প্রতি প্রথম সারির এটি সংবাদপত্রের একটি সংবাদ সবাই হয়তো খেয়াল করে থাকবেন: ‘ট্রাম্পের পার্টিতে নীতা আম্বানি পরলেন ২০০ বছরের পুরনো গহনা।’ সংবাদের শিরোনাম ভিন্ন হলেও অন্যান্য সব পত্রিকাই ট্রাম্পের পার্টিতে নীতা আম্বানির উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ করেছে।
সংবাদটি দেখে খটকা লাগে। কেন মুকেশ আম্বানি বা অন্য কোনো বিষয় না হয়ে নীতা আম্বানির সঙ্গে ট্রাম্পকে নিয়ে সংবাদ। কৌতুহলি মন নিয়ে আম্বানি এবং ট্রাম্পের সম্পর্ক খুঁজতে থাকি। সাদা চোখে আমরা দু’জনের ব্যবসায়ী যোগসূত্র খুঁজে পাই। এখন প্রশ্নটি হল যেহেতু দু’জনই ধনকুবের তাহলে সংবাদ শিরোনাম বা সংবাদে প্রাধান্য পাওয়ার কথা মুকেশ আম্বানির। কিন্তু নীতা আম্বানি কেন? তিনি তো আম্বানি পরিবারের ঘরণী-মাত্র। ট্রাম্পের পার্টিতে মুকেশ আম্বানি না হয়ে নীতা আম্বানি কেন মিডিয়ার লাইম লাইটে? সংবাদমাধ্যমগুলো কেন ট্রাম্পের পার্টির খবরে নীতা আম্বানিকে গুরুত্ব দিচ্ছে? কারণ, মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মধ্যে অন্যতম হলো—বিনোদন এবং গণমাধ্যম ব্যবসা। অন্যদিকে, ট্রাম্প বিনোদন জগতের একজন বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব। বিনোদন জগতে তাঁর খ্যাতি তৈরি হয় প্রথমে মিস ইউনিভার্স, মিস ইউএসএ, মিস টিন ইউএসএ সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার আয়োজক সংস্থার মালিক হিসেবে। এরপর তিনি এনবিসি রিয়েলিটি শো 'দ্য অ্যাপ্রেন্টিস' এর স্রষ্ট্রা হন। ট্রাম্প এবং রিলায়েন্স গ্রুপরা বিনোদনের কন্টেন্ট মানে বিষয়বস্তু নির্মাণ করেন। আবার সেই বিষয়বস্তু বা কন্টেন্টগুলো নিজেদের গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচার ও প্রসার চালায়। প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমেই সমাজে সৌন্দর্যের নতুন নতুন ন্যারেটিভ বা বয়ান নির্মিত হয়। দৈহিক সৌন্দর্যই যে প্রকৃত সৌন্দর্য, সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র, দৈহিক সৌন্দর্য আত্মবিশ্বাস বাড়ায় প্রভৃতি বয়ান নির্মাণ করে ট্রাম্প এবং আম্মাানিরা টিন এজার থেকে মধ্যবয়সীদের বহিরাবরণের সৌন্দর্য চর্চায় বুঁদ করে রাখার বিষয়ে সফল হয়েছেন। বাকি ছিল ষাটোর্ধ্ব নারীদের বাজারে প্রবেশ করানো। এই ষাটোর্ধ্ব নারীদের বাজারে নিয়ে আসার জন্য যে কৌশল অবলম্বন করছে এর মধ্যে প্রথমটি হলো—নীতা আম্বানিদের মতো কিছু ষাটোর্ধ্ব নারীদের আইকন নির্মাণ করা। এবং প্রতিনিয়ত তাদের প্রচার চালিয়ে যাওয়া। গোটা বিশ্ব দেখল, ২০২৪ সালে ভারতের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলের বিয়ে। ২/৩ মাস ধরে চলে বিয়ের এই আনুষ্ঠানিকতা। এই বিয়েতে বর-কনে, বিয়ের মেনু, উপহার, সেলিব্রেটি তারকাদের উপস্থিতির খবরের চেয়েও প্রধান আলোচনা বা মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছিল নীতা আম্বানিকে। নীতা আম্বানি হচ্ছেন মুকেশ আম্বানির স্ত্রী, ৬০ বছর বয়সী সুন্দরি নারী। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে নীতা আম্বানি সুন্দরী, তবে তাঁর মতো এমন সুন্দরী ভারতে ঢের আছে। মুকেশ আম্বানির স্ত্রী না হলে আলাদা করে তাঁকে চেনার কোনো কারণই ছিল না। কিন্তু নেটিজেনরা মুকেশ আম্বানি সম্পর্কে শুধু এটুকুই জানে যে, তিনি হচ্ছেন ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী। কিন্তু নীতা আম্বানির পানি পানের খরচ, শরীর চর্চা থেকে শুরু করে বাথরুমে কত সময় কাটান সবকিছুর আদ্যোপান্ত নেটিজেনরা ওয়াকিবহাল।
আর একটি কৌশল হচ্ছে, বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার মঞ্চে ষাটোর্ধ্ব নারীদের তুলে ধরা। নীতা আম্বানিকে যখন মিডিয়া সামনে বেশি বেশি হাজির করা হচ্ছে, ঠিক তখনই ৬০ বছর বয়সী আলেজান্দ্রা মারিসা রদ্রিগেজকে মিস ইউনিভার্স নির্বাচিত করা হয়। এটা মোটেও কাকতালীয় ঘটনা নয়। কারণ ২০২৩ সাল থেকে মিস ইউনিভার্স প্রতিযেগিতায় বয়সের সীমারেখা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন ১৮ বছরের বেশি যেকোনো নারী এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। পূর্বে অনূর্ধ্ব ২৮ অবিবাহিত এবং সন্তানহীন নারীরাই শুধু এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারতেন। এখন ৮০ বছরের মৃত্যুপথযাত্রী নারীও এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তবে, শর্ত হচ্ছে দৈহিক সৌন্দর্য বজায় রাখতে হবে। ২০২৩ সালের পর থেকেই কয়েকটি দেশের সুন্দরী প্রতিযোগিতায় দেখলাম, বিজয়ী হচ্ছেন বয়স্ক নারীরা। ৮০ এবং ৮১ বছর বয়সী নারীরাও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিজয়ী হচ্ছে। রাতারাতি সব প্রবীণ নারীই সুন্দরী হতে শুরু করেছে। সেই ১৯৯৪ সালের মতো। এশিয়ার বাজার ধরার জন্য হঠাৎ করে সব সুন্দরী ভারতে জন্ম নিতে শুরু করে। ঐশ্বরিয়া রায়কে দিয়ে উপমহাদেশের প্রথম বিশ্বসুন্দরীদের যাত্রা শুরু হয়। তা অনেক বছর চলার পর সব সুন্দরীরা আবার আফ্রিকাতে ভীড় করতে থাকে।
মানুষের গড় আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নারীরা এখন উপার্জনক্ষম। বিশ্বের টিন এজার থেকে মধ্যবয়সী নারীদের বিনোদন বাজারে প্রবেশ করানো শেষ। বাদ আছে ষাটোর্ধ্ব নারীরা। এই কারণে আমেরিকা ভারতসহ বিশ্বের বিনোদন জগতের মালিকদের নজর এখন বয়স্ক নারীদের দিকে। প্রবীণ নারীদের সৌন্দর্য ধরে রাখা বা বৃদ্ধির জন্য বাজারে প্রচুর প্রসাধন সামগ্রী এবং ইন্ড্রাষ্ট্রি তৈরি হয়েছে। আগে সৌন্দর্য ধরে রাখার চেষ্টা ও নিজেকে পরিপাটি করে অন্যের সামনে উপস্থাপন করার চর্চা শুধু অল্প বয়সীদের মাঝেই বেশি প্রচলন ছিল। কিন্তু বর্তমানে বয়স্ক নারীরাও নিজেদের দৈহিক সৌন্দর্যের বিষয়ে সচেতন। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে নারীরা বেশি বয়স পর্যন্ত উপার্জনক্ষম এবং কর্মক্ষম থাকছে। যেহেতু তারা উপার্জনক্ষম এবং কর্মক্ষম ফলে তারা বাজারে প্রবেশ করছে। প্রবীণ নারীরা দৈহিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে গেলে তাদের নিয়মিত নিজের দেহের প্রতি খেয়াল রাখতে হচ্ছে, প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহারসহ বিউটি পার্লারকে জীবনের সাথী করে তুলতে হচেছ এবং 'নিজেন মতো ভালো থাকতে' জানতেও হচ্ছে। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় ষাটোর্ধ্ব নারীকে বিজয়ী করা এবং গণমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে বয়স্ক নারীদের 'নিজের মতো ভালো থাকার' প্রতি গুরুত্ব দেবার অর্থনৈতিক দিকটি না হয় এতক্ষণ বুঝলাম। কিন্তু এর রাজনৈতিক দিকটি কী?
এই যে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নারীর বয়স সীমা তুলে দেওয়া হলো এবং ষাটোর্ধ্ব নারী মিস ইউনিভার্স হলো, এগুলো তো চরম বিস্ফোরক সিদ্ধান্ত! এই পদক্ষেপগুলো কি সত্যিই নারীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে সহায়ক? অনেকে হয়তো বলবে, বয়স্ক নারী যদি নিজের দৈহিক সৌন্দর্যের প্রতি মনোযোগী হয় তবে সমস্যা কোথায়? নারী নারীর ভিতরে স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্বা জাগিয়ে তুলছে—এতে তো নারীর খুশি হবার কথা। বয়স্ক নারীর সৌন্দর্য সচেতনতায় অস্বস্তির বিষয়টি হলো, নারীর শারীরিক ও মানসিকভাবে কর্মক্ষম ও সুস্থ থাকার প্রচেষ্টা এক বিষয়, আর দৈহিক সৌন্দর্য ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নিরন্তর পরিশ্রম বা মনোযোগ দেওয়া ভিন্ন বিষয়। দুটোতে রয়েছে বিস্তর ফারাক। আপাত দৃষ্টিতে এই পদক্ষেপকে খুব নারীবান্ধব ও নিরীহ মনে হলেও ব্যাপারটি আসলে ততটা সরল ও সাবলীল নয়।
একজন নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, ৬০ বছর বয়স মানে জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া। ৬০ বছর বয়সে এসে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সামাজিক যোগাযোগের সক্ষমতার সমন্বয়ে সে একজন ঋদ্ধ মানুষে পরিণত হয়। প্রকৃতপক্ষে, সমাজ-রাষ্ট্রকে কিছু দেওয়ার উপযুক্ত সময়ই তখন। কারণ সন্তানরা বড় হয়, কর্মজীবন বা সাংসারিক জীবনের ব্যস্ততা কমে কিছুটা ফুরসত মেলে ষাটোর্ধ্বদের। ব্যস্ততা বা পারিবারিক দায়বদ্ধতার কারণে যে নারী সমাজ-রাষ্ট্র, প্রতিবেশী-আত্মীয়-পরিজনের দিকে এতদিন নজর দেওয়ার সুযোগ পাননি, ষাটোর্ধ্ব বয়সই হচ্ছে এসবের সঙ্গে গভীর সখ্যতার উপযুক্ত সময়। কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে মধ্য বয়সী বা বয়স্ক নারীদের নিজের মতো করে থাকার নানান উপদেশ, পরামর্শ চোখে পড়ছে ইদানীং। বলা হচ্ছে, অন্যের খুশির কথা না ভেবে নিজের আনন্দ বা যা করতে ভালো লাগে তাই করো। সেই ভালো লাগার বা নিজের মতো থাকা বলতে যে উপদেশ বা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো হল—মন খারাপ হলে একা কোথাও ঘুরতে যাও মেয়ে, রেস্টুরেন্টে খাও, বাগান কর, পার্লারে গিয়ে স্পা নাও (ক্ষেত্র বিশেষে পরকীয়ার কথা বলা হয়) প্রভৃতি। নারীদের এই কর্মকাণ্ডগুলো খারাপ বা এগুলো করা যাবে না—প্রশ্নটি আসলে সেটি নয়। খটকা লাগে তখনই যখন বলা হয় না—নারী তোমাদের যোগ্যতা ও সার্মথ্য অনুযায়ী সমাজে অবদান রাখ। এই যে পার্লার, রেস্টুরেন্ট, পর্যটন স্থান এসবই তো সামাজিক সম্পদ। যেমন: একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে কি পার্লারের বিল্ডিং গড়ে, প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুত করে পুরুষ বা নারীকে সজ্জিত করা সম্ভব? মূর্ত ও বিমূর্ত কত মানুষের শ্রম নিহিত থাকে প্রতিটি জিনিসে, সেবায়। সেই মূর্ত ও বিমূর্ত শ্রম ও সহযোগিতার কথা থাকে না 'নারীর নিজের মতো করে ভালো থাকার' উপদেশ ও পরামর্শে। সমাজ-রাজনীতি-রাষ্ট্রের যেকোনো দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হচ্ছে নারীদের। সমাজ-রাজনীতি থেকে বিযুক্ত করে নারীর নিজের মতো করে ভালো থাকার বয়ানকে খুব সাধুবাদ জানাচ্ছেন শিক্ষিত নারীরা এবং নারীবাদীরা। নারীকে নিজের মতো করে থাকতে বলার অর্থ হচ্ছে, নারীকে সমাজ-রাজনীতি- রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করা। অমিত সম্ভাবনার ষাটোর্ধ্ব নারীকে বিরাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করানো হচ্ছে। নারীর ভিতর ব্যক্তিসত্তা জাগিয়ে তুলছে। অন্য সবকিছু বাদ দিলাম, ন্যূনতম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে দিক্ষিত হবারও সব পথ রুদ্ধ করছে নারীর। ব্যক্তিসত্তা হচ্ছে সেই বিষয় যা ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক প্রভাবমুক্ত অস্তিত্ব। ব্যক্তিসত্তার অস্তিত্বের ভেতরে সমাজ নেই, নেই কোনো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। বহিরাবরণের সৌন্দর্য প্রাকৃতিক দৃষ্টিনন্দন। বহিরাবরণের সৌন্দর্য অনুভব বা উপলব্ধির বিষয় নয়। কিন্তু ভেতরের সৌন্দর্য মানে ব্যক্তিত্ব, এটি অনুভব বা উপলব্ধির। ব্যক্তির ভেতরের সৌন্দর্য তৈরি হয় শিক্ষা, পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিকায়ণ, সাংস্কৃতিক চর্চায়। কিন্তু নারীর শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব গঠনে পুঁজিবাদ কখনোই বিনিয়োগ করে না। কারণ নারীর আত্মমর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব থেকেই জন্ম নিতে পারে সত্যিকারের বৈপ্লবিক চেতনার। তাই নারীর আত্মমর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব পুঁজিতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র এবং পুরুষতন্ত্র তিন মাধ্যমই ভয় পায়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বিরাজনীতিকরণেরও একটি রাজনীতি আছে। এখন নারী কোন পথে হাঁটবে তুমি, সিদ্ধান্ত নাও।



মন্তব্য নেই
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.