নিম্নবর্গের খতিয়ান: আত্মোপলব্ধি ও আত্মপ্রতারণা
এই উপমহাদেশের ইতিহাস-চর্চায় ইদানীং নিম্নবর্গের ভূমিকা বেশ প্রাধান্য পাচ্ছে। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক বাস্তবতার বিচার-বিবেচনায়, ও উত্তর-ঔপনিবেশিক মননের প্রেক্ষাভূমির অন্বেষণে। আগে ইতিহাস-চর্চায় সমাজে নিচুতলার মানুষের কথা আদৌ ওঠেনি, এমনটি বলা অবশ্য ঠিক নয়। ইতিহাস ঘটনারাশির কালানুক্রমিক বিবরণ মেলে ধরে। একটির সঙ্গে অন্যটির যোগসূত্র খোঁজে। সব মিলিয়ে প্রবহমান অতীতের, এবং অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য গতিপথের ছবি দাঁড় করাতে চেষ্টা করে।
ছবি একটাই হবে, এমন কোনো কথা নেই; হতে পারে অনেক। কারণ ঘটনারাশি বহুমুখী। কখনও কখনও এক মুখের বিপরীতে অন্য মুখ। প্রত্যেকটি সক্রিয়। এক ছবিতে সবগুলো না-ও আসতে পারে। নির্বাচনের প্রশ্নও এড়ানো যায় না। ইতিহাস যিনি বিচার করতে চাইছেন, তাঁর নির্বাচন। ফলে তিনিও একটা পক্ষ হয়ে যান। তাতে বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্ন দিকে ঝুঁকে পড়া খুবই সম্ভব। ঘটেও তেমন। এই রকম কোনো-কোনোটিতে নিচুতলার মানুষের ছবি যে আগে যথেষ্ট উজ্জ্বল করে আঁকা হয়নি, তা নয়। তবে মূলধারা সবসময়ে অনুসরণ করেছে ক্ষমতার চলমান কেন্দ্রাভিমুখিনতাকে। তার জমাটবাঁধা অবস্থা যেমন পাই, তেমনি পাই ভেঙে চৌচির হওয়া অবস্থাও। ভরকেন্দ্রে শক্তি-সমন্বয় না ঘটলে তা ছড়িয়ে যায়। এই ছড়িয়ে যাওয়ার গতিপ্রকৃতিও ইতিহাসের মূলধারায় উঠে আসে। এবং কেন্দ্রের স্বীকৃত চেহারা ফুটে উঠলে সেখান থেকে হয় কেন্দ্রাতিগ বিচ্ছুরণও। এই কেন্দ্র যে শুধুই রাজশক্তি, তা নয়; যদিও রাজশক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রত্যক্ষের সীমা সবটা ভরে রাখে। প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সমাজ-মানুষের জীবনধারণ ও জীবনযাপন চিন্তা ও কর্মের দ্বান্দ্বিক বিকাশের পথে ক্রমশ মজবুত একটা আকার পেতে থাকে। ওই পরিবেশ মানব-পরিবেশও বটে। ভেতরে-বাইরে তার যোগাযোগ। ফলে স্বয়ং তা পরিবর্তন মেনে নেয়। প্রকৃতিতেও অনিশ্চয়তা থাকে। তবে পৃথিবীর আবর্তনে-পরিক্রমণে কোনো বিশেষ জায়গায় তার প্রকাশমানতার এক ধারাবাহিক প্রত্যাশিত রূপ মানবচেতনায় সুনির্দিষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এরাও মানুষের ব্যক্তি ও সমষ্টিভাবনায় নির্ভুল ছাপ ফেলে। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবির্ভাব ঘটে চিন্তা নায়কদের। ঘটে সর্বজনমান্য কর্মবীরদেরও। তাঁদের অবদানও ওই ভাবনাপ্রবাহে দিক নির্দেশনার কাজ করে। সব মিলিয়ে তারা গণমানুষের বিশ্বাসে ও আচরণে যে বিশেষ একমুখিনতা—অবশ্যই নিশ্চিতভাবে স্থির নয়, যদিও স্থিতিশীলতার অভিলাষী—আনে, তাও একধরনের কেন্দ্রীয় চারিত্র্যের প্রকাশ ঘটায়। কেন্দ্রের ধারণা, অতএব, বহুমাত্রিক। তা সম্পূর্ণত স্বায়ত্তাধীন, এমনও বলা যায় না। দেওয়া-নেওয়ার পালা তার ওপরে-নিচে সর্বত্র। যখন মনে হয় চুপচাপ, তখনও। এমনকি থাকে দূরান্বয়ী সম্পর্কের টান। আপন বৃত্তকে তা অতিক্রম করে। প্রভাব তার সুদূরপ্রসারী। অন্তর্জগতের রেখাচিত্রে তার ছাপ পড়ে অব্যর্থ। এই সব মনে রেখে, এবং এদেরই প্রেক্ষাপটে নিচুতলার মানুষের কথা এতদিন ইতিহাসে আমরা শুনে এসেছি। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রায়শই কেন্দ্রভূমির ছত্রছায়ায়। যদি কখনও তারা কেন্দ্রে পা রাখে, অথবা রাখতে চায়, তখনও। কারণ কেন্দ্রের নির্ধারণী ক্ষমতাকে তারা অস্বীকার করে না; বরং সেখানেই তাদের নিজস্ব ছাপ তারা রাখতে চায়। ইতিহাসের কাঠামো ফলে অবিকৃতই থাকে।
এইভাবে ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতায় কীভাবে নতুন নগরকেন্দ্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, কীভাবে রেললাইন পাতায় শহর-গ্রাম সব এক জালে বাঁধা পড়ে, কেমন করে গ্রাম ক্রমশ নিঃস্ব হতে থাকে, গ্রাম ছেড়ে গরিব মানুষ এবং ভাগ্যান্বেষী মানুষ কতটা শহরমুখো হয়, পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণা কী করে সারাদেশে ছড়ায়, নানা উপাদানে—কোনো-কোনোটা আবার পরস্পরবিরোধী-জাতীয়তাবোধ পরিবর্তিত আঙ্গিকে কীভাবে আকার পেতে থাকে, কেন্দ্রের মানুষ-প্রান্তের মানুষ, সবাই কীভাবে তাতে সাড়া দেয়, তর্কে-বিতর্কে-দ্বন্দ্বে-মীমাংসায় পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুরপন্থা কীভাবে তারা পাড়ি দিয়ে চলে, যুগ যুগ ধরে অন্ত্যজ-অবহেলিত যারা, যাদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে থাকে কালের ঢাকনা দেওয়া কৃষ্ণগহ্বরের অন্তরালে, তারা ওই যাত্রায় কতটা শামিল হয়, প্রাপ্তিতে-বঞ্চনায় কোথায় তারা দাঁড়ায়, এগুলো কমবেশি আমাদের জানা হয়ে যায়। অন্তত জানার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো সংশয় থাকে না। এতে ইতিহাসের যে ছবি স্পষ্ট হতে থাকে, তাতে নিচুতলার মানুষদেরও চিনে নেওয়া যায়। নিজেদের সকর্মক চেহারায় যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি কেন্দ্রভূমির টানে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হয়ে। তবু তারা অদৃশ্য থাকে না। অবশ্য ইতিহাসের দরবারে আসন যা পাতা থাকে, তাতে তারা খুব বেশি সামনেও আসতে পারে না।
এই যে তারা সামনে আসতে পারে না, এতে কি সার্বিক বিচারে তারা অপাঙক্তেয় হয়ে যায়? অথবা, অন্যভাবে বললে, উপমহাদেশের আদর্শ স্বপ্নকল্পনাকে, তার কাক্সিক্ষত গতিরেখাকে তাদের পিছিয়ে পড়া কি কোনোভাবে বিপর্যস্ত করে? কেন্দ্রভূমিতে রচিত রাষ্ট্রের কল্পসত্যের সঙ্গে তাদের চেতনায় লালিত কল্পসত্যের কি গভীর কোনো বিরোধ কিংবা একে অন্যে প্রত্যাখ্যান নীরবে কাজ করে চলে? এবং এই ব্যবধানই কি গোটা জনগোষ্ঠীকে তার প্রত্যাশিত ভাগ্যরেখা থেকে বারবার বিচ্যুত করে তাকে হতাশায় ডোবায় না? এবং এই হতাশাই কি তার সমষ্টিচেতনায় সংশয়ের, ও সংশয় থেকে উদাসীনতার, এমনকি বিপজ্জনক অসহিষ্ণুতার বীজ বুনে চলে না? যদি তেমন হয়, তবে ওই জাতীয় ভাবনার রূপ-কাঠামোর ভেতরেই শনি জাঁকিয়ে বসে থাকে। ঘুণপোকার মতো ভেতর থেকে কুরে কুরে তা তাকে ফোঁপরা করায় ব্যস্ত। তাকে তাড়াতে হলে ওই রূপকাঠামোই পালটাবার কথা ভাবতে হয়। এবং কেন্দ্র থেকে নয়, প্রান্ত থেকেই সমগ্রকে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজন পড়ে। তাতে স্বীকৃত ধ্যান-ধারণা যদি খণ্ডিত হয়, এমনকি সমগ্র জাতির কল্পরূপ যদি তর্কাতীত আর না থাকে, তবে তাকেই বাস্তব বলে মেনে নিয়ে তারই অনুসরণে নতুন পথ খোঁজার কথা ভাবা যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। বিকল্প সম্ভাবনার কোনোটি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, এবং হলেও তা সমস্থিতি ও সুস্থিতি নিশ্চিত করে আনুভূমিক ও আলম্ব, সমাজের সকল অবস্থানে মানবসমুদয়ের মেধার ও কর্মপ্রতিভার অধিকতর সুষ্ঠু ও সমন্বিত বিকাশ ঘটাবার সুযোগ সৃষ্টির সংগত প্রত্যাশা জাগায় কি না, সেটা পরের বিষয়। পরের হলেও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা যদি ইতিহাসের সম্ভাবনার বিচারে অন্যতম পূর্বশর্ত বলে মেনে নিই, তবে তাকে উপেক্ষা করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। অনেক বেশি মূল্যই বরং তা দাবি করে।
প্রশ্নগুলো সামনে রেখে প্রায় পঁচিশ বছর আগে ইতিহাসচর্চাকে ঢেলে সাজাবার এক পরিকল্পিত উদ্যোগ নেন কজন প্রাজ্ঞ চিন্তাবিদ। নেতৃত্বে থাকেন কৃতবিদ্য ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহ। দৃষ্টি তাঁরা পুরোপুরি নিবদ্ধ রাখেন উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক পর্বের ওপর। তাঁরা মনে করেন, স্বাধীনতার পর ভারত তার আরব্ধ কাজ সঠিকভাবে সম্পাদনে অগ্রসর হওয়ায় পুরোপুরি ব্যর্থ। ব্রিটিশ আমলে শোষণ ও দারিদ্র্য যেমন ছিল—যে ধরনের ছিল—তার কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি। বিদেশি শাসকের জায়গায় কেবল দেশি শাসক এসেছে। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারই তারা বহন করে চলেছে। যে শাসকশ্রেণি ভেতর থেকে উঠে এসে সুযোগ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে, তাও ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাপনাতেই পরিপুষ্ট। চেতনায় ও কর্মে তাদের প্রতিফলন ঘটে প্রাক্-স্বাধীনতা পর্বের জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতারই। ফলে স্বাধীনতা জাতীয় জীবনে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনে না। তা যেন পরাধীন বাস্তবতারই সরলরৈখিক সম্প্রসারণ। এর কারণ হিসেবে প্রথমেই যা তাঁরা শনাক্ত করেছেন, তা হলো, আমাদের জাতীয়তাবোধের নির্মাণে কেবল উচ্চবর্গীয় মানুষের স্বার্থবাহী জীবনপ্রণালী থেকে উঠে আসা ভাবধারার অভ্যাসলালিত নিশ্চেতন অপপ্রয়োগ। ওই মানুষেরাই আবার সমাজে সুবিধাভোগী। উপনিবেশ তাদের ক্ষমতার শ্রীবৃদ্ধি ঘটায়। তাদের একচেটিয়া দাপট অব্যাহত থাকে স্বাধীনতার পরেও। সমাজজীবনের যে ছক আগে থেকে চলে আসছে, এবং যার ভেতরে তাদের অবস্থানও পূর্বনির্ধারিত, তাকেই তারা স্বাভাবিক ও ন্যায্য মনে করে নির্দ্বিধায় টেনে নিয়ে চলে। খেয়াল করে না যে, গোটা দেশের জনসমুদয়ের তারা অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ; তাদের ভাবনায় যা ভালো, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাবনায় তা ভালো না-ও হতে পারে। অথচ ওই জনগোষ্ঠী তার নিজস্ব ভাবনার প্রকৃত পছন্দের ও প্রত্যাশার প্রকাশ ঘটাবার কোনো পথ দেখতে পায় না। তাকে যে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়, এ কথাও উচ্চবর্গীয় সুবিধাভোগী বৃত্তের মাথায় আসে না। তারা যা ঠিক করে দেয়, সেটি মানা আর সবার ভাগ্যলিপি, এ কথা এক রকম স্বতঃসিদ্ধের মতো সমাজে স্বীকৃতি পায়। রাষ্ট্রের বিষয় নির্বাচনে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারই ছাপ নির্ভুলভাবে পড়তে থাকে। কারণ সমাজের ও রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে—যাদের বলি আমরা ইনস্টিটিউশন—তারাই সর্বেসর্বা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেও সুযোগ ও যোগ্যতার পূর্বাপর বাধা ডিঙ্গিয়ে অন্যদের ঢোকা সে সব জায়গায় প্রায় অসম্ভব। দু-চারজন ঢুকতে পারলেও তাদের পছন্দ-অপছন্দ কোনো পাত্তা পায় না। ওপরতলার মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে যে বিধি-বিধান অপ্রত্য বলে স্বীকৃতি পায়, তাকেই তারা মেনে নেয়। ব্যক্তিগতভাবে সফল হতে হলে সেটিই করণীয়। এবং সম্ভবত বাঞ্ছনীয়। জাতিসত্তার নির্মাণে জীবনে জীবন যোগ করার যে সাধনা, তা অচরিতার্থই থেকে যায়। নিচুতলার মানুষের অসহায়তা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ বেড়ে চলে। তা বিক্ষোভের বা বিদ্রোহের আকার নেয় কখনও কখনও। প্রভুশক্তি তাকে ঔপনিবেশিক কায়দাতেই দমন করে।
এটা শুধুই অনুমানের ব্যাপার থাকে না। তাঁরা দেখেন, স্বাধীন ভারতে প্রথম তিরিশ বছরের রাষ্ট্রপরিচালন প্রক্রিয়ায় ও সম্পদের বিলি-বণ্টন ব্যবস্থায় উচ্চবর্গের প্রাধান্য শুধু যে অব্যাহতই থাকে তা-ই নয়, তা আরও মজবুত হয়ে অনড়ত্ব পাবার দিকে এগোয়। নিচুতলার মানুষ শুধুই পিছু হটে। শাসক ও শাসিতের ভেতর দূরত্ব কেবল বাড়ে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত শতকে ষাটের দশকে ঘটে নকশাল আন্দোলনের বিস্ফোরণ। স্থিতাবস্থায় পরস্পর-বিচ্ছিন্নতা, বিমুখতা ও গভীর বৈষম্য তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আরও দেখিয়ে দেয় অভাজনদের অভ্যুত্থান ঠেকাতে রাষ্ট্র-প্রশাসনের চণ্ডরূপ। যেন, যাদের হাতে রাষ্ট্রশাসনের অধিকার, তারা জনগণের প্রতিনিধি নয়, জনগণের প্রতিপক্ষ। জাতিসত্তার মায়াবী পর্দা খসে পড়ে। ভেতরে লুকোনো ঔপনিবেশিক কাঠামোর বিকট রংচটা ছাঁদ ফুটে ওঠে। স্বাধীনতা অর্থহীনতায় ডুবতে বসে। আস্থায় সঙ্কট আরও বাড়ে, যখন সত্তরের দশকের মাঝামাঝি জরুরি অবস্থা জারি করে শুধুই ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে সরকার জনগণের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার অনেক কিছু কেড়ে নেয়। জনগণের জন্য জনগণের সরকার, এ কথা আর বলা যায় না। শাসন-ব্যবস্থায় নিষ্কাম নৈর্ব্যক্তিক নিরপেক্ষতার ভানটুকুও খসে পড়ে বলে অনেকের কাছে মনে হয়। তাছাড়া এও তাঁরা দেখেন, দারিদ্র্যবিমোচনে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে জনগণের উদ্যোগ তেমন কিছু গড়ে ওঠে না। কৃষিতে ভূমি-সংস্কারের নামে যা হয়, তা বেশিরভাগ লোক-দেখানো। কায়েমি স্বার্থের দখল ও নিয়ন্ত্রণ আগে যেমন ছিল, প্রায় তেমনই থাকে। গণমানুষের আপেক্ষিক সামর্থ্য বাড়াবার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয় সামান্যই। এগুলো কোনো জাতীয় চেতনার লক্ষণ নয়। অথচ ‘এক জাতি এক প্রাণ একতা’-এই প্রত্যয়ের অর্থবহ রূপায়ণ ঘটবে, এটাই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপ্ন-প্রেরণা। সব মানুষের প্রত্যাশার সমন্বয়ে এক জাতির ধারণা গড়ে উঠেছে, এমন তাঁরা দেখতে পান না। তা যে বহু মানুষের, এ কথাও ধোপে টেকে না। ফলে বারবার হোঁচট খেতে খেতে অগ্রসর হওয়া। তাতে জাতীয়তাবোধ কৃত্রিমভাবে ঝুলে থাকে। গণচেতনায় মেশে না। উল্টো মেশাতে গেলে তা ওপর থেকে আরোপিত মনে হয়।
তাঁরা মনে করেন, গলদ রয়ে গেছে এতদিনের ইতিহাসচর্চাতেই। ঔপনিবেশিকতার শিক্ষায়, এবং তারই প্রতিক্রিয়ায় জাতীয়তাবাদের একটা ধারণা বিদ্যাচর্চার আখড়াগুলোতে তৈরি হয়। যাঁরা তৈরি করেন, তাঁরাই তা ফেরি করেন। ফেরি করেন তাঁদেরই মতো আর যাঁরা সমমনা, অর্থাৎ বিদ্যায়-বুদ্ধিতে, সুযোগ-সুবিধার সদ্ব্যবহারে যাঁরা সাধারণের থেকে আলাদা, এককথায় ‘এলিট’ সম্প্রদায়ের, তাঁদের কাছে। তাঁরা এটিকে ভারত-ইতিহাসের নির্মাণে স্থাপন করেন, এবং তাকে প্রশ্নাতীত ধরে নিয়ে সাম্প্রতিক ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেন। গণমানুষ কীভাবে বাঁচে, কী তারা চায়, এ সবের সঙ্গে তাকে মিলিয়ে নেবার কোনো চেষ্টা তাঁরা করেন না। তা সত্ত্বেও এই ভাবনা-সূত্রই তাঁদের ওই আলাদা বৃত্তে স্বীকৃতি পায়। সেখানে স্বীকৃতি পাওয়া মানেই সমাজের স্বীকৃতি পাওয়া। কারণ তাঁদের নিচে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এ রকম ভাবনা নির্মাণে ও তার প্রয়োগে কর্তৃত্ব করার, অথবা তার অংশীদারিত্বের সুযোগ পায় না। তারা কেবল সাড়া দেয়, কিংবা নির্বিচারে মেনে নেয়। স্বতঃস্ফূর্ত কোনো উদ্যোগের বা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের নায়ক তারা হয় না। যদিও ফলভোগে সিংহভাগ ভূমিকা তাদেরই।
এই যেখানে অবস্থা, সেখানে প্রত্যাশায় ও প্রাপ্তিতে গরমিল হওয়াই স্বাভাবিক। ইতিহাস চর্চায় সংকল্প এক রকম, বাস্তব নিজেকে মেলে ধরে অন্যরকম। ইতিহাসে জাতীয়তাবোধের নির্মাণ যেভাবে, তার ভিত্তিতে এক অখণ্ড নির্দ্বান্দ্বিক সমন্বিত ভারতসত্তার পূর্বাপর অস্তিত্ব ধরে নিয়ে ওপর থেকে কলকাঠি নাড়লে সমাজ সবসময়ে ঠিক ঠিক গতি পায় না। ঠিক পথেও এগোয় না। মানুষে মানুষে পারস্পরিক সংযোগের, অথবা, উল্টো দিক থেকে পারস্পরিক বিমুখতার বা উদাসীনতার জায়গাগুলো একমুখো ও সক্রিয় না-হলে ইতিহাসের নির্দেশ গন্তব্যে পৌঁছুবে, এমনটি আশা করা বাতুলতা। স্বাধীনতা-উত্তর পর্বে এই আশার পঞ্চত্বপ্রাপ্তিই তাঁরা ঘটতে দেখেন বেশি। দায়ী করেন তাঁরা ইতিহাসের ভ্রান্ত প্রত্যয়রাশিকে—অন্তত তাঁরা যেগুলোকে ভ্রান্ত বলে খারিজ করতে চান, সেগুলোকে। এবং একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক চিন্তাকাঠামোকে, যা চরিত্রগতভাবে পরমুখাপেক্ষী, এবং কার্যত উপমহাদেশের গণমানুষের জীবনযাপন প্রক্রিয়া ও তাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বুঝে ওঠায় অক্ষম। এইখানেই তাঁরা অনুভব করেন নতুন পথ খোঁজার তাগিদ। এবং রণজিৎ গুহের নেতৃত্বে এই কাজেই তাঁরা অগ্রসর হন। পঁচিশ বছরে তাঁদের কাজে অনেক ডালপালা গজিয়েছে। নতুন নতুন তর্কেরও তা জন্ম দিয়েছে। তবে তাঁরা এখনও সক্রিয়, যদিও শুরুর মনোভাব ও লক্ষ্যভূমি অবিকল বজায় রেখে নয়।
প্রথমেই তাঁরা উপমহাদেশের ইতিহাসচর্চাকে এক রকম মাথার ওপর দাঁড় করিয়ে দেন। ঐতিহ্যগতভাবে ইতিহাস এখানে দেখা হয় ক্ষমতার বা কীর্তির কেন্দ্রভূমি থেকে। তাঁরা যে তা উলটে দিয়ে তলা থেকে দেখার কথা বলেন, এতে, তাঁদের ধারণা, সাধারণ মানুষের, অর্থাৎ সত্যিকারের জনগণের প্রকৃত স্বরূপ ফুটে উঠবে। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া জাতিসত্তার কল্পনা তা আর থাকবে না। হবে তাদের আত্মপরিচয়ের ও আত্মবিকাশের আকাক্সক্ষার স্বরূপের সঠিক পাঠ। এতে তাঁরা ওই সব অধস্তন মানুষের কথা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ধরবার চেষ্টা করেন। তাদের সুখ-শান্তি-অভাব-অভিযোগ, তাদের প্রতিবাদ ও পরাজয়, তাদের মনোজগতের বিচিত্র প্রতিচ্ছবি, সবই তাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের মতো করে বোঝার চেষ্টা করেন। একে তাঁরা বলছেন নিম্নবর্গের বৃত্তান্ত। আসলে ‘নিম্নবর্গ’ শব্দটি অনুবাদ। তাঁদের লেখা মুখ্যত ইংরেজিতে। তাকে তাঁরা চিনিয়ে দিয়েছেন সাবলটার্ন স্টাডিজ বলে। উপ-শিরোনাম, ‘রাইটিংস অন সাউথ এশিয়ান হিস্টরি অ্যান্ড সোসাইটি’-দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও সমাজবিষয়ক রচনাবলি। ‘সাবলটার্ন’ শব্দটি গ্রামশ্চির প্রিজন নোটবুকস থেকে সংগ্রহ করা। এ নিয়ে পরে কথা হবে। এর বাংলা তাঁরাই করেছেন ‘নিম্নবর্গ’ (আসলে রণজিৎ গুহের প্রস্তাবনা)। বাংলায় একখণ্ডে যে প্রবন্ধ সংকলন তাঁরা বের করেছেন, তার নাম, নিম্নবর্গের ইতিহাস, সম্পাদনায় গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়। সাবলটার্ন স্টাডিজ বহুখণ্ডে প্রকাশমান। শেষের খণ্ডগুলো হাতে পাইনি। যেগুলো পেয়েছি, সবগুলোরই সম্পাদনার দায়িত্বে রণজিৎ গুহ।
প্রবেশক প্রবন্ধে তাঁর বিষয়-ভাবনা তিনি স্পষ্ট করেন এভাবে: ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাস রচনায় দীর্ঘদিন ধরে সুধীসমাজের (এলিট) কর্তৃত্ব-ঔপনিবেশিক সুধীসমাজ আর বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী সুধীসমাজ। দুটোরই আদর্শিক উৎস ভারতে ব্রিটিশ শাসন, কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পরেও তার রেশ রয়ে গেছে এবং যথাক্রমে ব্রিটেনে ও ভারতে নয়া-ঔপনিবেশিক ও নয়া-জাতীয়তাবাদী বাক-বিস্তারের অঙ্গীভূত হয়ে পড়েছে।... উভয়েই তারা এই একপেশে মনোভাবের শিকার যে, ভারতের জাতিসত্তার নির্মাণ এবং জাতীয় চেতনার জাগরণ ও বিকাশ, যা ওই নির্মাণক্রিয়ার মাল-মশলা জোগায়, তা এককভাবে ও প্রবলভাবে উচ্চবর্গীয় সুধীসমাজের অবদান।... দুটোর প্রথমটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে প্রধানত বিচ্ছিন্নভাবে এক সরু আচরণনির্ভর পথে ক্রিয়ার ও প্রতিক্রিয়ার পরিণামফল হিসেবে দেখে। তাতে উপনিবেশ-সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান, সুযোগ ও সম্পদের ব্যবহারে উচ্চবর্গ তার ধ্যান-ধারণা ও ক্রিয়াকলাপের জোড়া লাগানোর ভেতর দিয়ে যেভাবে সাড়া দেয়, তারই এক যৌগিক রূপ জাতীয়তাবাদ।... সুধী বা উচ্চবর্গীয় ভদ্রজনের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাস নির্মাণ-প্রয়াসে একধরনের ভাববাদ কাজ করে। এতে বলা হয়, এলিট নেতৃত্ব জনগণকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করে, যেন এই ইতিহাস ভদ্র সম্প্রদায়েরই পারমার্থিক জীবনবৃত্তান্ত।
এইখানেই রণজিৎ গুহ দেখেন ইতিহাস নির্মাণের অপূর্ণতা, যা একই সঙ্গে পক্ষপাতদোষে দুষ্ট। তাঁর মতে, জাতীয়তাবাদের প্রকৃত স্বরূপ তা উন্মোচন করে না। কারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত স্বয়ংক্রিয় অবদানের কোনো ব্যাখ্যা এতে মেলে না, এমনকি স্বীকৃতিও না। ফলে জাতীয়তাবাদের যে আদর্শের কথা বলা হয়, তা অনেক কিছু চেপে দেয়। জনসমুদয়ের অনুভূত বোধ কী, জাতীয় মুক্তি বলতে তাদের কাছে কী প্রাধান্য পায়, স্বাধীন রাষ্ট্রে তাদের প্রত্যাশাই বা ছিল কী, এ সবের কোনো হদিস আমরা পাই না অথবা তারা যে নিষ্ক্রিয়, এমনও বলা যায় না। ব্রিটিশ আমলেই ঘটেছিল বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে বহু কৃষক-বিদ্রোহ। আপাতবিচ্ছিন্ন হলেও তাদের ভেতর কৃষকচেতনার আন্তরমিল একটা খুঁজে পাওয়া যায়। উপনিবেশবাদ-বিরোধী চরিত্রও তাদের গোপন থাকে না, যদিও একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক স্থাপনার সহযোগী স্থানীয় ভদ্রজনরাও তাদের বিরোধিতা থেকে রেহাই পায় না। ভদ্রসমাজের জাতীয় চেতনার দৈন্যও এতে ফুটে ওঠে। মুক্তির সংগ্রামে ওই সব বিদ্রোহের গণমুখিনতাকে তারা আত্মস্থ করে না; বরং ইচ্ছাকৃতভাবে পাশ কাটিয়ে যায়, এমনকি নিজেদের স্বার্থে আঘাত লাগার আশঙ্কা থাকলে তার বিপরীতে অবস্থান নেয়। জাতীয়তাবাদে, ফলে, গোটা জাতির, অর্থাৎ সমগ্র দক্ষিণ এশীয় অধিবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে না। তা মুষ্টিমেয়র ভাবনাকেই গুরুত্ব দেয়। হতে পারে সে ভাবনা সদিচ্ছাপ্রণোদিত, কিন্তু তা অতিমাত্রায় গণ্ডিবদ্ধ। অধিকাংশ মানুষের কাছে, যা তাদের প্রকৃত ভালো-মন্দ, তা বোঝার কোনো চেষ্টা তাতে খুব একটা ধরা পড়ে না। পরিণামে দেশ স্বাধীন হলে রাষ্ট্রনির্মাণে ও রাষ্ট্র-পরিচালনায় এলিট শ্রেণির নেতৃত্ব কোনো সুফল দেয় না। গণবিচ্ছিন্নতাই বরং তার বাড়ে। স্বাধীনতা কোনো সর্বোদয়ের বা সার্বিক উন্নয়নের পথরেখা আঁকে না।
রণজিৎ গুহ আরও বলেন, নিম্নবর্গের চেতনার বিস্তার আভূমি সমতলীয়। সমজাতীয়তার ও সহমর্মিতার বোধ সেখানে পরস্পরসংলগ্ন জীবন থেকে, অথবা নিজেদের অধস্তন অবস্থার অভিজ্ঞতায় বঞ্চনার সাদৃশ্য থেকে স্বাভাবিকভাবে জন্মায়। এলিটভাবনা যেমন আলম্ব-বিস্তৃত, এ তেমন নয়। সমতলে সহজভাবে ছড়ায়। তবে কখনও কখনও তাদের আন্দোলন আঞ্চলিক বা ব্যষ্টিক সীমায় আটকে যায়, তখন তা গণজোয়ার সৃষ্টি করে না; স্থানে ও কালে সংকীর্ণ পরিসর অতিক্রম করাতেও বিফল হয়। তা সত্ত্বেও ছোট-বড় এই রকম সব আন্দোলন নিম্নবর্গীয় চেতনার এক সম্যক রূপ ফুটিয়ে তোলে। এলিটধর্মী জাতীয় চেতনা তার নাগাল পায় না। এবং সে অনুপাতে তা ব্যর্থ। নিম্নবর্গীয় চেতনায় উত্থান, সম্প্রসারণ এবং ক্ষমতা ও সুযোগ বণ্টনের কেন্দ্রভূমিতে তার স্বীকরণ যদি ঘটে, তবেই এই বিফলতা থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তা না হলে সাহেব-বাবুদের সুবিধা-অনুযায়ী ওপর থেকে জাতীয়তাবোধ শেখাবার ব্যবস্থা চালু থাকলে রাষ্ট্র ও সমাজ এক সঙ্কট থেকে আরও গভীর সঙ্কটের ভেতর দিয়ে যেতে থাকবে। গণবিচ্ছিন্নতার কারণে জনগণ আর রাষ্ট্রকে আপন বলে ভাববে না। রাষ্ট্রের অস্তিত্বই অর্থহীন হয়ে পড়বে। সঙ্কটের শুরু কিন্তু ইতিহাসকে আমরা যেভাবে দেখি, যেভাবে পড়ি, তা থেকে। নিম্নবর্গের দিকে দৃষ্টি দেওয়া এই সঙ্কটমোচনের তাগিদেই। এবং সেখান থেকে গণমানুষের বঞ্চনার ও আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে রাষ্ট্রের ধারণা, আয়তন ও চেহারা কোনো কিছুই আর অসংশোধনীয় থাকে না। রণজিৎ গুহ ও তাঁর সঙ্গীরা সাবলটার্ন স্টাডিজে যে জবরদস্ত সওয়াল করে চলেন, তার ইঙ্গিত বারবার আমাদের দৃষ্টি টেনে নিয়ে যায় ওই সংশোধনের দিকে।
প্রবন্ধের পরিশিষ্টে ‘এলিট’, ‘পিপল’, ‘সাবলটার্ন এই শব্দগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন রণজিৎ গুহ। যেহেতু এটি একটি যৌথ উদ্যোগ, এবং তিনি তার অধিনেতা, কাজেই তাঁর ব্যাখ্যাই তাঁদের সবার ব্যাখ্যা বলে ধরে নিই। ‘এলিট’ বলতে তিনি বোঝাচ্ছেন যারা প্রভুত্বকারী (ডমিন্যান্ট) তাদের। দেশি-বিদেশি, দুই ধরনেরই তারা হতে পারে। বিদেশিদের ভেতর তিনি উল্লেখ করেছেন ঔপনিবেশিক শাসনে ব্রিটিশ আধিকারিকদের, বাইরের শিল্পপতি, বণিক-ব্যবসায়ী, ধনপতি, ভূস্বামী, বাগান-মালিকদের ও মিশনারি সাহেবদের। দেশি এলিটদের তিনি দুভাগে ভাগ করেছেন: সর্বভারতীয় ও আঞ্চলিক—সর্বভারতীয় পর্যায়ে তিনি রেখেছেন দেশীয় বড় বড় রাজাকে, শিল্প-বাণিজ্যের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের ও ওপরতলার দেশি আমলাদের। আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে তিনি আবার তাদের বাছাই করেছেন, যারা সর্বভারতীয় তালিকাতেও থাকতে পারে; সেইসঙ্গে তুলনায় যারা নিচে তাদেরও, যদি তারা নিজেদের চেয়ে ওপরতলার বাসিন্দাদের স্বার্থের সঙ্গেই বেশি একাত্মবোধ করে। এই স্তরের মানুষ সব জায়গায় এক রকম নয়। কোথাও তারা ওপরের হুজুরদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে, কোথাও-বা নিজেদের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে নিচের মানুষদের দিকে ঝোঁকে, যেমন—গ্রামীণ ভদ্রজন, ক্ষয়িষ্ণু জমিদার, সম্পন্ন কৃষক, ধনী মহাজন বা জোতদার ইত্যাদি। ‘এলিট’ বা সমাজ-প্রভুদের চিনিয়ে দিয়ে তিনি সোজাসাপটা বলেন, গোটা জনসংখ্যায় যারা প্রভুশক্তি নয়, বা প্রভুশক্তির সঙ্গে যুক্ত নয়, তারা সবাই সাবলটার্ন বা নিম্নবর্গের। (সাবলটার্ন স্টাডিজ, ১ম খণ্ড, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮২, পৃ. ১-৮) এভাবে দেখলে, মানতেই হয়, অসংখ্য প্রবণতা, যাদের কিছু পরস্পরবিরোধী, কিছু-বা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে, পরস্পর-বিচ্ছিন্ন ও ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যের অভিমুখী, তাদের এক জায়গায়, এক পরিচয়ে একত্রে মেলানো বেশ মুশকিল। হয়তো যারা প্রভু নয়, সবাই অধস্তন, এই সহজ হিসাব দিয়ে তিনি শুরু করতে চেয়েছেন। এতে বিষয় নির্বাচনের স্বাধীনতা বাড়ে। মূল উদ্দেশ্য, বহুবিচিত্র বাস্তব পরিস্থিতিতে অধস্তনতার অভিজ্ঞতা খুঁটিয়ে দেখা, এবং সে সব থেকে তার বৈশিষ্ট্যের কোনো সাধারণ রূপ উদ্ধার করা গেলে তা তুলে ধরা। পদ্ধতিগতভাবে এর অবরোহী (ডিডাকটিভ) নয়, আরোহী (ইনডাকটিভ) হবার কথা। একটি সম্যক ধারণা তৈরি হলে অবশ্য তা উলটেও যেতে পারে; যদিও এভাবে তিনি নিজে ভেবেছেন কি না জানি না। কিন্তু কাজ যত এগিয়েছে, তথ্যভাণ্ডার যত সমৃদ্ধ হয়েছে, পদ্ধতিও তত অবরোহী হবার দিকে ঝুঁকেছে। পরে নিম্নবর্গের ইতিহাস সংকলনের (১৯৯৮) নাম-প্রবন্ধে তাঁকে কিছুটা সুনির্দিষ্ট হতে দেখি, এবং তা আগের বিবরণ ধরে নিয়েই। তিনি জানান, ‘নিম্নবর্গের’ মধ্যে শ্রমিক, কৃষক, নিম্নমধ্যবিত্ত, গ্রাম ও শহরের গরিব জনতা ইত্যাদি গণ্য তো বটেই। কিন্তু ঔপনিবেশিক সমাজে প্রভু ও অধীনের সম্পর্কটা যাদের জীবনে খুবই প্রকট অথচ যারা আমাদের ইতিহাস-চিন্তায় এখনো প্রায় অনুপস্থিত সেই আদিবাসী, নিম্নবর্গ ও নারীদের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ করে ভাবতে ও লিখতে হবে।... নিম্নবর্গের অন্তর্ভুক্ত সকল শ্রেণিগোষ্ঠী ব্যক্তি ও সমূহকে ঐতিহাসিক গবেষণা ও বক্তব্যের বিষয় বলে স্বীকার করতে হবে সচেতনভাবে।’ এ থেকে নিম্নবর্গের চিন্তা-চেতনার, প্রত্যয় ও প্রত্যাশার, আত্মরক্ষার কৌশলের ও অস্তিত্বের সংগ্রামের যে রূপকাঠামো বেরিয়ে আসে তাকেই তিনি ও তাঁর সহযোগীরা আলোচনার কেন্দ্রভূমিতে নিয়ে আসেন। দক্ষিণ এশীয় জনসমুদয়ের জাতিসত্তা নিয়ে এলিট-ভাবনার মায়াজাল তার সামনে খসে পড়ে। তাঁরা বিকল্প নির্মাণের দিকে অগ্রসর হন। ঔপনিবেশিক ধারণার অনুসরণে এলিট-রচিত জাতীয়তাবাদের কল্পরূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে রাষ্ট্র ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করে চলে, তার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়। নিম্নবর্গ ও জনগণ (পিপ্ল) সমার্থক ধরে তাঁরা এই জনগণের চাওয়া-পাওয়াকেই হয়তো পরস্পর সম্পর্কহীন, হয়তো অনিয়ন্ত্রিত ও সমাজশাসনের উচ্চাশাহীন—তাদের মতো রেখে সুসম্বন্ধ করতে চেয়েছেন। তারই ওপর ভিত্তি করে তাঁরা খুঁজেছেন ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসা জনপদের কর্তৃত্বহীন স্বাভাবিকতা। সম্ভবত সেই চূড়ান্ত লক্ষ্য মাথায় রেখে তাঁদের ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার উদ্যোগ। তাদের মনোজগতের সত্য স্বরূপের হদিস পাওয়া খুবই জরুরি। কারণ তাকেই তাঁরা করতে চান পরস্পরবিচ্ছিন্ন যৌথ জীবনচর্চার প্রাথমিক উপাদান। তার সুষ্ঠু বিকাশ যদি নিশ্চিত করা যায়, তবেই মেলে ওই জীবনচর্চায় সুস্থিতির ও সমৃদ্ধির অর্থবহ প্রতিশ্রুতি। ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক বিবিধ ঘটনা প্রচলিত বুর্জোয়া ধ্যান-ধারণা থেকে বিচ্যুতিগুলো খুব প্রকটভাবেই ধরিয়ে দেয়। ধরিয়ে দেয় নিম্নবর্গের মনোজগতের যথার্থ প্রতিচ্ছবিও। এগুলো জানা গেলে তবেই বিকল্প নির্মাণের কথা। নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চায় এই জানার কাজটি সমধিক গুরুত্ব পায়।
তবে নিম্নবর্গের ওপর পাদপ্রদীপের আলো ফেলা অভিনব কিছু নয়। বিশ্ব-ইতিহাসের নানামুখী আলোচনায় তো বটেই, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসচর্চাতেও নয়। এ ছাড়া কেবলমাত্র ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতাই তার সীমা নির্দেশ করে না। সমাজে নানাভাবে বিভাজনক্রিয়া সভ্যতার ক্রমবিকাশেরই অবদান। নিচুতলার মানুষের আবির্ভাব তারই অনিবার্য পরিণাম। বিভিন্ন দেশের প্রাচীন সাহিত্যে তাদের বিস্তারিত, এবং কোথাও কোথাও করুণ বর্ণনা পাই। কৃষক ও ভূমিদাসদের ওপর শোষণ-নির্যাতনের কাহিনী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চেয়ে পুরনো। এবং ঔপনিবেশিকতা নিচুতলার মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন মাত্রা নিশ্চয় যোগ করে, কিন্তু কোথাও তাদের অস্তিত্বের সূচনা ঘোষণা করে না। এই উপমহাদেশের বেলাতেও না। আসলে সমাজ যে পর্যায়েই থাক, উদ্বৃত্ত উৎপাদনের প্রায়োগিক জ্ঞান আয়ত্তে এলে তার বণ্টনের সঙ্গে শ্রমবিভাজনের সামঞ্জস্যবিধান অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই শ্রমবিভাজন ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই। আলাদা আলাদা কাজের আলাদা আলাদা মূল্য আরোপের শুরু তখন থেকেই। ব্যক্তিগত প্রয়োজনের মূল্য, সামাজিক মুল্য, দুটোই। এই মূল্যের হেরফেরে বিভিন্ন মানব-মানবীর বৈষয়িক ও সামাজিক অবস্থানেও হেরফের ঘটে। তা থেকেই আসে তাদের স্তরবিন্যাস। কোথাও তা বংশপরম্পরায় জগদ্দল পাথরের মতো স্থির; কোথাওবা বিভিন্ন স্তরে মানুষের চলাচল কাজের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে ধীরলয়ে হলেও প্রত্যক্ষগোচর, এবং সে কারণে স্তরবিভাজন অপরিবর্তিত থাকলেও কারও কারও, অথবা কোনো কোনো পরিবারের অবস্থান এক স্তর থেকে অন্য স্তরে ওঠে-নামে। মোট কথা, তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারুক, আর না-ই পারুক, নিচুতলার মানুষ সমাজে সৃষ্টি হয় অনেক আগে থেকে। ঔপনিবেশিকতা তাতে নতুন মাত্রা যোগ করে মাত্র—হয়তো তার প্রভাব খুব গভীর—কিন্তু নিম্নবর্গের মানুষ আগের বৈশিষ্ট্যও বহন করে চলে; এবং তার প্রভাব তুলনায় বেশি বই কম নয়। মার্কসীয় চিন্তাকাঠামোয় নিচুতলার মানুষই তো প্রধান ভূমিকায়। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ চিহ্নিত করে মানবসভ্যতার প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে প্রাগ্রসর, কিন্তু বঞ্চিত উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কে প্রভুশক্তির সংঘাত। দ্বন্দ্বের নিরসন ঘটে উৎপাদিকা শক্তির বিজয়ে। সমাজ পর্ব থেকে পর্বান্তরে যায়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এই তত্ত্ব অনুসারে মূল দ্বন্দ্ব শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে মালিকশ্রেণির। শ্রমিকশ্রেণির সর্বহারা চরিত্র বুঝিয়ে দেয়, তারা নিম্নবর্গের। যাঁরা আজ দক্ষিণ এশিয়ার ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ঝালিয়ে নিম্নবর্গকে নায়কের ভূমিকায় আনতে চাইছেন, তাঁরা মার্কসীয় শ্রেণিতত্ত্বকে মাথায় রাখেন ঠিকই, নিম্নবর্গকে প্রাধান্য দেওয়া তারই অনুসরণ-কিন্তু ওই শ্রেণিবিভাজন চূড়ান্ত বলে মানেন না। তাঁদের নিম্নবর্গের উপস্থাপনা খুবই শিথিল। ইচ্ছামতো তাতে যোগ-বিয়োগ চলে। এতে গবেষকের স্বাধীনতা বাড়ে। এমনকি কখনও কখনও স্বেচ্ছাচারের পর্যায়েও চলে যায়, মনে হয়। কিন্তু বিষয়ের শক্ত বাঁধন থাকে না। অন্তর্দ্বন্দ্বও এড়ানো যায় না। সেই অনুপাতে বক্তব্যের বেঢপ ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। পরে আবার এই প্রসঙ্গে আমাদের ফিরে আসতে হবে।
আসলে বুর্জোয়া রাষ্ট্রকাঠামোর পত্তন হয় এ অঞ্চলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভেতর দিয়েই। তখন কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না ভারতবর্ষ। জনগণের কাছে জবাবদিহিরও কোনো দায় ছিল না বিদেশি শাসকচক্রের। তারা চেয়েছিল শুধু ঔপনিবেশিক শাসন অব্যাহত থাক; চিরস্থায়ী হোক তাদের আধিপত্য, অক্ষুণ্ন থাক তাদের সাম্রাজ্যগৌরব ও পুঁজির সংগঠনের বাস্তব সুযোগ। কিন্তু এগুলো চরিতার্থ করতে গিয়েই প্রয়োজন পড়েছিল এক সচল ও কার্যকর শাসন-ব্যবস্থার, যা ওপর থেকে দেশের সর্বত্র ছড়ায়; এবং তার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার, যাতে জনগণ তার প্রতি অনুগত থাকে। স্বেচ্ছায় যদি নাও হয়, তবু বাধ্য হয়ে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ও অবাধ্যতা দমনের এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ওই রাজশক্তি চালু করেছিল, যা ছিল যথেষ্ট মজবুত ও সহজে সম্প্রসারণশীল। এই শাসনব্যবস্থার উত্তরাধিকার বর্তায় স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিচালকদের হাতে। ফলে ঔপনিবেশিক প্রশাসনই রূপান্তরিত হয় স্বাধীন রাষ্ট্রের কার্যপ্রণালিতে। জনগণের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ যে খুব একটা কমে না, এই কথাটাই কিছু চিন্তাবিদকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়। তাঁরা দেখেন, নিচুতলার মানুষেরা আগের মতো শাসিতই হয়, শাসনের অংশীদার হয় না। অথচ তাদের নামেই রাষ্ট্রশাসন, তাদের নামেই ক্ষমতার বিলিবণ্টন। সাবলটার্ন স্টাডিজ এই স্ববিরোধ ঘোচাতে চায়। তাই তার গবেষণায়-আলোচনায় উঠে আসে কেবলমাত্র ‘তাহাদের কথা’।
এই তাদের মনোজগৎকে তাদের মতো করে তাদের জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে ধরতে চাওয়া, তাদের জীবনকাহিনী, বিশেষ করে টিকে থাকার সংগ্রামের ও বাইরে থেকে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তার সঙ্গে সংঘাতের বৃত্তান্ত, তাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা এবং বলা, এগুলোই শুরুতে নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার বিষয় হয়ে দেখা দেয়। পদ্ধতিগতভাবে প্রচলিত ধারা থেকে তা খুব একটা সরে আসে না। অভিনবত্ব ধরা পড়ে মূলত বিষয়-নির্বাচনে এবং দৃষ্টির প্রক্ষেপণে। পুরোপুরি বস্তুনিষ্ঠ থেকে, এবং যথাসম্ভব বিশ্বস্ততার সঙ্গে ইতিহাসের অবহেলিত জনসমষ্টিকে চোখের সামনে মেলে ধরা, আর তাদের বিস্তারে ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা এই সব নিবিড় পাঠে আত্যন্তিক গুরুত্ব পায়। যেহেতু অধিকাংশ মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ, তাই নানা ঘটনায় কৃষক-প্রতিক্রিয়া ও কৃষক-বিদ্রোহের কথা বিভিন্ন রচনায় বারবার উঠে আসে। তাদের প্রত্যেকটিতে আছে গভীর অনুশীলনের ছাপ। যেমন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘কৃষি উৎপাদন সম্পর্ক ও বাংলায় সাম্প্রদায়িকতা, ১৯২৬-১৯৩৫;’ জ্ঞান পাণ্ডের ‘কৃষক বিদ্রোহ ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ: অযোধ্যার কৃষক আন্দোলন, ১৯১৯-১৯২২’, শহীদ আমীনের ‘গান্ধী যখন মহাত্মা: গোরখপুর জেলা, উত্তরপ্রদেশ পূর্বাঞ্চল, ১৯২১-১৯২২’: ডেভিড আর্নল্ডের ‘কৃষক চেতনায় ও কৃষক-আন্দোলনে দুর্ভিক্ষ, মাদ্রাজ, ১৮৭৬-১৮৭৮’ ইত্যাদি। প্রতিটি প্রবন্ধেই আছে কৃষক-চৈতন্য নির্মাণের উদ্যোগ। এই চৈতন্য ভেতর থেকে, অথবা, আপেক্ষিক অবস্থানে নিচে থেকে যেমন গড়ে ওঠে, তেমন। এলিট ভাবনায় কৃষকের চিন্তার ও কর্মের বৃত্ত যেমন, অথবা, যেমন তা হওয়া উচিত, তাকে তা অনুসরণ করে না, বরং তাকে দূরে রেখে, কৃষক তার আপন পরিমণ্ডলে কীভাবে চলে, কীভাবে তার জীবনের চাহিদা-সংশ্লিষ্ট ঘটনারাশিতে সাড়া দেয়, তার নিখাদ রূপটি তথ্যের নির্যাস থেকে সাজিয়ে তুলতে চায়। তবে এই সাজিয়ে তোলার কাজে অনিবার্যভাবে মূল্য আরোপের প্রশ্ন ওঠে। কৃষক জীবনের বহুবিধ তাগিদ ও অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা তাকে চালনা করে। প্রকাশ ঘটে তার নিত্যদিনের ক্রিয়াকর্মে। যদিও তার স্বাধীন ইচ্ছার প্রকাশের ক্ষেত্র সীমিত ও অনেকখানি পূর্বনির্ধারিত, তবু তার আপন বৃত্তে অগ্রাধিকারের ক্রম একটা তৈরি হয়। এই ক্রম একজনের নয়, সকলের আচরণের সামষ্টিক পরিণাম। সেই অনুযায়ী মূল্য আরোপ। কৃষকরা নিজেরা এটা করে না। কখনও করলেও তারা তার হিসাব রাখে না, বা কেউ কেউ হিসাব রাখলেও সবার সামনে তার প্রকৃত চিত্র মেলে ধরে না। নিম্নবর্গের অতি মেধাবী রূপকাররা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এই কাজটি আগ বাড়িয়ে করেন।
কৃষকদের কথা ছাড়াও তাঁরা বলেন আদিবাসীদের কথা, হরিজন-গিরিজনদের কথা, শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে অভ্যন্তরীণ ফাটলের কথা। ডেভিড হার্ডিম্যান লেখেন গুজরাটের আদিবাসীদের আন্দোলন নিয়ে, তাদের ধ্যান-ধারণার জগৎকে বাইরের জগতে নিত্যদিনের অভাব-অভিযোগের সঙ্গে মেলাবার চেষ্টা নিয়ে, স্বপন দাশগুপ্ত, তনিকা সরকার, এঁদেরও বিষয় আদিবাসী সমাজ ও তার বিদ্রোহ; একই রকম অন্ধ্রপ্রদেশের গুডেমরাম্পা গিরিজনদের (১৮৩৯-১৯২৪) অবাধ্যতার ওপর আলোকপাত করেন ডেভিড আর্নল্ড, দীপেশ চক্রবর্তী দেখান স্তরবিন্যস্ত সমাজবাস্তবতায় পাটকল শ্রমিকদের (১৯২০-১৯৫০) অন্তঃসারশূন্যতা, একই সঙ্গে ওপর থেকে জারি করা বামপন্থী নির্দেশনার শোচনীয় ব্যর্থতা। সব লেখাতেই, এ সবে, এবং অন্যত্র, নিম্নবর্গ তাঁদের কাছে আত্মপক্ষ, আর, এলিট-ভাবনা ও এলিট-শাসন, প্রতিপক্ষ। সেইসূত্রে উচ্চবর্গের শ্রেয়চেতনানির্ভর মূলধারার ইতিহাস রচনাও, তাঁদের কাছে, সচেতনে বা অবচেতনে অভিসন্ধিমূলক, সে কারণে বিভ্রান্তিকর, এবং তার তত্ত্বকাঠামো পরিত্যাজ্য। একেবারে ধোয়ামোছা স্লেটে তাঁরা দাগ কাটেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পূর্বাধিকারের তোয়াক্কা করেন না। ইতিহাসের মোড় ফেরানোই শুধু নয়, তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াও তাঁদের লক্ষ্য। গণমানুষই সেখানে জনগণেশ। তার চৈতন্যরেখার অনুসরণেই, তাঁরা মনে করেন, ইতিহাস-নির্মাণের সার্থকতা। ইতিহাসের মুক্তিও ওই পথেই।
তবে সাবলটার্ন স্টাডিজও তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। যে সরল অবস্থান থেকে নিম্নবর্গের নির্মাণ ও ইতিহাসের কেন্দ্রভূমিতে তার প্রতিষ্ঠা শুরুতে প্রাধান্য পায়, তার রসদ যেন ফুরিয়ে আসে। অথবা যথেষ্ট থাকলেও তার বৈচিত্র্য বা অভিনবত্ব তেমন আর ধরা পড়ে না। ইতিহাস পাঠের রেওয়াজ মেনে এগুলে স্থান ও কালের সীমিত পরিসরে সবই হয়ে দাঁড়ায় সাবলটার্ন কেস স্টাডিজ বা নিম্নবর্গীয় বাস্তব অভিজ্ঞতার সমীক্ষা। তাতে একই ধরনের পুনর্নির্মাণ বা একই বক্তব্যের পৌনঃপুনিক উচ্চারণ এড়ানো যায় না। মুক্তমন নিয়ে দেখছি বললেও আসলে উদ্দেশ্যই বিষয়-নির্বাচন ঠিক করে দেয়। চয়নে পক্ষপাতিত্ব দেখা দেওয়া তাই খুবই স্বাভাবিক। নিম্নবর্গের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নয়, যেখানে তা প্রতিষ্ঠানবিরোধী ও উচ্চবর্গের প্রতিস্পর্ধী, কেবলমাত্র সেইখানে তার আচার-আচরণের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, এতেই মেধার সবটুকু ঢেলে দেন সাবলটার্ন-কাণ্ডের রথী-মহারথীরা। তাতে কাজে একঘেয়েমি আসে। উদ্দেশ্য মহৎ হলেও তা তার প্রাথমিক আকর্ষণ অনেকখানি হারিয়ে ফেলে। বৈচিত্র্যের ভেতর আরোহী পদ্ধতির প্রয়োগ খুবই কাজের। সিদ্ধান্তের ব্যাপারে পূর্বানুমান কিছু না রেখে আলাদা আলাদা প্রত্যক্ষণের চূড়ান্ত ফল থেকে কোনো সাধারণ মীমাংসা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা আদৌ উপেক্ষা করার নয়। কিন্তু প্রত্যক্ষণরাশিতে যদি কোনো বৈচিত্র্য না থাকে, সবই যদি বাছাই করা হয় বিশেষ উদ্দেশ্যসাধনের কথা মাথায় রেখে, তবে ওই আরোহী-পদ্ধতি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। নতুন নতুন অনুশীলনের প্রয়োজন বোধহয় আর থাকে না।
এটা ঠিক, নিম্নবর্গের লেবেল যাদের ওপর সেঁটে দেওয়া হয়, সামাজিক অবস্থানে, স্বার্থের টানে ও কর্মসম্পর্কের যোগসূত্রে তারা সবাই এক রকম নয়। তার ভেতরে পড়ে যেমন—কৃষক, শ্রমিক, সর্বহারা—তেমনি পড়ে নারী, শিশু, হাটুরে-বাটুরে, উপজাতি-আদিবাসী ইত্যাদি। পরিচয়ের এই ব্যাপকতায় এক বহুবর্ণ চালচিত্র ফুটে ওঠার কথা। কিন্তু তা হয় না। প্রথমত, উচ্চবর্গ-বিরোধী অবস্থান নিশ্চিত করায় সব বিরোধের বৈশিষ্ট্য এক রকম হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, পেছনে নকশাল আন্দোলন যে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেয়, তার প্রতিফলনে ওই চেতনার সম্প্রসারণ বা সমর্থন বিভিন্ন লেখায় প্রত্যক্ষে বা প্রচ্ছন্নে নিজেই একটা মাত্রা বেঁধে দেয়। তাতে
কৃষক-বিদ্রোহের ইতিবৃত্তান্ত রচনার দিকে যে শুধু বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তাই নয়, অন্যান্য রচনাতেও তার পারস্পরিক সম্পর্ক-বিচারের ও বক্তব্যের ছায়াপাত ঘটেছিল। ফলে বৈচিত্র্যের ধারাগুলো খোঁজা হয় না। নিম্নবর্গে অন্যদের নিজস্ব সত্তা প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাদের নীরক্ত ও ম্লান মনে হয়। পার্থ চট্টোপাধ্যায় নিজেই মেনে নেন, ‘অস্বীকার করে লাভ নেই, ১৯৬০-এর আর ১৯৭৫-এর দশক-দুটির রাজনৈতিক বাদানুবাদ এবং নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের আপাতবিপর্যয়ের পটভূমিতে সাবলটার্ন স্টাডিজে কৃষক-বিদ্রোহের ইতিহাসচর্চা প্রায় অনিবার্যভাবেই এক ধরনের নকশালি রাজনীতির রোমান্টিক রোমন্থন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল। এও সত্যি যে, প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনাকে সমালোচনা করতে গিয়ে সাবলটার্ন স্টাডিজের একাধিক লেখক প্রচ্ছন্নভাবে হলেও এ ধরনেরই কোনো বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থানকে অবলম্বন করেছিলেন।’ (ভূমিকা, নিম্নবর্গের ইতিহাস, গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়-সম্পাদিত, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৮)। এই যে রোমান্টিক রোমন্থনের কথা তিনি বলেন, এটি খুবই যথার্থ। দৃষ্টি এতে অনেকখানি আচ্ছন্ন হয় বইকি! দাঁড়াবার জায়গাও ছোট হয়ে আসে।
মনে রাখি, শ্রেণিবিভাজনের ভিত্তিতে ইতিহাস রচনার ফলবান ধারা একটি আছে। তাতে শ্রেণির সংজ্ঞা আঁটোসাঁটো। প্রত্যয়সমূহ পূর্বনির্ধারিত ও স্পষ্ট। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের নিরিখে যাচাই করা। সে কারণে সর্বত্র এক। এতে এ রকম সব কাজই মূলত অবরোহী। তা ব্যষ্টিক, আঞ্চলিক বা সমষ্টিক, যাই হোক না কেন। ইতিহাসের বিকাশ একটি ছকই অনুসরণ করে সত্য, কিন্তু ভেতরের কার্যকারণের সুনিশ্চিত ও সুবিস্তৃত ছবি সকল সম্পর্কের জটাজাল নিয়ে সেখান থেকে উঠে আসে। লক্ষ্মণের সঙ্গে ঘটনা মিলিয়ে এগুনো। ফলে বাস্তবতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার সম্ভব। বাস্তব যে কোনো অবস্থারই। বিশেষ স্থান-কালের গণ্ডিতে তা বাঁধা নয়। প্রাজ্ঞ ঐতিহাসিক নিরাসক্ত বিবেচক হলে তা করেও থাকেন। নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চায় কিন্তু এমনটি হবার উপায় ছিল না। উপযুক্ত ঘটনার রসদ ফুরিয়ে গেলে বৃত্তান্ত রচনার কাজও থমকে যায়।
এমন অবস্থায় সাবলটার্ন স্টাডিজকেও নতুন পথ খুঁজতে হয়। পুরনো প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে নয়, তবে পেছনে চিন্তাকাঠামো একটা প্রত্যক্ষে বা প্রচ্ছন্নে ধরে নিয়ে। এই চিন্তাকাঠামো স্বোপার্জিত নয়। অনেকটাই বাইরে থেকে ধার করা। সমকালীন জ্ঞানচর্চায় যে ভাবনাগুলো তুমুল আলোড়ন জাগায়, প্রাগ্রসর অথবা সৃষ্টিছাড়া বলে যারা নজর কাড়ে, এবং সমাজের স্থিতাবস্থার যে কোনো ছককে যারা আঘাত হানে, তাদের দিকে আমাদের নিম্নবর্গের মেধাবী ভাষ্যকাররা হাত বাড়ান। এতদিন যে কোনো আগাম ধারণা না রেখে নিম্নবর্গকে তাদের জায়গা থেকে তাদের মতো করে অবিকল নির্মাণের প্রয়াস প্রাথমিকতা পেয়ে আসছিল, যদিও ঘটনা বাছাই ছিল প্রবলভাবে পরিকল্পিত বক্তব্যের অনুসারী,—তা থেকে তাঁরা কার্যত সরে আসেন! তত্ত্বগত ভিত্তিও একটা তৈরি হয়। অবশ্য তাঁদের বক্তব্যের সহায় হতে পারে বলেই তাকে তাঁরা মেনে নেন। কিন্তু ব্যাপারটা দাঁড়ায় এই যে, নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চায় আরোহী-চরিত্র দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়। পরমুখাপেক্ষিতার যে অভিযোগ ছিল তাঁদের প্রচলিত ধারায় ইতিহাসচর্চার বিরুদ্ধে, তা এখন তাঁদের বিরুদ্ধেও তোলার সুযোগ তৈরি হলো। তাঁরা অবশ্য বলতে পারেন, এ সহমর্মী-সহযোগী সহযোদ্ধার সমবায়। কিন্তু সে সমবায় নিম্নবর্গের নয়, না দেশে, না কালে। এই ধরে-নেওয়া বিদ্যার ওপর দাঁড়াবার ফলে সাবলটার্ন স্টাডিজ পদ্ধতিগতভাবে অবরোহী হবার দিকে বাঁক নেয়। প্রতিটি রচনায় হয়তো তা প্রত্যক্ষ নয়; কিন্তু প্রতিটি রচনার অন্তরালেই তার প্রভাব যে সক্রিয়, তা খুব ভালোভাবেই বোঝা যায়। আসলে এই প্রভাব কাজ করে চলে নিম্নবর্গের নব্য কথাকারদের মাথার ভেতরেই। নিরাসক্তি অবশ্য তা সত্ত্বেও ইতিবাচক ফল দেওয়ার দাবি জানাতে পারে। যদিও ভিন্নরূপে ভিন্ন বেশে। কিন্তু তার অভাবের পরিণাম অনিবার্যভাবে শোচনীয়।
পালাবদলের ভাবনাকে প্রবলভাবে উসকে দেয় গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের দুটো বিস্ফোরক প্রবন্ধ: প্রথমটি, ‘সাবলটার্ন স্টাডিজ: ডিকনস্ট্রাকটিং হিস্টরিয়োগ্রাফি’,—বেরোয় সাবলটার্ন স্টাডিজ চতুর্থ খণ্ডে (১৯৮৫)। দ্বিতীয়টি, ‘ক্যান দ্য সাবলটার্ন স্পিক?’—নামেই চমক। ছাপা হয় ১৯৮৮ সালে, লারি গ্রসবার্গ ও কেরি নেলসনের সম্পাদনায় মার্কসিস্ট ইন্টারপ্রিটেশনস্ অব লিটারেচার অ্যান্ড কালচার: লিমিটস্, ফ্রন্টিয়ারস, বাউন্ডারিজ গ্রন্থে, কিন্তু লেখা প্রথমটির আগে। তাঁর প্রথম প্রতিপাদ্য, সাবলটার্ন নিজে কথা বলে না; বলতে পারে না। সমাজবাস্তবতায় সে বোবা। অধীনতার অভ্যস্ত-বৃত্তে সে তার জীবনযাপনে আচার-আচরণে বিরূপতার প্রতিরোধের ও প্রত্যাখ্যানের লক্ষণ নিত্যদিন নীরবে ফুটিয়ে তোলে। অন্তত সেই রকমই মনে হয়। তার নয়, অন্যের। এই মনে হওয়াকে ভাষায় রূপান্তরিত করেন নিম্নবর্গের মুখপাত্ররা, সাবলটার্নকে যাঁরা বিষয় করেন, তাঁরা। কারকতার সূক্ষ্ম হস্তান্তর ও সম্প্রসারণ ঘটে। ফলে এই ইতিহাসচর্চা যাঁদের বিষয় তাঁরাও পরোক্ষে নিম্নবর্গীয় গোত্রে ঢুকে পড়েন। ঘটনার কর্তা হিসেবে নয়, কারক হিসেবে। এবং ঘটনার প্রতিফলন ঘটে তাঁদের মধ্যস্থতায়। এতে বিষয়-বিষয়ীর প্রথাসিদ্ধ বিভাজন ভেঙে যায়। ‘সিগনিফায়ার’ ও ‘সিগনিফায়েড’ নিজেদের ভেতর জায়গা বদল করে, এবং ক্রমাগত করেই চলে (ডিকনস্ট্রাকশন)। অতএব নিস্পৃহ পর্যবেক্ষণ নয়, বিষয়ের সঙ্গে সচেতন একীভবন সাবলটার্ন স্টাডিজ-প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের ওপর অনিবার্যভাবে বর্তায়। রচনাবলি তাই শুধু ঘটনার নিরপেক্ষ বিবরণ থাকে না, নিম্নবর্গের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রতিনিধিত্বও করে। তাদের স্বপ্ন-কল্পনাকে আকার দেয়, এমনকি মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার কৌশল নিয়েও মাথা ঘামায়। ইতিহাসচর্চার পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে সাবলটার্ন স্টাডিজ, তিনি মনে করেন, বৃহত্তর পরিসরে পদচারণার দাবি রাখে। ক্ষমতার চক্রব্যূহ থেকে বেরিয়ে এসে নিম্নবর্গের মানুষেরা তাদের চৈতন্যে লালিত প্রকৃত মুক্তির স্বাদ যাতে পায়, তার সর্বোত্তম পথ খোঁজাও এ কারণে প্রাসঙ্গিক। সমাজনীতি, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক ভাবনা, এ সবের বিচার-বিশ্লেষণ তাদের জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে তাহলে সামনে চলে আসে। উপযুক্ত তত্ত্বের সন্ধানও বাদ পড়ে না। তাঁর প্রস্তাব-অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও সমাজ আগের মতোই আলোচনার বিষয় থাকলেও বাইরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বা তত্ত্ব-সন্ধানে বিশ্ববিদ্যার যে কোনো ভাণ্ডারে হাত বাড়াতে, কোথাও তার সর্বশেষ সংযোজনকেও কাজে লাগাতে, এই উদ্যোগ অকুণ্ঠে অগ্রসর হতে পারে। দ্বিবিধ বাস্তবতার যোগসূত্র দেখাতে নিজেকেই উদাহরণ টেনে তিনি লেখেন, My role in this essay, as subject of investigation, has been entirely parasitical, since my only object has been the Subaltern Studies themselves. Yet I am part of their object as well. Situated within the current academic theatre of cultural imperialism, with a certain carte d’entree into the elite theoretical ateliers in France, I bring news of power lines within the palace. Nothing can function without us, yet the part is at least historically ironic. (Subaltern Studies: Deconstructing Historiography, Subaltern Studies, IV, 1985, p 363).তাঁর এই Historically Ironic কথাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। চোখ-কান খোলা রেখেই তিনি যে নিম্নবর্গের জীবনপাঠের ও তার স্বরূপ-অন্বেষণের নতুন পথ বাতলান, তার পরিচয় এতে মেলে।
একটি কথা এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভালো। মার্কসীয় পদ্ধতিতেও ঐতিহাসিক পটভূমিতে খেটে-খাওয়া মানুষের বা সর্বহারা মানুষের চলমান বাস্তব অবস্থার বিচার-বিশ্লেষণ সম্ভব। দিকনির্দেশনাও মেলে। তবে সেখানে, আগেই বলেছি, প্রাধান্য পায় দ্বান্দ্বিক বাস্তবতায় উন্নয়ন-রেখার সন্ধান। তাত্ত্বিক ছক, এবং বিন্যাস ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি আগে থেকে দেওয়া। তার সঠিক সক্ষম প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে অনুশীলনের সার্থকতা। কিন্তু সাবলটার্ন স্টাডিজের বেলায় উন্নয়নের প্রশ্ন অবান্তর। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় নিম্নবর্গের স্বরূপ চিনে নেওয়া, ও উচ্চবর্গের-সেই অর্থে দেশি-বিদেশি এলিট সম্প্রদায়ের প্রভাববলয় থেকে মুক্ত করে তাকে তার আপন ভূমিতে প্রতিষ্ঠা করা, এটিই তার চূড়ান্ত লক্ষ্য। অবশ্য গায়ত্রী স্পিভাকের প্রস্তাবনা মেনে নিলে প্রশ্ন-মীমাংসার প্রক্রিয়া আর অনন্যনির্ভর থাকে না। ভেতর থেকে নয়, মার্কসীয় পদ্ধতির মতোই তা বাইরে থেকে, এমনকি ওপর থেকে সঞ্চালিত হয়। কোথাও পুরোপুরি, কোথাও-বা আংশিক। তবে এক ও অদ্বিতীয় কোনো সিদ্ধান্ত অনিশ্চিত। তাঁর ডিকনস্ট্রাকশন প্রক্রিয়া এই অনিশ্চয়তা ডেকে আনে। বচনে কর্তা-কর্মের জায়গা বদল তার যে রূপান্তর ঘটায় একইভাবে তার পুনরাবৃত্তি ক্রমান্বয়ে ঘটাতে থাকলে যে সংযোগরেখার সৃষ্টি হয়, তা যে এক ও অনন্য, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। সম্ভাব্য অনেকগুলোর ভেতর থেকে প্রতি পদে রূপান্তরবিন্দু একটি বাছাই করা। এই বাছাইয়ের কোনো যুক্তিসিদ্ধ উপায় নেই। যিনি দেখছেন, তাঁর তাৎক্ষণিক বিবেচনাই সব। ফলে চূড়ান্ত প্রস্তাবও ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের পরিণাম। বিভিন্নজনের বেলায় তা বিভিন্ন হওয়া বিচিত্র নয়। এমনকি একজনও সময় ও বাস্তব অবস্থা বদলে গেলে নিজের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে পারেন। অঙ্কশাস্ত্রে ফিক্সড পয়েন্ট থিওরেম বলে একটি তত্ত্ব আছে। আবশ্যক পূর্বশর্ত কটি মেনে নিলে যুক্তিক্রম অনুসরণ করে একক স্থিরবিন্দু-সমাধান তাতে মেলে। ডিকনস্ট্রাকশনে এমন কোনো পূর্বশর্তের বালাই নেই। চিন্তার স্বাধীনতাকে তা আক্ষরিক অর্থেই অনর্গল করতে চায়। হাতে তাই কিছুই নিশ্চিত ধরা পড়ে না। চারপাশে অনেক সম্ভাবনা এলোমেলো ছড়িয়ে যায়। হাতেরটা, আর হাতের বাইরের কোনোটা যদি সমান গ্রহণযোগ্যতা দাবি করে, তবে তার একক মীমাংসা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মার্কসীয় পদ্ধতি আমাদের এমন অনিশ্চয়তার ভেতরে ফেলে না। অবশ্য পদ্ধতিটিই যদি প্রত্যাখ্যান করি-এবং প্রত্যাখ্যান করি তা সুনির্দিষ্ট সমাধান দেয় কেন, এই অভিযোগ তুলে-তবে এ নিয়ে কথা বলার আর কোনো সুযোগ থাকে না।
ডিকনস্ট্রাকশনের এক নমুনা খাড়া করেছেন গায়ত্রী স্পিভাক স্বয়ং। কর্তা-কর্ম সম্পর্কে ওলট-পালট ঘটিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর ‘স্তনদায়িনী’ গল্পটির বিভিন্ন বিদগ্ধ পাঠ অসামান্য দক্ষতায় তিনি আমাদের সামনে হাজির করেছেন। (‘এ লিটেররি রেপ্রেসেন্টেশন অব দ্য সাবলটার্ন: মহাশ্বেতা দেবী’স স্তনদায়িনী’, সাবলটার্ন স্টাডিজ, ৫; ১৯৮৭, পৃ. ৯১-১৩৪)। মহাশ্বেতা স্বয়ং যেখানে মনে করেন, তাঁর ‘স্তনদায়িনী’ ভারতমাতার রূপক, যাকে স্বাধীন ভারতবাসী চুষে ছিবড়ে করে নিজের মতো সবাই ফায়দা লোটাতেই ব্যস্ত, সেখানে গায়ত্রী তাকে দেখেন সাবলটার্নের প্রতিরূপ হিসেবে। ডিকনস্ট্রাকশন এ রকম হাজির করে আরও অন্যান্য পাঠ। (এখানে জনান্তিকে বলি, এক রচনার একাধিক ব্যাখ্যা সাহিত্যপাঠে নতুন নয়। রবীন্দ্রনাথের পঞ্চভূতের ডায়রিতেও ‘বিদায় অভিশাপ’ কবিতায় কচ-দেবযানী কাহিনির পাঁচরকম ব্যাখ্যা নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুক আছে। পূর্ণ প্রত্যক্ষণের অসম্ভাব্যতাই তো দর্শনে ফেনমেনলজির নিরুপায় বিবেচনার বিষয়। বাস্তব যে বহুমাত্রিক, এবং সব দিক থেকে তাকে এক সঙ্গে দেখা যায় না, এই বিষয়টিরই তা মুখোমুখি হয়। ডিকনস্ট্রাকশন এই বিবেচনার মাত্রা যেমন ইচ্ছামতো বাড়িয়ে দেয়, তেমনি সমাজ-সংসারের খোলসগুলো মেধার ছুরিতে খণ্ড খণ্ড করে বিষয়ের মৌলিক সত্তাকে তার নিজস্ব পরিমণ্ডলে ফুটিয়ে তুলতে চায়। যা পারে, ও যেটুকু পারে, তা সঠিক, কী মায়া, তা ভিন্নকথা। উত্তর-আধুনিক ভাবনায় এর বিশেষ দাপট। এ প্রসঙ্গে আসছি পরের অংশেই।)
অস্বীকার করা যায় না, গায়ত্রীর দিকনির্দেশনা নিম্নবর্গের কারবারিদের নতুনভাবে উজ্জীবিত করে। সরল ইতিহাসচর্চায় তাঁরা আর নিজেদের বেঁধে রাখেন না। হয়তো সেখানে চাষের জমিও অনাবাদি আর বেশি পড়ে ছিল না। তাতে নতুন নতুন ক্ষেত্র খোঁজার একটা তাগিদ ভেতর থেকেই তৈরি হয়ে থাকবে। গায়ত্রীর রচনা তাতে গতি সঞ্চার করে। ডিসকোর্সে নিম্নবর্গের একাত্ম হয়ে পড়া, চেতনাকে তাদের ভেতরে স্থাপন করে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বে কর্ম-সম্পর্কের পরিমণ্ডল তাদের মতো করে চিনে নেওয়া এবং তাদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির নিবিড় পাঠে তাদের ভাবনার জগৎ স্পষ্ট করে তোলা, তাঁদের উৎসাহ এ সবের দিকে নবউদ্যমে প্রসারিত হয়। কাজে তাঁদের বৈচিত্র্য আসে। সমৃদ্ধিও যোগ হয়। তবে স্বয়ং-সিদ্ধির, স্বয়ংসম্পূর্ণতার বা আপনত্বের শুদ্ধতার কথা আর বলা যায় না। নিম্নবর্গ নিয়ে তাঁদের অনুশীলন সরাসরি বিশ্ববর্গের জ্ঞানকাণ্ডে অন্বিত হয়। পন্থা-পদ্ধতি নির্দ্বিধায় তাঁরা বাইরের ওপরমহলের খাস-কামরা থেকে কুড়িয়ে আনেন। অজুহাত পেয়ে যান গায়ত্রীর দেওয়া মন্ত্রে। ঠিক-বেঠিক, ভালো-মন্দ, এ প্রশ্নগুলো ওঠে না। কারণ ডিসকোর্সে এমন বিভাজন-রেখা অবান্তর। প্রাসঙ্গিক শুধু প্রত্যক্ষের ধারাবাহিক নির্মাণ। এবং সেই নির্মাণে নিম্নবর্গের মুক্তির সন্ধান। কল্যাণ-অকল্যাণের ধারণায় সে মুক্তি ভারাক্রান্ত নয়।
উত্তর-আধুনিক জ্ঞানচর্চার কলাকৌশল নিয়ে কিছু বলার আগে উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাবিদদের প্রভাবের কথাও মনে করিয়ে দিই। নিঃসন্দেহে তাঁরা হয়ে পড়েন ফ্রান্স্ ফানোনের (Franz Fanon) সহযাত্রী। তাঁর অসাধারণ কালজয়ী বই Black Skin White Mask (ফরাসি ভাষায় ১৯৬১, ইংরেজি ১৯৬৩)। জাঁ পল সার্ত এর ভূমিকা লেখেন। নব্যস্বাধীন দেশসমূহে জাতীয়তানির্মাণে সঙ্কট ও ব্যর্থতা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে চিনিয়ে দেন। সেইসঙ্গে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো অগ্নিস্রাবী তাঁর ভাষা-হতাশায় ও ক্ষোভে দীর্ণ। দক্ষিণ এশীয় অভিজ্ঞতাকে সহজেই তাঁর বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়। মিলিয়ে নেওয়া যায় সামীর আমিন, ইমানুয়েল, ফুর্তাদো, এঁদের পরনির্ভরতার তত্ত্বে কেন্দ্র-প্রান্ত ব্যবধানের ব্যাখ্যার সঙ্গেও। সাবলটার্ন স্টাডিজ যখন ইতিহাসচর্চা থেকে সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির ব্যাপকতর ক্ষেত্রে নিজেকে ছড়ায়, তখন তার চিন্তাবলয়ে এঁরা সহজেই ঢুকে পড়েন। তবে ফানোন যেখানে জাতীয় চেতনা পরিশুদ্ধ করতে বৃহত্তর গণসংহতির আহ্বান জানান, সাবলটার্নওয়ালারা সেখানে জাতীয় চেতনার ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করে টুকরো টুকরো লোকসত্তার আলাদা আলাদা বিকাশের সম্ভাবনার ওপর জোর দেন। যেমন পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে বলেন, ভারতবর্ষের ইতিহাসের কোনো অখণ্ডতা নেই। তাঁর প্রস্তাব, ‘কোনটা সমগ্র আর কোনটা অংশ, কে অবয়ব কে অবয়বী, এ প্রশ্নও নতুন করে বিচার করতে হবে।... এই বিকল্প ইতিহাসের সামগ্রিকতা যদি কিছু থাকে, তবে তা রাষ্ট্রীয় নয়, যুক্তরাষ্ট্রীয়...।’ বিপরীতে ফানোন তাঁর সিদ্ধান্ত টানেন, ‘—The living expression of the nation is the moving consciousness of the whole of the people, it is the coherent, enlightened action of men and women. The collective building up of a destiny is the assumption of responsibility on the historical scale. Otherwise there is anarchy, repression, and the resurgence of tribal parties and federalism. The national government, if it wants to be national, ought to govern by the people and for the people, for the outcasts and by the outcasts. No leader, however valuable he may be, can substitute himself for the popular will; and the national government, before concerning itself about international prestige, ought first to give back their dignity to all citizens, fill their minds and feast their eyes with human things, and create a prospect that is human because conscious and sovereign men dwell therein. (পূর্বোক্ত, পৃ. ২০৪-৫)।
বোঝা যায়, তিরিশ বছরের ব্যবধানে বিশ্বচিন্তার বলয়ে কম্পাসের কাঁটা একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গেছে। সাবলটার্ন চিন্তার পুরোহিতরাও সেই অনুযায়ী নৌকায় হাল ধরে মাস্তুলে পাল খাটিয়েছেন; যদিও বস্তুগত অবস্থার পাঠ নিয়েছেন ফানোনের গভীর অন্তর্দৃষ্টি অনুসরণ করে। একই রকম কেন্দ্র-প্রান্তর বিচারে সামীর আমিন, ইমানুয়েলদের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এঁরা একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল ঘরের ভেতরের অভিজন-অভাজন সম্পর্কেই নজর দেন। চিন্তার ছকটা কিন্তু ফেলে দেন না। প্রয়োজনমতো সংকীর্ণ পরিসরে তাকে কাজে খাটান।
তবে তাঁদের ভাবনা-প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ছাপ ফেলেন বোধহয় উত্তর-আধুনিক তত্ত্বজ্ঞানীরা। গায়ত্রী স্বয়ং তাঁদের একজন। এবং অবস্থান তাঁর প্রথম সারিতেই। নিচুতলার মানুষকে নিয়ে, এবং নিচুতলার মানুষের মতো ভাবনাচিন্তার অবিকল ছাঁচ তৈরি করাতেও তাঁর বৈদগ্ধ ও খ্যাতির প্রভা সম্মোহনের জাল ছড়ায়। সাবলটার্ন স্টাডিজ স্বেচ্ছায় তাতে বাঁধা পড়ে। সেইসূত্রে অদৃশ্যে ছড়ি ঘোরান দেরিদা, ফুকো, লিওতার, আলথুসারের মতো উত্তর-আধুনিকতার সর্বজনস্বীকৃত প্রবক্তারা। উত্তর-আধুনিকতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা। বিশেষ করে রাষ্ট্রের ও রাষ্ট্রের অনুশাসনে চালিত সংগঠনসমূহের কর্তৃত্ব থেকে মানুষের মৌলিক সত্তাকে মুক্ত করার তত্ত্ব-নির্মাণে তাঁদের মানসলোকে পথপরিক্রমা। তাঁদের লক্ষ্যে মার্কসের অনুরণন কিছুটা মেলে অবশ্যই। কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে এবং তত্ত্বগতভাবে সংঘশক্তিকে অস্বীকার তাঁদের মার্কসের বিপরীত মেরুতে টেনে নিয়ে যায়। তবু যেহেতু তাঁরা শৃঙ্খলাপরায়ণ সমাজব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাই তাঁরা র্যাডিকাল। এবং র্যাডিকাল ভাবধারার একটা মোহ আপনা থেকে তৈরি হয়। অনেককে তা আকর্ষণ করে। যেমন আকর্ষণ করে দক্ষিণ এশীয় সাবলটার্ন চিন্তার নায়কদের।
আমরা জানি আলথুসার ইতিহাসের ক্রমবিকাশের ধারায় কোনো কর্তার (ঝঁনলবপঃ) বা নিয়ন্তার ভূমিকা অস্বীকার করেছেন। এতে মার্কসীয় শ্রেণিসংগ্রামের ধারণায় শ্রেণির কোনো নির্ধারণী ক্ষমতা আর থাকে না। যেমন থাকে না অসংখ্য সম্পর্কের জটাজালে ব্যক্তির ক্রিয়াকর্মেরও। সমাজে উৎপাদন-সম্পর্কের সৃষ্টি হয় ঠিকই। তা ঘটে ভেতরের নিরন্তর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার তাগিদে। শ্রেণিও ফলে দানা বাঁধে। স্বার্থের টানে অথবা বিপরীত স্বার্থের বিরোধিতায় তার সক্রিয় হওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। প্রশ্ন ওঠে না ব্যক্তিরও তাতে ভিড়ে যাবার প্রবণতা নিয়ে। কিন্তু তারা কেউই কর্তৃত্ব করে না। ঘটনার চাবিকাঠি তাদের হাতে নয়। ঘটনার অন্তরালে অস্তিত্বের তাগিদে জৈব প্রবণতাগুলো পরিপার্শ্বের সংস্পর্শে-সহায়তায় ও সংঘাতে যেভাবে শত্রুতায় ও মিত্রতায় নিজেদের ক্ষেত্র রচনা করে, তার হাতে। (‘তোমার কর্ম তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি’—এই রামপ্রসাদী পদ থেকে কি খুব দূরের মনে হয়?) ব্যক্তি বা শ্রেণি তার হাতের পুতুল। তার কর্তৃত্বের বোঝা টেনে চলে মাত্র। (আবার মনে করি, ‘মা আমায় ঘোরাবি কত, চোখ-বাঁধা বলদের মতো।’) এদিক থেকে ইতিহাসের গতি কোনো মানবিক বোধে অনুপ্রাণিত নয় (অ্যান্টি-হিউম্যানিস্ট)। মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের পেছনেও, তাঁর মতে, মানবিকতার কোনো তাগিদ নেই। কল্যাণ-অকল্যাণ-ভাবনা নিরর্থক। পাশাপাশি দেরিদা যখন বলেন, সব কিছুই ডিসকোর্স, গোটা পৃথিবীতে তারই মায়ার খেলা, তখন চূড়ান্ত গন্তব্য বলে আর কিছু থাকে না। বাস্তব প্রতিটি বর্তমানে যেভাবে নিজেকে উন্মোচিত করে, তার সামনে নিজের ভূমিকা চিনে নেওয়া যায় মাত্র। কারণ ডিসকোর্স অন্তহীন প্রক্রিয়া। সম্ভাবনাও তার বহুমুখী। কর্তা-কর্মের নিয়ত রূপান্তরে তা গতি পায়। অনেক সম্ভাবনার ভেতর ঘটনা একটিই ঘটে এবং তা নতুন ঘটনার দিকে অগ্রসর হয়। ঘটনার পেছনে ক্ষমতার সন্নিবেশের ধরন তার চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলে। এইভাবে, ফুকো দেখান, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সর্বত্র তার ক্ষমতার জাল ছড়ানো, এমনকি পাগলাগারদে, কয়েদখানাতেও। সব প্রতিষ্ঠান তার আজ্ঞাবহ, এবং তার কেন্দ্রভূমিতে রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হয় ক্ষমতার বণ্টন-ব্যবস্থা। ব্যক্তির সক্রিয় উদ্যোগের জায়গা ক্রমশ ছোট হয়ে আসে। নিরর্থকতায় হারিয়ে যেতে বসে তার অস্তিত্ব। ক্ষমতার এই কাঠামো যদি ব্যক্তির স্বকীয়তা ধ্বংস করে, যদি তা হয়ে পড়ে নিবর্তনমূলক ও সর্বগ্রাসী, তবে তাকে প্রত্যাখ্যান করে তার বলয় থেকে বেরিয়ে আসার কথাই ভাবতে হয়। কিন্তু তা মার্কসীয় বৃত্তে অনুরূপ আর একটি প্রতিস্পর্ধী ক্ষমতাবলয় তৈরি করে নয়। কারণ তাতেও ব্যক্তির নিজস্বতা পুঞ্জীভূত ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারিতার কাছে বিপন্ন। লক্ষ্য তাই ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঠেকানো, যাতে ব্যক্তি ও আলাদা আলাদা বর্গ ও গোষ্ঠী, প্রত্যেকে আপন আপন শিকড়ে সংলগ্ন থেকে, বুর্জোয়া এলিটের প্রভাবমুক্ত হয়ে আত্মস্বরূপে বিকশিত হতে পারে। কীভাবে ওই ক্ষমতা তাদের মৌলসত্তায় বিকৃতি ঘটায়, কেমন করে তা থেকে উদ্ধার মেলে, এই সব প্রশ্নের অনুশীলন ও পূর্ণ স্বাধীনতায় মীমাংসার সন্ধান তাই তাঁর প্রথাবিরুদ্ধ জ্ঞানচর্চায় প্রাথমিকতা পায়। উত্তর-আধুনিক চিন্তাবলয়ে আলথুসার-দেরিদা-ফুকো তাঁদের ভাবনা-সিদ্ধান্তকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করান, যেখানে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বা কোনো একক দলের শাসন আর সর্বজনমান্য বলে গ্রাহ্য হয় না। ধারণা হিসেবে বুর্জোয়া রাষ্ট্র তার নিরঙ্কুশ অধিকার হারায়, ফরাসি বিপ্লবের ভাবাদর্শে জাতীয়তার নির্মাণেরও কোনো সংগত ভূমি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের কর্তৃত্বহীন কর্তৃত্বের প্রদর্শনীর সামনে, বহু ফাটলে দীর্ণ জাতীয়তার বিবর্ণ ভঙ্গুরতাকে বাস্তব মেনে নিয়ে তাঁরা তাই বিভিন্ন মানবসমুদয়ের জন্য ওই সব আরোপিত নিষেধের বন্ধন অথবা কৃত্রিম পরিচয়ের জবরদস্তি থেকে উদ্ধারের পথ বাতলাবার কাজে নামেন। জ্ঞানচর্চায় এতটুকু ছাড় তাঁরা দেন না। ডিসকোর্সকেও টেনে নিয়ে যান সম্ভাবনার নতুন নতুন বিন্দুর দিকে। কিন্তু বুদ্ধির মুক্তি বা এনলাইটেনমেন্টকে তাঁরা পরিহার করেন। ধরা দেন স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে সহজ পরিচয়ের কর্তৃত্বহীন অবস্থানের আকর্ষণে প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজ সংগঠনের প্রকৃতিতাড়িত বিশ্বাস ও সংস্কারের বিশেষ বিশেষ অবয়বের কাছে। সেগুলোই তাঁরা মনে করেন খাঁটি। মেধার আলোক বর্ষিত হয় তাদের ওপরেই। যেহেতু চিরসত্য বলে কিছু নেই, সবই ডিসকোর্সে ভেসে-ওঠা এক একটা পর্যায়; এবং ন্যায়-অন্যায়েরও নির্বিকল্প কোনো ধারণা নেই, আছে কেবল ক্ষমতার কঠিন-শিথিল নানারকম বুননের নমুনা, যেখানে তার নাগপাশ ছিঁড়ে ফেলাটাই প্রধান কাজ, তাই এই সব তাত্ত্বিকের চিন্তার আনুকূল্য গিয়ে পড়ে বৈচিত্র্যের সংহতিতে—বৃহত্তর ও ব্যাপকতর জাতীয়তাবোধের ওপর নয়, বরং ভেতর থেকে হয়ে-ওঠা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বয়ংক্রিয় উদ্বোধনের ওপর।
এই ধারণাগুলো লুফে নেন সাবলটার্ন স্টাডিজের বাঘা বাঘা দিকপাল। বুর্জোয়া আগ্রাসনের মুখে নিম্নবর্গের প্রতিবাদের ও প্রতিরোধের ইতিহাস রচনার পাশাপাশি তাঁরা নজর দেন কীভাবে এলিট ভাবনায় নিম্নবর্গের অপরায়ন ও অবনমন ঘটে, কীভাবে এই বিকার জাতীয়তার কথামালায় ঢুকে গিয়ে অনড়ত্ব পায়, কীভাবে ক্ষমতার জাল ওপর থেকে বিছিয়ে বহুবিধ ক্রিয়াকর্মের ভেতরে তাদের অধীনতাকে পাকাপোক্ত করার অলিখিত উদ্যোগ অবিরাম চালু থাকে, কীভাবে তাদের লুপ্ত পরিচয় ফিরিয়ে আনা যায়, কীভাবে জাতীয়তার পক্ষপাতদুষ্ট ভুল পাঠ সংশোধন করে নতুন পাঠে প্রত্যেকের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়, এ সবের ওপর। আমরা বেশ কিছু ব্যতিক্রমী রচনা পাই। অস্বীকার করা যায় না, তারা আমাদের বিচলিত করে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় লেখেন ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে ‘ভগ্নাংশের সমর্থনে’। মূলধারার ইতিহাসরচনায় নিম্নজনের ও ব্রাত্যজনের অনুপস্থিতি যে প্রকৃত বাস্তবতাকে আড়াল করে, শূন্যতা ও ভ্রান্তির দুর্বল ভিতের ওপর যে জাতীয়তাবাদের প্রাসাদ দাঁড়িয়ে থাকে, পাশ্চাত্যের অনুসরণে সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা যে আমজনতার অনুভূত সংবেদনার প্রতিফলন ঘটায় না, এই কথাগুলো তাঁদের লেখা থেকে উঠে আসে। রণজিৎ গুহও সওয়াল করেন লোকচেতনায় ধর্মবিশ্বাসের যথাযথ মূল্যায়নের জন্যে। লৌকিক আচারে যদি পারস্পরিক ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটে, তবে তাকে নাই—বলে চেপে দেওয়া একধরনের অন্ধতা। জাতীয়তার নির্মাণ, তাঁদের মতে, তাতে মজবুত হয় না। রাষ্ট্রও সমূহ চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে তাকে বারবার প্রভুত্ব খাটিয়ে ও কর্তৃত্বের হাতিয়ার ব্যবহার করে দেশে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাবার কাজে নামতে হয়। দীপেশ চক্রবর্তী লেখেন ‘শরীর সমাজ ও রাষ্ট্র: ঔপনিবেশিক ভারতে মহামারি ও জনসংস্কৃতি’। ফুকোর তত্ত্বকাঠামো ও পর্যবেক্ষণের ছায়া পেছনে অস্পষ্ট থাকে না। ‘কথকতার নানা কথা’য় গৌতম ভদ্র ফুটিয়ে তুলতে চান নিম্নবর্গের নিজস্ব ভাবনায় তার নান্দনিক স্বপ্নকল্পনা। বুর্জোয়া নাগরিক মাপকাঠিতে তা উপেক্ষিত। সেই অনুপাতে ওপর থেকে জাতীয় সংস্কৃতির যে রূপ তুলে ধরা হয়, তা ভীষণভাবে খণ্ডিত ও রক্তশূন্য।
সবমিলিয়ে নিম্নবর্গ নিয়ে অতি উঁচুদরের জ্ঞানানুশীলন প্রবলভাবে প্রথমবিশ্বের উত্তর-আধুনিক চিন্তাবলয়ে ঢুকে পড়ে। সেখান থেকে ধ্যান-ধারণা যেমন তা নির্বিচারে নেয়, তেমনি নেয় সেখানে উদ্ভাবিত পদ ও শব্দরাশি, এমনকি র্যাডিকাল ভাষাভঙ্গিমাও। একে তাঁরা স্ববিরোধ বলতে নারাজ। পাশ্চাত্যের একটি দৃষ্টিভঙ্গি ও আনুষঙ্গিক ভাবনা-কৌশল তাঁরা ব্যবহার করছেন মাত্র। উভয়েই, তাঁদের মতে, দেশ ও কাল নিরপেক্ষ। নিম্নবর্গকে স্থানীয় পরিবেশ থেকে বিশ্বপরিসরে তুলে আনতে যদি তারা সর্বাধিক উপযোগী মনে হয়, তবে তাদের ওপর নির্ভর করায় কোনো অসংগতি তাঁরা দেখেন না; বরং নীরব ও নিশ্চল তথ্যে প্রাণসঞ্চারের সুযোগই এতে তাঁদের মেলে। অবশ্য স্থান ও কাল-মাহাত্ম্য মানুষের সমাজ-সংসার বিষয়ক, যে কোনো বক্তব্যে বর্তায়। তা তাত্ত্বিক হোক, আর প্রায়োগিকই হোক। এমন না হলে কোনো ডিসকোর্সের ধারণাই খাড়া করা যায় না। নিম্নবর্গের ভাষ্যকাররা ডিসকোর্সের ছকে ফেলা প্রয়োগিক তত্ত্ব বাইরে থেকে ধার করে যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করার ফলে নিজেদের বক্তব্যকে নিজেরাই কিছুটা হলেও খণ্ডন করেন। যদিও তাঁদের কণ্ঠস্বর অনেক দূরে পৌঁছোয়, এবং চিন্তার জগতে সম্ভ্রান্ত জনের দরবারকক্ষে বসার অধিকারও তাঁদের জন্মায়। কেন্দ্র ও প্রান্তের ব্যবধানে তাঁরা আর প্রান্তে পড়ে থাকেন না। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার তকমা গায়ে এঁটেই কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে প্রতিষ্ঠানের খাসমহলে ঢুকে পড়েন। বিদ্যাচর্চার বুর্জোয়া ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমীহও আদায় করেন। বিদ্যাচর্চায় নয়া-উপনিবেশবাদী স্বার্থচক্রের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ও-নাকি তত প্রচ্ছন্ন নয়। তাঁদের জোটে। কৌলীন্যপ্রাপ্তি যদি নিম্নবর্গের মেধাবী ব্যাখ্যাতাদের মোক্ষলাভের নিশ্চিত প্রমাণ হয়, তবে তা তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে অর্জন করেন। বাস্তবে নিম্নবর্গ বলে যাদের তাঁরা শনাক্ত করেন, তারা নিজেরা এর ফলে কতটা কৌলীন্য পায়, তা অবশ্য আলোচনার বাইরেই থেকে যায়। এত কিছুর পরও সাবলটার্ন স্টাডিজের অন্তর্বয়ন ও তার ভূমিকা নিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। আমরা তেমন কিছু কিছু প্রশ্নের এবার মুখোমুখি হই।
প্রথমেই খটকা জাগে নিম্নবর্গের পরিচয়বিধি নিয়ে। একে সংজ্ঞা বলা যায় না। কারণ সংজ্ঞা বিষয়ের ধারণা পুরোপুরি দেয়। এতটুকু বেশি না, কমও না। এবং একই সঙ্গে তুলনীয় পরস্পরবিরোধী বিষয়-ধারণাও তাতে ঢুকে পড়ে না। এমন আঁটোসাঁটো কোনো সূত্র নিম্নবর্গের পরিচয়সূত্রে পাই না। যিনি বর্ণ-বিভাজন করছেন, তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিরুচি এতে নিঃসন্দেহে কাজ করে। এতে যার যেমন খুশি বলার স্বাধীনতা বাড়ে, এমনকি তা স্বেচ্ছাচারিতা বলেও মনে হয়। অবশ্য উত্তর-আধুনিক মার্গে তাঁরা শৃঙ্খলাহীনতারই উপাসক। কাজেই তাঁদের বিষয়-পরিচয়েও তার ছাপ থাকবে, এটিই বোধহয় স্বাভাবিক। তাঁদের ভাষ্যমতে, শ্রমিক, কৃষক, নিম্নমধ্যবিত্ত গ্রাম ও শহরের গরিব জনতা, আদিবাসী, নারী, সবাই নিম্নবর্গের। ‘বঞ্চিত, নিপীড়িতের দল’, ‘নিষ্ফলের, হতাশের দল’—এ সব বললেও তার এক বস্তুনির্ভর মানদণ্ড খাড়া করা যায়। কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে ধরে সবাই নিম্নবর্গ এমন বলায় আতিশয্যের আশঙ্কা থাকে। ক্ষেত্রভেদে পাত্রভেদ বলাতেও নিম্নবর্গের সুনির্দিষ্ট কোনো আকার তৈরি হয় না। ধরা যাক, নারী। এলিট-সাবলটার্ন বিভাজনে নারীকে সাবলটার্নভুক্ত করার অর্থ দাঁড়ায় সামাজিক অবস্থা ও অবস্থান-নির্বিশেষে সব নারী বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরাধীন। সংহতিতে ও সহমর্মিতায় নিম্নবর্গের ভেতরে নিজেদের জন্যে একটা জায়গা তারা করে নেয়। আমরা লক্ষ করি পাশ্চাত্যের চিন্তাবলয়ে নারীভাবনা জোরদার হবার পরই সাবলটার্ন প্রকল্পে তাদের টেনে আনা। এতে রচনা ফ্যাশনদুরস্ত হয় ঠিকই; কিন্তু মেকি চিন্তার বেসাতিও ধরা পড়ে। তা তোতাপাখির চিন্তাহীন অনুকরণপ্রিয়তাও ফুটিয়ে তোলে। অবশ্য গায়ত্রী যখন নারীবাদী প্রসঙ্গ আনেন, তখন তা একশভাগ খাঁটি-মেকি বা অনুকরণপ্রিয় তাকে বলা যাবে না কোনোমতেই। কিন্তু তাঁর পায়ের তলার মাটি নিম্নবর্গের নয়, তা উচ্চবর্গেরও উচ্চতম ধাপের।
এই উপমহাদেশে-অথবা পৃথিবীর যে কোনো জায়গায়; উপমহাদেশের কথা ওঠে, যেহেতু সাবলটার্ন স্টাডিজ উপমহাদেশকেন্দ্রিক-নারীর অবস্থান কি কেবলই অধীনতার, কেবলই উচ্চবর্গের পুরুষশাসনে পদপিষ্ট হবার? হাল-আমলের বুকনি ঝেড়ে এমনটি বললে হয়তো হাততালি জোটে, হয়তো বিদ্বৎসভায় কেষ্টবিষ্টুর সঙ্গে বসে এক ছিলিমে তামাক খাবারও সুযোগ হয়। কিন্তু এইটিই কি বাস্তবের সমগ্রতার পরিচয়? নারীর অবস্থান কি কেবল সমাজের নিম্নবর্গেই? আবার এমনও কি হয় না যে, নারীই নারীর দুর্গতির কারণ? সমাজব্যবস্থা তাকে প্রশ্রয় দেয় হয়তো, কিন্তু তারও গভীরে কি কাজ করে না ব্যক্তিনারীর আদিম অধিকার-সচেতনতা? এবং কালচক্রে একই নারীর বাস্তব অবস্থার কি পরিবর্তন ঘটে না? পারিবারিক ঐতিহ্যে, বা বর্তমানের সম্পর্কসূত্রে (হয়তো গরিবের মেয়ে বড়লোকের বউ হয়েছে, এমন,—আমাদের চলচ্চিত্রে এ জাতীয় স্বপ্নপূরণের কাহিনি প্রচুর) যে নারীর অবস্থান উচ্চবর্গে, তার আচরণে কিন্তু উচ্চবর্গের বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ পায় বেশি, তা বাইরে নিম্নবর্গের লোকজনের সঙ্গে যেমন, ঘরের ভেতরে চাকর-চাকরানিদের সঙ্গেও তেমন। ক্ষমতার খবরদারিতে কোথাও কোথাও পুরুষদের সে ছাড়িয়ে যায়। শাশুড়ি-পুত্রবধূর দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক যে প্রায়শই চোখে পড়ে, তা চিরকালের। এও দেখবার, একই নারীজীবনের তিন পর্যায়ে-কন্যা, পুত্রবধূ ও শাশুড়ি-তার ভূমিকার যে পালাবদল ঘটে, তাতে অধীনতা বা স্বাধীনতার একক বৃত্তে তাকে বেঁধে রাখা যায় না। অন্য নারীদের সঙ্গে সহমর্মিতার সহজাত আচরণও তার নিশ্চিত হয় না। বরং পারস্পরিক সন্দেহের ও ঈর্ষার প্রকাশই বড় বেশি চোখে পড়ে। নারীকে ঢালাওভাবে নিম্নবর্গের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করায় যে যৌক্তিক নির্মাণের সমস্যা দেখা দেয়, এ সব থেকে তার একটা আন্দাজ নিশ্চয় করা যায়। অবশ্য যৌক্তিক নির্মাণ উত্তর-আধুনিক চিন্তাবিদদের কাছে গুরুত্ব পায় না। আগেই বলেছি, তাঁরা অ্যান্টি-এনলাইটেনমেন্ট, এবং সেইসূত্রে অ্যান্টি-র্যাশনাল।
আদিবাসী, উপজাতি, জনজাতি, এদেরও ঢালাওভাবে নিম্নবর্গে ফেলে দেওয়াতে দেখা দেয় একই রকম বিভ্রান্তি। দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাধীনতা সংগ্রাম জাতীয়তাবাদের যে সামষ্টিক ভাবনাকে সংহত করে, সাবলটার্নবাদীরা তাকে আরোপিত বলে খণ্ডন করেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প ভাবনায় তাঁরা ওই সব জনগোষ্ঠীর বিভিন্নতা ও বিচ্ছিন্নতাকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের ওপর বুর্জোয়া রাষ্ট্রের আধিপত্যকে অনৈতিক ও অসংগত বলে রায় দেন। বিপরীতে তাদের ঠেলে দেন নিম্নবর্গের বৃত্তে। সেখানে অধীনতার সম্পর্কজাল থেকে বেরিয়ে এসে তারা পুরোপুরি আপন অবিমিশ্র পরিচয়ে, ঐতিহ্যশাসিত আপন বৈশিষ্ট্যে যদি প্রতিষ্ঠা পায়, তবে তাতেই দেখেন তাঁরা বাস্তব ভুলভ্রান্তির যথার্থ সমাধান। একদিক থেকে এটা ঔপনিবেশিক শাসনের কালপর্ব মন থেকে মুছে ফেলে তাদের তার আগের অবস্থায় বসিয়ে দেওয়া (টাইম মেশিনে উল্টো পাক, অথবা রিপ-ভ্যান-উইংকলের উল্টো দৌড়?)। এটা শুধু ভাববাদী কল্পনাবিলাস নয়, বিপজ্জনক পশ্চাৎমুখিনতাও। মনে করার কোনো কারণ নেই, প্রাক-ঔপনিবেশিক সোনালি অতীতে ক্ষমতা-সাম্য অথবা ক্ষমতা-সম্পর্ক না-থাকা ছিল ওই সব সমাজের বিশেষ উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়ে মানবপ্রগতির ও মানবমুক্তির সম্ভাবনার যে ধারণা, তা বাস্তবায়নের কোনো পরিবেশও সে সব জায়গায় ছিল না। নিচুমানের বৈষম্য, সমাজপতিদের বাড়াবাড়ি, প্রথার ও কুসংস্কারের দাপট, এগুলোরই চলেছে অপ্রতিহত রাজত্ব। বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন ধরন। কোথাও বেশি, কোথাও কম। যে নারীসমুদয়কে দেখি নিম্নবর্গের তালিকায়, তাদের অবস্থান ওইরকম কোনো কোনো জনগোষ্ঠীতে পাণ্ডা-পুরুত-মাতব্বরদের শাসনে অবরুদ্ধ ও দুর্বিষহ। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, এই সব জায়গার উপজাতীয় জীবনযাত্রার দিকে তাকালে এখনো বিষয়টি ধরা পড়ে। অন্ধবিশ্বাস ও স্থবিরতায় আক্রান্ত এই রকম কোনো কোনো জনগোষ্ঠীতে অন্তর্জাত অধীনতার সম্পর্ক ব্যাপক। সাবলটার্নপন্থী চিন্তাবিদরা কিন্তু সে সবেই দেখেন অধীনতার অবসান, বিশেষ করে রাষ্ট্রের অধীনতা থেকে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে মুক্তির আদর্শ রূপরেখা। গোড়ায় হয়তো স্বাধীনতা-অধীনতা, দুটোই অবান্তর, কিন্তু তাতে প্রযুক্তি-বিকাশ নেই, প্রগতিও নেই। শুদ্ধতায় এরই চূড়ান্ত প্রকাশ আন্দামানবাসী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতিতে, ভিন্ন মানুষের যোগাযোগ যারা এড়িয়ে চলে, সভ্যতার ও শিক্ষার আলো কিছুই যাদের ভেতর পড়ে না। একেই অভীষ্ট মানলে কারো কারো রোমান্টিক আকুতি তৃপ্তি পায় হয়তো, কিন্তু তা কতোটা কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন, তাও একই সঙ্গে ভেবে দেখা দরকার।
গ্রামীণ-সমাজে নিম্নবর্গের বলে যাদের এক কাতারে দাঁড় করানো হয়, তাদের ভেতরেও অসংখ্য ফাটল, অসংখ্য বিচ্ছেদ। জ্ঞানচর্চার ঊর্ধ্বলোকে বসে কেবল বইয়ে পড়া বিদ্যার ওপর নির্ভর করে যাঁরা সাবলটার্ন মানচিত্র আঁকতে বসেন, তাঁদের চোখে সে সব ধরা নাও পড়তে পারে, কিন্তু তাদের অস্তিত্ব ও গুরুত্ব তাতে কমে না। বিশেষ করে ইতিহাসের ধারায় ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা যেভাবে গড়ে ওঠে, তাতে নিম্নবর্গের সমতলীয়তা বা সমজাতীয়তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কোনো ঔপনিবেশিক হিসাব-নিকাশ এর জন্যে দায়ী নয়। কারণ গ্রামীণ-সমাজের রূপকাঠামো তৈরি হয়ে যায় ব্রিটিশ শাসনের আগেই। তাতে কৃষক আর ক্ষেতমজুর এক পর্যায়ের নয়, নয় কামার-কুমোর-মুচি-চামার। মেথর আর চণ্ডাল, তারাও আলাদা। সাবলটার্ন স্টাডিজ তাদের নিম্নবর্গে একসঙ্গে ধরে। যোগসূত্র একটিই। তা হলো, উচ্চবর্গের বিপরীতে তাদের অবস্থানের অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই সূত্র ধরে তারা একাকার হয় না। তাত্ত্বিক ভূমিতেও তাদের তফাৎ দূর করার কথা ভাবা হয় না। বরং তফাতগুলোকেই অটুট রাখতে চাওয়া হয়। তাতেই, বুঝি, প্রত্যেকের নিজের নিজের মৌলসত্তায় পৌঁছে যাওয়া। এবং আপন আপন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃত্তে সম্পূর্ণতা খোঁজা। এর রেশ যে আজকের একুশ শতকের ভারতের দ্বান্দ্বিক বাস্তবতায় মুছে গেছে, এমন নয়। গভীর দাগ তার ফুটে ওঠে এখনো আর্থসামাজিক ক্ষমতার ক্রমপ্রসারমান বলয়ে। লালুপ্রসাদ যাদব ও রামবিলাস পাসোয়ানের সমর্থনভূমির দিকে তাকালেই তাদের ঐতিহ্যের আশ্রয় ধরা পড়ে। তবে এই বিরোধের উৎস কোনো বুর্জোয়া উপনিবেশের কারসাজি নয়। তা প্রাচীন ভারতীয় সমাজ-সভ্যতার সমান বয়সী; এবং তার মূল থেকে যায় ওই সভ্যতার অন্তর-কাঠামোতেই। নিম্নবর্গের ভেতরে ছোট ছোট ভগ্নাংশের এই রকম তফাত যেমন সাবলটার্ন স্টাডিজ ভাঙতে চায় না, তেমনি তাদের পারস্পরিক বিরোধ নিয়েও মাথা ঘামায় না। ক্ষমতার বিন্যাসে ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক এলিট চক্রের সঙ্গে তাদের প্রত্যেকের যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক ও অধীনতার আয়োজন, তাই তার মনোযোগ বেশিরভাগ কেড়ে নেয়। আপন আপন নিজস্বতায় তাদের স্বাধীন বৃত্তগুলো কীভাবে রচনা করা যায়, আগেই বলেছি, তাও সে ভাবে। এবং তাকেই চূড়ান্ত করণীয় বলে মানে। সারকথা, পরস্পরবিচ্ছিন্ন হলেও তাদের এলিট-শাসনের বিরোধিতা। তারই ভিত্তিতে ওই সব জনসমাজের সরল যোগফলকে সেখানে বলা হয় নিম্নবর্গ।
ইরফান হবিবের কাছে অবশ্য সাবলটার্ন স্কুলের পণ্ডিতদের এই বিন্যাস অদ্ভুতই ঠেকে। নিম্নবর্গীয় বিভিন্ন শ্রেণি (সাবলটার্ন ক্লাসেস), এবং তাদের স্বয়ংক্রিয়া (অটোনমি), দুটো নিয়েই তিনি প্রশ্ন তোলেন। মন্তব্য করেন, ‘—their ‘Subaltern classes’, however, often appear to be not true classes, but merely castes, tribes and communities, where Zaminders and peasants are seen and accepted as undifferentiated. The view that these composite groups necessarily developed ‘autonomous’ ideologies (as the `working class’ does, in Marxism) is an unproven premise.... To think that ‘subaltern’ classes in India have possessed-deep-rooted subterranean ideologies of their own is belied by the universal prevalence of caste ideology, which these classes have shared with the ruling class. It is the prevalence of such ideas within the ‘autonomy’ of the subaltern groups that necessarily limited their protest or resistance and brought about their downfall.’
তিনি আরও বলেন, এবং যথার্থই বলেন, ‘The subaltern scholars are happy narrators of tragedy, it is not their task to look for salvation. That can come, of course, not with the oppressed protecting their ‘autonomy’ in a system of class-exploitation, but with their rejecting their own parochialism, espousing the ideology of the working class and joining with their peers in a common struggle for liberation.—’ (‘Problems of Marxist Historiography’, Essays in Indian History, Towards a Marxist Perception, Tulika, New Delhi, 2001, pp. 7-8). সাবলটার্ন চিন্তাবিদরা যখন ধার করা উত্তর-আধুনিক চিন্তার ছকে তাঁদের হাতে জড়ো করা ইতিহাসের মাল-মশলা খোপে খোপে বসিয়ে দেন, তখন অবশ্য তাঁদের বিচার ওইরকমই হবার কথা। একটু পরে এ প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসছি। তবে তার আগে এটাও দেখবার, তাঁরা গ্রামশ্চির ‘সাবলটার্ন’ শব্দের দ্যোতনা কীভাবে ইচ্ছামতো টেনে বাড়িয়েছেন। ইরফান হবিবও তাঁদের ‘peculiar way’-তে শব্দটির ব্যবহার লক্ষ করেছেন।
গ্রামশ্চির সাবলটার্ন স্তর সমাজে নিম্নবর্গের নয়, নিম্নতর বর্গের। এটা এক মধ্যবর্তী পর্যায়। ওপরে উচ্চবর্গ। তাঁরা সমাজে নেতৃত্ব দেন। নিচে খেটে-খাওয়া মানুষ, সাধারণ আমজনতা। যাঁরা নেতৃত্ব দেন, তাঁরা তা পারেন, যদি তাঁদের কর্তৃত্ব সর্বমান্যতা (hegemony) পায়। এই সর্বমান্যতা শুধুই চাপিয়ে দেওয়া নয়, তার সবটাই নঞর্থক নয়। সমাজের সব স্তরের মানুষে তার স্বীকরণ ঘটলেই তা স্থায়ী হতে পারে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে কীভাবে হেজিমনি গড়ে উঠতে পারে, এই ছিল গ্রামশ্চির অন্যতম প্রধান চিন্তার বিষয়। সাবলটার্ন গোষ্ঠীসমূহকে তিনি তারই প্রেক্ষাপটে তাদের বস্তুগত অবস্থানে, অথবা নির্মাণপ্রক্রিয়ায় বোঝার চেষ্টা করেছেন। সমাজতন্ত্র মানে শ্রেণিহীন সমাজ, এই মন ভোলানো কথায় তাঁর সায় মেলেনি। শ্রেণিহীন সমাজে পৌছুতে হলে তার আগে যে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, এই কথাটাই তিনি বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। সদর্থকভাবে শ্রমিকশ্রেণির সর্বমান্যতার উপায় নিয়ে তাই তাঁকে ভাবতে হয়েছে। সাবলটার্ন শ্রেণিসমূহের উদ্ভব ও অস্তিত্ব, শাসকশ্রেণির সঙ্গে তাদের দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক, তাদের ক্রমবিকাশ ও বিন্যাস, এই সব বিষয় সেখানে অনিবার্যভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রিজন নোটবুকসে দেখি, তিনি লিখে রেখেছেন, ‘The subaltern classes, by definition, are not unified and cannot unite until they are able to become a ‘State’;their history, therefore, intertwined with that of a civil society, and thereby with the history of states and groups of states. Hence it is necessary to study:
- the objective formation of the subaltern social groups, by the developments and transformations occurring in the sphere of economic production; their quantitative diffusion and their origins in pre-existing social groups, whose mentality, ideology and aims they conserve for a time;
- Their active or passive affiliation to the dominant political formations, their attempts to influence the programs of these formations in order to press claims of their own, and the consequences of these attempts in determining processes of decomposition, renovation or neo-formation;...’ (Selections from Prison Notebooks, edited and translated by Quintin Hoare and Geoffrey Nowell Smith, London, Lawrence & Wishart, 1976, p 52).
স্পষ্টতই এখানে ‘state’ কোনো রাষ্ট্র নয়, তা সমাজে সমঅবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমজাতীয়তার, সংহতির ও একক পরিচয়ে ওই সমাজের ভেতরেই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রত্যাশিত সুসম্বন্ধ রূপের একটি প্রকাশ। অন্তর্বর্তী বলেই সাবলটার্ন দোদুল্যমান। উৎসভূমির স্মৃতি থাকলেও সেখানে ফিরে যাওয়াই তার লক্ষ্য নয়, বরং সমাজের সমগ্রতায় প্রভুত্বকারী ও প্রভুত্বকামী শক্তির সঙ্গে বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে সুবিধা আদায়ের ও নিজেদের গুরুত্ব বাড়াবার কথাই কেবল তা ভাবতে পারে। আজকের সাবলটার্ন স্টাডিজের মুখপাত্রদের উচ্চকণ্ঠ অভিপ্রায়ের সঙ্গে এর আকাশ-পাতাল তফাত। যদিও হাত-সাফাইয়ের কেরামতিতে এই সাবলটার্ন শব্দটি গ্রামশ্চির ভাণ্ডার থেকে তাঁরা আত্মসাৎ করে ফেলেন। আসলে তাঁরা উত্তর-আধুনিক মুক্তির ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা দেন। চিন্তায় গণমুখিনতার ঐতিহ্যে তাকে স্থাপন করেন মাত্র।
শুরুতে তাঁদের ঝোঁক ছিল কৃষক বিদ্রোহের স্বরূপ উদ্ঘাটনে। একই সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের চিন্তায়-তাদের বিশ্বাসে ও সংস্কারে-তাদের নিজস্বতা ও সার্থকতার স্বপ্ন যেভাবে ফুটে ওঠে, তার বিশদ ব্যাখ্যায় ও তাকে জোরালো সমর্থন দানে। তবে তাঁদের ইতিহাসের শুরু ঔপনিবেশিক আমল থেকে। কারণ বুর্জোয়া আধিপত্যের পত্তন ঘটে তখনই। পরে জাতীয়তাবাদের শিক্ষা তারই প্রলম্বিত প্রতিক্রিয়া ও ঔপনিবেশিকতার অবসানে তারই ধারাবাহিক অনুসরণ। যেহেতু এই অধীনতা থেকে মুক্তিই তাঁদের অন্বিষ্ট, তাই তার আগের ইতিহাস তাঁদের কাছে অবান্তর। বুর্জোয়া সভ্যতা ও বুর্জোয়া-অতিক্রান্ত যে কোনো রূপান্তর তাঁদের প্রতিরোধের ও প্রত্যাখ্যানের বিষয়। ফলে যে ইতিহাস তাঁরা তুলে ধরেন, তা কাল-বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত। কৃষক-আন্দোলনের মূল ভাবনা তাতে বিপর্যস্ত ও বিকৃত হয় কিনা, এ প্রশ্ন ওঠা সেখানে খুবই স্বাভাবিক।
আমরা জানি, ভারতবর্ষের ইতিহাসে কৃষক-বিদ্রোহের একটা ধারাবাহিকতা আছে। এবং তার মূল শুধু কৃষক-সম্পর্কের ভেতরে লুকিয়ে নেই, প্রকৃতপক্ষে গোটা সমাজব্যবস্থার স্থিতিশীল যে ধাঁচ, তার তলদেশে গোড়ায় গোড়ায় তা ছড়ানো। জাতিভেদপ্রথা বাদ দিয়ে এর ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ হয় না। এবং জাতিভেদপ্রথা প্রাক-ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা। ঔপনিবেশিকতা পেরিয়েও তা বাস্তব। এগারো শতকে পাল রাজাদের আমলে ঘটেছিল কৈবর্ত বিদ্রোহ। কৃষিকাজ ও মাছধরা ছিল তাদের প্রধান জীবিকা। স্বাধীন রাজ্যও তারা গড়েছিল। কিন্তু টিকিয়ে রাখতে পারেনি। রাজা নিম্নবর্গের হলেও রাজা-প্রজা সম্পর্কে সমতা আসেনি। বৈষম্য আরও অরাজকতা ডেকে এনেছিল। শেষে ১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দে আবার এক পাল রাজাই তাদের পরাস্ত করেছিলেন। মনে রাখি, পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ভাবাপন্ন। জাতিভেদ প্রথায় তাঁদের প্রশ্রয় দেবার কথা নয়। কিন্তু কৈবর্তদের অস্পৃশ্যতা তাঁরা দূর করেননি। অথবা করতে পারেননি। আরও প্রায় একশ বছর পরে সেন রাজা বল্লাল সেন (১১৫৯-১১৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) সৎবর্ণের মর্যাদা দিয়ে তাদের সঙ্গে একটা রফা করেন। কৃষিপ্রশ্ন যে জাতিভেদ প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত, এবং তা অতি প্রাচীন এ থেকে তার ইঙ্গিত মেলে। আর নিম্নবর্গের কেউ রাজা হলেই যে তার সমাধান আপনা থেকে মেলে না, তারও নিদর্শন কৈবর্তরাজদের ব্যর্থতা। বর্ণবিন্যাসে নিম্নবর্ণেও বহুস্তর, বহু জল-অচল সমস্যা। তাদের বিরোধ বা ব্যবধান ঘোচাবার কথা কৈবর্তরাজরাও ভাবেননি। যেমন ভাবেন না আজ লালুপ্রসাদ যাদব ও রামবিলাস পাসোয়ানরা। সেদিন সবর্ণে উন্নীত হলে কৈবর্তদের ক্ষোভ মিটে যায়। বিষয়টির তাৎপর্য নিম্নবর্গের র্যাডিকাল ভাষ্যকারদের কাছে আদৌ গুরুত্ব পায় বলে মনে হয় না।
মোগল আমলে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কৃষক-বিদ্রোহে নতুন মাত্রা যোগ করে। রাষ্ট্র যত বিস্তৃত হয়, তার শাসন-ব্যবস্থা পরিচালনার ব্যয়ভার তত বাড়ে। বাড়ে যুদ্ধ-বিগ্রহের ক্ষয়ক্ষতি ও তা দ্রুত সামাল দেবার তাগিদ। খরচ মেটাবার কোপ সবটাই গিয়ে পড়ে ভূস্বামী ও কৃষকসমাজের ওপর। ভূমি থেকে উদ্বৃত্ত শোষণ সহ্যের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে কৃষকেরা উপায়ান্তর না পেলে বিদ্রোহ করে। প্রায় জায়গাতেই কৃষকের ও জমিদারের স্বার্থ একবিন্দুতে এসে মেলে। তা জায়গিরদারের নেতৃত্বে মারাঠা উত্থানে হোক, আর সত্ত্বামি কৃষক-বিদ্রোহে বা শিখ-বিদ্রোহেই হোক। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদ্রোহীরা অধিকাংশ নিচুজাতের। উদ্বৃত্ত শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গে আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার তাগিদও তাদের যুক্ত ছিল। অবশ্য কৃষকের লক্ষ্যটিই সব বিদ্রোহে একইভাবে সামনে প্রতিভাত হয়নি। এবং তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত মৌলিক প্রশ্নগুলো অধিকাংশই অনায়ত্ত থেকে গেছে। তবু, ইরফান হবিব মনে করেন, মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে এই কৃষক বিদ্রোহই একটা বড় কারণ। এও দেখবার, এই বিদ্রোহ কোথাও কৃষকের একার লড়াই ছিল না। তথাকথিত উচ্চবর্গের নেতৃত্বই তারা বেশিরভাগ মেনে নিয়েছে। বাইরে থেকে যদি নাও হয়, তবে ভেতর থেকে সরদার, মুখিয়া, মাতব্বর, এদের অবশ্যই। কাজেই সাবলটার্ন শুদ্ধতা কোথাও বজায় থাকেনি। বজায় থাকেনি ঔপনিবেশিক আমলে কৃষকবিদ্রোহেও। এই ধারাবাহিকতা সাবলটার্ন স্টাডিজের কৃতী চিন্তাবিদরা দেখেন না। ফলে তাঁদের বিচার-বিবেচনা অনেকখানি ইচ্ছাপূরণের উন্নতমানের খেলা হয়ে দাঁড়ায়। তাতে স্বেচ্ছাচারী ধ্যান-ধারণাকে বিকৃত অথবা খণ্ডিত তথ্যের ওপর ভর করে কৃষকচৈতন্যের প্রকাশ বলে চালিয়ে দিতেও তাঁরা পিছপা হন না। সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা নিম্নবর্গের খাঁটি জিনিস (যেন তাঁদের নয়, বাইরের উচ্চমার্গের বুদ্ধিজীবীদের নয়), এবং সেইসূত্রে তা আঁকড়ে থাকা বাস্তবের যথার্থ প্রতিফলন, এমন মহামূল্যবান বাণীও আমরা তাঁদের কাছ থেকে পাই। উত্তর-আধুনিক ভাবনাদর্শে এটি অস্বাভাবিক নয়, পরিত্যাজ্যও নয়, একে খারিজ করতে চাওয়াটাই বরং যা সঠিক, তাকে অনর্থক অস্বীকার করে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের হাঁড়িকাঠে মাথা গলিয়ে বিভ্রান্তির বোঝা টানা।
উদাহরণ, যেমন, একই গোত্রের ইতিহাসবিদ তাজুল ইসলাম হাশমির Pakistan as a Peasant utopia: the communalisation of class politics in East Bengal 1920-1947 (Westview Press, 1992)| আহমেদ কামালের ‘East Bengal at Independence’ (History of Bangladesh (1704-1971), Vol. 1, edited by Sirajul Islam, 1997) -এও কৃষকসমাজ ও এক বিশেষ সম্প্রদায়ের সর্বাত্মক অভেদ ধরে নিয়ে পাকিস্তানের আকাক্সক্ষা যে কেবল তৎকালীন পূর্ববাংলার কৃষিজীবী গণমানুষের মুক্তিকামনা থেকে উৎসারিত, এমন অভিমত প্রতিষ্ঠা পায়। নিচুতলার মানুষের মনোজগতের কথা বলছি, এই রকম এক র্যাডিকাল ভঙ্গি নিয়ে এ কিন্তু প্রকারান্তরে নিজেদের ওপরতলার সাম্প্রদায়িক ঝগড়া-ফ্যাসাদকে তাদের বলে তাদের ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা। লোকজীবনে ধর্মবিশ্বাস এখানে এক রকম ভধরঃ ধপপড়সঢ়ষর-র কাজ করে বই কি। যা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক, তা থেকে চোখ সরিয়ে ধর্মাশ্রয়ী সাম্প্রদায়িকতায় ও গণজাগরণে একাকার ঘটালে প্রত্যক্ষের আড়ালে যে প্রকৃত উপাদানগুলো ক্রিয়াশীল থাকে, তাদের চিনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অবশ্য উত্তর-আধুনিক ভাবনাবৃত্তে প্রকৃত বলে কিছু নেই। সবই ডিসকোর্সের গোলকধাঁধা, অথবা সাপ-লুডো খেলা। তারই প্রেক্ষাগারে সাবলটার্ন ধ্বজাধারীদের নর্তন-কুর্দন। চোখ-ভোলানো তো বটেই; জনরুচি মেনে মন-ভোলানোতেও কমতি নেই। তবে এখানে এটুকু বলবার, পাকিস্তান-দাবির ব্যাখ্যায় লিওনার্ড ব্লুমফিলড বা রালফ নিকোলাসের বিপরীতমুখী প্রস্তাবটিও ফেলনা নয়। বিষয়ের মূল দেখেন তাঁরা কৃষক-সমাজের স্বপ্ন-সাধে নয়, বরং উল্টো, এলিট-সমাজের দ্বিধাবিভক্তিতে ও দ্বন্দ্বে (Elite Conflict in a Plural Society)। তপন রায়চৌধুরীও হালে বাঙালনামায় এই রকমই লিখছেন। এক সম্প্রদায়ের উঠতি শিক্ষিতদের চাকরি-বাকরি-সুযোগ-সুবিধার ভাগ পাবার দাবি, অন্য সম্প্রদায়ের অনুরূপ গোষ্ঠীর আগেভাগে শুরু করে ওই সব সুযোগ-সুবিধার দখল নিয়ে তা আঁকড়ে থাকার, ও এতটুকু ভাগ না ছাড়ার মরিয়া প্রয়াস, এই দুইয়ের টানাটানিই বীজ বুনে দেয় পাকিস্তান দাবির। এদিকেও তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যে, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত করার কোনো উদ্যোগই নেয় না। উল্টো, গত শতকে ত্রিশের দশকে বিশ্বব্যাপী মহামন্দার কামড় অনুভূত হয় এ অঞ্চলেও। ব্যবসায়-বাণিজ্যে আসে স্থবিরতা। ব্যাংক-ঋণের অভাবে মুদ্রার প্রচলন কমে যাওয়ায় তার ধাক্কা সরাসরি এসে লাগে মহাজনি কারবারে। সুদের হার রাতরাতি যায় বেড়ে। অথচ ঋণের বিকল্প উৎসও কিছু চোখে পড়ে না। গরিব কৃষকের দুর্দশা গভীর থেকে গভীরতর হয়। সব কৃষকের। এবং ছোট মাঝারি ভূস্বামীদেরও। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে। পারস্পরিক কাড়াকাড়িও ফলে নগ্ন হয়ে চোখের ওপর এসে ঝাপটা মারে। বিষয়টি, অতএব, শুধু নিম্নবর্গকেন্দ্রিক ছিল কি না তা ভেবে দেখবার। অবশ্য নিম্নবর্গের কোনো ভূমিকা ছিল না, বিশেষ করে কৃষকসমাজের, এ প্রস্তাবও অসাধু। তবে প্রেরণার উৎস তারা ছিল না। নেতৃত্বেও তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। বেশিরভাগই ছিল তারা নাচের পুতুল।
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তাঁদের বিরাগ সাবলটার্নপন্থী পণ্ডিতরা গোপন করেন না। কারণ এই ধর্মনিরপেক্ষতা উদার ও বৃহৎ জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। এবং ওই জাতীয়তার আদর্শই তাঁদের কাছে এলিট চক্রান্তের ফল; তাই সর্বাংশে ক্ষতিকর। নিম্নবর্গের যে জীবন তা ঢেকে রাখে তাতে ধর্ম-সংস্কৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাকে যথার্থ মূল্য দিয়ে স্বীকার করে নেওয়াতেই তাদের উপস্থাপনা নির্ভরযোগ্য হবার দিকে যায়। বুর্জোয়া ধ্যান-ধারণায় জাতীয়তাবাদের বানানো খোলস তাহলে ছিঁড়ে ফেলা সহজ হয়। জনগণের আসল চেহারাও তবে ফুটে উঠতে পারে। তাঁর ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে এই কথাটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলতে চেষ্টা করেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। আশিস নন্দী আরও চাঁছাছোলা। সরাসরি নিম্নবর্গ নিয়ে না লিখলেও তিনিও একই পথের পথিক। তাঁর অসহিষ্ণু মন্তব্য: ‘—To accept the ideology of secularism is to accept the ideologies of progress and modernity as the new justification of domination and the use of violence to achieve and sustain ideologies as the new opiates of the masses.’ (‘The Politics of Secularism and the Recovery of Religious Tolerance’ in Veena Das (ed), Mirrors of Violence. Oxford University Press, Delhi, 1990, p. 192)। এ কথাগুলো কিন্তু, আমরা দেখব, সবটাই তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিকদের বক্তব্যই তিনি তোতাপাখির মতো উগরে দেন। মার্কস যে ধর্মবিশ্বাস ও ধর্ম-সংস্কারকে বলেছিলেন,Opiates of the masses, সেইটিই আশিস নন্দী ঝাঁঝের সঙ্গে পালটা ধর্মনিরপেক্ষ জীবনাদর্শের ঘাড়ে চাপিয়ে মনের ঝাল মেটান। আসলে জাতীয়তার নির্মাণে বহু মত-বহু পথের সমন্বয়-সাধনা, এবং বিবিধ কর্মকাণ্ডে নানা ধর্মের ও নানা বর্ণের মানুষের একত্রে অংশগ্রহণ মানবচেতনায় যে সম্ভাবনার সৃষ্টি করে, তাকে তিনি এককথায় খারিজ করে দেন। উন্নয়ন-প্রগতি, এ সবই তাঁর কাছে ধর্মীয় উদাসীনতার-ব্যাপক অর্থে আধুনিকতার-মায়ায় দেখা ভ্রান্তি। ক্ষমতার জবরদস্তির নতুন নতুন কৌশলই তার মোহ জাগিয়ে রাখে, তাকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। এবং একই সঙ্গে মানুষকে তা ধ্বংসের পথে টানে। উত্তর-আধুনিকতার প্রধান তাত্ত্বিকরাও এই রকমই বলে থাকেন।
যেমন: লিওতার তাঁর The Postmodern Condition: A Report on Knowledge (1979)-বইয়ের ভূমিকায় জানাচ্ছেন, ‘I will use the term modern to designate any science that legitimates itself with reference to a meta-discourse... making an explicit appeal to some grand narrative, such as the dialectics of spirit, the hermeneutics of meaning, the emancipation of the rational or working subject or the creation of wealth,... this is the enlightenment narrative, in which the history of knowledge works toward a good ethico-political end-universal peace.’ (উদ্ধৃত Aijay Ahmad, ‘Post-modernism in History’, The Making of History, Essays presented to Irfan Habib, K.N. Panikkar, J. Byres, Utsa Patnaik (ed), Tulika, New Delhi, 2001, pp. 440-477) আর তারপরেই তিনি দর্পিত অহংকারে বলেন, এর সব কিছু, সব মেটা-ন্যারেটিভের প্রতি চরম অনাস্থাই উত্তর-আধুনিকের বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতপক্ষে কান্ট, হেগেল, মার্কস, সবাইকে তিনি একসঙ্গে একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেন। জ্ঞানকাণ্ডের পরিণাম হিসেবে কোনো সার্বিক মঙ্গলের বা শান্তির লক্ষ্যও তাঁর কাছে অর্থহীন। বিপরীতে যুক্তিবাদকে ও আধুনিকতাকে অস্বীকার করায় প্রস্থান তাঁর প্রাক্-আধুনিকেই, যেখানে অস্তিত্বের অকৃত্রিম মূলভাব অটুট, যেখানে বহুর মিশ্রণে বিকাশমানতায় নয়, আপন আদিম নিজস্বতায় তার নিশ্চিত অবস্থান, এবং যেখানে স্বতঃস্ফূর্ত প্রথার অনুশাসন কাম্য ও মান্য। সব অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার নিয়ে গণ্ডিবদ্ধ মানুষের ধর্মাচরণই অতএব ধ্রুব, এবং বাস্তবের প্রকৃত মাহাত্ম্যের প্রতিরূপ। সাবলটার্নপন্থীরা এটা নির্বিচারে মেনে নেন। এরই প্রতিধ্বনি তাঁরা শোনাতে থাকেন একটার পর একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী অসাধারণ চমক জাগানো সব রচনায়। আয়জাজ আহমদ (Aijay Ahmad) যথার্থই উল্লেখ করেন, ‘Having rejected modernity tout court also refusing to offer any normative values of its own-indeed having refused the very idea of normative value that could be defended in terms of rationally argued validity claims-postmodernism tends at times to stage the pre-modern as its own answer to the problems of modernity. Herein lies the attraction of postmodernism to the subalternist, indigenists, rightwing radicals and anti-scientific irrationalists of all sorts...’ (পূর্বোক্ত)। এঁদের দলে সুনির্দিষ্টভাবে তিনি উচ্চারণ করেন আশিস নন্দী, দীপেশ চক্রবর্তী ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নাম। সাবলটার্ন জ্ঞানকাণ্ডে এঁদের প্রভাব সমধিক।
শুধু লিওতার নন, আধুনিকতার বন্ধন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ফুকোও যাত্রা করেন আদিমতার দিকে। তবে তাঁর নির্দেশ বা অভিপ্রায় সবার জন্যে এক নয়। বক্তব্যের নির্মাণকলা তাই আমাকে অপ্রস্তুত করে। অবশ্য যুক্তিশৃঙ্খল অস্বীকার করেই উত্তর-আধুনিকতার আত্মঘোষণা। তাই ভেবে দেখলে এতে অবাক হবার কিছু নেই। ইরানের ইসলামি বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর উচ্ছ্বসিত মন্তব্য, ধর্ম সেখানে কার্যতই ‘The spirit of a world without spirit’! তার ভূমিকা সেখানে ‘...not that of an ideology, which would help mask the contradictions.... It really has been the vocabulary, the ceremonial, the timeless drama of a people’ (‘Iran: the Spirit of a World without Spirit’ in Lawrence D Krityman (ed.) Michel Foucault: Polities, Philosophy, Culture-Interviews and other Writings, 1977-1984, New York, 1988, p. 223)। অদৃশ্য মার্কসকে খণ্ডন করার প্রবণতা লক্ষ করি এখানেও। মার্কস যেখানে বলেছিলেন, ধর্ম অন্তর্গত মূল দ্বন্দ্বকে—অভ্যন্তরীণ অসংগতিকে—আড়াল করে, ফুকো সেখানে ইরানে দেখেন তার শাশ্বত, অবিনাশী আয়োজন। তিনি যখন তাকে ‘The timeless drama of a people’ বলে অভিহিত করেন, তখন তা পড়ে আয়জাজ আহমদের মনে হয়, এমনকি আরএসএসও এতে আপত্তি করার কিছু পাবে না। আসলে অপকর্মের পক্ষে শক্ত এক অজুহাতই তারা পেয়ে যাবে। কিন্তু এর চেয়েও বিপজ্জনক ভ্রান্তিবিলাস ফুকো রচনা করেন, যখন তিনি লেখেন, ‘They don’t have the same regime of truth as ours, which, it has to be said, is very special, even if it has become almost universal. The Arabs of the Maghreb have another, and in Iran, it is largely modelled on a religion that has an exotic form and an esoteric content.... So not only is saying one thing that means another not a condemnable ambiguity, it is on the contrary, a necessary and highly prized additional level of meaning. It’s often the case that people say something that, at the factual level, isn’t true, but which refers to another, deeper meaning, which cannot be assimilated, in terms of precision and observation.’ (পূর্বোক্ত)।
স্পষ্টই লক্ষণীয়, ফুকো কীভাবে গোটা পৃথিবীকে ‘আমরা-তারা’-দুই ভাগে ভাগ করেছেন। এডওয়ার্ড সাঈদের ‘অপরায়নের’ তত্ত্ব থেকে এ কিছুটা ভিন্ন। দুই ক্ষেত্রের জন্যে পরস্পরবিচ্ছিন্ন দুটো মানদণ্ড, এবং একটি অন্যটির সম্পূর্ণ বিপরীত, ফুকো ব্যবহার করেছেন। দুটোই স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন। এমনকি সত্য-মিথ্যার ধারণাও আপেক্ষিক, সেই সঙ্গে ভাবনাবৃত্তের সম্পর্কজালও দুই জায়গায় দুইরকম; পরস্পর পরস্পরের প্রভাবমুক্ত। তাঁর কাছে এই রকমই কাম্য। কারণ এতে স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে সর্বত্র। এই পৃথকতা রণজিৎ গুহর সাবলটার্ন তত্ত্বেরও প্রাথমিক প্রত্যয়। তা ঔপনিবেশিক সমাজে উচ্চবর্গের সঙ্গে নিম্নবর্গের। আর নিম্নবর্গের চাপা পড়ে-থাকা স্বাধীন ক্ষেত্র পুনরুদ্ধারই তাঁর লক্ষ্য। আয়জাজ আহমদ অবশ্য যথার্থই মনে করেন, সাম্রাজ্যবাদ অথবা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের কোনো ব্যাখ্যাই এ থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। মূল দ্বন্দ্ব চিহ্নিত এখানে পাশ্চাত্যের এনলাইটেনমেন্টনির্ভর ধ্যান-ধারণার, এমনকি সত্য-মিথ্যার ধারণার সঙ্গে অন্যান্য জায়গার ধর্ম-প্রথা-আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সত্য-মিথ্যার নির্মাণ ইত্যাদি নিয়ে যে যুক্তিবাদ-বর্জিত ভাবনা-বিশ্ব, তার। উভয়ের স্থায়ী বিচ্ছিন্নতাকেই যদি সমাধান বলে মানা হয়, তবে তা লৌহ যবনিকা দিয়েও কার্যকর করা এক রকম অসম্ভব। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপুল অগ্রগতির, এবং তারই তাগিদে বিশ্বায়নের প্রবল তোড়ের সামনে ওই বিচ্ছিন্নতা খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। তাছাড়া সম্মুখগামিতা ও পশ্চাদগামিতার ভেতরে ফুকো যে ভৌগোলিক বিভাজন-রেখাকে স্থায়ী করতে চেয়েছেন, তাকে মেনে নেওয়াও সহজ নয়। মনে হয়, বাঞ্ছনীয়ও নয়। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় একই নিরপেক্ষ রেখায় তিনি উভয়কে বসিয়েছেন। এটাও গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। এক অংশে জীবনঘনিষ্ঠ ধর্মান্ধতা অর্থবহ, তার ওপর ভিত্তি করে সেখানে সার্থকতার সন্ধান; অন্য অংশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের ধারাকে সমর্থন। প্রকারান্তরে দুই স্তরের জীবনযাত্রা একই সঙ্গে বজায় রাখতে বলে এ পরনির্ভরতারও ঔপনিবেশিক পরিমণ্ডল নতুন করে রচনার পথ খুলে দেয়। প্রসঙ্গটি এখানে একটু বেশি বিস্তারিত করার একটি কারণ, এটা আজ আমাদেরও নানাভাবে স্পর্শ করে। জন্ম দেয় উৎকণ্ঠার, যদিও অনেকে আপন আপন দৃষ্টিকোণ থেকে অনুপ্রাণিত বোধ করেন। উত্তর-আধুনিক চিন্তাভাবনা আমাদের উচ্চশিক্ষিত মহলেও আজ নাড়া দেয়। যাঁরা আকৃষ্ট হন, জনসংখ্যার অনুপাতে হয়তো তাঁরা নগণ্য; কিন্তু সমাজে চিন্তার ভরকেন্দ্রে আলোড়ন তোলেন বইকি! গভীর ফাটলও তৈরি করেন সেখানে। তার গুরুতর প্রভাব পড়ে আমাদের জাতিসত্তার নির্মাণপ্রক্রিয়ায়। অস্বীকার করা চলে না, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে একটা বড় প্রেরণা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবোধের উন্মেষ। পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনে তার সচকিত উন্মীলন, একাত্তরে স্বাধীনতা-অর্জনে এই পর্বে তার ব্যাপ্তির এক সফল পূর্ণতা। জাতীয়তাবোধ গণচেতনায় যে সর্বমান্যতা পায়, তার মূলে কিন্তু কাজ করে উঠতি শিক্ষিত-সমাজের বাঙালি পরিচয় সর্বাংশে মেনে নেওয়া। একদিক থেকে এ এলিট ভাবনার হেজিমনি। আবার পুরো এলিটও নয়। কারণ এলিট নিজেই তখন নির্মীয়মাণ। ভিত দুর্বল। পা টলোমলো। সমাজ-বিন্যাসে উঁচু-নিচু বিভাজন রেখা অস্পষ্ট। হয়তো সে কারণেও আরও জাতীয়তাবাদের আগুন দ্রুত ছড়ায়। এটাও মনে রাখি, ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদ একটা বড় হাতিয়ার। তাছাড়া সেটা ছিল পৃথিবী-জুড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ও তা থেকে মুক্ত হবার কাল। বামপন্থী আন্দোলনেও তা মিশে যায়। সব ভাবনার বৃত্তেই তার মর্যাদা নিশ্চিত থাকে। সচেতন বাঙালি শিক্ষিত সমাজও আন্তর্জাতিক চিন্তাবলয়ে সংলগ্ন থেকে তাকে অসংকোচে মেনে নিয়ে গৌরববোধ করে।
কিন্তু সত্তরের দশক থেকে বুদ্ধিবৃত্তির জগৎ গোটা পৃথিবীতেই অন্য চেহারা নিতে থাকে। বাইরে স্থবিরতা দেখা দেয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়। একসময় তা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। বাজার অর্থনীতিও কেইনসীয় তত্ত্বভূমি থেকে বেরিয়ে এসে হায়াক, ফ্রিডম্যান-এঁদের গুরু মেনে রেগান-থ্যাচার কালপর্বে উৎপাদন-ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের পাখা ছেঁটে দেয়। প্রযুক্তি বিপ্লব উৎপাদন-কুশলতায় যে তাগিদ সৃষ্টি করে, তা রাষ্ট্রকে টপকে গোটা পৃথিবীতে কারবার ছড়াতে চায়। সফলও হয়। চিন্তাজগতে উত্তর-আধুনিকতার ঢেউ এসে লাগে এই সময়েই। তার দাপটে নতুন র্যাডিকাল চিন্তা শুধু যে ডানদিকে বাঁক নেয়, তাই নয়, জাতীয়তাবাদের ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে এনে ফেলে। একই সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদ, নৈরাজ্যিক সমাজ-বিন্যাস, অন্ধ কুসংস্কার, এগুলো শিকড়লগ্নতার পরিচয় বলে বিদ্বৎসমাজে ও উঁচুতলার বৈঠকে বাহবা পেতে থাকে। নিম্নবর্গের চর্চায় চৌকস বিদ্যা-দিগজ পণ্ডিতদের আবির্ভাব ঘটে তারই সূত্র ধরে। আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের চিন্তাবিদদের ওপর এ সবের অভিঘাত ভালোরকমই পড়ে। এতে চিন্তার জগতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্ত গাঁথুনি আর নিজে থেকে জমাট বাঁধে না। উল্টো এই সব দূরপ্রসারি প্রবণতায় তাতে বড় বড় ফাটল দেখা দেয়। দৈনন্দিন জীবনে বিড়ম্বনার সঙ্গে রাষ্ট্রশাসনে পৌনঃপুনিক ব্যর্থতার ও বিপথগামিতার ফলে জনগণের কাছেও উদার জাতীয় চেতনায় ঐক্যের আহ্বান আকর্ষণ হারাতে থাকে। উত্তর-আধুনিকতার তত্ত্বের অথবা তার আওতায় সাবলটার্ন তত্ত্বের তল্পিবাহকরা এ অবস্থায় আসর গরম করার সুযোগ পান। জনগণের বিভ্রান্তি তাতে বাড়ে বই কমে না। এক নিশ্চিত আত্মপরিচয় থেকে শতধাদীর্ণ ভঙ্গুর আত্মপচিয়ের দিকে আমাদের যাত্রা ত্বরান্বিত হয়। আপাতনিরীহ জ্ঞানচর্চার অন্তরালে স্বার্থান্বেষী মহলের দুরভিসন্ধি তাতে ইন্ধন জুগিয়ে চলে। ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তার পরিত্যক্ত ধারণা আবার আক্রোশের সঙ্গে ফিরে আসে।
আগেই উল্লেখ করেছি, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক একটা জরুরি প্রশ্নের অবতারণা করেছিলেন: নিম্নবর্গ কি নিজেই নিজের কথা বলতে পারে? এই প্রশ্ন থেকে আরও প্রশ্ন জন্ম নেয়। সার্বিক বিচারে কী তাদের জীবনে সুস্থিতি ও সমৃদ্ধি আনবে, তা কি তারা জানে? তাদের চাওয়া-পাওয়ার স্বপ্ন-কল্পনাইবা কতটা জ্ঞান ও তথ্যনির্ভর? যে জ্ঞান ও তথ্য অন্যদের দখলে, তা কি তারাও পায়? যেটুকু পায়, সেটুকুও কি চেতনার বৃত্তে ঠিক ঠিক বসিয়ে কাজে লাগাতে পারে? এরা সঙ্গে সঙ্গে সাবলটার্ন-চর্চায় যে তুমুল বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়, তার সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান এখনও মেলেনি। মিলবে, এমন আশাও ক্ষীণ। বিভিন্ন অবস্থান ও দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছোন সম্ভব। হতে পারে তারা পরস্পরবিরোধী। তবে দৈনন্দিন আনুগত্যের তলে তলে তাদের ভেতর যে প্রত্যাখ্যানের ও প্রতিরোধের চেতনা জন্ম নেয়, এবং তা তারা জিইয়ে রাখে, এই কথার পক্ষে তথ্য সাজিয়ে তৃপ্তি পান অনেকে। মূল প্রশ্ন কিন্তু সেটা নয়। তাদের ধ্যান-ধারণায় চাওয়া-পাওয়ার যে হিসাব, তাই কি তাদের সত্যিকারের চাওয়া-পাওয়ার ছবি আঁকে? জ্ঞানের ও সাধ্যের স্তর তো চাওয়া-পাওয়াকে প্রভাবিত করে; তার সীমারেখাও টেনে দেয়। ফলে জ্ঞান ও সাধ্যের বিস্তারের সঙ্গে চাওয়া-পাওয়ার চেহারাও বদলে যায়। এককথায় কিছু বলা যায় না। এই সীমার কথা যদি মনে রাখি, তবে তাদের কথা কি অন্যরা বলবে, যেমনটি গায়ত্রী প্রস্তাব করেছেন? তেমন হলে প্রশ্নটির যথার্থতাই স্পষ্ট হয়।
গৌতম ভদ্র লোকসংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটির ইতিবাচক জবাব খাড়া করেছেন। তাঁর ‘কথকতার নানা কথা’য় পালাগান-কথকতা ইত্যাদির জীবনঘনিষ্ঠ রূপায়ণে নিম্নবর্গের রসানুভূতির ও রসসৃষ্টির যে স্বকীয়তার প্রকাশ ঘটে, যেভাবে তা মুখর ও তাৎপর্যময় হয়ে মাটির কাছাকাছি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত নান্দনিক বোধের অকৃত্রিম ধারা সচল রাখে, তার সহৃদয় মূল্যায়ন করেছেন। যে কোনো সভ্যতাতেই লোকসংস্কৃতির অবদান যে বিশাল ও প্রাণময়, এ নিয়ে তর্কের কোনো অবকাশ নেই। তবে গৌতম ভদ্র, মনে হয়, নিম্নবর্গের সংস্কৃতিকে ব্যাপকভাবে লোকসংস্কৃতির সঙ্গে গুলোয়ে ফেলেছেন। কথকতা বা পালাগানের কর্তা বা ঠাকরুণরা সামাজিক মর্যাদায় কেউই নিম্নবর্গের নন। তাছাড়া কোন মানদণ্ডে তিনি হরুঠাকুর বা হরিহর রায়কে নিম্নবর্গের কাতারে ফেলেন? গ্রামীণ মর্যাদায় তাঁরা উচ্চবর্গীয়, অন্তত তাঁদের সমকালীন সমাজে। ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে কাঞ্চনমূল্যে সামাজিক মর্যাদার পরিমাপ অশ্রদ্ধেয় বলে গণ্য ছিল। তার রেশ বিশ শতকেও বজায় থেকেছে। চোখ-কান খোলা রাখলে দেখা যাবে, এখনো তা মুছে যায়নি। বর্ণপ্রথাও সেখানে একটা প্রচ্ছন্ন নিয়ামক বটে। এ সব কিছু বিবেচনায় না এনে নিম্নবর্গের ফিরিস্তি সাজালে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে ফেলার আশংকা প্রবলভাবেই থেকে যায়।
উত্তর-আধুনিকতা, এবং তার পাশাপাশি নিম্নবর্গের স্বয়ংসিদ্ধ পরিচয় নির্মাণ ভাষা-সাহিত্যের তৈরি জমিতেও আজ তাদের বীজ নির্বিবাদে বুনে চলেছে। কোন ভাষার ভূখণ্ড গড়ে ওঠে তাকে ঘিরে নানা মানুষের জীবনচর্চায় পারস্পরিক যোগাযোগে, বিশেষ করে দেওয়া-নেওয়ার ও ভাবের আদান-প্রদানে মুখের কথার অবিরাম সংশ্লেষণের ভেতর দিয়ে। চিন্তার ও কাজের তাগিদ ভাষাতেও ছাপ ফেলে। সেই অনুযায়ী আকার নেয় তার ক্রিয়াপদ, আহরণ করে সে তার শব্দসম্ভার। শক্তির বা ক্ষমতার প্রকাশ এখানেও ঘটে সত্য, তবে তা সামূহিক জীবনে ভাবনার ও ক্রিয়াকর্মের পরিণাম। তার অধিভুক্ত কোনো জনসমষ্টির আলাদা পরিচয় তা তুলে ধরে না, তাকে বিচ্ছিন্নও করে না। সব মিলিয়ে ভাষা নিজের ভূখণ্ডে আপন মহিমায় সবার কাছে সমান গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। জুলুম খাটিয়ে নয়, জনসমুদ্রের কর্মচাঞ্চল্যে প্রাণের আয়োজনে তাদেরই যোজনা গভীর ও বিস্তৃত করার প্রয়োজনে। তবে এর ফলে উপভাষা, আঞ্চলিক ভাষা, এরা ভাষার মূলস্রোতে কিছু-না-কিছু অবদান রাখলেও চিন্তার ও কর্মের নৈর্ব্যক্তিক বাহন হিসেবে নিজেরা আর সামনে আসে না, বরং আপন আপন জনপদখণ্ডে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এমনও হয়, অনেক শাখা-ভাষা, উপভাষা বা আদিভাষা মূল চেহারায় অপ্রচলিত হয়ে পড়ে। বৃহত্তর ভাষা-ভূখণ্ডে তারা মিশে যায়। নিম্নবর্গের নির্মাতারা এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতায় উচ্চকণ্ঠ। কারণ তাঁরা মনে করেন, এতে ছোট ছোট জাতি, উপজাতি, জনজাতি বা আদিবাসী সম্প্রদায় ভাষাহীন হয়ে পড়ে। আবার আঞ্চলিকতার স্বশাসনও ক্ষুণ্ন হয়। তাই একটি তৈরি ভাষাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলাতে তাঁদের সর্বাত্মক সমর্থন। এতেই বুঝি ঘটে বৃহত্তর ভাষার বন্ধন থেকে মানুষের মুক্তি। তাঁদের এই জনদরদি অবস্থান ওই জনগণের মুক্তির পথ কতটুকু দেখায়, তা অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ। কাজের ক্ষেত্র যখন প্রসারিত হয়, তখন ভাষারও তার সঙ্গে তাল মেলাবার প্রয়োজন করে। কূপমণ্ডুক হয়ে তা পারা যায় না। বরং ব্যাপকতর প্রেক্ষাপটে নিজেকে ছড়াতে হয়। যদিও ইতিহাস ও ভূগোল তার নিবেশনের স্বাভাবিক সীমা চারদিকে রচনা করে। নিজেকে সক্ষম করে ছড়াতে না পারলে, এবং বৃহত্তর মাতৃভাষা বিতাড়িত হলে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ভাষা জায়গাটা অবধারিত দখল করে নেয়। একে ঠেকানো যায় না। আপন প্রান্তীয় ভাষারও মরণদশা ঘোচে না। ভারতবর্ষের অসংখ্য উপভাষার ও শাখাভাষার ইতিহাস নির্মোহভাবে যাচাই করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তবু উত্তর-আধুনিকতার অনুসারীরা ও নিম্নবর্গের তথাকথিত সুহৃদজনেরা জনদরদি সেজে প্রান্তজনে নায়কত্ব আরোপ করে তার অস্তিত্বের ও তার ভাষার অধিকার পুনরুদ্ধারের কথা বলেন। সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডার সঙ্গে তার বিরোধ ঘটে না, কারণ, বিচ্ছিন্নতার রাজনীতি আপন ভূখণ্ডে জোরদার হয়। তা জাতীয় শক্তিকে দুর্বল করে বাইরের পরাশক্তির পথ সুগম করে দেয়। বুঝে হোক, না বুঝে হোক, খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায়ও এই পথেই হাঁটেন। তাঁর তিস্তাপারের বৃত্তান্ত পড়লে এ বিষয়ে কোনো সংশয় থাকে না। ডানপন্থী ভাবনাদর্শে মাথা মুড়িয়ে কি করে তিনি, এবং তাঁর মতো ভাবুকেরা বামমার্গে বিচরণ করেন, তা বুঝে উঠতে পারি না। পরিণামে গণচেতনায় যে চরম বিভ্রান্তি জাগে, তার ফল ভালো হবার কথা নয়। অবশ্য ভালো-মন্দ বিচারের দায় উত্তর-আধুনিকতার অনুসারীরা স্বীকার করেন না।
তাহলে সাবলটার্ন স্টাডিজ আমাদের আদৌ কি আলোকিত করে? আমরা তা থেকে কী ও কতটুকু জানতে পারি, শিখতে পারি? ‘আলোকিত’ শব্দে, জানি, তার প্রণেতাকুলের আপত্তি করার কথা। কারণ তাঁরা ‘এনলাইটেনমেন্টে’র প্রত্যয়রাশি অস্বীকার করেন। নিটশে থেকে ফুকো, দেরিদা, লিওতার তাঁদের প্রেরণা। গ্রামশ্চির কাছ থেকে ‘সাবলটার্ন’ শব্দটি নিলেও তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে তার প্রয়োগে বিকৃতি ঘটান। গ্রামশ্চির সংজ্ঞানুযায়ী ‘সাবলটার্ন’ এক মধ্যবর্তী স্তর। তার নিচে নামহীন-গোত্রহীন খেটে খাওয়া মানুষ-সেনাবাহিনীতে আজ্ঞাবাহী সাধারণ সেপাই। সেই নিরিখে সাবলটার্ন হলো হাবিলদার। তপন রায়চৌধুরী তাই ঠাট্টা করে তাঁর ‘বাঙালনামা’য় সাবলটার্ন স্টাডিজ গ্রুপকে বলছেন ‘হাবিলদারচর্চা গোষ্ঠী’। নামের প্রায়োগিক বিভ্রাটের দিকেই তাঁর ইঙ্গিত। গ্রামশ্চির বিন্যাসে এলিটশ্রেণি নেই। অথচ রণজিৎ গুহ এই শ্রেণিকেই আগে চিহ্নিত করেন। পরে তার বাইরে যারা (ডিমোগ্রাফিক ডিফারেনস) তাদের বলেন সাবলটার্ন বা নিম্নবর্গ। এই ‘ডিফারেনস’কে নির্ণায়ক হিসেবে দেখা উত্তর-আধুনিকতার লক্ষণ। শুরুর এই বৈশিষ্ট্য তাঁদের, তপন রায়চৌধুরীর ভাষায়, ‘তুখোড় বুদ্ধিদীপ্ত’ রচনাসমূহে যে স্ববিরোধ বা অস্পষ্টতা আনে, তা থেকে তাঁদের মুক্তি ঘটেনি। অথবা বলা চলে, এই মুক্তি তাঁরা চাননি। অনুশীলনে স্বেচ্ছাচারী হবার সুযোগ এতে অনেকখানি থেকে যায়।
গত শতকে সত্তরের দশকের গোড়ায় ইন্টারমিডিয়েট রেজিম, বা অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা পাই আমরা কালেকির কাছ থেকে। গ্রামশ্চির সাবলটার্ন ধারণার অনুসরণে হয়তো নয়, তবে উঁচুতলা ফাঁকা হয়ে গেলে, অথবা গড়ে না উঠলে রাষ্ট্রব্যবস্থা কেমন দাঁড়ায়, উন্নয়ন-কৌশলে কী পরিবর্তন আনা উচিত, এগুলো তাঁর তন্নিষ্ঠ আলোচনার বিষয়। উত্তর-ঔপনিবেশিক অধিকাংশ দেশের অবস্থা ছিল ওইরকম। তাদের সামনে রেখে এখানেই গ্রামশ্চির সাবলটার্ন ভাবনার এক সৃষ্টিশীল প্রায়োগিক রূপ আমরা পাই। তা অনেকখানি নতুন। কারণ ওপরের প্রভুত্বকামী শক্তি সেখানে একেবারে অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতি ছিল প্রবলভাবে বাস্তব। কিন্তু সাবলটার্ন স্টাডিজ গোষ্ঠী তার খোঁজ রেখেছেন বলে মনে হয় না। রাখলে হয়তো তাঁরা সাবলটার্ন শব্দটিকে অমন চটকদার করে ব্যবহার করতেন না। এখানে বলে রাখা ভালো, রেহমান সোবহান ও মোজাফ্ফর আহমদ ওই সময়েই বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পাবলিক এন্টারপ্রাইজ ইন এন ইন্টারমিডিয়েট রেজিম নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা-গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। কালেকি উপপাদ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার অসাধারণ এক নিদর্শন এটি।
নিম্নবর্গের রূপকাররা রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীকে তাঁদের বিচারে অপ্রয়োজনীয়, এমনকি ক্ষতিকর বলেও মনে করেন। পার্থ চট্টোপাধ্যায় লেখেন, ‘দুর্বল নিম্নবর্গের প্রতিরোধের বিচিত্র কৌশল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ খুব একটা কৌতূহলী ছিলেন বলে মনে হয় না’ (প্রজা ও তন্ত্র)। তাঁর বিবেচনায় রাষ্ট্র জাতীয়তা ইতিহাস মানব-মুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা আজকের বাস্তবতায় জটিল সব প্রশ্নের সদুত্তর তেমন দিতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি বাড়ায়। প্রথমেই যেটা বলবার, তা হলো, এমন অভিযোগ অবান্তর। রবীন্দ্রনাথ যা চাননি, তা তিনি কেন দিতে পারেননি, এমন নালিশ অর্থহীন। তাঁর না-চাওয়াটা বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেও সংগত কী অসংগত, এ প্রশ্ন অবশ্য তোলা যায়। আমরা জানি, কোনো কিছু খণ্ড খণ্ড করে দেখায় তাঁর সায় ছিল না। ভালোবেসেছিলেন তিনি এক বৃহৎ সমগ্রতাকে। এটা নেহাৎ ভাববিলাসিতা নয়। জীবনের গভীরতর উপলব্ধির যে নোনা স্বাদ এতে মিশে ছিল, তার পেছনে ছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের হয়ে-ওঠার অভিজ্ঞতায় যুগ যুগ ধরে অর্জিত ও সমন্বিত বিশ্বচেতনা ও মূল্যবোধ। নিচুতলার মানুষ তার বাইরে নয়। তার মর্যাদার প্রশ্নও সেখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এবং তার মানুষী সম্ভাবনার সর্বোত্তম বিকাশের পথ নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল অনিঃশেষ। তবে এটা খুবই সত্য যে, নিচুতলার মানুষই কেবল তাঁর ভাবনার জগৎ ভরে রাখেনি। তা রাখলেই যে তাদের জন্যে আরও ভালো সমাধান মিলত, এটা তর্কসাপেক্ষ। খণ্ডদৃষ্টিতে কোনো পূর্ণ সমাধানের হদিস কোথাও মিলেছে, এটা আমাদের জানা নেই।
গান্ধীকে তাঁরা এককথায় খারিজ করেন না; কিন্তু শেষ বিচারে তিনি বুর্জোয়া স্বার্থের প্রতিনিধি, এবং সে কারণে গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে তিনি ব্যর্থ, প্রয়োজনে তা বিসর্জনেও তিনি অকুণ্ঠিত, এই হলো তাঁর সম্পর্কে তাঁদের সার্বিক মূল্যায়ন। দুটো কথা এখানে ভাববার। প্রথমত, আমরা বারবার বলার চেষ্টা করছি, বুর্জোয়া ব্যবস্থা দিয়েই আমাদের ইতিহাসের শুরু নয়। এবং ঔপনিবেশিক বুর্জোয়া ব্যবস্থাও ছিল বিকলাঙ্গ ও দুর্বল। মানুষের কথা বলতে এবং মানুষের পাশে দাঁড়াতে জমে থাকা প্রাক-ঔপনিবেশিক অন্যায়কে যদি পাশ কাটিয়ে যাই, তবে তা কেতাবি ঢঙের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ আন্দোলন হলেও জনগণের মনে সাড়া জাগাতে তার ব্যর্থ হবার সম্ভাবনাই বেশি। দ্বিতীয়ত, যুগে যুগে যাঁরা এই অঞ্চলে মানবমুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছেন, তাঁরা কেউই সংকীর্ণ দৃষ্টিতে জনসমুদয়ের ভগ্নাংশের কথা শুধু বলার জন্যে আসেননি। সে তাঁরা গৌতমবুদ্ধ বা শ্রীচৈতন্যের মতো উচ্চবর্গের হোন, অথবা বাল্মীকি, কবীর, দাদু বা নানকের মতো নিম্নবর্ণের হোন। এই ধারাতেই আমরা পাই গান্ধীকে, এবং একইভাবে রবীন্দ্রনাথকে। সাবলটার্ন স্টাডিজের রথী-মহারথীরা নিম্নবর্গের মানুষের সত্য কাহিনি শোনাতে চান, কিন্তু বাস্তবকে দেখেন বাইরে থেকে ধার করা চোখে; সেখান থেকে আমদানি রঙিন চশমায়। বাস্তবের বিকৃত ছবিই তাতে ফুটে ওঠে। সত্যের নাগাল মেলে কমই।
আগে একবার বলতে চেষ্টা করেছি, নকশাল আন্দোলনের স্মৃতি নিয়ে সাবলটার্ন-পাঠচক্রের উত্থান। ওই আন্দোলনে আত্মত্যাগের গৌরব আমাদের অনুপ্রাণিত করে নিশ্চয়। তার রোমান্টিক আকুতি আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে। কিন্তু নিরাসক্তভাবে দেখলে বোঝা যায়, তা কতটা একপেশে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রসব মাও সে তুংয়ের বিপ্লবী ভাবমূর্তিতে অনুপ্রাণিত হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আরবান গেরিলা তারা। কিন্তু চোখে তাদের কৃষক-বিপ্লবের স্বপ্ন; যদিও গ্রামীণ সমাজ সম্পর্কে, বিশেষ করে কৃষিকাজ সম্পর্কে, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা, দুটোই তাদের সামান্যই। রাষ্ট্রশক্তির অনুকম্পাহীন পালটা মারে আন্দোলন একসময়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এক প্রজন্মের মেধাও প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসে। যারা বেঁচে থাকে, আর যাদের সহায়-সম্বল আছে, তারা পাড়ি জমায়, না, বেজিংয়ে নয়, আমেরিকায়। সমসাময়িক পাশ্চাত্যের ছাত্রবিপ্লবের মতোই তার একই পরিণাম। তখনকার ফরাসি ছাত্রনেতা রেজিদেব্রের বহুল প্রচারিত মন্তব্য (১৯৭৮) আবার স্মরণ করি: ‘In France, all the Columbusses of modernity thought that they were discovering China in Paris, when in fact they were landing in California...’ তারপর তাঁর বিষণ্ন আত্মজিজ্ঞাসা, ‘Was it necessary to fancy ourselves Maoists to become American!’ নকশাল আন্দোলনের পরিণতির একটি ধারাও এই রকম। মেধা তার চেতনার প্রস্থানভূমি খুঁজে পেল আমেরিকান র্যাডিকালিজমে। তারই প্রলম্বিত প্রচ্ছায়া নিম্নবর্গের আত্মপরিচয় ও ভাগ্যলিপি রচনায় কিছু অত্যুজ্জ্বল গবেষকের চমকপ্রদ উদ্যোগ। এতে আন্তরিকতা থাকতে পারে, কিন্তু অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি বা অন্তর্দৃষ্টির গভীরতা কতটা আছে, বলা মুশকিল। চিন্তাজগতে তাঁরা আলোড়ন তোলেন অবশ্যই। তবে তা নৈরাজ্যিক বিশৃঙ্খলাকেই আমন্ত্রণ জানায়। উপমহাদেশে চিন্তার নরম মাটিতে তার আপেক্ষিক ক্ষতি তুলনায় অনেক বেশি।
তাই বলে নিচুতলার মানুষের চিন্তার ও কর্মের জগৎ যে সাবলটার্ন স্টাডিজ কিছুই আমাদের সামনে মেলে ধরে না, তা নয়। বিশেষ করে তাতে সামাজিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দুর্বল মানুষের প্রতিরোধের সংগ্রাম ও টিকে থাকার কৌশল নিয়ে প্রকাশিত রচনাসমূহ যথেষ্ট উন্নতমানের-আমাদের চিন্তার তারা খোরাক জোগায়, পরিধিও তার বাড়ায়। কিন্তু নিম্নবর্গের মানুষ শুধু নিম্নবর্গের জন্য, বিচ্ছিন্নতাতেই সমস্যার সমাধান, এ জাতীয় মানসিকতার প্রশ্রয় অগ্রহণযোগ্য। প্রকৃত প্রতিকারের উপায়ও তা নয়। নয়া-ঔপনিবেশিক আগ্রাসন তা ঠেকাতে পারে না; বরং তার পথ আরও সহজ করে দেয়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ অবশ্যই কাম্য। কিন্তু ফুকোর বিচারধারা মেনে তাকে টুকরো টুকরো করে বাতাসে মিশিয়ে দেওয়া বা নিশ্চিহ্ন করা অবশ্যই নয়। শুধু জীবনকে নয়, বিশ্বপ্রকৃতির নিয়মকেও তা অস্বীকার করে। ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র রচনা করে শোষণমুক্তির একটা পথ দেখিয়েছিলেন মার্কস। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, তাতেও হুকুমদারি ও জবরদস্তিতে মানুষের মুক্তি বিপন্ন হবার আশঙ্কা থাকে। তা বিপর্যয়ও ডেকে আনে। শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে, এবং কর্তৃত্বেও, সমাজের সকল শক্তির আলাদা আলাদা অস্তিত্ব বজায় রেখেই যে সর্বমান্য ব্যবস্থার, বা হেজিমনির কথা গ্রামশ্চি ভেবেছিলেন, তার যথার্থ প্রয়োগ কোথাও হয়নি। তবে সেখানেও সমগ্রকে ভাঙা নয়, অংশকে সমগ্রে মিলিয়ে তার সার্থক-সর্বোত্তম বিকাশই লক্ষ্য। সাবলটার্ন স্টাডিজের তত্ত্বজ্ঞানীরা এ পথও পরিহার করেন। আলাদা আলাদা পরিচয়ে প্রত্যেক জনগোষ্ঠী আপন শিকড়ে ফিরে গিয়ে সেইখানেই চিরস্থায়ী হবে, এই তাঁদের আদর্শ কল্পনা। এটা বাস্তবোচিত নয়। ওই সব জনগোষ্ঠীকেও তা কোনো সিদ্ধির বৈকুণ্ঠধামে পৌঁছে দেয় না। মনে রাখা দরকার, শিকড়ের পুষ্টির জন্যেও চাই বাইরের জল-হাওয়া, চাই আলো আর আহারের পরিচর্যা। এ সব বাদ দিয়ে শিকড়ের অন্ধকারে ডুবে থাকায় মাদকতা নিশ্চয় আছে। কিন্তু তা জীবনবিমুখী। তাতে প্রাণ বাঁচে না। শিকড়ও মরে যায়। অথবা জীবন্মৃত হয়ে সবার অলক্ষে হারিয়ে যেতে বসে। লুপ্ত অথবা লুপ্তপ্রায় মানবগোষ্ঠীগুলোর হদিস নিলেও এটা বোঝা যায়। জীবন কেবলমাত্র একটি প্রয়োজনের পেছনে ছোটে না। অনেকগুলোর ভারসাম্য খোঁজে। তাদের কোনো-কোনোটা পরস্পরবিরোধী। যেমন: জল আর আগুন। এই প্রাথমিক জ্ঞানের পরিচয় সাবলটার্ন গোষ্ঠীর চিন্তাবিদদের ভেতর পাই না। সে অনুপাতে তাঁরা আমাদের হতাশ করেন বইকি!


মন্তব্য নেই
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.