মার্কসবাদ ও উত্তর আধুনিকতা
উত্তর আধুনিকতার মতাদর্শ
‘মতাদর্শ’ শব্দটির অর্থ নিয়ে বিতর্ক আছে। সুতরাং মতাদর্শ বলতে আমরা কী বুঝছি, সেটা গোড়াতেই স্পষ্ট করা দরকার। মতাদর্শ বলতে আমরা বুঝছি, গ্রামশির ভাষায়—বিশ্ব সম্পর্কিত ধারণা যা মানুষের ব্যক্তি ও যৌথজীবনের যাবতীয় অভিব্যক্তিতে ব্যাপ্ত থাকে এবং যা আইন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কাজকর্মের মধ্য দিয়ে অনুচ্চারিতভাবে (ওসঢ়ষরপরঃু) প্রকাশিত হয় (প্রিজন নোটবুকস্, পৃ. ৩২৮)। নিজেদের মধ্যে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও উত্তর আধুনিকতাবাদীদের মতাদর্শে একটি বিষয়ে ঐকমত্য আছে। প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছি উত্তর আধুনিকতাবাদী মতাদর্শে বিশ্ব সম্পর্কিত ধারণার মূল কথা হল, এই বিষয়ে কোনো সার্বিক জ্ঞান বা বিশ্ববীক্ষা থাকা সম্ভব নয়। বস্তু, প্রাণী এবং সমাজ জীবন নিয়ে কোনো ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ থাকতে পারে না; যে বাচন (উরং-পড়ঁৎংব) পৃথিবীর সবকিছুকে কোনো এক সাধারণ (ঈড়সসড়হ) সূত্রে গাঁথতে চায় তা ভ্রান্ত বাচন। পৃথিবীতে কোনো ‘মাস্টার ডিসকোর্স’ নেই। কেউ যদি ‘হেগেলের বিশ্ববীক্ষা’ অথবা ‘মাকর্সবাদ’ নামক কোনো চরম বাচনের কথা বলেন, তিনি ভ্রান্ত।
সুতরাং ‘সামন্তবাদ’, ‘পুঁজিবাদ’, ‘দাস সমাজ’ কিংবা ‘সমাজতান্ত্রিক সমাজ’ নিয়ে যদি পৃথক পৃথক বাচন থেকেও থাকে, এগুলিকে সূত্রবদ্ধ করে ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ নামক সামান্য বাচন তৈরি করা মূর্খামি। ঊনবিংশ শতকের জলের মধ্যে এইসব সামান্য বাচন-এর স্রষ্টারা বিচরণ করতে পারেন। বিংশ শতকের কঠিন জমিতে এদের মৃত্যু, অনিবার্য। সমাজে আসলে থাকে বহু ধরনের বাচন। ধর্ম, জাতি, বর্ণ, পরিবার, লিঙ্গ-এসব কিছু নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বাচন সৃষ্টি হয়। প্রতিটি বাচনে থাকে একটি কর্তৃত্বকারী (ঐবমবসড়হরংঃরপ) অংশ। আবার প্রতিটি বাচনেই থাকে একটি বা একাধিক পালটা বাচনের বা প্রতিবাচনের সম্ভাবনা। কর্তৃত্বকারী বাচনের বিনির্মাণের (উবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ) মধ্য দিয়ে এই পালটা বাচন গড়ে ওঠে। কর্তৃত্বকারী বাচনের অংশীদাররা হল সুবিধাভোগী। সুবিধাভোগীরা যাদের উপর কর্তৃত্ব করে সেই দলিতরাই পালটা বাচন তৈরি করে।
পালটা বাচন সুবিধাভোগীদের ক্ষমতা হ্রাস করে, এবং এভাবে বিদ্যমান বাচন কাঠামোর মধ্যেই গণতন্ত্রের জমি বা পরিসর (ঝঢ়ধপব) তৈরি হয় কিংবা প্রসারিত হয়।
একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সমাজে যে লিঙ্গের বাচন থাকে তার কর্তৃত্বকারী বাচন হল পুরুষ বাচন। পুরুষ বাচনের অংশীদাররা এই বাচনে সুবিধাভোগী। নারী বাচন এই কর্তৃত্বকারী বাচনের বিনির্মাণ ঘটায়। বিনির্মাণের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে নারীর আধিকার। লিঙ্গভিত্তিক বাচন কাঠামোর মধ্যেই এভাবে গড়ে ওঠে গণতন্ত্রের জমি। নারী পায় তার বাচনিক অধিকার।
ভিন্ন ভিন্ন বাচনের মধ্যে কি কোনো আন্তঃসম্পর্ক থাকে যাতে করে সব বাচনের দলিত অংশগুলি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে? বাচনভিত্তিক আলোচনার ওপর জোর দিতেন ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিকরা। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের হাবেরমাস বলেছেন, যুক্তিবাদী বাচনের সাহায্যে একটি যুক্তিগ্রাহ্য মতৈক্য গড়ে তোলা সম্ভব। মিশেল ফুকো এবং তাঁর অনুগামীদের মত হল, সেক্ষেত্রে আবার প্রবণতা থাকবে একটি মেটা-ন্যারেটিভ বা সামান্য বাচন গড়ে তোলার। এই ধরনের সামান্য বাচন আসলে কোনো একটি বিশেষ বাচনের কর্তৃত্ব নিয়ে আসবে, যা কর্তৃত্বকারী বলেই ভঙ্গুর। উত্তর আধুনিক মতবাদ অনুসারে, হাবেরমাস নয়, তাঁর সমালোচকরাই সঠিক। নারীবাদ যে পুরুষ বাচনের বিনির্মাণ ঘটায়, সে বাচন শ্রমিক পুরুষের বাচন হলেও কর্তৃত্বকারী। ঐক্যের পরিসর একটা অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যায়। নারী এবং পুরুষ, উভয়েই এক্ষেত্রে শ্রমিক। এঁরা উভয়েই লড়েন পুঁজির বিরুদ্ধে। এঁদের মধ্যে গড়ে উঠতে পারে শ্রমভিত্তিক ঐকমত্য। কিন্তু লিঙ্গভিত্তিক বাচনে কর্তৃত্বকারী যেহেতু পুরুষ, এরকম হতেই পারে যে এখানে শ্রমভিত্তিক ঐক্যমত গড়তে গেলে শ্রমিক পুরুষের বাচনের দাসত্বই হবে নারীবাদের পরিণতি। একইভাবে বলা যায়, দলিত ঐক্যও ক্ষণভঙ্গুর। কেননা দলিত নারী দলিত পুরুষের বাচন দ্বারা শৃঙ্খলিত। তাহলে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে উত্তর আধুনিক মতবাদভিত্তিক রাজনীতির চেহারা? ক্রমাগত ‘অন্তর্ঘাত’ চালানো, নাকি একটা ‘যুক্তিগ্রাহ্য’ ঐকমত্য’ গড়া-হাবারমাস যেমন বলেছেন। এ নিয়ে জটিল সমস্যা আছে। পরবর্তী উপবিভাগে এ নিয়ে আমরা আলোচনা করব। কিন্তু তার আগে, মার্কসবাদীরা কেন এই বাচন সংক্রান্ত বক্তব্যর বিরোধীতা করেন, সেটি আলোচনা করা দরকার।
কেন মার্কসবাদীরা এই উত্তর আধুনিক বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন না? মূল কারণটা মতাদর্শগত। বাচনের এই মতাদর্শ কয়েকটি বিষয়কে প্রাক্সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেয়। প্রথমত সত্যের কোনো বাচন-নিরপেক্ষ অস্তিত্ব নেই। পৃথিবীর ভূগোল সংক্রান্ত ‘কর্তৃত্বকারী’ বাচন যদি পৃথিবীকে গোলক সদৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করে এবং তার পালটা বাচন যদি বিনির্মাণের সাহায্যে পৃথিবীকে ‘চ্যাপ্টা’ হিসেবে দেখায়, বাস্তব আসলে কী তা কোনোমতেই বলা যাবে না। কর্তৃত্বকারী বাচনের বাস্তব হল গোলকসদৃশ্য পৃথিবী, দলিত বাস্তব হল চ্যাপ্টা পৃথিবী। উত্তর আধুনিকতাবাদ অনুসারে, কথাটা তাহলে এই দাঁড়ায় যে পৃথিবী আসলে কেমন দেখতে এ প্রশ্ন অর্থহীন। সত্যর কোনো বস্তুভিত্তি নেই, সত্য বিষয়ীভূত। সত্য নির্মিত হয়। নির্মাণকারী যেভাবে সত্যকে দেখে, সত্য সেটাই। প্রথম অধ্যায়েই আমরা দেখেছি, উত্তর আধুনিকতার ভাষায় সত্য হল ‘টেক্সট’ (ঞবীঃ) নির্ভর। ‘টেক্সট’ নির্মাণকারী সত্যকে যেভাবে দেখে, সত্য সেটাই। ঊনবিংশ শতকের তাত্ত্বিকরা এটিকে বলতেন ভাববাদ। ভাববাদ যে মতাদর্শের ভিত্তি, তা ভাববাদী মতাদর্শ। ঊনবিংশ শতকের অবসানের সাথে সাথে সমস্ত ভাববাদী মতাদর্শ যদি বস্তুবাদের রূপান্তরিত না হয়ে থাকে তা হলে বলতে হবে, উত্তর আধুনিকতার যাবতীয় নির্মাণ হল ভাববাদী নির্মাণ। মার্কসবাদ এর বিরোধিতা করে কারণ মার্কসবাদ হল ভাববাদবিরোধী মতাদর্শ।
দ্বিতীয়ত, উত্তর আধুনিকতাবাদ-চিহ্নিত যে বহু ধরনের বাচনের মধ্যে সমাজের অস্তিত্ব, এই মতবাদ অনুসারে সেই বাচনগুলির মধ্যে কোনো আন্তঃসম্পর্ক নেই। আন্তঃ সম্পর্ক না থাকার কারণ হল, বস্তু বা প্রাণীজগতে কিংবা মানুষের সমাজজীবনে কার্যকারণ সম্পর্কের যে যুক্তি কাঠামো ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের যুগ থেকে মানুষ খুঁজে এসেছে, প্রথম অধ্যায়েই আমরা দেখিয়েছি, উত্তর আধুনিকতাবাদ আসলে সেই যুক্তিকাঠামোটিকে খণ্ডন করে। সমাজে কেন লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন থাকে, জাতি ও বর্ণবিভাজনের উৎস কী, অর্থনৈতিক শ্রেণি বিভাজনের কারণ কী—মানুষকে বহুদিন এসব প্রশ্ন তাড়িত করেছে, এগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ পেয়েছে এগুলির মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের সূত্র এবং তা থেকে গড়ে উঠেছে সমাজ বিবর্তনের তত্ত্ব। এসব বিষয়ে উত্তর আধুনিকতাবাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাঁদের জিজ্ঞাসা একটি বিশেষ বাচনের জিনিওলজিতেই আবদ্ধ। বাচনগুলিকে আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে দেখা যায় কিনা, বাচনগুলিকে প্রধান এবং অপ্রধান—এইভাবে ভাগ করা যায় কিনা, বাচনগুলির ঐতিহাসিক পরম্পরা আছে কিনা এবং সেগুলির বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে এগুলির ভবিষ্যৎ বিকাশের ধারা সম্পর্কে কোনো ধারণা করা যায় কিনা—এই সব বিষয়েই উত্তর আধুনিকতাবাদের উত্তর হল নেতিবাচক। তাঁদের মতে বাচনের আন্তঃসম্পর্ক খুঁজতে হলে মেনে নিতে হয় নির্ধারণবাদ (উবঃবৎসরহরংস) এবং অত্যাবশকত্ববাদ (ঊংংবহঃরধষরংস)। ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট এই দুই ধারণা মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছে এবং এই ধারণাই মার্কসবাদ নামক চিত্তাকর্ষক একটি বিনির্মাণকে নষ্ট করে দিয়েছে। আসলে কোনো কিছুই অন্য কিছু দিয়ে নির্ধারিত হয় না, কোনো বাচনের জন্যই অন্য বাচনের অস্তিত্ব অত্যাবশ্যক নয়। অর্থনীতির বাচন রাজনৈতিক বাচনকে নির্ধারণ করে-এ ধারণা ঠিক নয়, ঠিক নয় এই ধারণাও যে রাষ্ট্রের আইন এবং বিচার কাঠামোর চরিত্র নির্ণয়ে শ্রেণিভিত্তিক বাচন অত্যাবশ্যক ভূমিকা পালন করে।
নির্ধারণবাদ ও অত্যাবশ্যকত্ববাদ ব্যাতিরেকে মার্কসবাদী যুক্তিকাঠামো দাঁড় করানো যায় কি না, এই রচনার চতুর্থ অধ্যায়ে সে নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। কিন্তু সে প্রসঙ্গ আপাতত মুলতুবি থাক। বরং দেখা যাক, বাচন সংক্রান্ত উত্তর আধুনিক বক্তব্যর ব্যবহারিক তাৎপর্য কী। উত্তর আধুনিক মতবাদ অনুসারে বাচনের আন্তঃসম্পর্ক বিচার না করে বরং যে বাচন যখন গুরুত্ব পাচ্ছে তখন সেই বাচন নিয়ে ভাবনা চিন্তা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। উত্তর আধুনিকতার ভাষায়, এ হল আশু বা তাৎক্ষণিক (ঈড়হঃরহমবহঃ) প্রয়োজনীয়তার দাবি মিটিয়ে চলার পদ্ধতি। যখন পরিবেশ নিয়ে সমস্যা বাড়ছে, পরিবেশ নামক বাচনের গুরুত্ব বাড়বে, বসনিয়ার জাতি দাঙ্গা, মধ্য ইউরোপের জাতি সমস্যা নিয়ে ডিসকোর্সকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় করে তুলবে।
এ কথার অর্থ এই নয় যে অন্য বাচনগুলো তখন উধাও হয়ে যাবে। অন্য বাচনগুলোও থাকবে, কিন্তু তাৎক্ষণিক গুরুত্ব সেগুলোর উপর বর্তাবে না। মার্কসবাদীরা যদি ভাবেন, একথা বলতে উত্তর আধুনিকতাবাদীরা তাঁদের মতো করেই ‘প্রধান’ এবং ‘অপ্রধান’—এই ভাগটি করে নিতে চাইছেন, তাহলে ভুল করবেন। মার্কসবাদীরা বহু দ্বন্দুের যুগপৎ অস্তিত্বের মধ্যে সমাজকে দেখেন এবং সেই সব দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রধান দ্বন্দুটি খুঁজে বের করে তার সমাধানের চেষ্টা করেন। উত্তর আধুনিকতাবাদীরা এ বিচারধারার সঙ্গে একমত নন। দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি তো উত্তর আধুনিকতাবাদ-বিরোধী বটেই, বাচনের মধ্যে প্রধান-অপ্রধান বিচারও তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয়। উত্তর আধুনিকতা বলে তাৎক্ষণিকতাই হবে এ বিচারের মাপকাঠি এবং তাৎক্ষণিকতা একই সময়ে একাধিক বাচনের বিশ্লেষণ (বিনির্মাণ) প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে। অর্থাৎ বসনিয়ার বিনির্মাণের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা থাকলে পরিবেশ নিয়ে বিনির্মাণের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা থাকবে না, একথা বলা যায় না।
উত্তর আধুনিকতার চোখে সমাজ হল বহুবিধ নির্মাণ এবং বিনির্মাণের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কোনো এক বাচনে যে নির্মাতা, অন্য এক বাচনে সেই ব্যক্তিই বিনির্মাতা। এটা ঘটে এই কারণে যে, মানুষের থাকে বহু মাত্রা। যে মানুষ শ্রমিক, সে মানুষই পুরুষ। শ্রমিক হিসেবে যে পুঁজিবাদের বিনির্মাণ ঘটায়, পুরুষ হিসেবে সে চায় লিঙ্গভিত্তিক আধিপত্য। অর্থাৎ একই মানুষ কোথাও নির্মাণ করে, কোথাও বিনির্মাণ ঘটায়। ফলত একই মানুষ কোথাও তিরন্দাজ কোথাও তিরের লক্ষ্য। এভাবে বিচার করলে সবাই এই যুদ্ধে সবার টার্গেট। প্রধান ও অপ্রধানে যেহেতু ভাগ নেই, এ যুদ্ধ হল সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ। বলা বাহুল্য, এ হল নিখাদ নৈরাজ্যবাদ। যুক্তিবাদবিরোধী এই মতবাদ মার্কসবাদীরা এই কারণে বিরোধিতা করেন যে মতবাদটি প্রশ্রয় দেয় নৈরাজ্যবাদকে এবং সে কারণে শেষ বিচারে এই মতবাদ রাজনৈতিক আন্দোলনে একটি ক্ষতিকারক ভূমিকা পালন করে।
উত্তর আধুনিকতার রাজনীতি
উত্তর আধুনিকতাবাদের রাজনীতি হল ‘অন্তর্ঘাত’-এর রাজনীতি। সমাজের একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কর্তৃত্বকারী বাচনের বিপরীতে গড়ে ওঠে পালটা বাচন। পালটা বাচন গড়ে ওঠে কর্তৃত্বকারী বাচনের বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে। এই বিনির্মাণ বহুমুখী, পালটা বাচনও তাই বহুবিধ। বহুমুখী বিনির্মাণ-এ উত্তর আধুনিকতাবাদ সচেতনভাবে অংশ নিতে চায়। সংশ্লিষ্ট বাচনে দলিতদের যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তার তুলনায় এই সচেতন প্রয়াসের গুরুত্ব কিছু কম নয়, কেননা এই সচেতন অংশগ্রহণ আসলে কর্তৃত্বকারী বাচনে অন্তর্ঘাত ঘটায়। অর্থাৎ কর্তৃত্বকারী বাচন যে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হয় তার পিছনে উত্তর আধুনিকতাবাদের সচেতন প্রয়াসের, তাদের অন্তর্ঘাতী প্রচেষ্টার একটি বিশেষ অবদান থাকতে পারে। উত্তর আধুনিক মতবাদভিত্তিক রাজনীতির নির্যাসও তাই এই ধরনের ‘অন্তর্ঘাত’-এর রাজনীতি।
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করা যেতে পারে। কর্তৃত্বকারী বাচনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হল উত্তর আধুনিকতাবাদের টার্গেট। ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে ক্ষমতাহীনদের দমন করে রাখার মধ্যে দিয়ে। কর্তৃত্বকারী বাচনের ক্ষমতাচ্যুতির অর্থ হল ক্ষমতাহীনদের উপর দমনের অবসান। দমনের অবসানে কী ঘটবে? ক্ষমতাহীনরা ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে এবং ক্ষমতাচ্যুতরা দমিত হবে? না-কি সংশ্লিষ্ট বাচনে এমন একটি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, যাতে কেউ কারও ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবে না? এ বিষয়ে উত্তর আধুনিকতায় মতবিরোধ আছে। যদিও এবিষয়ে সকলেই একমত যে প্রতিটি পালটা বাচন, প্রতিটি বিনির্মাণ কিছুটা গণতন্ত্রের জমি তৈরি করে (যথা নারীবাদী আন্দোলন নারীর জন্য কিছু গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করে), কিন্তু এই বিনির্মাণ শেষ পর্যন্ত কী করে? উত্তর আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব অনুসারে একথা ভাবা যেতে পারে যে পালটা বাচন যখন কর্তৃত্বে আসে, তখন সেই কর্তৃত্বকারী বাচনের ভূমিকা হবে দমনের ভূমিকা। যাদের উপর কর্তৃত্ব আরোপ করা হবে তারা হবে দলিত এবং এই দলিতরা আবার গড়ে তুলবে পালটা বাচন। (যথা: নারীবাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর নারীবাদের দমনের বিরুদ্ধে দলিত পুরুষ নারীবাদের বিনির্মাণ ঘটাবে এবং উত্তর আধুনিকরা সম্ভবত তখন নারীবাদে ‘অন্তর্ঘাত’ ঘটাবেন)। অর্থাৎ ক্ষমতা নিয়ে একটা নাগরদোলা চলতেই থাকবে।
কিন্তু উত্তর আধুনিকতাবাদীদের কেউ কেউ এই জ্ঞানতত্ত্ব অস্বীকার করেন।
হাবারামাসের সঙ্গে একমত হয়ে তাঁদের কেউ কেউ বলেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তির উপর ভিত্তি করে একটা ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ক্ষমতার লড়াই শেষ হবে গণতন্ত্রের জমি একটি বাঞ্ছিত পর্যায়ে প্রসারিত করার মধ্যে দিয়ে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অবশ্য সংশয় থাকে। গণতন্ত্রের জমি একটি বাঞ্ছিত পর্যায় পর্যন্ত প্রসারিত হবার পর এই যুদ্ধ থেমে গেলে পালটা বাচন এবং বিনির্মাণের তত্ত্ব কীভাবে বলবৎ থাকে? তাছাড়া সব বাচন একটি বাঞ্ছিত পর্যায়ে পৌঁছে গেলে একটা ‘মাস্টার ডিস্কোর্স’ তৈরি হয়ে যাবার বিপদ দেখা দেবে না কি?
বলা বাহুল্য, এটাই উত্তর আধুনিকতা ভিত্তিক রাজনীতির প্রধান দুর্বলতা। উত্তর আধুনিকতাবাদের অন্যতম রূপকার জাক দেরিদা বলেছেন, বিনির্মাণের যে র্যাডিকাল তত্ত্ব, তা কী ধরণের রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্ম দেয়, তা নিয়ে তাঁর ধারণা স্পষ্ট নেই। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছেন, বিনির্মাণের পদ্ধতির সঙ্গে সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতির মিলন ঘটানোর কাজটি তিনি এখনও করে উঠতে পারেননি (দ্রষ্টব্য: শ্যামলাল ঘোস্টস্ অফ্ মার্কস্, টেলিগ্রাফ, ১২ জানুয়ারি, ১৯৯৫)। দেরিদার জীবনাবসানের সময় পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান হয়নি। সমস্যাটি বর্তমানে উত্তর আধুনিকতাবাদী জ্ঞানচর্চার জগৎ থেকেই নির্বাসিত।
সুতরাং ‘অন্তর্ঘাত’-এর রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কী করবে, এই রাজনীতির অন্যতম রূপকারই তার উত্তর খুঁজে পাননি তাঁর জীবদ্দশায়। দেরিদাপন্থীদের মধ্যে এর উত্তর যাঁরা জানেন বলে দাবি করেন, তাঁদের মধ্যে এ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। বলা বাহুল্য, এই অবস্থায় একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি গড়ে তোলা অসম্ভব। সমস্ত নৈরাজ্যবাদী রাজনৈতিক কর্মসূচির মতোই উত্তর আধুনিকতাবাদের রাজনীতিও বিভ্রান্তির কুয়াশায় আচ্ছন্ন।
রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ক্ষমতার প্রশ্ন। বাচন-প্রতিবাচনেব নাগরদোলাই হোক, অথবা যুক্তিভিত্তিক ঐকমত্যের একটি ভারসাম্যই হোক, রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ক্ষমতার প্রশ্ন। উত্তর আধুনিকতাবাদে এই ‘ক্ষমতা’ শব্দ নিয়েও সমস্যা আছে। ‘ক্ষমতা’ যদি দমনের হাতিয়ার হয়, একটি বিশেষ বাচনিক ক্ষেত্রে এই হাতিয়ার ছড়িয়ে দেওয়া থাকে সংশ্লিষ্ট বাচনভুক্ত সমস্ত সদস্যদের মধ্যে। এই হাতিয়ার অবয়ব পায় ব্যবহার, অভ্যাস ও জ্ঞানতত্ত্বে। অর্থাৎ এই হাতিয়ার কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির বা শ্রেণির সম্পত্তি নয়। এমনকি একটি বিশেষ বাচনিক ক্ষেত্রে যারা দলিত, তারাও কখনো কখনো এই হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, লিঙ্গভিত্তিক সমাজে নারীর উপর অত্যাচারের হাতিয়ার, ব্যবহার ও অভ্যাসের কারণে অন্য নারীর কাছেও থাকতে পারে। বিশেষত জ্ঞানতত্ত্বে অধিকার কোনো নারীবাদী নেত্রীর অন্য নারীকে দমন করার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
কথাগুলো শুনতে ভালো। কিন্তু এসব কথার তাৎপর্য কী? ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্ব অনুযায়ী ক্ষমতা যেহেতু সর্বত্র ছড়িয়ে থাকতে পারে, ‘ক্ষমতা দখল’ শব্দটি সুতরাং অপ্রাসঙ্গিক। ক্ষমতা হল সংশ্লিষ্ট বাচনভুক্ত সামাজিক সম্পর্কের একটি ‘ক্রিয়াক্ষেত্র’, সময়ের সাথে সাথে, পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল রেখে যা ক্রমাগত বদলাতে থাকে। এই ক্ষমতা ‘দখল’ করার কিছু নেই।
তাই যদি হয়, তাহলে উত্তর আধুনিকতার ‘অন্তর্ঘাত’ দিয়ে কর্তৃত্বকারী বাচনকে টলিয়ে দেবার যে কাজ করার কথা বলা হয় তার পিছনে কী উদ্দেশ্য থাকে? উদ্দেশ্য যা থাকে তা হল আশু বা তাৎক্ষণিক যে সম্পর্কগুলো মানুষকে প্রভাবিত করে-সামাজিক, রাজনৈতিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পর্ক-তার সবগুলোর ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল ‘ক্ষমতা’কে নড়বড়ে করে দেওয়া, যাতে করে বাচন থেকে পালটা বাচন গড়ার কাজ সহজ হয়। এই যুদ্ধটা আসলে মস্তিষ্কের যুদ্ধ। বিতর্ক, প্রতিবাদ—এসব হল তার অভিব্যক্তি। আজকাল যে ‘ডায়লগ’ বা সংলাপকেন্দ্রিক রাজনীতির কথা উঠছে, তার মূলেরও আছে এই ধরনের ভাবনাচিন্তা। এখানে কামান বন্দুকের কোনো ভূমিকা নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, ক্ষমতাবান বাঘ যদি ঘাস খাওয়ার উদারতা না দেখায়, তার মস্তিষ্কে যদি উত্তর আধুনিকতার যুক্তি প্রবেশের পথ না থাকে-তবে কী হবে? উত্তর আধুনিকতায় তার জবাব নেই। আসলে উত্তর আধুনিকতার রাজনীতিতে হিংসার স্থান নেই। উত্তর আধুনিকতায় পরিবর্তনের রাজনীতি হল অহিংস, এই মতবাদে ক্ষমতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হল বিতর্কসভায় হার-জিতের লড়াই।
আগেই দেখেছি, উত্তর আধুনিকতার রাজনীতি হল এমন এক রাজনীতি যাতে সবাই সবার শত্রু। এখন বলা যায়, এই শত্রুতা কোনো রক্তপাতের সম্ভাবনা নিয়ে আসে না, কারণ শত্রুরা যুদ্ধ করে না, বিতর্ক করে। বিতর্ক থেকে যুদ্ধ বেধে যাবার কোনো সম্ভাবনা নেই কারণ এ যাবৎকাল যুদ্ধ যে কারণে বেধেছে, সেই ক্ষমতার পাটিগণিতও এক্ষেত্রে সরল। ক্ষমতা নামক মায়ামৃগকে কেউ বাঁধতে পারে না। ক্ষমতা কারও সম্পত্তি নয়। বলা বাহুল্য, এই সরল পাটিগণিত যুদ্ধ আনে না, আনে মনসিজ কিছু তত্ত্বের মাদক সেবক করে সতত বিদ্যমান যুদ্ধকে অস্বীকার করার আনন্দ।
শ্রেণির সম্পত্তি নয়। এমনকি একটি বিশেষ বাচনিক ক্ষেত্রে যারা দলিত, তারাও কখনো কখনো এই হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, লিঙ্গভিত্তিক সমাজে নারীর উপর অত্যাচারের হাতিয়ার, ব্যবহার ও অভ্যাসের কারণে অন্য নারীর কাছেও থাকতে পারে। বিশেষত জ্ঞানতত্ত্বে অধিকার কোনো নারীবাদী নেত্রীর অন্য নারীকে দমন করার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
কথাগুলো শুনতে ভালো। কিন্তু এসব কথার তাৎপর্য কী? ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্ব অনুযায়ী ক্ষমতা যেহেতু সর্বত্র ছড়িয়ে থাকতে পারে, ‘ক্ষমতা দখল’ শব্দটি সুতরাং অপ্রাসঙ্গিক। ক্ষমতা হল সংশ্লিষ্ট বাচনভুক্ত সামাজিক সম্পর্কের একটি ‘ক্রিয়াক্ষেত্র’, সময়ের সাথে সাথে, পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল রেখে যা ক্রমাগত বদলাতে থাকে। এই ক্ষমতা ‘দখল’ করার কিছু নেই।
তাই যদি হয়, তাহলে উত্তর আধুনিকতার ‘অন্তর্ঘাত’ দিয়ে কর্তৃত্বকারী বাচনকে টলিয়ে দেবার যে কাজ করার কথা বলা হয় তার পিছনে কী উদ্দেশ্য থাকে? উদ্দেশ্য যা থাকে তা হল আশু বা তাৎক্ষণিক যে সম্পর্কগুলো মানুষকে প্রভাবিত করে—সামাজিক, রাজনৈতিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পর্ক—তার সবগুলোর ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল ‘ক্ষমতা’কে নড়বড়ে করে দেওয়া, যাতে করে বাচন থেকে পালটা বাচন গড়ার কাজ সহজ হয়। এই যুদ্ধটা আসলে মস্তিষ্কের যুদ্ধ। বিতর্ক, প্রতিবাদ-এসব হল তার অভিব্যক্তি। আজকাল যে ‘ডায়লগ’ বা সংলাপকেন্দ্রিক রাজনীতির কথা উঠছে, তার মূলেরও আছে এই ধরনের ভাবনাচিন্তা। এখানে কামান বন্দুকের কোনো ভূমিকা নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, ক্ষমতাবান বাঘ যদি ঘাস খাওয়ার উদারতা না দেখায়, তার মস্তিষ্কে যদি উত্তর আধুনিকতার যুক্তি প্রবেশের পথ না থাকে-তবে কী হবে? উত্তর আধুনিকতায় তার জবাব নেই। আসলে উত্তর আধুনিকতার রাজনীতিতে হিংসার স্থান নেই। উত্তর আধুনিকতায় পরিবর্তনের রাজনীতি হল অহিংস, এই মতবাদে ক্ষমতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হল বিতর্কসভায় হার-জিতের লড়াই।
আগেই দেখেছি, উত্তর আধুনিকতার রাজনীতি হল এমন এক রাজনীতি যাতে সবাই সবার শত্রু। এখন বলা যায়, এই শত্রুতা কোনো রক্তপাতের সম্ভাবনা নিয়ে আসে না, কারণ শত্রুরা যুদ্ধ করে না, বিতর্ক করে। বিতর্ক থেকে যুদ্ধ বেধে যাবার কোনো সম্ভাবনা নেই কারণ এ যাবৎকাল যুদ্ধ যে কারণে বেধেছে, সেই ক্ষমতার পাটিগণিতও এক্ষেত্রে সরল। ক্ষমতা নামক মায়ামৃগকে কেউ বাঁধতে পারে না। ক্ষমতা কারও সম্পত্তি নয়। বলা বাহুল্য, এই সরল পাটিগণিত যুদ্ধ আনে না, আনে মনসিজ কিছু তত্ত্বের মাদক সেবক করে সতত বিদ্যমান যুদ্ধকে অস্বীকার করার আনন্দ।
উপর যে আক্রমণ তার জবাব দিয়েছেন লুই আলথুসার (সে জবাব নিয়ে সমস্যা আছে। এই রচনার চতুর্থ অধ্যায়ে এ নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি)। দেরিদার আক্রমণের আশু লক্ষ্য এক্ষেত্রে তাই লুই আলথুসার। লক্ষ্যণীয় এই যে, এই আক্রমণ করতে গিয়ে দেরিদা আসলে কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ভর যুক্তিবাদেরই বিরোধিতা করছেন এবং নিজের তাত্ত্বিক অবস্থানকে ‘বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব’, ‘জটিলতা তত্ত্ব’ ইত্যাদির সঙ্গে সমান অবস্থাতে নিয়ে এসেছেন। দেকার্ত, বেকন, নিউটন কিংবা আইনস্টাইন যে যুক্তিবাদ অবলম্বন করে তাঁদের গবেষণায় সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন, নির্ধারণবাদ বা অত্যাবশ্যকত্ববাদের বিরোধিতার নাম করে সেটিকে যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না-একথা তিনি সতর্কভাবে বিবেচনা করেননি।
যাইহোক, বহুমাত্রিক এই যে মানুষ, রাষ্ট্রের কাছে তার দাবি কী? সে কি রাষ্ট্রর উৎখাত চায়? সে কি পালটা রাষ্ট্র গড়তে চায়? উত্তর আধুনিক তত্ত্বিকদের রচনায় তার জবাব নেই। উত্তর আধুনিক সমাজকর্মীদের কাজকর্মে মনে হয়, তাদের লক্ষ্য হল, বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই অধিকারের ক্ষেত্র প্রসারিত করা। উত্তর আধুনিক তত্ত্বের ভাষায় কথাটা হল, প্রতিবাচনের মধ্য দিয়ে মানুষ এই অধিকারকে প্রসারিত করা। কোন বিশেষ মাত্রাকে ঘিরে এই প্রতিবাচন দেখা দেবে তা পূর্ব নির্ধারিত নয়। যখন যেটি আশু হয়ে দেখা দেবে প্রতিবাচন গড়ে উঠবে সেটিকে কেন্দ্র করে। কখনও হয়তো দেখা দেবে, এই প্রতিবাচন জমাট বাঁধছে পরিবেশ সংক্রান্ত রাষ্ট্রনীতি নিয়ে, কখনও বা সেটা জমাট বাঁধছে কোনো আর্থিক নীতি দিয়ে। কখনও নীচ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্তৃত্বকারী বাচনের বিরুদ্ধে প্রতিবাচন গড়ে ওঠে। কখনও সচেতন হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে তা গড়ে তোলা হয়। উত্তর আধুনিকতাবাদীদেব একাংশের মতে এ সবই গণতন্ত্রের জমি বাড়িয়ে দেয়, ফলত সিভিল সোসাইটির ভিত জোরদার হয়। অন্য অংশের মতে এর ফলে পালটা কোনো বাচনের কর্তৃত্ব তৈরি হয়।
সে যাই হোক, মূল কথাটা হল, উত্তর আধুনিকতাবাদের চিন্তায় বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে বলপূর্বক ধ্বংস করে একটি পালটা রাষ্ট্র গঠন করার কর্মসূচি অপ্রয়োজনীয়। রাষ্ট্রের গায়ে কোনো লেবেল আঁটারই দরকার নেই। ইউরোপের উদারনৈতিক মতবাদ যেভাবে ভাবত (এখনও ভাবে) যে মানুষের গণতান্ত্রিক করে নেওয়া যায়, বিদ্যামান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই মানুষের অধিকার সমূহ প্রতিষ্ঠিত করা যায়, উত্তর আধুনিকতার মতবাদ তার চেয়ে বেশি কিছু ভাবে না। এ কথার তাৎপর্য কী? এ কথার তাৎপর্য, উত্তর আধুনিকতার ভাষায় বললে যা দাঁড়ায় তা হল, আসলে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিবাচন নেই। রাষ্ট্র যে হেগেলিয় সিভিল সোসাইটির অঙ্গ, সেই সিভিল সোসাইটিরও কোনো প্রতিবাচন নেই। রাষ্ট্র এবং সিভিল সোসাইটি উভয়ের মধ্যেই কর্তৃত্বকারী বাচনগুলির বিপরীত পালটা বাচন তৈরি হয়, কিন্তু কোনো বাচনই রাষ্ট্র ও সিভিল সোসাইটির প্রতিবাচন নয়।
সুতরাং নারীবাদী, পরিবেশবাদী, সমকামবাদী ইত্যাদি সব গ্রুপই আসলে কিছু গণতান্ত্রিক চাহিদা সৃষ্টিকারী গ্রুপ। উত্তর আধুনিকতার ভাষায় এগুলো হল ডিমান্ড গ্রুপ। উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিক রুডলফ্ বলেছেন, ‘নুতন বিষয় উত্থাপন করে এবং তাদের পক্ষে সমর্থন তৈরি করে ডিমান্ড গ্রুপগুলো রাষ্ট্র ও জাতীয় নীতির কর্মসূচির রূপান্তর ঘটায় এবং টানা হ্যাঁচড়া করে সুবিধে আদায় করে।’ রুডলফ্-এর এই মন্তব্য কতটা সঠিক তার প্রমাণ, মার্কসবাদের কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসা নারীবাদ, পরিবেশবাদ, গণতান্ত্রিক অধিকারবাদ ইত্যাদির কর্মসূচি সমূহ। এগুলির কোনোটিই কোনো র্যাডিক্যাল পরিবর্তন চায় না। এমনকি, তেমন সংকটে তারা যে সাম্রাজ্যবাদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলে, জার্মান পরিবেশবাদীদের কাজকর্ম তা প্রমাণ করেছে।
বলা বাহুল্য, এই মতবাদ সব ধরণের রাষ্ট্র সম্পর্কে সমান সহিষ্ণু নয়। বুর্জোয়া রাষ্ট্রের প্রতিবাচন থাকে না বটে, তবে উত্তর আধুনিকতার মতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিবাচন গড়ে তোলা খুবই জরুরি। অর্থাৎ এই মতবাদ আদ্যোপান্ত সমাজতন্ত্র বিরোধী। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পতন তারা এক সর্বগ্রাসী আধিপত্যবাদী মতাদর্শের পতন হিসেবে চিহ্নিত করে। সমাজ নিয়ে সমাজতন্ত্রীদের থাকে ঘোষিত শ্রেণিমাত্রা। এই ঘোষিত শ্রেণিমাত্রা নাকি দমন ও পীড়নের এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করে যা জনবিরোধী। সমাজতন্ত্রের পতনে তারা তাই উল্লসিত। যে রাষ্ট্রে অঘোষিত শ্রেণি মাত্রা থাকে সেটির কেন পতনের প্রয়োজন নেই, সেটিকে নড়বড়ে করে দেবার জন্য কোনো কাউন্টার ডিসকোর্স কেন গড়া যাবে না, এসব প্রশ্ন উত্তর আধুনিকতা-নিষিদ্ধ। সেরকম ডিস্কোর্স গড়তে গেলে এই শান্ত তার্কিকেরা যে ‘সহজ পাঠ’-এর শম্ভুর মতো লাঠি নিয়ে তাড়া করবে তার ইঙ্গিতও আছে।
অণুসংগ্রাম ও সংগঠন
উত্তর আধুনিকতার চোখে কোনো সামান্য বাচন, কোনো ‘মাস্টার ডিস্কার্স’ নেই। খণ্ড বাচনগুলি থেকে যে রাজনীতির জন্ম হয় তা স্থানিক, কেননা বাচন হল স্থানিক (ঈড়হঃবীঃঁধষ)। স্থানিক বাচনগুলিকে একটি সাধারণ কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টাও ভুল। উত্তর আধুনিক মতবাদ অনুসারে বলা যায়, সে চেষ্টা নানা ধরনের অবদমনের জন্ম দেবে। গড়ে উঠবে এক বিশেষ ধরনের আন্দোলনের মধ্যেই সর্ব নিয়ন্ত্রক, সর্বগ্রাসী
এক কাঠামো। অর্থাৎ ‘নর্মদা বাঁচাও’ আন্দোলন যদি অন্য কোনো পরিবেশবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা দুটি আন্দোলনেরই ক্ষতি করবে। কেননা সেক্ষেত্রে দুটিরই স্থানিক বাচন পর্যাপ্ত পরিমাণে বিকশিত হবে না, অথবা একটির বিকাশ হবে অন্যটির বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সংগ্রাম তাই অণু (গরপৎড়) সংগ্রাম। অণু সংগ্রামে কোনো সাধারণ সংগ্রামের মাত্রা আরোপ করা অবাঞ্ছিত।
এই অণুসংগ্রামের সাংগাঠনিক কাঠামো কী হবে? সাংগঠনিক কাঠামোকে ঘিরেও থাকে এক বা একাধিক বাচন যার মধ্যে একটি হল কর্তৃত্বকারী বাচন। এই কর্তৃত্বকারী বাচন তার মতো করে সংগঠনকে গড়তে চায়, কিন্তু কর্তৃত্বকারী বাচনেরও প্রতিবাচন থাকে। এই প্রতিবাচন গড়ে ওঠাকে সমর্থন করে। কেননা, তা না হলে গড়ে উঠবে সর্বনিয়ন্ত্রক, সর্বগ্রাসী এক সাংগাঠনিক কাঠামো যা আন্দোলনেরই ক্ষতি করবে। মার্কসবাদী পার্টি কাঠামো নাকি এই সর্বনাশটিই করেছে। এই কাঠামো কোনো প্রতিবাচন গড়তে দেয়নি। ফলত তা আন্দোলনেরই ক্ষতি করেছে।
সাংগাঠনিক প্রতিবাচন গড়ার অর্থ কী? এই প্রতিবাচন আসলে কর্তৃত্বকারী বাচনকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে স্বেচ্ছাচারকে মদত দেয়। স্বেচ্ছাচার হয়তো ব্যক্তির পক্ষে কাঙ্খিত, কিন্তু স্বেচ্ছাচার কীভাবে একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। স্বেচ্ছাচার আনে বিশৃঙ্খলা। বিশৃঙ্খলা থাকলে একটি বিতর্কও ঠিকমতো গড়ে তোলা যায় না, সংঘবদ্ধ আন্দোলন তো দূরের কথা। সুতরাং মার্কসবাদী পার্টি কাঠামো সর্বনিয়ন্ত্রক হয়ে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নামে সংগঠনের ক্ষতি করেছে কি না, এ বিতর্ক না করেও বলা যায় কর্তৃত্বকারী বাচনের পালটা বাচন উত্তর আধুনিকতাপন্থীরা যেভাবে গড়তে চান তার মধ্যে আছে স্বতঃস্ফূর্ততা। এটা গড়বে স্বেচ্ছাচারের মধ্য দিয়ে-এরকমই তাঁরা মনে করেন। বলা দরকার, সাংগঠনিক প্রতিবাচন গড়ার নামে স্বেচ্ছাচারে মদত দিয়ে কোনো আন্দোলনই করা যায় না। কেননা, সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা যায়, স্বেচ্ছাচার কোনও আন্দোলনই গড়তে পাবে না। উত্তর আধুনিকতা সাংগাঠনিক পালটা বাচনের নামে উসকে দিতে চায় স্বেচ্ছাচারিতাকে। সুতরাং প্রশ্ন ওঠে, উত্তর আধুনিকতা কি কোনো সচেতন আন্দোলন গড়তে চায়, না কি রাজনৈতিক আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্ততার হাতে সমর্পণ করে সংগঠন গড়ার দায় থেকে অব্যাহতি চায় উত্তর আধুনিকতাপন্থীরা?
একদিকে আন্দোলনকে স্থানিক স্তরে বেঁধে রাখা, অন্যদিকে সেই স্তরেও আন্দোলন গড়ার যে হাতিয়ার সেই সংগঠনকে স্বতঃস্ফূর্ততার হাতে ছেড়ে দেওয়া—মোটামুটি এই হল উত্তর আধুনিক পন্থার আন্দোলন। ক্ষমতার প্রশ্নটিকে ধোঁয়াটে করে রেখে, রাষ্ট্রের বিষয়টিকে এবং বুর্জোয়া রাষ্ট্র যার ওপর নির্ভর করে শাসন করে সেই সিভিল সোসাইটিকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে তুলে রেখে, উত্তর আধুনিকতাবাদ যে সংগ্রাম গড়তে বলে তা বড়ো জোর সংস্কারমূলক আন্দোলন হতে পারে। সেই আন্দোলনও যাতে প্রচলিত বুর্জোয়া কাঠামোর গায়ে আঁচড় না ফেলতে পারে সেজন্য আছে অণুসংগ্রামের তত্ত্ব। আবার এই সংগ্রাম যাতে জোরদার না হয় তার জন্য আছে সাংগঠনিক স্বতঃ স্ফূর্ততার আইন।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এসব তত্ত্ব আসলে কোথায় অন্তর্ঘাত চালাতে চায়?
অন্তর্ঘাতের লক্ষ্য: মার্কসবাদ
আসলে উত্তর আধুনিকতার যুদ্ধ হল মার্কসবাদের সঙ্গে। মার্কসবাদ চায় পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অবসান। রেনেসাঁস-এর যুগ থেকে মানুষ যে সাম্যর স্বপ্ন দেখে, মার্কসবাদ চায় সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে। এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে মার্কসবাদ ধাক্কা খেয়েছে, তার বাহিনীর মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। উত্তর আধুনিকতাবাদ চায় এই সংশয় দেখা দিয়েছে। উত্তর আধুনিকতাবাদ চায় এই সংশয়াচ্ছন্ন বাহিনীকে হতোদ্যম করতে, যাতে বিদ্যমান অসাম্যের জগৎ স্থায়িত্ব অর্জন করে। কঠিন সব শব্দের আড়ালে এই হল সেই ‘মাস্টার ডিস্কোর্স’ এবং এই ‘মাস্টার ডিসকোর্স’ আসলে আধুনিক পুঁজিবাদের হাতিয়ার।
এ কাজটি করা হয়েছে সুপরিকল্পিতভাবে তত্ত্বের ইট গেঁথে গেঁথে। লক্ষ করা যায়, উত্তর আধুনিকতার প্রথম তত্ত্ব হল, সত্যের কোনো বস্তুগত (ঙনলবপঃরাব) রূপ নেই। সত্য হল বিষয়ীগত (ঝঁনলবপঃরাব)। এ নিয়ে সরাসরি কোনো বিতর্ক না করে তত্ত্বটি হাজির করা হল সত্যের বাচনিক রূপ আবিষ্কারের নাম করে। এটি যে ভাববাদ, সেকথা স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হল না, বাচন এবং পালটা বা প্রতিবাচনের ধূম্রজালের আড়ালে তা ঢাকা দেওয়া হল, যাতে বস্তুবাদী দর্শন লালিত রাজনৈতিক কর্মীরা প্রথমেই তা নাকচ না করে বসেন।
দ্বিতীয় তত্ত্ব হল, বস্তু বা ঘটনাকে কার্যকারণ সম্পর্কের মধ্যে দেখার চেষ্টা করা ভ্রান্ত। কীসের জন্য কী হয়, তা আসলে কেউ নাকি জানে না। বস্তু বা ঘটনাবলীর ইতিহাসগুলি তাই কোনো সূত্রে গাঁথা যায় না। এই তত্ত্বটির নাম সামান্য বাচনের অসম্ভবতা। এ থেকে কেউ যদি এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে উত্তর আধুনিকতাবাদ যুক্তিবাদ বিরোধী এবং সেই সিদ্ধান্ত থেকে তিনি মার্কসবাদে ফেরত যান, তা রুখবার জন্য আনা হল খণ্ডবাচনের তত্ত্ব এবং খণ্ডবাচনের জিনিওলজি। উৎসুক ব্যক্তি উত্তর আধুনিকতাবাদের কাছে চমৎকার ব্যাখ্যা পাবেন জেলখানার উদ্ভব এবং তার বিকাশের বিভিন্ন স্তরের। কিন্তু জেল-আইন-মিলিটারি-ব্যক্তি সম্পত্তি-পরিবার-রাষ্ট্র, সব মিলিয়ে তিনি যদি একটি সামান্য বাচনের খোঁজ করেন, তবে তিনি জানবেন এরকম কোনো বাচন হয় না, তার কোনো জিনিওলজি বা স্তর পরম্পরার ইতিহাস নেই। অর্থাৎ যুক্তিবাদ অস্বীকৃত নয়, তবে যুক্তি কোনো সামগ্রিক তত্ত্ব গড়তে পারে না যা দিয়ে সমাজকে বোঝা যায়, সমাজকে বদলে দেওয়া যায়। যুক্তিবাদকে সরাসরি খণ্ডন করলে মানুষকে যতটা বিভ্রান্ত করা যায়, যুক্তিবাদের এই আধা-খণ্ডন মানুষকে তার চেয়ে অনেক বেশি বিভ্রান্ত করতে পারে।
মার্কসবাদীরা সামাজিক ঘটনাবলীর উপর হস্তক্ষেপ করতে চান। উত্তর আধুনিকতাবাদ তার বিরোধিতা করে না। তাঁরাও চান কর্তৃত্বকারী বাচনের পালটা বাচন গড়তে, কর্তৃত্বকারী বাচনে ‘অন্তর্ঘাত’ ঘটাতে। কিন্তু এই অন্তর্ঘাতের জঙ্গিত্ব কতটা ভঙ্গিসর্বস্ব সেটা ভাবা দরকার। এই জঙ্গিত্ব যাতে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সিভিল সোসাইটিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে তার জন্য এই অন্তর্ঘাতের রাজনীতির সঙ্গে এসেছে ক্ষমতা, সংগ্রাম ও সংগঠন প্রকরণ নিয়ে এমন সব তত্ত্ব যা সংস্কারবাদী কাজের চৌহদ্দিতেই মানুষকে আটকে রাখে। অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে যে মানুষ পড়ে থাকতে চায় না, যে সত্যিই পালটা কিছু কেটা করতে চায় তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য এর চেয়ে বড়ো কৌশল আর কী হতে পারে?
উত্তর আধুনিকতাবাদ সরাসরি লড়ে না। এই মতবাদ ‘অন্তর্ঘাত’ চালায়। এই অন্তর্ঘাতের লক্ষ্য নিয়ে এদের কোনো সংশয় নেই। তত্ত্বের ধূম্রজাল সৃষ্টি করে এরা আক্রমণ করে সেই মতবাদকে যা এই সিভিল সোসাইটির কাউন্টার ডিস্কোর্স গড়তে চায়। এদের আক্রমণের লক্ষ্য হল কার্ল মার্কসের মতবাদ।
এ আক্রমণ কঠিন আক্রমণ, কেন না আক্রমণকারী হাজির হয় বন্ধু বেশে। আক্রমণকারী বন্ধুর মতো করে মার্কসের ‘টেক্সট’ পড়ে। মুগ্ধতা দেখায় তাব বিনির্মাণে। মার্কসের উত্তর আধুনিক পাঠ জানাচ্ছে, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি কর্তৃত্বকারী বাচনে মার্কসের বিনির্মাণ আছে এবং এই বিনির্মাণ কর্তৃত্বকারী বাচনের কর্তৃত্ব আলগা করার কাজে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। এ বক্তব্য স্বয়ং দেরিদার। দেরিদার মতে মার্কস ছিলেন একজন ডিকনস্ট্রাকটর-মার্কস এই সমাজের কর্তৃত্বকারী বাচনের বিনির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছিলেন এবং তা থেকেই তৈরি হয় তার প্রতিবাচন। কর্তৃত্বকারী বাচনের বিনির্মাণে তিনি বহু বক্তব্য রেখেছিলেন, যার সারবত্তা আজও অস্বীকার করা যায় না। মার্কসের ‘ভূত’ আজও সমাজকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
দেরিদার মতে মার্কসের বহু ‘ভূত’ আছে, যার সবগুলির প্রাসঙ্গিকতা নেই। যেগুলি প্রাসঙ্গিক সেগুলিকে বোঝর জন্য প্রয়োজন মার্কসীয় ‘টেক্সট’-এর বিনির্মাণ। অর্থাৎ মার্ককে ঘিরে যে বাচন সৃষ্ট হয়েছে তার প্রতিবাচন তৈরি করা আজ জরুরি। একাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ছিল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকারি মার্কসবাদ, যা এই বিনির্মাণকে দমন করত। এখন যেহেতু এইসব রাষ্ট্রের পতন হয়েছে, এই বিনির্মাণ হবে সহজতর।
কিন্তু এই বিনির্মাণ কেন প্রয়োজনীয়? খণ্ড সত্য, খণ্ড ক্ষমতা, বুর্জোয়া সিভিল সোসাইটির মধ্যে গণতন্ত্রের জায়গা বাড়ানো-এসবের জন্য সেই বৃদ্ধের টেক্সট পড়ার দরকার নেই যিনি এ যাবৎকালের ইতিহাসকে দেখেছিলেন শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস হিসেবে, যিনি বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে বলপূর্বক ধ্বংস করে পালটা সমাজ গড়ার কথা বলেছিলেন। উত্তর আধুনিকতার কাছে এই বিনির্মাণ প্রয়োজন একথা প্রমাণ করতে যে মার্কসের ‘টেক্সট’-এর মধ্যে অন্য মার্কস আছেন যিনি উত্তর আধুনিকতাবাদীদের মতোই এই নরখাদক সমাজব্যবস্থার মধ্যে গণতন্ত্রের জমি বাড়াতে চেয়েছিলেন। একথা যদি প্রমাণ করা যায়, তাহলে মার্কসের ভূত আর তাড়া করে বেড়াবে না; ‘অন্তর্ঘাত’-এর রাজনীতির নামে কিছু কুযুক্তি দিয়ে বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার সাফাই গাইতে হবে না। এই সমাজকে ভেঙে দেবার রাজনীতিকেই এই সমাজকে রক্ষার কাজে ব্যবহার করা যাবে। বন্ধু বেশে মার্কসের উপর এত বড়ো আক্রমণের পরিকল্পনা ইতিপূর্বে আর কখনও হয়নি।
উত্তর আধুনিকতাবাদের গুরুত্ব
কিন্তু যত তীব্র সমালোচনাই করা হোক না কেন, উত্তর আধুনিকতাবাদ আজ যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শ, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বুদ্ধিজীবীদের একটা বড়ো অংশ আজ এই মতাদর্শের সমর্থক। বহু মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ত্যাগ করে ক্ষুদ্র, স্থানিক আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাভিত্তিক পার্টিতে যোগ দিতে তাঁরা অনীহা প্রকাশ করছেন। বরং তাঁরা চাইছেন ঢিলাঢালা সাংগঠনিক কাঠামো। বিপ্লবের বদলে তাঁরা চাইছেন সংস্কারবাদী আন্দোলন। এঁদের সকলেই অসৎ নন, সকলেই সহজ পথে কেরিয়ার গড়তে এই তত্ত্ব গ্রহণ করেননি। তাঁরা বিশ্বাস করেন মার্কসবাদ ভ্রান্ত, সঠিক হল উত্তর আধুনিকতাবাদ।
কেন তাঁরা একথা বিশ্বাস করেন? এর একটি কারণ অবশ্যই উত্তর আধুনিকতাবাদের তীক্ষ্ম বাচাতুর্য। তাঁরা যে ঊনবিংশ শতকে ফেলে আসা কিছু মতবাদকেই আধুনিক মোড়কে বিক্রি করার চেষ্টা করছেন তা সরাসরি বোঝা যায় না। এই মতবাদের অন্তর্নিহিত ভাববাদী দর্শন, এই মতবাদের যুক্তিবাদ বিরোধিতা, এই মতবাদের অন্তর্নিহিত নিহিলিজম্ এবং সর্বোপরি এই মতবাদের যুক্তিবাদ বিরোধিতা, এই মতবাদের অন্তর্নিহিত নিহিলিজম্ এবং সর্বোপরি এই মতবাদ যে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর সমর্থক-এসব কিছুই কঠিন কিছু ডিস্কোর্সের আড়ালে ঢাকা থাকে। ফলত তৈরি হয় এক মতবাদের পরিমণ্ডল যাকে এক কথায় নাকচ করা যায় না। এই পরিমণ্ডল কতটা সচেতনভাবে গড়া হয়েছে তা বিতর্কের বিষয়। কিন্তু যাঁরা নতুন কথা শুনতে চান, এই মতাদর্শগত পরিমণ্ডলের আকর্ষণ তাঁদের কাছে তীব্র হয়ে-ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
অন্য একটি কারণেও এই মতবাদ বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীদের আকর্ষণ করেছে। মার্কসবাদ, বিশেষত তৃতীয় আন্তর্জাতিক-লালিত মার্কসবাদ মার্কসের বহু শিক্ষাকে আপ্তবাক্যে পরিণত করে তার বিপ্লবী মর্মবস্তুকে নষ্ট করেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, এ যাবৎকালের সামাজিক ইতিহাস শুধু শ্রেণি সংগ্রামেরই ইতিহাস নয়। শ্রেণি ছাড়াও মানুষের অন্য সত্তা থাকে এবং সেই সত্তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক দ্বন্দ্বও ইতিহাসকে প্রভাবিত করে। এই ইতিহাস ও শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাসের আন্তঃসম্পর্ক কী, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। তার জন্য দ্বান্দ্বিক বিশ্লেষণ কাঠামো ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই বটে, কিন্তু ‘ইতিহাস শুধু শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস’-এই আপ্তবাক্য উচ্চারণ করে গেলে এই আন্তঃসম্পর্ক আদৌ বোঝা যাবে না। দুর্ভাগ্য এই যে, কমিউনিস্ট পার্টি এই আপ্ত বাক্য উচ্চারণ করেই সমস্যাটির সমাধান খুঁজে এসেছে। সঙ্গত কারণেই এভাবে তাঁরা এই জটিল সমস্যার সমাধান পাননি। তাঁদের কর্মীবাহিনী হতাশ হয়েছেন। এই হতাশ কর্মীবাহিনী যখন মানুষের বহুমাত্রার তত্ত্ব বুঝছেন, তার সাথে সাথে এটাও তাঁরা বুঝে নিচ্ছেন যে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হল ভ্রান্ত। আসলে মতবাদ যখন আপ্তবাক্য হয় তখনই তার মৃত্যু ঘটে। যে পরিমাণে কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদকে আপ্তবাক্যে পরিণত করছে, সেই পরিমাণে তা মার্কসবাদকে ধ্বংস করছে। মতাদর্শে এর ফলে শূন্যতা সৃষ্ট হচ্ছে, ফলত তাতে উত্তর আধুনিকতার আগাছা জন্মানোর সুযোগ বাড়ছে। এই রচনার শেষে অধ্যায়ে এ নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।
মার্কসবাদকে এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে হবে। এই সীমাবদ্ধতা কাটাবার জন্য তার মধ্যে গড়ে ওঠা মতান্ধতা দূর করতে হবে। মার্কসবাদ ধর্মীয় মতবাদ নয়। এই মতবাদের ভিত্তি হল যুক্তি, ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট যে যুক্তিবোধের সাধনা করেছে মার্কসবাদ এসেছে তারই ধারাবাহিকতায়। মতান্ধতা দূর করলে মার্কসবাদীরা দেখতে পাবেন, যুক্তির দিগন্ত বহুদূর প্রসারিত এবং বহু কিছু থেকে শিক্ষা নেবার আছে। এমনকি তাকে খণ্ডন করতে যা গড়ে তোলা হয়েছে, ‘সেই উত্তর আধুনিকতার বিনির্মাণ থেকেও তার শিক্ষা নেবার আছে। এই শিক্ষা নিয়ে নিজেকে সে আরো শক্তিশালী করে তুলতে পারে এবং এভাবেই সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
কিন্তু একথাও একই সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার যে মার্কসবাদকে উত্তর আধুনিক তত্ত্বের কাঠামোতে পুনর্বিন্যাস করার কোনো প্রচেষ্টাকেই অনুমোদন করা যায় না। কারণ, মার্কসবাদ সমাজ ব্যবস্থায় যে মৌলিক পরিবর্তন চায়, কোনো উত্তর আধুনিকতাবাদী তত্ত্বে তা ধারণ করা যায় না। না যাওয়ার কারণ হল, মার্কসবাদীরা যে পরিবর্তন চান, সেটা দাঁড়িয়ে আছে সমাজব্যবস্থা সংক্রান্ত একটা বিশেষ ইতিহাস তত্ত্বের ওপর। এই তত্ত্বের ভিত্তি হল বস্তুবাদ ও যুক্তিবাদ—উত্তর আধুনিকতা যা ঠিক মনে করে না।



মন্তব্য নেই
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.
Philip W
প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর ২০১৮ প্রতিমন্তব্যPhasellus hendrerit. Pellentesque aliquet nibh nec urna. In nisi neque, aliquet vel, dapibus id, mattis vel, nisi. Sed pretium, ligula sollicitudin laoreet viverra, tortor libero sodales leo, eget blandit nunc tortor eu nibh. Nullam mollis. Ut justo. Suspendisse potenti.